Saturday 19 December 2020

অনির ডাইরি, ১৮ই ডিসেম্বর, ২০২০

 


“বাবা একটা পেন্সিল এনো তো” ডাইনিং টেবিল থেকে গলা উঁচু করে বলছে তুত্তুরী। একটা মানে এক বাক্স। ও এমনি বলে। মামমাম- দাদুর রূপকথার জগৎ থেকে যখন উপড়ে নিয়ে এসেছিলাম আমাদের লাল নীল সংসারে, প্রথম সপ্তাহেই চারতলার বারন্দা থেকে এক পাটি হাওয়াই চপ্পল নীচে ফেলে দিয়েছিল বছর সাড়ে তিনের তুত্তুরী। নাঃ এক্কেবারে মাটিতে পড়েনি, পড়েছিল একতলার অধিবাসীর সান শেডের মাথায়। দোতলার বারন্দা থেকে লাঠি গলিয়ে তাকে দিব্যি তুলে আনা যেত, কিন্তু দোতলার ঐ ফ্ল্যাটের অধিবাসী ভিনদেশে পরবাসী। ফলতঃ অতীব বিরক্ত হয়ে যখন কিনে আনলাম নতুন হাওয়াই চপ্পল, তুত্তুরী অবাক হয়ে বলেছিল,“দুটো আনলি কেন মা? একটা তো আছে-”।  তখন তুইতোকারি করত তুত্তুরী ওর বাবাকে আর আমাকে। শৌভিক বড় ভালোবাসত ঐ সম্বোধন, কিন্তু সমাজের ভয়ে পাল্টাতে বাধ্য করেছিলাম মেয়েকে। আজ খুব আফশোস হয় সেই দিনগুলো, সেই ছোট্ট তুত্তুরীর কথা ভাবলে। 


একবার ডেট পেরিয়ে যাওয়া জনসন শ্যাম্পু খেয়ে নিয়েছিল তুত্তুরী। সে কি কাণ্ড। বাপরেঃ। তখনও চার বছর পুরো হয়নি। সন্ধ্যা বেলা। সদ্য আপিস থেকে ফিরেই দেখি লোড শেডিং। তখনও জেনারেটর বসেনি আমাদের আবাসনে, মোমবাতিই ভরসা এবং মোমবাতি বাড়ন্ত। একখান মোমবাতি জ্বালিয়ে ডাইনিং রুমে বসে দরদর করে ঘামছি, মাঝে মাঝে মাসি ঐ মোমবাতিটাই নিয়ে যাচ্ছে রান্নাঘরে চা বানাতে। উল্টো দিকের চেয়ারে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছিল তুত্তুরী, আচমকা কখন অন্ধকারে পেঁচো মাতালের মত ঠাকুর ঘরে ঢুকে টুক করে এক ছিপি পচা বেবি শ্যাম্পু খেয়ে এসেছে কে জানে? দুম করে যখন আলো এল, ধাঁধিয়ে যাওয়া চোখ সামলে দেখি কন্যা মুখ দিয়ে ফুঃ ফুঃ করে বড় বড় বুদবুদ বানাচ্ছে এবং ওড়াচ্ছে। প্রাথমিক ভাবে মাথাতেই আসেনি কি করব এই হাড় বজ্জাত মেয়েটাকে নিয়ে। খাবার মত আর কিছুই কি পেলি না বাপ তুই? শৌভিক তখনও বিডিও, আবাস সুদূর দক্ষিণ ২৪পরগণার উস্তি। বাড়ির কর্তাগিন্নী সবই আমি। ফোন করলাম, বেজে গেল। অগতির গতি সেই আমার বাপ। প্রাথমিক হাউমাউ থামিয়ে সব শুনে তিনি ফরমান দিলেন গলায় আঙুল দিয়ে বমি করা। সদ্য খেয়েছে বোঝাই যায়। কাকে বমি করাব? তিনি তো মুখ খুলতেই চাননা। জবরদস্তি হাঁ করিয়ে, তিনবার কামড় খেয়ে বমি করাতে গিয়ে নখে হাল্কা চিরে গিয়েছিল তুত্তুরীর গলা। আমি কাঁদছিলাম মেয়ে বাঁচবে কি না এই আতঙ্কে, আর মেয়ে কাঁদছিল চিরে যাওয়া গলা আর মুখ দিয়ে আর বুদবুদ না বার করতে পারার দুঃখে- 


“বাবা ডমের পেন্সিল আনবে, ওগুলোর পিছনে রাবার থাকে, খুব সুবিধে হয়। ”পুনরায় চিৎকার করছে তুত্তুরী। এতক্ষণ গুণগুণ করছিল, দিবারাত্র দুর্গা স্তোত্র গায় তুত্তুরী। আমার অনবধানতার সুযোগে অথবা বাবাকে পটিয়ে মোবাইল পেলেই দুর্গা- কালী- ছিন্নমস্তার ভিডিও দেখে তুত্তুরী। তারপর তাই নিয়ে চলে দাদুর সাথে গোপন আলাপচারিতা। ঠাম্মা দাদু অর্থাৎ শ্বশুরমশাইকেও শোনাতে চায় তুত্তুরী, তবে ভদ্রলোক চিরকেলে অধার্মিক, ওসব ধর্ম কথা শোনাতে গেলেই উল্টে স্যামসন আর ডিলাইলার গল্প শোনান। অথবা শোনান স্পার্টাকাসের উপাখ্যান, পরিণাম? দিনান্তে নৈমিত্তিক দুর্গা-কালীচরিতের পাশাপাশি ঐ গল্পগুলোও শুনতে হয় আমার বুড়ো বাপটাকে। দাদু হওয়া কি মুখের কথা!


শৌভিকের দৃঢ় ধারণা, বাবা তুত্তুরীর সবকথা শোনে না। এত অত্যাচার আশি বছুরে হাড়ে সইবে না, বাবা নির্ঘাত ফোনটা টেবিলে রেখে ঘুরে বেড়ায় বা কাজকর্ম করে। এত সহজে যদি ছাড় পাওয়া যেত তাহলে তো মিটেই যেত, বাবা শোনে। ধৈর্য ধরেই শোনে, মাঝে মাঝে কিছু বলে, তুত্তুরী ভুল বললে সংশোধন করিয়ে দেয়। তাতে অনেক সময় হিতে বিপরীতও হয় বটে। মনের অমিল হলেই রেগে গিয়ে ঘ্যাঁচ করে ফোন কেটে দেয় তুত্তুরী। 


বেচারা মামমাম, তাঁর জগৎটাই তুত্তুরীকে ঘিরে অথচ তাঁর জন্য বরাদ্দ মিনিট দুয়েক কেবল। তুত্তুরীর প্রতি মামমামের স্নেহ প্রায় স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর রচিত গোপালের মাসির তুল্য। সেই যে মাসির কান কামড়ে দিয়েছিল গোপাল, কবে যে তুত্তুরী অমন কামড়াবে সেই অপেক্ষায় বসে আছি। কামড়ানোই উচিৎ। ফোন করলেই খালি তুত্তুরীর খবর নেয় মা। তুত্তুরীর শতেক গলতিতেও কোনদিন দোষ দেখে না মা। ছুটির দুপুরে সাধের ভাতঘুম দিয়ে উঠে দেখি দপ্তরী মোবাইলটা ভাঙা -কে ভেঙেছে তাই নিয়ে তদন্ত কমিশন বসানো নিষ্প্রয়োজন কারণ হত্যাকারী ভাঙা মোবাইলে কাঁচে হাত কেটেছেন- অন্তত তিনি তাই দাবী করছেন বটে। সেই কাটা দেখতে অবশ্যি রীতিমত অণুবীক্ষণ যন্ত্র প্রয়োজন। এমন খবরেও কোন হেলদোল থাকে মায়ের? মনখারাপী সুরে নালিশ করার পর মায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া হল,“আহারেঃ ওর হাত কেটে গেছে? খেয়াল রাখবি তো?” অতঃপর,“ ওকে এত দামী মোবাইল দিসই বা কেন বাবা? সব দোষ তোর। পড়াশোনার জন্য যদি দিলি তো খাটে বসিয়ে দিবি তো?” ধেড়ে মেয়েকে আমি খাটে বসিয়ে মোবাইল ধরাব? তাও নিদ্রিত অবস্থায়? বিরক্তি প্রকাশ করলে উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে ক্রুদ্ধ স্বর এবং ঘ্যাঁচ করে কাটা হয় ফোন। বেশ বুঝতে পারি, মতের অমিল হলেই ফোন কাটার বদভ্যাসটা আমার কন্যা কোথা থেকে পেয়েছে। 


আর একটা জিনিসও মায়ের থেকে পেয়েছে তুত্তুরী, হুট কথায় গঙ্গাযমুনা বইয়ে দেওয়া। আজই যেমন, “তুমি মামমামকে কেন বকলে, ওহো হো” করে হাপুস নয়নে কাঁদছিল তুত্তুরী। যত বলি বকিনি তো, বলেছি যা বলার জলদি বলো, আপিস বেরোতে দেরী হয়ে যাচ্ছে। একটু থিতু হয়েই আবার ফোন করব মামমাকে, শোনে কে? “তুমি সবাইকে বকো। বাড়িতে- মামমামকে- অফিসে ও হো হো”। বোঝ কাণ্ড আমার আপিসে আমি কাকে বকব আর কাকে হামি খাবো সেটাও কি আমার কন্যা ঠিক করে দেবে নাকি? দেরী ভুলে কিছু বোঝাতে গেলাম শৌভিকের মুচকি মুচকি হাসি দেখে থমকে গেলাম। বর বলল, “এই হাপুস নয়নে কাঁদাটা একদম তোর মত”। যেটা বলতে পারলাম না সেটা হল,মোটেই অমন করুণ সুরে কাঁদি না আমি। বা হয়তো কিছুটা কাঁদি, কারণ আমার শরীরেও তো সুদূর মুর্শিদাবাদের রামনগর গাঁয়ের ঘোষ বাড়ির রক্ত আছে। মায়ের থেকে আমি হয়ে তুত্তুরীর মধ্যেও সেই জিন, জিনদৈত্য হয়ে বেঁচে আছে। 


বেঁচে থাকুক জিনদৈত্য, এমনি আক্খুটে থাকুক তুত্তুরী,এমনি স্নেহে অন্ধ থাকুক মা, একটু গপ্পে বুড়ো হয়েই বেঁচে থাকুক বাবা আর এমনি নীতি শিক্ষা দিয়ে যান শ্বশুরমশাই।  আজকের প্রতিটা মুহূর্তই তো কাল নিখাদ ইতিহাস। আর ইতিহাস যত রঙীন হয়, ততোই তো ভালো।  আজ সকালেই বলছিল এক ফুলওয়ালী বন্ধু, হোয়াটস্অ্যাপে যার স্টেটাস দেখার জন্য মুখিয়ে থাকি আমি, যার একচিলতে বারন্দায় বিরাজ করে চিরবসন্ত। পিটুনিয়া, গেজেনিয়া, প্যানজি, ডায়ান্থাস নামগুলো তো ওর থেকেই শেখা। ফুল ছাড়া যেটা লাগায় ওর দুলালীর গুচ্ছ গুচ্ছ ছবি। এখনকার তন্বী,রূপসী কন্যা নয়, বরং শৈশবের গাল ফোলা, আলুভাতে মার্কা মেয়ের ছবি লাগায় ওর মা। সেই প্রসঙ্গেই বলছিল,  “ছোট্ট মেয়েটাকে ভীষণ মিস করি যে, ছেলেমেয়েগুলো বড় হঠাৎ করে বড় হয়ে যায়। ” আরো না হয় একটু এমনি থাকুক সবকিছু। ফুসফুসে ভরেনি আরেকটু ভালোবাসা।

Saturday 12 December 2020

তুত্তুরী উবাচ ১২ই ডিসেম্বর, ২০২০

 


👧🏻-(সকাল সকাল বাংলা বিপরীত শব্দ মুখস্থ করার ফাঁকে) জানো তো মা, রোজ যদি তুমি ভাতের পাতে একটু করে সর্ষে শাক খাও, তোমার ওবেসিটি কমে যাবে। 


👩🏻-(ব্যাঙ্গাত্মক সুরে) কি করে জানলে মা? ব্যাকরণ বইয়ে লেখা আছে? 


👧🏻-(কিঞ্চিৎ  ম্রিয়মাণ হয়ে বইয়ের পাতা উল্টে) ইউটিউবে দেখেছি। (আরো কিয়ৎক্ষণ পড়ার পর, কাতর স্বরে) মা একটু ছেড়ে দাও না, দাদুকে একবার ফোন করি-


👩🏻- পড়তে বসলেই তোর এত দাদুর কথা মনে পড়ে কেন রে? মুখস্থ হল? দে তো ধরি-


👧🏻-আঃ আবার ধরা কেন? পরীক্ষা তো সেই মঙ্গলবার। দাদুকে একটু রঙ্কিনী কালীর গল্পটা শোনাই না। (মা নিরুত্তর দেখে উৎসাহিত হয়ে) জানো তো মা কালী দুরকমের রঙ্কিনী কালী আর উলঙ্গ কালী। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আমি জীবনেও উলঙ্গ কালী দেখিনি। 


👩🏻-(তিতিবিরক্ত হয়ে) তুই আজ অবধি যত কালী দেখেছিস, সবাই উলঙ্গ কালী। টাটকার বিপরীত শব্দ কি?


👧🏻-(ততোধিক বিরক্তি নিয়ে) বাসি। উঃ ঐ রকম নয়, ওণারা তো বর্ম পরে থাকেন- 


👩🏻-বানান কি?


👧🏻-(হতভম্ব হয়ে) কিসের? (সামলে নিয়ে) ওঃ বাসি। ব য়ে আকার ষ এয়ে ই। না,না ঈ। 


👩🏻-(হতাশ হয়ে) হে ভগবান। এর মাথা থেকে উলঙ্গ কালীকে নামাও। মূর্খের বিপরীত শব্দ কি?


👧🏻- জ্ঞাতি। 


👩🏻-কিঃ?


👧🏻-(নির্বিকার চিত্তে) জ্ঞাতি। 


👨🏻-(পাশ থেকে গম্ভীর মুখে) তাহলে বুঝতে পারলি ওর প্রজাতিটা কি?


👧🏻-(মায়ের অট্টহাস্য আর বাবার গম্ভীরমুখ পর্যায়ক্রমে পর্যবেক্ষণ পূর্বক, হাল্কা সুরে) এই, ডোন্ট স্প্রে ছিটে অব সল্ট ইন কাটা ঘা।

Wednesday 2 December 2020

পায়ের তলায় সর্ষে, ড্যামচি বাবুর দেশে-

 #ড্যামচি_বাবুর_দেশে 1

প্রৌঢ় পাথরের পাঁজরে ব্যথা জাগিয়ে খিলখিল করে হেসে দৌড়ল নদী, যেন প্রথম প্রেম প্রস্তাব পাওয়া সদ্য কিশোরী। জানেই না, জীবন পেতে রেখেছে কতবড় ফাঁদ। ঝপাং করে ঝাঁপ দিল নদী। পড়তে পড়তেও ধরে রাখল মুখের হাসি। কিন্তু সে অার কতকক্ষণ?

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10216355866716479&id=1449214651

খালি পায়ে এদের ওপর দিয়ে যেতে হবে,উশ্রী ফলসের ওপরে,রোমাঞ্চকর, কি বলুন?

পায়ের তলায় সর্ষে-

#ড্যামচি_বাবুর_দেশে -২

ঝাঁপিয়ে তো পড়ল নদী, কিন্তু এবার কি?

জীবন বড় রুক্ষ, নদী তা তো জানত না। 

অকালেই বৃদ্ধ হল,ভাঙল নদীর বুক। 

ক্লান্ত নদী বয়ে চলে, বদলে যায় ঋতু,

পাঁচটা ঋতু বদল হলে,হঠাৎ আসে সে। 

দামাল ছেলে বর্ষার তখন সোহাগ দেখে কে?

শরমে মরে নদী, খুশিতে মেশে ভয়, 

এই বুঝি সাড়ম্বরে শরৎ এসে হাজির হয়। 

উৎসবে মজে দুই পাড়,শুধু নদীর চোখে জল-

হাত ছাড়িয়ে বর্ষা বলে, “আমি তোমারই, আসব আবার কাল”।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10216361556298715&id=1449214651


উশ্রী ফলস

তাহলে শেষ থেকেই শুরু করা যাক। এই মুহূর্তে আমরা বসে আছি,মধুপুরের লীলাকমল গেস্ট হাউসে। আসার পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘদিনের। জনৈক বন্ধুর মুখে বছর খানেক আগে শোনা ইস্তক আমার বরের আসার ইচ্ছা। প্রথম চোটে যাদের সাথে আসার কথা ছিল, আমাদের উভয়ের অনুজ প্রতিম এক দম্পতি, কিছু ব্যক্তিগত  সমস্যার জন্য তারা আর শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গী হতে পারল না। বদলে যারা হল, তাদেরও কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য আসার পরের দিনই ফিরে যেতে হল। ফলতঃ আপাততঃ আপনি আর কপনি সম্বল। 


মধুপুর ঠিক সফিস্টিকেটেড ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়। কে যেন শৌভিককে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছে,মধুপুরে আবার মানুষ আসে? তাতে আমার বর বেশ আহত। সত্যিই তো মধপুরে কেন আসবেন বলুন তো? পাঁচতারা বাদ দিন গোটা দুয়েক তারার হোটেলও মধুপুরে বিরল। নেই দাক্ষিণাত্যের  চকচকানি, বা উড়িষ্যার গৌরব। নেই হিমালয়ের উন্নাসিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নেই সমুদ্র। নেই কোন মল-মাল্টিপ্লেক্স বা নিদেন ঝাঁ চকচকে মার্কেট। 

তাহলে মধুপুরে কেন আসবেন? আসবেন তখনি যদি আপনি শৌভিক বা অনির মত গবেট হন। আসবেন যদি ছোটবেলায় পড়া এবং সাদাকালো সিনেমায় দেখা বাঙালীর পশ্চিমের প্রতি আপনার দুর্বোধ্য টান থাকে। ব্যোমকেশ থেকে বরদা, প্রিয়তম শরদ্বিন্দু থেকে হাটেবাজারের বনফুল হয়ে বুদ্ধদেব বাবুর ঋজুদা, আমাদের ছোটবেলাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে পশ্চিম। কত গল্প,কত স্মৃতি। মধুপুর জুড়ে এখনও বহু পুরাণো দিনের বাড়ি,যাদের মাথায় বা দরজার পাশের ফলকে বাঙলা হরফে লেখা বাড়ির নাম। সামনে সুদৃশ্য গাড়িবারন্দা। দেখলেই মনে হবে, আরাম কেদারায় বসে চা খাচ্ছেন স্বয়ং ছবি বিশ্বাস। পাশে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে আছেন ছায়াদেবী। এই তো চাদর জড়িয়ে আড্ডা দিতে যাচ্ছেন সদাহাস্যময় পাহাড়ি সান্যাল। ঐ দেখুন ধুতি পাঞ্জাবি পরে পাশ দিয়ে চলে গেলেন সৌমিত্র।শমিত ভঞ্জকে দেখে ঘোমটা টেনে সলজ্জ হেসে সন্ধ্যাদীপ দিচ্ছেন সন্ধ্যা রায়। দুদিকে বিনুনী দুলিয়ে বই নিয়ে পড়তে বসছে তরুণী মহুয়া রায়চৌধুরী। মোদ্দা কথায় মধুপুর মানে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। 


যাই হোক ফিরে আসি লীলাকমলের ঘরে, এ ঘরে কোন বাহুল্য নেই। আসবাব বলতে একটি কিং সাইজের খাট, তাতে একটি ছোবড়ার গদি আর একটি তোশকের ওপর পাতা একটি চাদর। তিনটি পুঁচকে বালিশ,দুটি কম্বল। আলমারি একটি আছে বটে, তাতে তালা দেওয়া। দেওয়ালে তিনটি তাক, তাতেই আমাদের ঘড়ি-মোবাইল কানের দুল, বডি লোশন,চিরুনি ইত্যাদি রাখা। আর আছে তিনটি বেতের চেয়ার,একটি প্লাস্টিকের চাকা লাগানো টেবিল। লাল সিমেন্টের মেঝে। বাথরুমের মেঝেও লাল। বাথরুমের সাইজ আমাদের থ্রী বি এইচ কের মাস্টার বেডরুমের দেড়া। ঘরের লাগোয়া আর একটি ঘর। সেটিতে খাবার প্লাস্টিকের চেয়ার টেবল আছে বটে,তবে এরা চা ছাড়া ঘরে কোন খাবার দেয় না। খেতে হলে নীচের দালানে পেতে রাখা খাবার টেবিলে যেতে হয়। বড় ভালোবেসে খাওয়ান এরা। 

আমাদের ঘরের বৈশিষ্ট্য হল,ঘরের বাইরে বিশাল ছাত। এখানে লোডশেডিং হয়। এই মুহূর্তে যেমন আমরা তিনজন নিকষ আঁধারে শুয়ে বসে আছি। কলকাতায় লোডশেডিং দুর্লভ বলেই হয়তো এত ভালো লাগছে এই আঁধার। বাইরের ছাতে চাঁদের আলোয় বান ডেকেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মন্ত্রচ্চারণের মৃদু আওয়াজ। আজ গুরুপূর্ণিমা বলে কোথাও পুজো হচ্ছে। একটু আগে ঐ মন্ত্রের সুরে মিশেছিল সন্ধ্যাকালীন নামাজের সুর। বড় ভালোলাগল জানেন। যাই একটু ছাত থেকে ঘুরে আসি। বাতাসে কি অসম্ভব মিষ্টি একটা ঠাণ্ডা। আজই মধুপুরে আমাদের শেষ রাত। কাল ফিরে যেতে হবে। কিন্তু ফিরব কি করে?একটু আগে মেসেজ ঢুকল,আমাদের কষ্টের কথা ভেবে ভারতীয় রেলের দুঃখের সীমা নেই,কারণ আমাদের ট্রেন ক্যান্সেল। 

পায়ের তলায় সর্ষে

ড্যামচি বাবুর দেশে ৪

তো যা বলছিলাম আর কি, ছাঁদা বেঁধে বেলা দুটোর পাটনা হাওড়া জনশতাব্দী ধরে মধুপুর যখন নামলাম ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছয়ের ঘরে ঢুকেছে বা ঢুকব ঢুকব করছে। মধুপুর স্টেশন থেকে লীলাকমল গেস্ট হাউস মাত্র এক কিলোমিটার। খবর দিলে ওণারাই গাড়ি পাঠান। স্করপিও গাড়ির ভাড়া পড়ে ১৫০টাকা। 

পশ্চিমে ঠাণ্ডা সদ্য পড়ছে,শহর জুড়ে নামছে হৈমন্তী কুয়াশা। রাস্তাঘাট ফাঁকা। গাড়িঘোড়া নেই বললেই হয়। স্টেশনের ধারে দু চারটি মাত্র দোকান খোলা রয়েছে। যার একটিতে গরম গরম পকৌড়া ভাজা হচ্ছিল,এরা বলে পকোড়ি।হাল্কা শীতে গরম পকোড়ি, লোভ সামলানো দুষ্কর। পাশে এক চুপড়ি গরম নমকিন রাখা। সদ্য নেমেছে কড়া থেকে। সরু, সরু লম্বা লম্বা, অায়তাকার। খেতে অনেকটা আমাদের খাস্তা নিমকির মত, সাথে ইমলি আর মির্চার চাটনি। 

লীলাকমলের বিশাল গ্রীলের গেটের ভিতর অনেকটা বাগান। মূলতঃ গোলাপের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন বর্ণ এবং সাইজের গোলাপ। এছাড়াও নানা রকম ফুলের সমাহার। ফুলের পিছনে লুকিয়ে আছে ফুলকপি। শুনলাম এবারে বর্ষার হাল শোচনীয় বলে অনেক কম গাছ লাগানো হয়েছে। অন্যান্য বার নাকি গোলাপের সাথে ফুলকপি, আলু,পেঁয়াজের চাষ হয় দেখার মত। 

ঘরের কথা আগেই বলেছি। লীলাকমলের একতলার ঘরগুলির সাবেকী বিন্যাসের জন্য ভাড়া মাথাপিছু ৭০০টাকা। আর দোতলার গুলির মাথাপিছু ৬০০টাকা।  বাচ্ছাদের ভাড়া অর্ধেক। আমাদের ঘরের লাগোয়া ছাতের জন্য আমাদের ঘরটি দোতলায় হওয়া সত্ত্বেও ভাড়া ছিল ৭০০টাকা। দাঁড়ান এক্ষেত্রে ভাড়া মানে থাকা খাওয়া সমেত। সকালে এক কাপ চা আর বিস্কুট, প্রাতরাশে লুচি,হয় আলু চচ্চড়ি নয়তো ছোলার ডাল আর রসগোল্লা বা পান্তুয়া, দুপুরে ভাত, ডাল,একটা সব্জি,পাঁপড় ভাজা,আর মাছ/চিকেন/মাটন যেমন ফরমাইশ করবেন। সাথে জিভে জল আনা জলপাইয়ের চাটনী। সন্ধ্যায় আবার চা বিস্কুট। রাতেও দিনের মতই মেনু,তবে ভাতের বদলে রুটিও খেতে পারেন। শৌভিক জানিয়ে রেখেছিল রাতে খাসির মাংস খাবে। রান্না তুলনাহীন। গরম গরম পরিবেশন। রন্ধনশৈলীতে মেলবন্ধন ঘটেছে বাংলার সাথে ঝাড়খণ্ডের, সবকিছুই অতীব সুস্বাদু।  বিশেষতঃ ওদের বেগুন ভর্তার কোন তুলনা হয় না। 

দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৩/১১/১৮ সকাল সকাল পেট ভরে লুচি তরকারি খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আজকের গন্তব্য উশ্রী ফলস্,খাণ্ডুলী লেক আর বুড়া পাহাড়। আরও দুটি ট্যুরিস্ট স্পট আছে, এই পথে,সেগুলি হল তোপচাঁচী লেক আর বাকুলিয়া ফলস্। কিন্তু অপ্রতুল বর্ষার ফলে বাকুলিয়া ফলস্ শুকিয়ে গেছে। তোপচাঁচী লেক হয়ে দাঁড়িয়েছে এঁদো পুকুর। উশ্রী হল বরাকরের একটি উপনদী,গিরিডি থেকে ১৩কিলোমিটার দূরে গহিন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত উশ্রী ফলস এখনও মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা।তেনারা নাকি এখনও লুকিয়ে চুরিয়ে নজর রাখেন পর্যটকদের ওপর। ছবি তোলার ব্যাপারে একটু সাবধান থাকবেন। যদি ড্রাইভার নিষেধ করেন, না তোলাই ভালো। আমাদের ড্রাইভার যেমন না জেনে একবার একদল পর্যটক নিয়ে হাজির হয়েছিল উশ্রী,সেইসময় তেনাদের মিটিং চলছিল। কিছু করেনি অবশ্য কারণ ড্রাইভারের গল্প অনুসারে মাওবাদীদের সাথে নিকটবর্তী এলাকার গ্রামবাসীদের একটা চুক্তি আছে।  এখানে আগত ট্যুরিস্টদের ওরা পরম যত্নে ধরে ধরে ফলস দেখায়। জলে নামায়। বদলে কিছু টাকা পয়সা পায়। এটাই ওদের রুজি। সাধারণ মানুষের পেটে লাথ মারে না মাওবাদীরা। 

 ৩৯ফুট উঁচু থেকে উশ্রী তার জলরাশি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নীচে, চতুর্দিকে গোল নড়বড়ে মসৃন পাথর। গেলে কেটস্ বা স্নিকার পরে যাওয়াই শ্রেয়। নইলে পা মচকানো অবধারিত। স্থানীয়রা আপনাকে নিয়ে যাবে পাহাড়ের ওপরে,যেখানে নদী আপাত শান্ত। তবে জুতো খুলে চড়তে হবে। জুতা রক্ষার দায়িত্বও ওণাদের। এই শেষ নভেম্বরেও ভালো জল আছে উশ্রীতে। শুনলাম আর একমাস পরেই এই  অঞ্চল অগম্য হয়ে পড়বে। কারণ একে তো শুকিয়ে আসবে নদী,তারওপর পিকনিক পার্টির অত্যাচারে নোংরা পুতিগন্ধময় হয়ে পড়বে পরিবেশ। বিগত বছরের পিকনিকের শোলার থালা আমরাও দেখে এলাম,হাওয়ায় উড়ছে এপাশ ওপাশ। 

লীলাকমল গেস্ট হাউস, মধুপুুুর
কমে অাসছে জল,উশ্রী ফলস্ , গিরিডি

এখানে নির্জনতা চিরবিরাজমান। শব্দ করার অধিকার শুধু নদীর। আরেকবার উশ্রী। 

পায়ের তলায় সর্ষে

ড্যামচি বাবুর দেশে ৫

পরবর্তী গন্তব্য খাণ্ডুলি লেক। পশ্চিমের অন্যান্য লেক যেমন বুরুডি বা মাসাঞ্জোরের মতই খাণ্ডুলি। তবে জাঁকজমক অনেক কম। ভিড়ও কম। গোলাকার লেকের জল নীল। জলে ঝাঁক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরো শীত পড়লে নাকি ভিড় আরো বাড়ে। গাড়ি থেকে নামলেই ট্যাক্স দিতে হয়। গাড়ির জন্য কুড়ি টাকা। আর মানুষ পিছুও সম্ভবত গোটা কুড়ি টাকা করে। বাচ্ছাদের লাগে না। লেকের পাড়ে একটা ছোট্ট অ্যামিউজমেন্ট পার্ক আছে। তেমন কিছু না। আমাদের রথের মেলার মত। যদিও সেটা বন্ধ। উশ্রীর উত্তেজনার পর বেশ হতাশ লাগছিল। লেকের উল্টোদিকে গোটা দুই ওয়াচটাওয়ার। যার একটিতে সহজেই ওঠা যায়। অন্যটা পাহাড়ের গায়ে,ভালো চড়াই, তবে সিঁড়ি আছে। সর্বোপরি ঐ সিঁড়ির মুখে পৌঁছতে গেলে বিশাল পাইপ ডিঙোতে হয়। ভাগ্যিস সবাই পশ্চিমী পোশাকে সজ্জিত। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে বুঝলাম উচ্চতার জন্য এ পথ কেউ তেমন মাড়ায় না। সিঁড়ি ভেঙেছে,সর্বত্র ঘাস। নোংরাও বটে। জন্মে কেউ সাফ করে না। তবে ভিউ দুর্ধর্ষ। একদিকে ঘন নীল লেক, পাশ দিয়ে গোল করে লালচে মেটে পথ চলে গেছে,অন্যদিকে ধান ক্ষেত। যার রঙ কোথাও হলুদ,কোথাও হাল্কা সবুজ,কোথাও বা ন্যাড়া ধুসর জমি। আর গোটা মাঠ ঘিরে অসংখ্য পায়ে চলা লাল মাটির পথ। ওপর থেকে পরিযায়ী পাখিদের অলস জলকেলি বড়ই চিত্তাকর্ষক। দেখতে গেলে বাঁধের লাল মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হয়। সদ্য পড়া পশ্চিমা শীতের আদুরে রোদে ঐ পথ ধরে হেঁটে চলার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশে আমি অক্ষম। 

বাঁধের পথে যাওয়ার মুখে বেশ কয়েকটি চাটের দোকান। দেখে জিভে জল আসে। অন্য সময় হলে ঐ মেঠো ধুলো পড়া জিনিস খাব বললে নির্ঘাত শৌভিক তালাক দেবার হুমকি দিত। হয়তো আবহাওয়ার গুনেই নিষেধ করলনা। মা মেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। দশটাকায় ছটি ফুচকা। আলুর সাথে অনেকটা ঘুঘনি মিশিয়ে তেলতেলে ফুচকায় ঠুসে পেঁয়াজ লঙ্কা কুচি ছড়িয়ে তেঁতুল জলে চুবিয়ে খেতে দিল। খেয়ে সত্যিই বলছি তেমন ভালো লাগেনি। আরো খারাপ ওদের পাপড়ি চাট। পাপড়ি চাটে পাপড়ি তো থাকে,দই থাকে না। বদলে দেয় একগাদা ঘুঘনি ঢেলে। ওপরে পেঁয়াজ কুচি,এক খাবলা ঝুরি ভাজা আর লাল লোকাল টমেটো সস্ ছিটিয়ে ধরিয়ে দেয়। মূল্য তিরিশ টাকা। ঐ সব খেয়েও মরিনি বা গরহজম হয়নি কারো,আশা করি মধুপুরের জলের এর থেকে ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারে না। 



ওয়াচটাওয়ারের পথে-

ওয়াচটাওয়ার থেকে এক ঝলক খাণ্ডুলি লেক-

ওয়াচটাওয়ার থেকে এক ঝলক খাণ্ডুলি লেক-

মেঠো বাঁধের ওপর থেকে নীলচে খাণ্ডুলি লেক-
খাণ্ডুলিতে নিরুপদ্রব পরিযায়ী পাখির দল-
সবে তো আনাগোনা শুরু,শীত যত বাড়বে,পাল্লা দিয়ে এনাদের ভিড় বাড়বে- 

পায়ের তলায় সর্ষে

ড্যামচি বাবুর দেশে -৬

পরবর্তী গন্তব্য বুড়া পাহাড়। এটা ছোটনাগপুর জনাব, এখানে তো সব পাহাড়ই বুড়া। তাহলে আর যাব কেন? এদিকে বেলা দুটো বাজে, ফিরে গিয়ে লাঞ্চ করতে হবে, ড্রাইভার বিড়বিড় করে বলল,“সবাই আসে তো। ভালো লাগবে। বুড়া বাবার মন্দিরও আছে। ” অগত্যা উপরোধে ঢেঁকি গেলা।  

শেষ নভেম্বরের মিষ্টি রোদের হাল্কা ওমে গাড়িতে বসে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আচমকা প্রচণ্ড ঝাঁকানিতে ঘুম ভেঙে গেল। ঢালু এবড়োখেবড়ো পথে গড়াতে গড়াতে গাড়ি যেখানে এসে থামল, নেমে মন ভরে গেল। এইরজায়গার নমষহওয় উচিত শান্তিনিলয়।  চারপাশে সত্যিই বুড়োহাবড়া ক্ষয়া ক্ষয়া পাহাড়। পাহাড়ের পাথর গুলো সময়ের আঁচড়ে ফোঁপরা হয়ে গেছে স্পঞ্জের মত। পাহাড়ের গা ঘেঁষে কয়েকটি নিঃসঙ্গ নারকেল গাছ আর পটে আঁকা ছবির মত রাস্তা।  এণাদের মধ্যে যিনি বৃহত্তম,তাঁর বুকের ভিতর সযত্নে রক্ষিত একটি টলটলে পুষ্করিণী।বাঁধানো গোল সিঁড়ি সভয়ে স্পর্শ করেছে পুষ্করিণী পবিত্র অঙ্গ। সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বিরাজমান অখণ্ড নিস্তব্ধতা আর শান্তি। অদূরেই বুড়াই বাবার মন্দির,বুঝতেই পারছেন আশা করি বুড়াই বাবা কে? আমাদের ভোলা মহেশ্বর। 

বুড়া পাহাড়ের কোলে,ঐ বাঁধানো পুকুর ঘাটে সারাদিন বসে থাকা যায়। প্রচণ্ড গরমেও নাকি এখানে শীতল বাতাস বয়। জনবিরল।বুড়ো পুরোহিত যদিও বললেন,সামনের মাসের তিন চার তারিখে ওখানে বিশাল মেলা বসে। তখন এত ভিড় আর নোংরা হয় বুড়াপাহাড়,যে না যাওয়াই মঙ্গল। 

লীলাকমলে যখন ফিরলাম প্রায় পৌনে চারটে। মুখ হাত ধুয়েই খেতে বসতে হল,খেয়ে উঠে পাথরোল কালি বাড়ি যেতে হবে। স্থানীয় পাঁচশ বছরের পুরাণো কালি মন্দির। খাবার বলতে গরম ভাত,মুসুর ডাল, মাছের মাথা দিয়ে বাঁধা কপির তরকারি,পশ্চিমী মসলা পাঁপড় ভাজা, সর্ষে আর ধনে পাতা বাটা দেওয়া কাতলা মাছের অতীব সুস্বাদু ঝাল আর হাল্কা গুড়ের ছৌঁকা দেওয়া জলপাইয়ের জিভে জল আনা মিষ্টি চাটনী। 

খেয়ে যখন বের হলাম,সূর্য ঢলতে শুরু করেছেন পশ্চিমে। পাথরোল কালি বাড়ি আর পাঁচটা কালিবাড়ির মতই। গোলাকার চত্বরকে ঘিরে অনেকগুলি মন্দির। লোকজনের ভিড় তেমন নেই। মন্দির গাত্রে অসংখ্য লম্বাটে লালচে আঙুলের ছাপ। পুরোহিত মশাই বাঙালী।  ভাঙা বাংলায় বললেন,দিওয়ালির সময় স্থানীয় রমণীরা নতুন সিঁদুর কৌটো খুলে প্রথমে মন্দির গাত্রে পরায়, তারপর সারা বছরঐ সিঁদুরই রঞ্জিত করে সিমন্ত। পাথরোলের মায়ের মূর্তিটি বড় অদ্ভুত। চোখ গুলি রূপোর বলে কি না জানি না,কেমন যেন ধকধক করছে। অবশ্য কম আলোয় ভুলও দেখে থাকতে পারি। সন্ধ্যা নামছে,ঘরে ফেরার পালা। কাল যাব দেওঘর। বাঁদর আর হনুমানের মস্তানির আখড়া। এসে ইস্তক শুনছি তাদের অত্যাচারের উপাখ্যান। ক্যামেরা মোবাইল মায় ব্যাগটুকুও বোধহয় গাড়িতে রেখে যেতে হবে। তুত্তুরীকে চেপে ধরে থাকতে হবে,না হলে নাকি বাঁদরে আপনজন মনে করে টানাটানি করবে।  তবে সে গল্প আবার পরে,সুযোগ পেল বলা যাবে খণ। আপাততঃ গরম ভাত আর ঝাল ঝাল দেশী মোরগের ঝোল আমাদের প্রতীক্ষারত। সাথে ডাল,আলু পটল আর সেই মনমোহিনী বেগুন ভর্তা- উলস্। 

বুড়াই বাবার মন্দির।
বুড়ো পাহাড়ের ছোট্ট পুকুর।
এই জায়গায় নাম হওয়া উচিত শান্তিনিলয়।
বুড়াই বাবার মন্দিরের উল্টোদিকের পাহাড়ের মাথায় একাকী দেউল। কে জানে কার অধিষ্ঠান সেখানে?
বুড়া পাহাড়ের ফোঁপরা পাথর
পাথরোল কালিবাড়ির মা কালী।
পাথরোল কালিবাড়ি
পাথরোল কালিবাড়ি।

পাথরোল কালিবাড়ি।

পায়ের তলায় সর্ষে
#ড্যামচি_বাবুর_দেশে -৭
যবে থেকে মধুপুরে পা রেখেছি,শুনে আসছি বাঁদর আর হনুমানের উৎপাতের না না কিস্যা। ত্রিকূট পাহাড়ে যাবার নাম করতেই ড্রাইভার সাহেব বললেন,“স্যার,ওখানে কিন্তু ক্যামেরা লিয়ে যাবেন না। ম্যাডাম ব্যাগও গাড়িতে রেখে যান। আর বাবুকে চেপে ধরে রাখবেন।”কেন রে বাবা?সে বিষয়ে পরে জানাব-আপাততঃ রইল ত্রিকূট পাহাড়ে রোপওয়ে চড়ার ভিডিও। পারলে শুনে দেখুন গাইড কি বলছে-  বান্দরসেনা নিয়ে। শৌভিক প্রশ্ন করছে, ওপরে বাঁদর আছে কি না। কারণ নীচে যাকে বলে থিকথিক করছে গিজগিজ করছে লালমুখো বাঁদরের দল। গাড়ির দরজা খুলে টুক করে নেমে পড়েই ধড়াম করে দরজা বন্ধ করতে হল। নইলে তারা নাকি দল বেঁধে ঢুকে পড়ে। গাইড নিতেই হয়। কারণ বাঁদর বাহিনী ভয় পায় কেবল, গাইডকুলকে। তাদের প্রতেকের হাতে সদ্য ভাঙা গাছের ডাল এবং বাঁদর দেখলেই, সপাং-শব্দে পশ্চাতদেশে এক বাড়ি মারে। বাঁদরকুল ঐ বাড়ি খেয়ে পগার পার। তবে অনুগ্রহ করে গাইড বাবুকে নকল করার চেষ্টা করবেন না। ঐ ঠেট দেহাতী ভাষায় উদোম খিস্তি মারতে ভালো,নাহলে কিন্তু বাঁদরে প্রথমে ঝাঁপিয়ে আপনার লাঠি কেড়ে নেবে,তারপর ঘ্যাঁক করে দেবে কামড়ে। তারপর সদ্ব্যবহার করবে ঐ লাঠির। কি দরকার বাপু?

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10216390750308547&id=1449214651

পায়ের তলায় সর্ষে

#ড্যামচি_বাবুর_দেশে-৮

তপোবন কেন যাব? ওখানে কি আছে?প্রশ্নের জবাবে ড্রাইভার সাহেব,গাড়ি চালাতে চালাতে রজনীগন্ধা পানমশলার ভুরভুরে সুগন্ধ ছড়িয়ে বললেন,“তেমন কিছু না বউদি। ঐ কয়েকটা মন্দির আছে।”এদিকের মন্দির মানে সবই বুড়া পাহাড়ের মন্দিরের মত আভরণহীন, একচালা সিমেন্টের মন্দির। ইতিমধ্যে নওলখা মন্দির,বালানন্দ আশ্রম, অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম দেখে ক্লান্ত। আবার মন্দির? এমনিতে দেওঘর আসার আমার তেমন ইচ্ছা ছিল না। এসেছি শৌভিক আর তুত্তুরীর চাপাচাপিতে। ত্রিকূট পাহাড়ে নাকি রোপওয়ে চালু হয়েছে,সেই রোপওয়ে চড়বার প্রলোভন দেখিয়েই মূলতঃ তুত্তুরীকে আনা হয়েছে মধুপুর। আর শৌভিকের কাছে দেওঘর মানে পিওর নস্টালজিয়া। সেই কোন সুদূর শৈশবে এসেছিল, শ্বশুরমশাই তখন বীরভূমে মহম্মদবাজারের বিডিও। আড়াই তিন বছর বয়সী শৌভিক বাবার হাত ধরে ত্রিকূট পাহাড়ে চড়েছিল,সেই স্মৃতিই দেওঘর টেনে আনার মূল চালিকা শক্তি। 

তপোবনের সামনে গাড়ি থামতেই গোটা দুয়েক লোক এসে গাড়িকে ঘিরে ধরল, এরা হকার। হনুমানের খাবার বিক্রি করে। তপোবনে গিজগিজ করছে হনুমান। হকারদের সাথে এদের কনট্র্যাক্ট  আছে, খাবার দিয়ে দিলে আপনাকে বিব্রত করবে না। নাহলেই-

দুপ্যাকেট খাবার কিনে আমরা রওণা দিলাম। পথে বাজারের মধ্যে খুলে রাখতে হল জুতো। এক বয়স্ক ব্যক্তি পরম যত্নে আমাদের পথ দেখাতে লাগলেন। পরে বুঝেছিলাম উনি গাইড। এখানে গাইডরা আগে থেকে পরিচয় না, এমনি এমনি সহযাত্রী হয়ে পড়ে। পথের শেষে আপনি এমন ফাঁসবেন,যে ঐ গাইডই হবে আপনার ত্রাতা। 

প্রথমেই সাক্ষাৎ হয় একপাল হনুমানের সাথে। গাইডই বলে দেয়,“দিন। দিন খাবার দিন। ”শৌভিকের হাতের প্যাকেটটা একটা হনুমান এসে নিয়ে গেল। বেচারা তুত্তুরী, ওর হাতের প্যাকেটটাও বাড়িয়ে দিয়েছিল,হনুমানটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেল। আমার মেয়ে তারপর বেশ কয়েকটা হনুমানকে সাধল,“খাবি?খাবি?”কেউ খেল না গো। গাইড বলল,“দিল ছোটা মত করো জী। পেট ভরা হুয়া হ্যায় ইনলোগন কা। ” অতঃপর অনেক উঁচু থেকে একজন নেমে এসে হাত বাড়ালেন। তুত্তুরী তার হাতে ধরিয়ে দিল খাবার প্যাকেট, নিয়েও তিনি গেলেন না। সোজা এসে খপ করে জড়িয়ে ধরলেন শৌভিকের হাঁটু। তারপর করুণ চোখে তাকিয়ে রইলেন আমার বরের দিকে। কোথা থেকে দৌড়ে এল পেঁড়াওলা। “দিজিয়ে সাব। দিজিয়ে। উসকো মিঠা খানা হ্যায়। ”থ্যাবড়া আটার গুলির মত দেখতে প্যাড়া কিনে দিতে হল। বিক্রেতাকেই বলা হল,পয়সা দিচ্ছি বাপ,তুই দিয়ে দে। হনুমান নাকি হনুমতী তাকে পাত্তাই দিল না। পাকদণ্ডীর ফুটপাতে বসে হাত বাড়াল শৌভিকের দিকে। বিক্রেতা এবং গাইড বলল,“সাব উহ আপকে হাতসে খায়েগা।” কি আব্দার মাইরি।

তপোবনের হনুমানকুল। এত সুসভ্য হনুমান কোথাও দেখিনি। হকার এবং গাইডকুলের চূড়ান্ত বশংবদ
সাব উসকো মিঠা খানা হ্যায়। আপনে হাত সে খিলাইয়ে-
অবশেষে তুত্তুরীর ভাগ্য শিকেয় ছিঁড়ল।

তপোবনের রাস্তা-

তপোবনের মাথা থেকে পরিপার্শ্ব-

পায়ের তলায় সর্ষে

ড্যামচি বাবুর দেশে-৯

কি ভাবছেন?মন্দির দেখলাম আর তপোবন দেখা শেষ?আজ্ঞে না স্যার। পিকচার আভি বাকি হ্যায়। যে পথে উঠেছিলাম,বেশ খাড়াই হলেও,বাঁধানো সিঁড়ি আছে। যদি গাইড না নিতাম তাহলে হয়তো আবার ঐ পথেই নেমে আসতাম আর জানতেই পারতাম না যে জীবনের অন্যতম অ্যাডভেঞ্চার হেলায় হারালাম। 

তপোবনের মাথায় চড়ে ঢালু পাহাড়ের কিনারে ঠ্যাং দুলিয়ে যথেচ্ছ সেল্ফি তুলে এবার যখন ফিরে আসব,গাইড বললেন,“ সাব,একঠো গুম্ফা হ্যায়। দেখিয়েগা?”ঐ গুহায় নাকি বালানন্দ মহারাজ তপস্যা করেছিলেন। বেশ চলো দেখি। পাহাড়ের মাথায় মন্দিরের মেঝেতে একটি ক্ষুদ্র আয়তাকার ছিদ্র আছে। ঐটি দিয়ে নেমে,ঘাড় বেঁকিয়ে দুই ধাপ সিঁড়ি টপকে,সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে হড়কে নামতে হয়,গুহায়। আমার ব্যাগ আর শৌভিকের ক্যামেরা কেড়ে নিল গাইড। নিয়ে পাশের জানলা দিয়ে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ল। 

ভাবলাম গেল সব। কোনমতে কোমর বেঁকিয়ে দুধাপ নেমে,শুয়ে পড়ে,পিছন ঘষে হড়কে যেখানে নামলাম সেটি একটি ছোট ঘর। ছাত বেশ নীচু। স্বামী বালানন্দের ছবি আছে। সামনে থালা। যদি কিছু দান করতে চান। পাশে একটি খুপরি জানলার মত ফাঁক। গাইড ওখান থেকে চিৎকার করছে,হামাগুড়ি দিয়ে বেরোতে হবে। বুড়ো বয়সে হামা টানতে আপত্তি নেই,তবে যা চেহারা আমার,যদি আটকে যাই?

বেরোবার পর শৌভিক বলল,মন্দ না। এবার ফেরার পালা। গাইড বলল,“সাব সিঁড়িসে উতরিয়ে গা,ইয়া ফির জঙ্গলকে রাস্তে সে?এই তরফ  এক অওর গুম্ফা হ্যায়। অউর সঙ্কটমোচন হনুমানজীকা মন্দির ভি হ্যায়। ” চলো তাহলে জঙ্গলের পথ ধরি। ভুলে যাবেন না, পা কিন্তু খালি- জুতো রেখে এসেছি অনেক নীচে বাজারের একটি মিষ্টির দোকানে। কোন দোকান?সে কি আর মনে রেখেছিরে ভাই-

গুহা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরানো-
এবার এই পথে নামতে হবে-

খালি পায়ে উচ্চাবচ পাকদণ্ডী,তাও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে-আরে ডরিয়ে মাৎ। আশুন তো সহি, না পারবেন তো হামি আপনাকে কোলে করে নিয়ে যাব-


Tuesday 1 December 2020

অনির ডাইরি ১লা ডিসেম্বর, ২০২০

 

মারি ম্যাম জানতে চাইছেন, “ আপনাদের কোন প্রশ্ন আছে কি? বা কোন মতামত? পরামর্শ?” সবাই চুপ। কম্প্যুটরের ওপাশে মারি ম্যামের পেলব ত্বকে পিছলে যাচ্ছে আলো। নাঃ আমার কোন প্রশ্ন নেই, তবে কিছু বলার আছে। বলতে দিচ্ছে কই তুত্তুরী? বলতে গেলে স্পেস বারে আঘাত করে আনমিউট করতে হবে তো নিজেকে। আষ্টেপৃষ্ঠে আমার আঙুলটাকে চেপে ধরে আছে তুত্তুরী। এই মেয়েটার সবে তে মাতব্বরী। 


একটু আগে পোশাক বদল করা নিয়েও আমার পিছনে পড়েছিল বাপ আর মেয়ে। ভার্চুয়াল পেরেন্টস্ টিচার মিটিং এর জন্য খামোখা কেন ভালো জামা পরছি? ছেঁড়া নাইটি পরে বসলেই বা কি? বড়জোর মধ্যপ্রদেশ অবধি দেখা যাবে তো কেবল-। ঠিক যেমন জুম ক্লাসে বসে তুত্তুরী। ধোপদুরস্ত সাদা শার্ট, গলায় টাই আর তলায় ইজের। আজও তেমনি বসেছে আপদটা। অথচ ম্যামের সুস্পষ্ট নির্দেশ, বাচ্ছারা যদি আপাদমস্তক স্কুল ড্রেস না পরে, তাহলে এই মিটিং এ বাবা-মাদের প্রবেশ নিষেধ। 


মারি ম্যাম বড় ভালো কি না। ফিরিঙ্গি ভাষায় হলেও, কেমনি মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলেন, তাই এই ডেঁপোগুলো ওণাকে পাত্তাই দেয় না। কতবার বলেছেন ম্যাম মাথায় সাদা কাপড়ের হেয়ার ব্যাণ্ড পরে তবে জুম ক্লাসে আসতে, অথচ রোজই উকুনে বুড়ির মত এক মাথা উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে ক্লাস করতে বসে তুত্তুরী। ম্যাম যখন জানতে চান,“হোয়্যার ইজ ইয়োর ব্যাণ্ড পুরোযা?” পুরোযা ওরফে তুত্তুরী নির্বিকার চিত্তে ভুলভাল ফিরিঙ্গি ভাষায় জানায়, "আমার মা কোথায় যেন রেখেছে, আর খুঁজে পাচ্ছি না।" বোঝ! 


আর ম্যামও তেমনি ভালো,  বলেন,“ নো প্রবলেম চাইল্ড।” তারপর অনুমতি দেন, যেটা খুঁজে পাচ্ছ,সেটাই পরে আমায় ধন্য করো মা। বড় বড় ঝুটো লাল গোলাপ ফুল ওয়ালা ব্যান্ড পরে ক্লাস করে তুত্তুরী। এরপর যদি ক্লাসের ছেলেরা ওকে “ফুলটুসি” বলে খ্যাপায়,তো নালিশ করে তুত্তুরী। ভাগ্যে খ্যাপায়, তাই না মা জানতে পারে, কি গর্হিত অপরাধে অপরাধী তিনি। 


সত্যি বলছি, এমনি পড়াশোনাই যাও বা মাথায় ঢোকে, এই অনলাইন পড়াশোনা  আমার মাথার বেশ কয়েক ফুট ওপর দিয়ে যায়। ছকে বাঁধা প্রশ্ন, তার ছকে বাঁধা উত্তর, সেই উত্তর লিখে সবার ফুল মার্কস পাওয়া- ভাগ্যে বড় মেসোমশাই জীবিত নেই, থাকলে নির্ঘাত বলতেন “ফুঃ ভজহরিঃ।” 


আচ্ছা আমরা কিন্তু ফুলমার্কস্ পাই না হ্যাঁ! আমি এবং তুত্তুরী।  আমরা ব্যাপক চেষ্টা করি, উত্তরপত্র স্ক্যান করার পূর্বে চেক করে আপলোড করি, তাও, ভুল হয় বানান। কাটা যায় অঙ্ক। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত হয় দাম্পত্যকলহ। হোক না চতুর্থ শ্রেণীর খেলনা পরীক্ষা, তাও, আমি কেন মিসের আগে তুত্তুরীর খাতা চেক করব? এই নিয়ে ভয়ানক উষ্মা প্রকাশ করে শৌভিক। এতো জুয়াচুরি। 


পুজোর আগের পরীক্ষাটায় তাই আর করিনি, অনেকগুলো পেপারে ২৫এ ২২/২৩ পেয়েছে তুত্তুরী।তাতেই হেব্বি খুশি আমরা, শতাংশের হিসেব যদি কষি, জীবনে এত নম্বর পেয়েছি আমরা দোঁহে? তবে ড্রয়িংটা করে দিতে হয়েছিল আমায়। সেকি জ্বালা বাপস্। 


পুজোর ছুটি পড়ার এক হপ্তা আগে শেষ পরীক্ষা, তাও আবার ড্রয়িং। মেয়ে বেঁকে বসল, অনেক পড়িচি, আর না। এমনিতেও তুত্তুরী ছবি আঁকলে D- থেকে C+ এর মধ্যে কিছু একটা পায়। মা আর কত খারাপ আঁকবে? ম্যাম তো দুটো টপিক দিয়েই রেখেছে, যে কোন একটা আঁকতে দেবে, “তুমি চিকেনটাই এঁকে রাখো মা। আই লাভ চিকেন-”। 


সে তো চিকেন আমারও মন্দ লাগে না। তাই বলে আপিস থেকে গলদঘর্ম  হয়ে ফিরে মস্ত বড় মুর্গি আঁকতে কার ভালো লাগে? শুধু মুর্গি আঁকলেই হবে না, পাশে কুঁড়েঘর, গাছপালা,গাছে ঝুলন্ত পাকা আম, ঢেউ খেলানো দিগন্তরেখা, নীলচে আকাশ, তাতে সোনার থালার মত সূয্যি মামা,পেঁজা তুলোর মত কয়েক খণ্ড মেঘ এবং পরিশেষে একজোড়া  উড়ন্ত মুক্ত বিহঙ্গও আঁকতে হবে। মা গো!


কি যে আঁকলাম জানি না, প্রথম চোটে মুর্গিটা কেমন যেন পেট মোটা হাতির ছানা হয়ে গেল, তারপর উড়ন্ত আপ্পু হল- সেই দেখে বাপ আর মেয়ের কি হাসি! শুধু আঁকলেই তো হল না, রঙ করা, মার্জিন কাটা সব করে দেবার পর, তিনি ট্যারাব্যাঁকা হস্তাক্ষরে নিজের নাম-ক্লাস-রোল নং লিখে আমাদের যুগপৎ ধন্য করলেন। অতঃপর স্ক্যান করে পিডিএফ বানিয়ে ঘুমাতে গেলেন।  


পরদিন পরীক্ষায় এল মৎস শিকারী সারস। ছিমতী তুত্তুরী তখনও যোগনিদ্রায় সমাহিত। ঘাড় করে ঘুম থেকে তোলার পর তিনি সারা বাড়ি কাঁপিয়ে গর্ গর্ গর্ করে গজরে বেড়ালেন মিনিট দশ। অতঃপর বসলেন আঁকতে। তারপর কি হল জানি না, কারণ আপিসটাকে তো রাখতে হবে- 


সেই আর্ট পরীক্ষায় সম্প্রতি B+ পেয়েছে তুত্তুরী। যে ছবি এঁকে রঙ করতে আমার পাক্কা সোয়া দুই ঘন্টা লেগেছিল, তিনি সেই কাজ কি করে যে পৌনে ঘন্টায় সারলেন তা এক বিস্ময় বটে। আসলে বিস্ময় নয়, সমস্তটুকুই স্যার এবং ম্যামদের কারসাজি। বহুদূরে বসেও বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দ্বারাও যেভাবে ওণারা স্পর্শ করে চলেন আমার সন্তানের মন আর মাথা, কোন প্রশংসাই তার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি তো একটি নিয়েই গলদঘর্ম , আর ওণারা এত গুলো পগেয়া পাজিকে একসাথে নিয়ে চলেন-তুত্তুরীর হাত ছাড়িয়ে, কবেকার তারাসুন্দরীর আধো আধো ইংরেজিতে সেটাই জানালাম ম্যামকে, “অনেক ধন্যবাদ ম্যাম। এই মনখারপের বছরেও ভাগ্যিস আপনারা পাশে আছেন। ”

Tuesday 17 November 2020

অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি- ২০২০

অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি-১ম কিস্তি, ১৬ই নভেম্বর ২০২০

#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০ #শিবপুরী #মধ্যপ্রদেশ #Shivpuri #MP



পাতি মোবাইল ক্যামেরায় তোলা। আসলে দেখে চোখ ঝলসে গেল এমন। মানছি রাজা মশাইয়ের সমাধি, তাই বলে এই আকালেও আট আটখানা রূপার দরওয়াজা? ছাত থেকে ঝুলন্ত ভারি ভারি তিনখানা চাঁদির ঝাড় লণ্ঠন। মার্বেলের ছড়াছড়ি শুধু নয়, শ্বেত মর্মরের বুকে আঁকা অজস্র চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ফুল-লতা- পাতা।  যার ফুলগুলি গোমেদের, পাতাগুলি নাকি পান্নার, আর শাখাপ্রশাখা নীলমের। বুড়ো সেপাই বারবার গজগজ করছিল, “বস্ সাড়ে তিন হাজার তনখা মিলতা হ্যায় মেমসাহাব। উসমে খায়ে গা ক্যায়া অর-”। কিছু বখশিশের লোভে কি না জানি না, পকেট থেকে বৃদ্ধতর মোবাইলটা বার করে টর্চ জ্বালিয়ে চেপে ধরলেন দেওয়ালের ফুল লতাপাতার গায়ে, পলকে ঝিলিক মারতে লাগল গোমেদ আর পান্না। নীলম যদিও চমকাল না। 


স্থান-রাজা মাধো রাও সিন্ধিয়ার ছত্রী, শিবপুরী।  গোয়ালিয়র থেকে সড়ক পথে ১২০ কিলোমিটার মাত্র। আমি যদিও গোয়ালিয়র বলে বসে আছি। আসলে এত ঐশ্বর্য্য দেখে ধাঁধিয়ে গেছে চোখ-  


প্রসঙ্গতঃ সম্পর্কে মাধো রাও জী, স্বর্গীয় কংগ্রেস নেতা মাধব রাও সিন্ধিয়ার পিতামহ। 

অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি-২য় কিস্তি, ১৭ই নভেম্বর ২০২০

#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০


রাত পৌনে দশটা। চান্দেরীর বাতাসে বেশ হিমেল আমেজ। কিলা কোঠির বারন্দা প্রায় জনহীন, এমনিতেই বেশ কম পর্যটক আসে এই শহরে, এখন তো সংখ্যা আরো কম।  আমরা ছাড়া আর কেউ নেই আজ রাতে এই কিলা কোঠিতে। প্রসঙ্গতঃ কিলা কোঠি হল চান্দেরীতে মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের অন্যতম রিজর্ট। কিলা অর্থাৎ কেল্লার মধ্যে তাই কিলা কোঠি। আর একটা আছে বটে, শহরের সীমানা ছাড়িয়ে, তার নাম তানাবানা।

মূল শহর থেকে অনেকটা উঁচুতে, টিলার মাথায়, চান্দেরী কেল্লার পরিধির মধ্যেই এই রিজর্ট। রিজর্টের বারন্দা থেকে নীচে রাতের চান্দেরী শহর এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। একনজরে মনে হবে, দিগন্ত বিস্তৃত কালো সিল্কের শাড়িতে বুঝি সলমা চুমকির কারুকার্য রচনা করছে কেউ।


অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি-৩য়য় কিস্তি, ১৮ই নভেম্বর ২০২০

#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০


ডুবন্ত সূর্যের আলোয় মহারাণী শাক্য রাজে সিন্ধিয়ার ছত্রীর অন্তর্ভাগ। ছত্রী কি বলুন তো?এককথায় ছত্রী হল স্মৃতি সৌধ। শিবপুরীর মূল আকর্ষণই হল সিন্ধিয়াদের ছত্রী। বিশাল এলাকা জুড়ে,মুখোমুখি দুটি ছত্রী। যার মধ্যে যেটি অধিক জাঁকজমক পূর্ণ, সেটি রাজা মাধো রাও সিন্ধিয়ার, আর উল্টো দিকে  অপেক্ষাকৃত পুরানোটি রাণী শাক্য রাজে সিন্ধিয়ার। সম্পর্কে তিনি স্বর্গীয় মাধব রাও সিন্ধিয়াজীর প্রপিতামহী তথা রাজা মাধো রাও সিন্ধিয়ার জননী। তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তিও আছে ভিতরে। ছত্রীটির নির্মাণকাল বিংশ শতকের প্রারম্ভ- জুতো খুলে ঢুকতে হয়।



অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ১৮ই নভেম্বর- কিস্তি ৪

#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০

আমরা আছি, বেতোয়া নদীর ধারে, ওর্চা নগরীতে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মৎসপুরাণে বর্ণিত বেত্রবতীই নাকি বেতোয়া। যমুনার এক শাখানদী। এই বেত্রবতী থুড়ি বেতোয়া নদীর ধারেই গড়ে ওঠে বুন্দেলা রাজাদের রাজধানী ওর্চা। স্থানীয়রা ডাকে অর্চা বলে, “যিস কা না কোই অওর না ছওর।”


আলো তো ফুটেছে তবে এখনও হয়নি সূর্যোদয়। বাতাসে হিমেল পরশ, হাল্কা শিশিরের ছোঁয়া। এখনই বেতোয়া নদীতে নেমেছে শতরঙ্গী জনস্রোত। দূর দূর থেকে আসছেন পল্লীবাসিনীরা। সকলের পরণে উজ্জ্বল রঙের পোশাক। হাত ভর্তি রিনরিনে কাঁচের চুড়ি। সিঁথিতে ডগডগে মেটে সিঁদুর। লাজ শরম ভুলে ঝপাঝপ ঝাঁপিয়ে পড়ছেন জলে। বেতোয়ার জলে স্নাত হয়ে, ভিড়ের মধ্যেই উঁচু নীচু পাথরের আড়ালে পটু হাতে কাচা কাপড় পরে, অথবা স্নাত অবস্থায়ই দিচ্ছেন অঞ্জলি। গাইছেন নানা সুরেলা ভাষার গান। জ্বালছেন দিয়া আর খুশবুওয়ালা আগরবাতি।  আমরা ভাবলাম অগ্রিম ছট পুজো বুঝি। পরে শুনলাম গোটা কার্তিক মাস জুড়েই চলে এই  পরব। পল্লীবালাদের স্নান আর পুজোর সাক্ষী বেতোয়া পাড়ের ছত্রীর দল। ওর্চা বা অর্চা জগদ্বখ্যাত তার ছত্রীদের জন্য। সম্প্রতি ইউনেস্কোর সম্ভাব্য হেরিটেজ সাইটের লিস্টেও উঠেছে এই নগরীর নাম। বুড়া মোবাইল কতটা ধরতে পারবে জানি না, তবে বেতোয়া নদী, পরবের গান আর কুয়াশায় মোড়া ছত্রীর দল, সব মিলিয়ে সকালগুলো আজকাল বড় মনোরম এই শহরে। 



অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ১৯ই নভেম্বর- কিস্তি ৫


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০


সন্ধ্যা নামছে ওর্চায়। একে একে জ্বলে উঠছে রাজপ্রাসাদের আলোকমালা। সারাদিন রাজকার্য সামলে শ্রান্ত রাজামশাই এসে বসলেন বারমহলে। চৌকা আঙিনায় জমে উঠল আসর। চৌকোণা আঙিনার এক কোণে সবথেকে উঁচু আসনে দেহ এলিয়ে জুৎ করে বসলেন রাজামশাই। পদতলে ধাপে ধাপে বসলেন মন্ত্রী অমাত্যগণ। বসল রাজার বিদুষক। কোণাকুণি দ্বিতল ঝরোকায়, রক্তরঙা বালিপাথরের জাফরির আবডালে এসে বসলেন রাণী মা স্বয়ং।


  আর তারপর? কাহারবা নয়, বেজে উঠল দাদরা। ছনছন করে উঠল রোশনী বাইয়ের পায়েল- কত যে তুফান ছুটল, কত যে কলজে ঘায়েল হল তার ইয়ত্তা নেই। সন্ধ্যে গড়িয়ে নামল রাত। অনুষ্ঠান শেষে বাঈজীকে খুশ করে, ক্লান্ত রাজামশাই রওণা দিলেন তাঁর শয়ন কক্ষের দিকে। রাজামশাই অর্থাৎ বুন্দেলখণ্ডের অধিশ্বরের শয়নকক্ষটি তিন ভাগে বিভক্ত। সবথেকে বাইরের প্রকোষ্ঠটি বরাদ্দ রাজার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের জন্য। এই প্রকোষ্ঠটির ছাতের দুই দিক উটের পিঠের মত, আর মাঝখানের অংশটি হীরকাকৃতি। 


তার পরের প্রকোষ্ঠটি হল রাজার আপৎকালীন গুপ্তমন্ত্রণা কক্ষ। না জানী কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত,পরামর্শ আর ষড়যন্ত্রের সাক্ষী এই কক্ষ।  ছাতের আকৃতি হাতির পিঠের মত। সমগ্র দেওয়াল জুড়ে আঁকা অসংখ্য সুন্দর সুন্দর বুন্দেলা চিত্র। যাদের বয়স কমপক্ষে পাঁচশ বছর। কোথাও রাজ্যাভিষেক চলছে রাজা রামের, তো কোথাও লীলায় মত্ত শ্রীকৃষ্ণ। উল্টোদিকে বিবর্তনবাদ মেনে আঁকা বিষ্ণুর নব অবতার। দশম এখনও আসেনি, তাই নেই তার ছবি। ছবি গুলোয় মিলে মিশে গেছে বিভিন্ন দেশীয় চিত্রশৈলী। সবই অনন্য। সবই অসামান্য। 


তৃতীয় তথা শেষ প্রকোষ্ঠে সজ্জিত রাজার শয্যা। এই কক্ষটিরও দেওয়াল জুড়ে শুধু ছবি আর ছবি। সব ছবিতেই মাখামাখি বীরগাথা। তবে বড় ছোট এই প্রকোষ্ঠটি। কারণ একটাই, কক্ষ যত বড় হবে, নিদ্রিত রাজার ওপর হামলাকারীর ততোই সুবিধা হবে। 


সবই এখন অতীত। পাঁচশ বৎসর পূর্বে পরম যত্নে সাজানো কক্ষ এখন পড়ে থাকে নিঝুম আঁধারে। মুছে গেছে অধিকাংশ চিত্র। যতটুকু আছে, তারওপরও নাম লিখেছে, প্রেমিকার নাম লিখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। প্রতি বছর বর্ষাও একটু একটু করে মুছে দিয়ে যায় অতীত গৌরব। বাজ পড়ে ফাটল ধরছে প্রাসাদের বিভিন্ন মিনার আর গম্বুজে।  হতাশ গাইড দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে চলে, “কা জানে আগলে সাল ইয়ে মহল অটুট রহেগা ভি কে নেহি”। আশার কথা একটাই ইউনেস্কো তার হবু হেরিটেজ সাইটের সম্ভাব্য তালিকায়  রেখেছে ওর্চা নগরী। দেখা যাক- 


অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ২০শে নভেম্বর- কিস্তি ৬


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০

ওর্চা থেকে গোয়ালিয়র আসতে সড়ক পথে সময় লাগে ঘন্টা সোয়া দুই - আড়াই মত। এদিকে পথঘাট বড়ই ভালো। ঝকঝকে রাজপথ দিয়ে হুহু করে দৌড়য় গাড়ি। এদিকে বুগেইনভেলিয়া গাছের বড় প্রাবল্য। রাস্তার দুইধারে, ডিভাইডারে যেন মুঠো মুঠো লাল-গোলাপী-কমলা- বেগুনী আবির ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। আজ তেমন রোদ ওঠেনি,যদিও মধ্যাহ্ন তবুও  বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে  হাল্কা কুয়াশার ছায়াজাল। দূরে পথের ধারে, ছোট্ট টিলার উপর যেন ফুটে ওঠে আবছায়া কোন এক ভুলে যাওয়া কেল্লার অবয়ব। 

শৌভিক জানতে চায়, “ত্যাগী জী ওহ কেয়া হ্যায়-?” আধবুড়ো শাকাহারী ড্রাইভার সাহেব গাড়ি চালাতে চালাতে না তাকিয়েই জানান, “দাতিয়া কা পুরানা কিলা হ্যায় সাব। ওহ বীর সিং জী নে বানায়া থা। সাত মঞ্জিলি কিলা হ্যায় সাব।” সাত তলা কেল্লা? এ আবার হয় নাকি? 


দাতিয়া জেলার সদর শহরও দাতিয়া। ছোট্ট বেশ অপরিষ্কার শহর। অবশ্য অপরিষ্কার বলতে অন্যকিছু নয়, শুধু মোষ আর মোষ। এদিকে বোধহয় সব বাড়িতেই মোষ পোষা হয়। রাজপথ থেকে ডানদিকে বেঁকে উঁচু নীচু রাস্তা ধরে গোটা পাঁচেক কিলোমিটার পর গিয়ে গাড়ি থামে সাত তলা কেল্লার সামনে। ওর্চা রাজ বীর সিংহ বানিয়েছিলেন। সপ্তদশ শতকের শুরু থেকেই শুরু হয় বীর সিংহের রাজত্বকাল। ইতিহাসে বীর সিংহ বুন্দেলা অবশ্য অন্য নামে খ্যাত। ইনি হলেন প্রখ্যাত কবি তথা বাদশাহ আকবরের অন্যতম উজির আবুল ফজলের হত্যাকারী। শেহজাদা সেলিমের মসনদে আসীন হওয়া মোটেই সমর্থন করতেন না আবুল ফজল। ক্রমাগত বিপরীত মন্ত্রণা দিতেন বাদশাহ আকবরকে।  পথের কাঁটা দূর করতে ওর্চার বুন্দেলা রাজাদের সাহায্য প্রার্থনা করেন শেহজাদা সেলিম। রাজা রাম শাহ দিলেন, “বচন”। মধ্যভারতে গড়ে উঠল নতুন রাজনৈতিক জোট। 


এত বড় ধৃষ্টতা? বাদশা আকবরের বিরোধী পুত্রের সাথে জোট তথা ঘোঁট পাকানো?এতো রাজদ্রোহিতা। বুন্দেলা রাজকে উচিৎ শিক্ষা দিতে বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ওর্চা আক্রমণ করলেন আবুল ফজল। রাজা রাম শাহ পাঠালেন যুবরাজ বীর সিংকে। এরপরের গল্প জানে কেবল ইতিহাস।বুন্দেলী চারণ কবিরা বলে বীর সিংহের তরবারির এক কোপে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে আবুল ফজলের। হিন্দিতে নাড়িভুঁড়িকে বলে আন্ত্রিঁয়া, যেখানে এই অসম্ভব অঘটনটি ঘটেছিল, যেখানে নিহত হয়েছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপ জেনারেল, সেই অঞ্চলটির নাম আজও আন্ত্রিঁ। সেখানেই রয়েছে আবুল ফজলের সমাধি।  


তার সঙ্গে অবশ্য এই কেল্লার কোন সম্পর্ক নেই। এই গল্প শুধু রাজা বীর সিৎহের পরিচয় দিতে। তো এহেন রাজা বীর সিংহের শখ ছিল বড় বড় প্রাসাদ আর মহল নির্মাণ করার। দাতিয়ার সাত তলা কেল্লাও তিনিই বানান। তবে মজার কথা হল এত বড় কেল্লা বানালেও, একটি দিনরাতও তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ এখানে অতিবাহিত করেননি। বরাবরের তরেই জনশূণ্য পড়ে থাকে দাতিয়া কা কিলা। পাদশাহনামাতেও নাকি উল্লেখ আছে এই কেল্লার।  ভারতেশ্বর শাহজাহানের সাথে এখানে এসেছিলেন আব্দুল হামিদ লাহোরীও। তবে থেকেছিলেন কিনা জানা যায় না।  


এই বেলেপাথরের  সাততলা কেল্লা বানাতে ব্যবহৃত হয়নি একটুকরোও লোহা। পুরোটাই যাকে বলে স্থাপত্যের বিস্ময়। জন্মলগ্ন থেকেই বড় দুর্ভাগা এই কেল্লা। আজও তেমন পর্যটক টানতে পারে কই? কতজন দিশী- বিলিতি পর্যটক মাড়ায় এপথ? দাতিয়া মূলতঃ প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠ হিসেবে। পীতাম্বরা মন্দিরে একাধারে পূজিত হন মা বগলামুখী এবং ধূমাবতী। বাইরের পর্যটক না অাসলেও, বিশেষ বিশেষ তিথিতে ঢল নামে স্থানীয় ভক্তবৃন্দের। বিশেষতঃ যখন মেলা বসে-


সেই বিশেষ দিনে কিছু মানুষ ঢুকেই পড়ে কেল্লার ভিতর। তাদের নিয়েই দুশ্চিন্তায় থাকে নিরাপত্তা রক্ষীর দলবল। নিরাপত্তা রক্ষী বলতে অবশ্য চার ইয়ার। স্থানীয় গুটি চারেক বিভিন্ন বয়সী ছেলেপিলে আড্ডা মারছিল বাইরে বসে। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন সবথেকে বয়স্ক ব্যক্তি, বাকিরা বলল, “আপকা টিকিট নেহি লাগে গা।  পর একেলে মত যাও জী। গুম হো যাওগে। ইয়ে দাদাকো লেকে যাইয়ে-”।  


দাদা’জী অবশ্য মোটেই ইতিহাস বিশারদ নন। তবে বড় আদর করে ঘোরালেন আমাদের। জানালেন পাঁচতলা অবধি ওঠাই যায়। ছয়-সাত তলার হাল খারাপ। দেখালেন বন্ধ সুড়ঙ্গ, যা নাকি এককালে যেত সিধা গোয়ালিয়র।


প্রতিটি তলায় আছে বারন্দা, আছে খোলা আঙিনা। সারা মহল জুড়ে নাকি এমন কুড়ি খানা আঙিনা আছে।  দেখালেন মহলের দেওয়াল জোড়া অসংখ্য চিত্র, যা প্রায় সবই বরবাদ হতে বসেছে, কিছু আবহাওয়া আর বাকি অনেকটা স্থানীয় দর্শনার্থীদের অত্যাচারে। সর্বত্র নিজের আর প্রেমিকার নাম লিখে গেছে অপগণ্ডের দল। রাজু ♥মিলি। কে জানে সত্যিই এই রাজুদের সাথে মিলিদের সম্পর্ক আদৌ টেকে কি না। যদি টিকেও যায়, তাহলেও এই সম্পদ নষ্ট করার জন্য, উভয়ের কয় ঘা বেত্রাঘাত প্রাপ্য হয়? 


আজকাল ছবিওয়ালা ঘরগুলি ওণারা তালাচাবি মেরে রেখেছেন। শুধু একটা তালা দেওয়া ঘরের দরজা ভাঙা, সেটা শুধু জানে এই নিরাপত্তা রক্ষীর দল। ভাঙা দরজা দিয়ে কোনমতে গলে ঢুকতেই ধাঁধিয়ে গেল চোখ- অপূর্ব সব চিত্রকলা। দেখতে দেখতে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম, তাকিয়ে দেখি শৌভিক আর তুত্তুরী পাশে নেই। গাইড দাদাই বা গেল কোথায় ? দূরে গলা শোনা যাচ্ছে সবার, কিন্তু কিছুতেই আর খুঁজে পাচ্ছি না। এই গলি থেকে সেই গলি, এই চবুতরা থেকে সেই চবুতরা ঘুরছি, খুঁজেই পাই না কাউকে। এতো ভুলভুলাইয়া রে ভাই। 


পরে নামতে নামতে যখন গল্প শোনাচ্ছিলাম, বুড়ো গাইড হেসে বলল, কিছুদিন আগেও একজন এমনি হারিয়ে গিয়েছিল। একা একা ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যে ঢুকে পড়েছিল- তারপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। বিকেল গড়িয়ে সাঁঝ। পাঁচটা নাগাদ ফাঁকা মহলে তালা মেরে বাড়ি ফিরে গেছেন নিরাপত্তারক্ষীর দল। বেচারা আধো অন্ধকারে ঘুরতে ঘুরতে, পথ খুঁজে না পেয়ে শেষে ফোন করে ১০০তে। আর তারপর? তারপর আবার কি, পুলিশের জিপ এসে, তালা খুলিয়ে, খুঁজে পেতে উদ্ধার করে তাকে। একাকী বসেছিল লোকটা কোন এক চবুতরায় গালে হাত দিয়ে। কি দেখেছিল সে? কাকে দেখেছিল সে? কে জানে।



অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ২০শে নভেম্বর- কিস্তি ৭


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০

 মধ্যভারতে ছত্রী বলতে মূলতঃ স্মৃতিসৌধ। যেমন মুসলিম শাসক মারা গেলে, তাঁর কবরের ওপর নির্মিত হত মকবরা, ঠিক তেমনি হিন্দু রাজাদের মৃত্যুর পর, যেখানে তাঁকে দাহ করা হত, সেই স্থলে নির্মিত হত ছত্রী। যদিও এই নিয়ম সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবে মূল ভাবনাটা একই। ছত্রী নির্মিত হত, তিন ধরণের মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে, পর্যায়ক্রমে সতী,সন্ত আর রাজা। 


বেতোয়া নদীর ধারে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গোটা পনেরো ছত্রী পনেরো জন বুন্দেলী রাজার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত। সকাল নটা থেকে বিকাল চারটে পর্যন্ত খোলা থাকে ছত্রীগুলি। তবে ঢুকতে গেলে লাগে টিকিট। টিকিট মেলে কেবল ওর্চা দুর্গে। টিকিটের মূল্য যৎসামান্য, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দশ টাকা মাত্র। শিশুদের বিনামূল্যে। মাত্র দশটাকার টিকিটে ঘুরে দেখতে পারেন গোটা ওর্চা নগরী, সারাদিন ধরে। 


পনেরোটি ছত্রীর মধ্যে ছটি গড়ে উঠেছে একই পরিসরে। বাকি গুলি আসেপাশে। বিশাল সাজানো বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো বেলে পাথরের ছত্রীগুলি আপাততঃ নানা প্রজাতির পাখিদের আবাসস্থল। শহরের এককোণায়, বেতোয়া নদীর কলধ্বনি ছাড়া প্রায় নিঃঝুম ছত্রীগুলিতে বাস করে নাকি প্রায় ১৭৫ প্রজাতির পাখি। যার মধ্যে চারটি প্রজাতি শুধু শকুন। শীত পড়ার সাথে সাথেই বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয় পক্ষীবিশারদদের দলবল। আর আসে স্থানীয় প্রেয়স-প্রেয়সীর দল। নির্জনে নিভৃতালাপের জন্য। আজ অবশ্য ততোটা নিঃঝুম নয় চরাচর, কার্তিক মাসের ব্রত উপলক্ষ্যে বাস- লরি- গাড়ি ভর্তি করে এসেছে পূণ্যলোভী নরনারীর দল। প্রাকারের ওপারে চলছে পূজা আর পূজার গান। কিন্তু কিছুই যেন এসে পৌছাচ্ছে না এপারে। 


গাইড বললেন, “ছত্রী গুলি ভালো করে দেখুন।” সবই ইন্দো-ইসলাম স্থাপত্যে মাখামাখি।  মাঝবরাবর একটি শিখর আর তাকে ঘিরে চারটি গম্বুজ। এই স্থাপত্য বলে দেয় রাজা কেমন ছিল। শিখরটি বোঝায় রাজার মধ্যে ধার্মিক সত্ত্বা প্রবল ছিল অার গম্বুজ গুলি নির্দেশ করে যে রাজা দক্ষ প্রশাসকও ছিলেন। সব ছত্রীই মূলতঃ এই একই আকৃতির,ব্যতিক্রম শুধু দুইজনের ছত্রী। রাজা মধুকর শাহ বুন্দেলার ছত্রী নিছক মন্দিরের মত দেখতে। আর রাজা বীর সিংহ দেও বুন্দেলার ছত্রী দেখতে গম্বুজের মত। 


রাজা মধুকর শাহের আমলেই রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় ওর্চায়। কথিত আছে যে রাজা মধুকর শাহ ছিলেন ঘোরতর কৃষ্ণভক্ত। আর ওণার রাণী গণেশ কুমারী ছিলেন রামের অনুরাগিনী। বৃন্দাবনে গিয়ে স্বয়ং বাঁকে বিহারীর দর্শন পেয়েছিলেন রাজা। মন্দিরের সামনে একদল সুরদাসের সাথে কৃষ্ণভজনায় মশগুল রাজার সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন বাঁকেবিহারী, সেই গরবে গরবী রাজা এসে রাণীকে বলেছিলেন, “কোথায় তোমার রাম? এবার তাঁকে পরিত্যাগ করে, কৃষ্ণভজনা শুরু করো।” কিন্তু রাণী নারাজ তাঁর প্রাণের রামকে ছাড়তে। রামের টানে ওর্চা ছাড়লেন রাণী মা। পদব্রজে গিয়ে হাজির হলেন অযোধ্যা। সাধন-ভজন-দান-অনশন কিছুতেই পেলেন না তাঁর রাম। অবশেষে হতাশ রাণী চললেন সরযূ নদীতে আত্মঘাতী হতে। নদীতে ডুব দিতেই সামনে আবির্ভূত হল দিব্য জ্যোতিপুঞ্জ। ভেসে এল কার মধুর বাণী। “তুই তো আমায় ফেলে গিয়েছিলি মা।” গাইড দাদা বলে চলেন মন্দ্রমধুর কণ্ঠে, ত্রেতা যুগে রাজা দশরথ আর রাণী কৌশল্যা চেয়েছিলেন রামকে রাজা হিসেবে দেখতে। ভাগ্যের পরিহাস সব বাঞ্চাল করে দেয়। রাম রাজত্বের স্বপ্ন দেখতে দেখতেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন রাজা দশরথ। আর রাণী কৌশল্যা হয়ে ওঠেন উন্মাদিনী। একটি মূর্তিকে রাজারূপী রাম মনে করে আঁকড়ে ধরেন তিনি। রাণীর এই দুর্দশা অসহনীয় হয়ে ওঠে তাঁর সহচরী ভৃত্যদাসীদের কাছে। এইভাবে তেরো বছর কেটে যায়। অবশেষে একদিন আর থাকতে না পেরে একদাসী কৌশল্যাকে মিথ্যা আশ্বাস দেয়,“রাণী মা চলো, তোমার রাম ফিরে এসেছে।” উন্মাদী জননী,  তখন সরযূনদীর জলে স্নান করাচ্ছিলেন রামের মূর্তিটিকে। রাম ফিরেছে শুনে মূর্তি ফেলে দৌড়লেন রাজপ্রাসাদে।


 কিন্তু কোথায় রাম? তাঁর ফিরতে তো বাকি আরও একবৎসর। আকুল হয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কৌশল্যা ছুটে যান সরযূ নদীর কিণারে। বুকে জড়িয়ে ধরতে যান রামের মূর্তি, কিন্তু পলকে বিলীন হয়ে যায় রামের মূর্তি। অতঃপর? আকুল কৌশল্যার আকুলিবিকুলি কান্নায় কেঁদে ওঠে সমগ্র অযোধ্যা। শেষে শোকাতুরা জননী যখন  আত্মঘাতিনী হতে উদ্যত হন, পুঞ্জীভূত জ্যোতিরূপে আবির্ভূত হন রাম। জননীকে আশ্বস্ত করেন, অচীরেই ফিরবেন তিনি। আরও বলেন, যে রামকে রাজা রূপে দেখার সাধ পূরণ হবেই তাঁর। কলিযুগে পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জন্মাবেন দশরথ অার কৌশল্যা। তখন ফিরবেন রাম, রাজা হয়ে।  


রাণী গণেশ কুমারীর কাছে অনুযোগ করেন রামচন্দ্র,সেদিন তাকে ফেলে যাবার জন্য। তারপর আশ্বস্ত করেন, এই সরযূর জলেই ভেসে উঠবেন তিনি রাণীর আঁচল ধরে। তবে শর্ত তিনটি- প্রথমতঃ তাঁকে নিয়ে পদব্রজে ওর্চায় ফিরতে হবে রাজরাণীকে। দ্বিতীয়তঃ তিনিই হবেন ওর্চার রাজা। রাজা মধুকর শাহকে ছাড়তে হবে রাজার পদ। শুধু মধুকর শাহ নন, তাঁর বংশের কেউই কখনও হতে পারবেন না ওর্চার রাজা। রাজা একজনই থাকবেন। তিনি হলেন রাম। আর তৃতীয়তঃ ওর্চায় নিয়ে গিয়ে প্রথমেই তাঁকে যেখানে স্থাপন করা হবে, আর নড়ানো যাবে না সেখান থেকে। 


সবশর্ত মেনে রামকে বুকে নিয়ে ওর্চার উদ্দেশ্যে রওণা দেন রাণী। খবর পাওয়া মাত্রই মন্দির বানানোর নির্দেশ দেন রাজা মধুকর শাহ। দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লান্ত রাণীমা যখন ওর্চায় পৌছালেন, তখন মন্দির অর্ধনির্মিত। ক্লান্তিতে চুর রাণীমা তৃতীয় শর্ত ভুলে রামকে নিয়ে গেলেন আপন মহলে। স্থাপন করলেন স্বীয় কক্ষে। তারপর তলিয়ে গেলেন গভীর ঘুমে। সেই থেকে রাণীমহলই হয়ে উঠল ওর্চার শ্রীরামরাজা মন্দির। আজও রামচন্দ্র গান স্যালুট পান এই নগরীতে। বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ পূণ্যার্থী আসেন রামরাজাকে দেখতে। আজও আগে ওর্চায় আরতি হয়, তার ঠিক একঘন্টা পর আরতি হয় অযোধ্যায়। যেহেতু মধুকর শাহের আমল থেকেই ধর্মীয় কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ওর্চা তাই ওণার ছত্রীটি মন্দিরের আকৃতিতে গঠিত।  


আর রাজা বীর সিংহ বুন্দেলার ছত্রী কেন গম্বুজের মত দেখতে? এই মহাশয়ের হাতেই নিহত হন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রবলপ্রতাপ জেনারেল আবুল ফজল। সে গল্প তো আগেই বলেছি। 

অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ২২শে নভেম্বর- কিস্তি ৮


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০


 গ্রাম মিতাওয়ালী। জিলা মোরেনা। রাজ্য মধ্যপ্রদেশ।  গোয়ালিয়র শহর থেকে সড়ক পথে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে, চম্বলের ভিতর এই মিতাওয়ালি নামক গ্রামে এক অবক্ষয়িত টিলার ওপর আবিষ্কৃত এই মন্দিরটির অনুকরণে নির্মিত ভারতীয় সংসদ ভবন। 


মিতাওয়ালীর সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। শুধু এটুকু জানা যায়- নির্মাণকাল চতুর্দশ শতক। নির্মাতা রাজা দেবপাল। প্রায় শতখানেক সিঁড়ি ভেঙে একশফুট ওঠার পর, এএসআই এর যে বোর্ড চোখে পড়ে, তাতে লেখা যে রাজা দেবপাল ১৩২৪ খ্রীঃ এই মন্দির নির্মাণ করেন। এইখানেই একটু সমস্যা আছে। এইরাজা দেবপাল যদি কচ্ছপঘাত বংশীয় রাজা দেবপাল হয়ে থাকেন তবে তাঁর রাজত্বকাল-১০৫৫-১০৮৫খ্রীঃ। অর্থাৎ একাদশ শতক। সেক্ষেত্রে এই মন্দিরের বয়স দাঁড়াবে পাক্কা হাজার বছর। 


শোনা যায় যে  মধ্যভারতে অবস্থিত তিনটি চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরের অন্যতম এই মন্দির। আরাধ্য দেবতা শিব। স্থানীয় মানুষ একে একাত্তর শ শিবমন্দির বলেই চেনে। খুব বেশী মানুষ আসে না এই মন্দির দেখতে। গোয়ালিয়রের ভ্রমণের এমনি যে প্যাকেজ তাতে নেই মিতাওয়ালী- পাঢ়াওয়ালি বা বুড়ো বটেশ্বর। 


রাস্তাও খুব খারাপ। গোয়ালিয়র থেকে কেন্দ্রীয় রাজপথ ধরে খানিক এসে বেঁকে রাজ্যপথে উঠে তারপর যখন বাঁক নেয় গাড়ি, সামনে এসে দাঁড়ায় রুক্ষ চম্বল। ধুধু মাঠ আর ভাঙাচোরা পাথর। ইতিউতি সামান্য কিছু চারাগাছ থাকলেও তা রোদে পুড়ে তামাটে। পথে মোষচরানো পুরুষ আর গলা অবধি ঘোমটা টানা জলের কলসি বয়ে আনা রমণী ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। পর্দা প্রথা বেশ কঠোর এদিকে- 


মিতাওয়ালীর টিলার আসেপাশে অবশ্য বেশ সবুজ। গাড়ি থেকে নেমে শতখানেক সিঁড়ি ভেঙে তবে প্রবেশ করা যায় এই একাত্তর শও শিব মন্দিরে। আমরা আর গোটা ছয়েক কপোত-কপোতী ছাড়া প্রায় জনশূণ্য মন্দির চত্বর। ছেলেমেয়েগুলো স্থানীয়। মাঝের গোল চত্বরে আসীন বুড়ো মহাদেব। মাথায় সামান্য মেটে সিঁদুর ছাড়া আর অর্চনার কোন চিহ্ন নেই। বাইরের বড় গোল চক্করে অসংখ্য কুঠুরি। প্রতিটি কুঠুরিতে একটি করে শিবলিঙ্গ থাকার কথা। অধিকাংশ আসনই শূণ্য। বাইরের এবং ভিতরের গোল চক্করদুটির মাথা থেকে পাথুরে রেন ওয়াটার পাইপ ঝুঁকে পড়েছে মাঝের আঙিনায়। তলায় পাতা পাথুরে ঝাঁঝরি। জলবিহীন চম্বলে সাড়ে সাতশ  অথবা হাজার বছর আগের রেনওয়াটার হার্ভেস্টিং। মিতাওয়ালীর পাদদেশে বেশ কিছু কুষাণ আমলের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। যা গোয়ালিয়র ফোর্টের ভিতরের মহলে সযতনে রক্ষিত। 


 অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ২৩শে নভেম্বর- কিস্তি ৯


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০


গোটা মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণে বার দুয়েক আমার হৃদপিণ্ড স্তব্ধ হতে বসেছিল। প্রথমবার চান্দেরী দুর্গে। চৌকোনা দুর্গের চার কোণে চারটি গোল গম্বুজ আছে। সামনের দিকে একটি গম্বুজ থেকে আরেকটিতে যাওয়ার সহজ পথ  বলতে মূখ্য তোরণের মাথার ওপর দিয়ে ফুট খানেক চওড়া এক কার্ণিশ মাত্র। শৌভিক তো ক্যামেরা গলায় সটান চলে গেল টকটক করে। তুত্তুরী যেতে গিয়ে যখন সামান্য টাল সামলাল, তখন পলকের জন্য নির্ঘাত থেমে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন। 


আর দ্বিতীয় দফায় ভয় পেয়েছিলাম, ওর্চার এই ব্রীজ পেরোতে। বেতোয়া নদীর ওপর এই সেতুর নির্মাণকাল কবে কে জানে? তবে এতই নীচু সেতু যে ফি বছর বর্ষায় ডুবে যায়। স্থানীয় অধিবাসীরা বলেন যে ঘোর বর্ষায় এক বাস সমান উচ্চতার জল দৌড়য় সেতুর ওপর দিয়ে। ফলতঃ দুইধারে যতই রেলিং দেওয়া হোক টেকে না কিছুই। পড়ে থাকে ভেসে যাওয়া মর্চে ধরা রেলিং এর কঙ্কাল। 


জল কম থাকলে এই  সেতুর ওপর দিয়ে পদব্রজে সকালের হাওয়া খেতে দিব্য লাগে। ওপারে শালের জঙ্গল।  ঐ গাছে প্লাস্টিকের আম ঝুলিয়ে, শুটিং হয়েছিল, আমসূত্রের। স্লাইসের বোতল হাতে দৌড়েছিলেন বলিউডের চিকনি চামেলী। চল্লিশ সেকেণ্ডের বিজ্ঞাপন তুলতে লেগেছিল পাক্কা তিনদিন। ওর্চা নগরীতে তখন লেগেছিল অকাল- দোল। 


সেতুর ওপর থেকে বিকালের সূর্যাস্ত,বিশেষতঃ যখন লালমুখো সূর্য মুখ লুকোয় মৃত রাজাদের ছত্রীর পিছনে, আর বেতোয়ার জলে গুলে দিয়ে যায় লাল-কমলা আবির, তখন পুরো স্বর্গীয় মনে হয় সবকিছু। 


মুস্কিল হয়, তখন যখন এই  সেতুর ওপর দিয়ে একসাথে দুদিকে দৌড়য় মানুষ আর গাড়ি। আর যখন আসে বাস? আজ্ঞে হ্যাঁ, এই অপরিসর ন্যাড়া সেতুর ওপর দিয়ে চলে যাত্রীবোঝাই দুমুখী বাস।


 বাপরেঃ সে অভিজ্ঞতা জীবনে ভুলব না। মেয়ের হাত ধরে প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, হয় বাসের ধাক্কা খাব,অথবা ঝপাং করে জলে পড়ে যার। জলের গভীরতা তেমন নেই বটে, তবে যা স্রোত, বাপরেঃ।  


শৌভিক দিব্যি জলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি আর তুত্তুরী কিছুতেই আর বাসের দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এল বাস।  ওপর মাত্র কয়েক ইঞ্চি জায়গায় কোন মতে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।  প্রায় গা ঘষে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল যমদূত। বাসের পাদানিতে


বসা দেহাতি বাবু, নির্বিকার ভাবে আমাদের কাছাকাছি আসতেই গুটিয়ে নিলেন জুতো সমেত পদযুগল। চোখ খোলা থাকলেও দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা, কতক্ষণ কে জানে? তবে বেশীক্ষণ নয়, কারণ উল্টোদিকের বাসগুলিকেও তো যেতে দিতে হবে।

অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ২৭শে নভেম্বর- কিস্তি ১০


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০

গাঁয়ের নাম পাঢাওয়ালি। জিলা মোরেনা। গোয়ালিয়র শহর থেকে খুব দূরে নয়। সড়ক পথে পৌঁছতে লাগে বড়জোর ঘন্টাখানেক। চম্বল উপত্যকা। মানুষ বড়ই কম এদিকে। রাস্তাঘাটও তো তেমন ভালো না। সময় হেথায় থমকে আছে পথের ধারে, পল্লীবধূর গলা অবধি ঘুঙ্ঘটের আবডালে। 


রুক্ষ চম্বলের বুকচিরে চলে যাওয়া এবড়োখেবড়ো পথে চরে বেড়ায় দলে দলে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মোষ।  চাষবাস তেমন হয় না বোধহয় এদিকে, জীবিকা বলতে মূলতঃ গোচারণ।   


এমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেন কে জানে কচ্ছপঘাত বংশীয় রাজারা এত সুন্দর মন্দির বানাতে গেলেন? সুন্দর বলে সুন্দর, যে মন্দিরের শোভা ধাঁধিয়ে দিয়েছিল খোদ চন্দেল রাজাদের চোখ। পরবর্তীকালে পাঢাওয়ালির মন্দিরের অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছিল খাজুরাহোর মন্দিররাজি। 


খাজুরাহের নাম-যশের ছিটেফোঁটাও জোটেনি পাঢাওয়ালির কপালে। পথের ধারে অনাদরে পড়ে থাকে হাজার বছরের পুরাতন মন্দির। মন্দির কইলাম কি? ভুল বলেছি। অবশিষ্ট শুধু নাটমন্দির খানা। এরা বলে মুখমণ্ডপ। 


কার উদ্দেশ্য নির্মিত এই নিঃসঙ্গ মন্দির? তা তমসাবৃত। নন্দীকেশ্বরের মূর্তি দেখে অনুমিত হয় দেবাদিদেবের উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয় এই দেবালয়।


 পরবর্তীকালে কারা যেন ধ্বংস করে দেয় সবকিছু। অথচ অটুট রাখে মুখমণ্ডপখানি। কেন? সে গল্প বলতে পারে কেবল দেউলের গাত্রে খোদিত মর্মর মূর্তিরা। কিন্তু তারা যে বড় উদাসীন। বড় নীরব। 

 

প্রায় নয় শ বছর পরে, গোহাডের জাট রাণারা এই ধ্বসে পড়া মন্দিরকে ঘিরে গড়ে তোলেন এই দুর্গ। মন্দিরের কেয়ারটেকারের জবানি অনুসারে, জাট রাজাদের নান্দনিক বোধবুদ্ধি বড়ই স্বল্প ছিল। ফলে ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাপ্ত অনুপম কারুকার্য খচিত পাথরের টুকরোগুলি দিয়েই তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন দুর্গ। দুর্গের প্রাকারে ইতিউতি আজও খুঁজে পাওয়া যায় নষ্ট হয়ে যাওয়া অতীত। 


গোহাডের রাণারা মুখমণ্ডপকে ঘিরে দুর্গ বানালেন, অথচ মন্দির গড়লেন না কেন? সবকিছু বড়ই রহস্যাবৃত এথায়। স্থানীয় কেয়ারটেকার একখানি শিবলিঙ্গ দেখিয়ে কইলেন, হাজার বছরের পুরাণ শিবজী।  ঠিক বিশ্বাস হল না। হতেও বা পারে। একদিন যাঁর জন্য নির্মিত হয়েছিল অনুপম এই দেউল, আজ তিনিই অনাদরে পড়ে আছেন, জাট রাণাদের বন্ধ কারাগারের সম্মুখে। 




অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ৫ই ডিসেম্বর- কিস্তি ১১


#হিন্দুস্থানের_হৃদয়_হতে_২০২০

গোয়ালিয়র নগরীর বুকের মাঝে, ঘুমিয়ে আছেন তিনি। পিতৃদত্ত নাম ছিল রামতনু পাণ্ডে। পিতা স্বর্গীয় মুকুন্দ রাম ছিলেন নেশায় ছিলেন কবি তথা সুরসাধক। শোনা যায় বারাণসীর কোন মন্দিরে পৌরহিত্য করতেন তিনি। সেখান থেকে কি করে যে তিনি গিয়ে পৌঁছালেন রেওয়ার রাজার দরবারে তা এক বিস্ময় বটে।  আপন গুণে জিতে নিলেন রাজার হৃদয়। গড়ে উঠল প্রবল সখ্য।  উভয়ে মিলে ডুব দিলেন সুরের সায়রে। 

দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর সৌরভ। সেই সৌরভে আমোদিত হলেন সম্রাট স্বয়ং। এল তলব, এমন নক্ষত্রকে রেওয়ার রাজসভায় মানায় না। এণার মর্যাদা দিতে পারেন কেবল বাদশা আকবর। এমন সম্মান তো স্বপ্নাতীত, অথচ বেঁকে বসলেন রামতনু। যাবেন না প্রিয় নগরী, প্রিয় সখাকে ছেড়ে। 


রেওয়া রাজ রামচন্দ্র প্রায় জোর করেই পাঠালেন দিল্লীর দরবারে। ষাট বছর বয়সে দিল্লীতে পা রাখলেন রেওয়ার রামতনু, মাতিয়ে দিলেন, কাঁপিয়ে দিলেন রাজধানী সহ সমগ্র দেশ। তাঁর কীর্তির ছটা সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল দিগদিগন্তারে। বাদশা খুশি হয়ে উপাধি দিলেন তানসেন। 


জাহাঙ্গীরনামাতে নাকি লেখা আছে, প্রৌঢ়ত্বে পদস্খলন হয় তাঁর। নতুন করে প্রেমে পড়েন তানসেন। ধর্মান্তরিত হয়ে নিকাহ করেন শাহজাদি মেহরুন্নিসাকে। দুই পক্ষ মিলিয়ে তাঁর পুত্রকন্যারা সকলেই তাদের সময়কার নামী সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। মৃত্যুর পর নিজের নগরীতেই তাকে সমাহিত করা হয়। গোয়ালিয়র নগরীর অন্যতম দ্রষ্টব্য তানসেনের সমাধি।


 এটা নিয়ে অবশ্য আছে সামান্য ধোঁয়াশা। একদল বলে, তানসেনকে দাহ করা হয়। অপরদল বলে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। তবে দুদলই একবাক্যে মেনে নেয়, যে তিনি শেষ নিশ্বাস ফেলেন দিল্লী নগরীতে। তাহলে? সেই যুগে দিল্লী থেকে তাঁর মৃতদেহ গোয়ালিয়রে নিয়ে এসে সমাধি দেওয়া হল কি করে? এই প্রশ্নের উত্তর জানে শুধু সময়। বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থিত উদ্যানের সবথেকে বড় সমাধিসৌধটি কিন্তু তানসেনের নয়। জনৈক মহঃ ঘৌসের। ফলকে লেখা তিনি নামি সুফি সন্ত ছিলেন। কেউ কেউ বলেন তিনি নাকি তানসেনের গুরু ছিলেন। ব্যাস এইটকুই।  আর খুব একটা কিছুই জানা যায় না তাঁর সম্বন্ধে। তাঁর সমাধির পিছনে তুলনায় সাদামাটা এক কবরে ঘুমিয়ে আছেন সুরসম্রাট। আসেপাশে আরও অনেকগুলি বেনামা কবর। অথবা হয়তো লেখা আছে, কিন্তু ঐ ভাষায় অক্ষরজ্ঞান আমার নাই। তানসেনের কবরের ওপর প্রতি বৃহস্পতিবার চাদর চড়ায় স্থানীয় মানুষ। কবরের মাথার কাছেই আছে একটি তেঁতুল গাছ। গলা সাধার আছে প্রত্যহ তেঁতুল পাতা চিবাতেন নাকি তিনি। 

ভিডিওতে যেটি ধরা পড়েছে,ওটি কিন্তু মহঃ ঘৌসের সমাধি সৌধ।  


https://youtu.be/J_XWYd2b-4k
অনির মধ্যপ্রদেশের ডাইরি, ১৩ই মার্চ ২০২১
কিস্তি-১২
#হিন্দুস্তানের_হৃদয়_হতে_২০২০
শেহজাদি কা রওজা-

সেই বহু পুরাণ গপ্প। রাজকন্যা আর ঘুঁটে কুড়োনীর ছেলের প্রেম। সময়টা পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগ। দিল্লীর মসনদে সদ্য সওয়ার সৈয়দ রাজবংশ। খণ্ড বিখণ্ড হিন্দুস্তান। সদ্য বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া  তুঘলকী সাম্রাজ্যে রোজই ইতিউতি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে নতুন নতুন রাজ্য। কালকের ছোট্ট সামন্তপ্রভু বা মামুলী ভূস্বামীও আজ সদর্পে ঘোষণা করে, ‘সাবধান! আমি হলুম রাজা! অথবা সুললতান!’ রাজ্য থেকে রাজ্যে বদলে যায় শাসকের ধর্ম, বদলায় না ইতিহাসের গতি। তেমনি কোন সুলতানের মেয়ে প্রেমে পড়ল এক অজ্ঞাত কুলশীল সেপাইয়ের। পর্দানশীন অসূর্যস্পর্শ্যা শেহজাদির এমন পদস্খলন কি করে মেনে নিতে পারতেন সুলতান? 
রাতারাতি পদোন্নতি হয় মূর্খ সেপাইয়ের। সিপাই থেকে সিপাহশালার অর্থাৎ সেনাপতি। নিন্দুকে অবশ্যি বলে, আরে ও তো শুরু থেকেই সেনাপতি ছিল। কিন্তু ধমনীতে ছিল না অভিজাত নীল রক্ত। ছাপোষা ধর্মান্তরিত মোছলমান। কে জানে কোনটা সত্যি। কোনটাই বা ঘোর মিথ্যা।  
শেহজাদির অজ্ঞাতসারেই তাঁর দয়িতকে পাঠিয়ে দেওয়া হল এক অসম যুদ্ধে। যেখানে মৃত্যু ছিল সুনিশ্চিত। এখানেই কিঞ্চিৎ  ঝাপসা ইতিহাস। কেউ বলে,হারেনি সে। ফিরছিল বিজয়ী হয়ে, আবার কেউ বা বলে, ধুর ধুর হেরে গোভূত। ফিরেছিল কচুকাটা হয়ে। অথবা ফেরেনি---

খবর লুকাতে পারেননি সুলতান। ঠিক পৌঁছেছিল  শেহজাদির কানে। এইখানে আবার ঝাপসা ইতিহাস। ভরসা কেবল জনশ্রুতি। কেউ বলে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসা সেনাপতিকে হত্যা করার জন্য ঘাতক পাঠিয়ে ছিলেন সুলতান। খবর পেয়ে, হারেমের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করেও দৌড়ে গিয়েছিলেন শেহজাদী। তবে দেরী হয়ে গিয়েছিল বড়। রক্তাক্ত মৃত প্রেম সহ্য হয়নি রাজদুলারীর। দয়িতের অস্ত্রেই আত্মঘাতিনী হন তিনি। বিরুদ্ধপক্ষ অবশ্যি কয়, নাঃ রাজঅন্তপুরেই আত্মঘাতিনী হন তিনি। মৃত্যুর পূর্বে কেউ কাউকে দেখতে পাননি। 

মৃত্যুর পর অবশ্য, চৈতন্যোদয়  হয় সুলতানের। উভয়কে দফন করা হয় পাশাপাশি। আর তার উপর নির্মাণ করা হয় এক চোখ ধাঁধানো সৌধ। মৃত শেহজাদী আর তার ব্যর্থ প্রেমের সৌরভে মাখামাখি এই সৌধের নাম আসলে কি ছিল কে জানে? যেমন কেউ জানে না, কি নাম ছিল সেই রাজদুহিতার। চান্দেরী শহরের উপান্তে এক বিশাল জলাশয়ের মাঝে নির্মিত এই সৌধ বর্তমানে শেহজাদি কা রওজা নামেই খ্যাত।  ছবিতে শেহজাদি কা রওজার ভিতর থেকে, ওপরে নীল আকাশের চাঁদোয়া



Saturday 14 November 2020

অনির ডাইরি, ১৪ই নভেম্বর, ২০২০

 



যদি আপনার চেহারা একটু ইয়ে হয়, ঐ আরকি হৃষ্টপুষ্ট, তাহলে বিশ্বাস করুন, আপনাকে আর গাঁটের কড়ি খরচা করে উল্কি কাটাতে হবে না। এই সমাজই দেগে দেবে, যাবতীয় দৃশ্যমান তথা আচ্ছাদিত অঙ্গপ্রতঙ্গ সমূহ। আর আমি তো শৈশব থেকেই- মানে  হেঁ হেঁ। 


বাবা বলত, “আহাঃ আমার মেয়েকে দেখে কেউ আমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের আন্দাজ পাবে না।” চুপিচুপি বলি, বাবার তো কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ছিল না, তো ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আসবে কোথা থেকে? মা চাকুরী করত ভারতীয় ডাকবিভাগে, সেসব সোনার দিন ছিল মশাই। স্বল্পসঞ্চয় নিয়ে ব্যাঙ্কের সাথে ডাক বিভাগের চলত ঘোরতর আকচাআকচি। মা জীবনে মানে কর্মজীবনে আর কি, ব্যাঙ্কের ছায়াও মাড়ায়নি। আর বাবা তো অতিশয় পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক। ফলে উভয়ের কেউই আর -- ।


 তা সে যাই হোক, বাবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট না থাকলেও, আমার দৈহিক সৌষ্ঠব দেখে জনগণ বরাবরই বাবাকে বেশ ধনী বলেই সমীহ করেছে। বিদ্যালয় জীবনের জনৈকা সহপাঠী তো, আমার অসাক্ষাতে জনে জনে বলেই বেড়াত,“অনির বাবার অনেক কালো টাকা আছে। টাকাগুলো ওরা মাটির নীচে পুঁতে রাখে। ”  


তবে সবাই যে অমন অসাক্ষাতেই বলত তেমন না, মুখের ওপরে বলার মত হৈতেষীও কম কিছু ছিল না- ট্রেনে সদ্য আলাপ হওয়া মহিলা মাকে জ্ঞান দিয়েছে- “ ওকে ভাত খেতে দেবেন না।” বাপরেঃ।  মা আর আমি হতভম্বের মত একে অপরের দিকে তাকিয়েছিলাম বেশ খানিকক্ষণ, “ভাত দেবে না মা তুমি?”


মোটা হলে আর যেটা শুনতে হয়, সেটা হল, মোটা মানেই হাফ অপদার্থ। নিষ্কর্মা, ঢ্যাঁড়শ ইত্যাদি প্রভৃতি। সারা জীবন এই অপদার্থতার সাথে লড়াই করেই বাঁচতে হয়েছে, বাঁচতে হয়- শুধু আমায় নয়, আমার মত প্রতিটি মেয়েকেই। খিদে থাকলেও কম করে খেতে হয় জনসমক্ষে। আবার পেট ভর্তি হয়ে গেলেও খিল্লি করে জনগণ- “কি বলছিস? এতেই পেট ভরে গেল তোর? লজ্জা করিস না খা-”।  


শুধু কি খাওয়াদাওয়া?পোশাকপরিচ্ছদ নয়? কোন পোশাক কাকে মানায়, এই নিয়ে রীতিমত থিসিস করে জনগণ। মোদ্দাকথা মোটাদের কিছুই মানায় না। তবে শাড়ি ঢেকে দেয় সব খুঁত- সিরিয়াসলি? খুঁত ঢাকার জন্য পোশাক পরি কি আমরা? বা খাওয়াদাওয়া করি? বা হাঁটাচলা? কথাবলা? তাহলে মশাই,নিজের ভালোলাগার জন্য কি করি? খুজলি? 


ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকলাম। সেখানেও শালা বৈষম্য- স্বাধীন অফিস কি মেয়েরা পারে? আর যদি পারেও, আমি পারব নাকি? আহাঃ পুতুল- পুতুল গড়ন। কত যে সাগর নদী এইভাবে পেরিয়ে এলাম- কত যে পচা শামুকে পা কাটলাম, কত যে খড়কুটো ঝড়ে উড়ে এলো আর গেল- কতজনের সাথে যে আমার তুলনা করা হল- কতজনের চপ্পলে যে পা গলিয়ে জুতোটাই চুরি করে নিলাম- সেসব লিখতে বসলে মহাভারত হবে। 


 মাথার অর্ধের কেশগুচ্ছ সফেদ হয়ে হাবিব বাবুর নিয়মিত খরিদ্দার হয়ে গেলাম। এখনও সমালোচনা হয় বৈকি- আহাঃ তেনারা আমার ভালো চান কি না। চান, চান আরও ভালো চান- আপনাদের শুভাশিসে আরও ফুলে ফেঁপে উঠি আমি। জীবন অনেক কিছু শিখিয়েছে, যার অন্যতম হল তোয়াক্কা না করা- বিশ্বাস করুন, জীবন বড়ই কর্মব্যস্ত, একসাথে বাপের বাড়ি-শ্বশুর বাড়ি- অাপিস-মেয়ে- উৎসব- পার্বন- ঘরের কাজ সামলে যেটুকু সময় পাই, আপনাদের কথা ভেবে (মাইরি বলছি, খিল্লী নয়) বড় মজা পাই।  শুভ দীপাবলী। 

Monday 2 November 2020

অনির ডাইরি ২রা নভেম্বর, ২০২০

 


গম্ভীর গলায় বাবা বলল, “তোমার জিনিসটা দিয়ে গেছে। খুলে দেখেও নিয়েছি। সব গোটা আছে। তবে-” শুনেই ব্যোমকে গেলাম। অনলাইন শপিং ব্যাপারটা বাবার ভয়ানক অপছন্দের। আরে সব যদি ঐ দিশী-বিলিতি শপিং সাইট থেকে কিনব, তো ছোট-মাঝারি ব্যবসাদাররা খাবে কি? এদের বাপ-ঠাকুর্দাই তো খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের। একই মত বাবার জামাইয়েরও। তবে ব্যাপারখানা হল যে, এতকিছুর পরও ঘুরে ঘুরে বাজার করার মত একজনের সামর্থ্য (শারীরিক) নেই, আর একজনের নেই সময়। অগত্যা এই শর্মা জিন্দাবাদ।


 বিশেষ কিছু কিনিনি এ যাত্রা, গুটি কয়েক কাঁচের কাপ। তাও তো গোটাগুটিই ডেলিভারি দিয়েছে অ্যামাজন, তাহলে আবার 'তবে ' কি? ফোনের ওপারে সাময়িক নীরবতা ভঙ্গ করে ভেসে আসে বাবার হতাশ কণ্ঠস্বর, “বাক্স থেকে আরম্ভ করে, মালটা- সবই চীনে মাল।” সর্বনাশ! বৃদ্ধ আবার ভয়ানক স্বদেশী। ঠাকুমা এবং বাবার পিসিরা এককালে বিলিতি কাপড় তথা পণ্যের দোকানে পিকেটিং করত। তাঁরা সকলেই আপাততঃ স্বর্গত, তবে স্বদেশীয়ানার ভূতটা বেশ বিরাজমান আমাদের ব্যাঁটরার চাটুজ্জে বাড়িতে।  আমিই দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। তবে মালটা যে চাইনিজ এটা আমিও জানতাম না। অ্যামজন একটা বাবা থুড়ি চীনে ফিল্টার লাগাতে পারে- দমে না গিয়ে জোর গলায় বললাম, “সে আর কি করা যাবে? তোমার দেশ ঐ জিনিস বানাতে পারে না, তাই-”। কথা শেষ করতে দিলে না বৃদ্ধ ফোঁস করে উঠল, “আরো ভালো জিনিস বানায়, তাই”।  


বেলা বাড়ছে, বেজার মুখে রান্নাঘরে ঢুকলাম। খুব ভালো না পারলেও, রান্না করতে আমার বেশ ভালোই লাগে। একথা শুনলেই শিকারী বেড়ালের মত ফ্যাঁচ করে ওঠে অন্তরা আর চৈতালী। “কি বললি, রান্না করতে ভালো লাগে?” বাকিটা ওদের বলতে লাগে না, আমিও জানি, রোজ রান্না করতে হয় না বলেই এসব বুলি আসে আমার মুখে। তবে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়, রান্না করার থেকে অনেক বেশী জটিল, কি রাঁধব তা ঠিক করা। 


“কি রান্না হচ্ছে?” পিছন থেকে গম্ভীর ভাবে জানতে চাইল শৌভিক। সকাল থেকেই অমন ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে ঘুরছে। এমন মিঠে আবহাওয়া, এমন কাঁচ কাঁচ রোদ, এমন দিনে ছিল হয়তো অন্য কোন পরিকল্পনা, হয়তো অন্য কোন জনমে। কিন্তু আপাততঃ “ভেস্তে গেল সন্দরী গো সবই কপাল দোষে”।


 উচ্ছে খাওয়া মুখে এখন বসেছি করলা কাটতে। বস্তুটির প্রতি তুত্তুরী বা আমার ছিটেফোঁটাও প্রীতি নেই, বরং তীব্র অসূয়া আছে। বাজাড়ু গৃহকর্তা অবশ্যি বেশ ভালোবাসেন। সিদ্ধ উচ্ছে/করলা বেশী, আলু কম, অপরিমিত ঝাঁজালো সর্ষের তেলে মাখো মাখো। খেয়ে মুখ পচে গেছে মাইরি। আজও কি রাঁধতাম নাকি? নেহাৎ পুজো শেষে হাওড়া থেকে ফিরে ফ্রীজ সাফ করতে গিয়ে গুটি কয়েক প্রায় হিমায়িত করলা আবিষ্কার হয়েছে- 


ঘাড় না ফিরিয়েই জবাব দিলাম, “কুড়কুড়ি করলা।” ভ্যাবাচাকা খাওয়া বিড়বিড়ে অথচ কিঞ্চিৎ অভিমানী  স্বর ভেসে এল,চৌকাঠের ওপার থেকে  “ ভাতের সাথে আমি কুড়কুড়ি খাই না রে বাবা। ” সত্যি বলতে কি, কুড়কুড়ি করলা আমিও বাপের জন্মে খাইনি। কোন স্মরণাতীত কালে কুড়কুড়ি ভিণ্ডি রাঁধতে শিখিয়েছিল রিমি। ভাড়ার বাসে করে মহানগরে আপিস করতে যেতাম তখন। বাসের নাম ছিল স্নেহা। দরজা দিয়ে উঠেই ডান দিকের তিন নম্বর সিটটি বরাদ্দ  ছিল আমাদের দুজনের জন্য। বড়ই সুখের ছিল সেই সব দিন। 


অনেক দিন কেটে গেছে, ভুলেই গেছি অর্ধেক রেসিপি। স্মৃতি হাতড়ে ফালি ফালি করে করলা কেটে,বীজ ছাড়িয়ে, জল ঝরিয়ে হলুদ, জোয়ান, সামান্য লঙ্কা গুঁড়ো আর বেসন দিয়ে চটকে মাখি। কর্ন ফ্লাওয়ার দিতে বলেছিল বোধহয় রিমি। ওদের বাড়িতে বেসনের ব্যবহার প্রায় ব্রাত্য। সব ভাজাভুজিই ভুট্টার আটায় করেন ওণারা।অনেক বেশী মুচমুচে হয়। কর্নফ্লাওয়ার ফুরিয়েছে খেয়াল করিনি। যাক গে বেসনই সই। এখনই নুন মাখাতে নিষেধ করেছিল রিমি, তাহলে জল বেরিয়ে,মুচমুচে ভাজা আর হবে না। গরম গরম ভেজে চাটমশলা ছড়াতে হবে। সেটাও বোধহয় ফুরিয়েছে, তাহলে বিট লবণ।  


গুটি চারেক হিমায়িত পটলও বেরিয়েছে। দইপটল খেতে খুব ভালোবাসে তুত্তুরী। গোটা গোটা পটল অল্প খোসা তুলে, সামান্য চিরে নিয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে তেলে ভেজে তুলে রাখলাম। এবার অল্প পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ভালো করে ফেটানো টক দই, সামান্য সর্ষে,জিরে,লঙ্কা গুঁড়ো, নুন আর একটু বেশী মিষ্টি মিশিয়ে কষে জল ঢেলে দিলেই তুত্তুরীর প্রিয় দই পটল তৈরী।  ফ্রেশ ক্রীম মেশালে স্বাদ আরও বাড়ে বটে, তবে আপাততঃ তাও বাড়ন্ত।  


ভাবতে ভাবতেই অর্ধেক রান্না শেষ। ডাল আর পাঁপড় আগেই ভেজে রেখেছি। বেলা বাড়ছে, শুধু ভাত আর মাছটা করে নিলেই হল। আজ পাবদা এনেছে শৌভিক। পাবদা আমার শ্বশুর মশাইয়ের অন্যতম প্রিয়মাছ। আমাদের বাড়ির সব শুভকাজে পাবদা হবেই। আমাদের রেজিস্ট্রিতে এত্ত বড় পাবদা হয়েছিল যে ন্যাজামুড়ো সমেত একপ্লেটে ধরছিল না। পাবদা নাকি আমার দাদাশ্বশুরও খুব ভালোবাসতেন। একবার খেতে বসে সে কথা বলতে বলতে ছলছলিয়ে উঠেছিল শ্বশুরমশাইয়ের দুই চোখ। “ তখন তো আর এত বড় বড় পাবদা পাওয়া যেত না, ছোট ছোট মাছ, তাও কদাচিৎ পাওয়া যেত শালকিয়া বাজারে। তখন তো আর এত প্রাচুর্য ছিল না, বড় পরিবার। আর লোকও আসত কত। বাঙাল বাড়িতে চুলা নিভতই না আমাদের ছোটবেলায়-। ” বলতে বলতে থেমে গিয়েছিলেন শ্বশুরমশাই। আঙুল দিয়ে এঁটো থালায় কি যে আঁকিবুকি কাটলেন খানিকক্ষণ, তারপর ঢোঁক গিলে বললেন,“ হলেও ঐ হয়তো মাথাপিছু একটি করে।  তবুও যেদিন পাবদা হত, কি যে পরিতৃপ্তি করে ভাত খেত বাবা-”।  


আমি অবশ্য ঘটি বাড়ির মেয়ে। কেন জানি না, ধারণা ছিল,পাবদা শুধু বাঙালরা খায়। খেতে মন্দ নয়, তবে ঐ আর কি, ফিরিঙ্গী ভাষায় একটু ওভারহাইপড্। বলাইবাহুল্য রাঁধতেও জানতাম না। এবাড়িতে অবশ্য কোন মাছ রাঁধতে না জানলেই কোন সমস্যা নেই, এরা গুষ্টিসুদ্ধু  কালোজিরে কাঁচালঙ্কার ভক্ত।  তবে সুকন্যা বলেছিল পাবদা ভীষণ ফাটে, একহাতে খুন্তি আর একহাতে ঢাল নিয়ে রান্না করতে হয়। তাই হয়তো করতাম, যদি না এক বয়ঃজ্যেষ্ঠ সহকর্মী এক টোটকা না শেখাতেন। বেশ বনেদী রইস আদমি ছিলেন ভদ্রলোক। মানুষকে রেঁধে খাওয়াতে বড় ভালোবাসতেন। ছুঁতোনাতা পেলেই অফিসে চাঁদা তুলে মহাভোজ আয়োজন করতেন। চাঁদা তো উঠত কচু, আমরা কজনই দিতাম বাকি উনি লুকিয়ে গাঁটগচ্ছা দিতেন। জানাজানি হবার পর ভুরিভোজ উঠেই গেল অফিসটা থেকে। কিন্তু উনি যে ন্যাড়া থুড়ি ওণার মাথাভর্তি চকচকে টাক, তাই উনি ঘুরেফিরে ঠিক বেলতলা আবিষ্কার করেই ফেলেছিলেন। বড় টিফিন ক্যারিয়ারে করে রেঁধে আনতেন চব্য-চোষ্য-লেহ্য। হয়তো পেয়ও থাকত,তবে সে ব্যাপারে কেউ আমার সামনে মুখ খুলত না। উনি কোনদিন পনীর রেঁধে আনতেন তো কোনদিন খাসির মাংস। রেসিপি জিজ্ঞাসা করলেই বলতেন, “কি খাবেন বলুন না। করে আনব।” 


শুধু যে খাওয়াতেন তাই নয়, রান্নার তরিকাও শেখাতেন। ততোদিনে তুত্তুরী হামা টানছে, কিন্তু ওণার ধারণা ছিল আমি রান্নাবান্না কিছুই পারি না। সবই শেখাতেন, তারপর বলতেন, “খুব সাবধানে কিন্তু। আমার বড় মেয়ে আপনার থেকেও বড়, তার ঐটা রাঁধতে গিয়ে হাত পুড়ে এত্ত বড় ফোস্কা পড়ে গিয়েছে জানেন। ” মাংস রান্নায় কাবাবচিনির ব্যবহার উনিই শিখিয়েছিলেন। আর শিখিয়েছিলেন, কাঁচা পাবদা মাছের গা যদি ছুরি দিয়ে সামান্য চিরে দেওয়া হয়, তাহলে গরম তেলে দিলেও তা আর ফাটে না।


পাবদা মাছ রাঁধতে গেলেই প্রতিবার ওণার কথা মনে পড়ে যায়।  ছুরি দিয়ে পাবদার পেট ফাঁসাচ্ছি, হঠাৎ দেখি মুঠোফোনে ওণারই নাম ফুটে উঠেছে। একি রে বাবা! দীর্ঘদিন ওণার সাথে যোগাযোগ নেই। আমি থাকতে থাকতেই উনি অবসর নিয়েছিলেন, তারপরও বছর খানেক যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই হুমকি দিতেন আমার ডায়েট নষ্ট করতে আসছেন- তারপর আর কোন যোগাযোগ নেই। দৃষ্টির আড়াল,মনের আড়ালের অজুহাতে হয়তো যোগাযোগের চেষ্টাও করিনি আমি। ভেবেছি নম্বর বদলে গেছে হয়তো। ফোন পেয়েও বিশ্বাস হচ্ছিল না, ভয়ে ভয়ে হ্যালো বলতেই, ওপার থেকে ওণার দরাজ গলা- “শুভবিজয়া”। গ্যাস অফ করে, পাবদায় চাপা দিয়ে, অভিমানী বরের গায়ে হেলান দিয়ে অনেক গল্প হল। অনেককিছুই জানতাম না। জানতাম না ওণার দুলালী দৌহিত্রী, আক্রান্ত হয়েছিল মারণ ব্যাধিতে।  বছর দুয়েক আগে মারা গেছে মেয়েটি। সেই শোককে কবর দিয়ে উনি ব্যস্ত নিজকন্যার শোক দূরীকরণে। বছর পঞ্চাশ বয়স হয়েছে মেয়েটির। আর সন্তানধারণের কোন সম্ভবনা নেই। একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে পাথরের মত হয়ে গেছে সে। বৃদ্ধ চেষ্টা করছেন, যদি দত্তক নিয়েও কোন শিশুকে তুলে দেওয়া যায় সন্তানহারা মায়ের ক্রোড়ে। কিন্তু সেখানেও বারবার ব্যর্থ মনোরথ হচ্ছেন ওণারা। 


কয়েক পর্দা নেমে গিয়েছিল ওণার কণ্ঠস্বর, আবার চনমনিয়ে উঠল, “একবার আসুন। কর্তামশাই, মেয়েকে নিয়ে। অমুক-অমুককেও ডাকব। যে চলে গেছে তার জন্য আর মনখারাপ করে কি করব বলুন? বড় ভালো ছিল মেয়েটা। জানেন তো, আর কেউ না চিনলেও আমি চিনতে পেরেছিলাম, ও আসলে আমার স্ত্রী ছিল। ঐ ফিরে এসেছিল জন্মান্তরে। নইলে আমায় এতো কেন ভালোবাসবে বলুন তো? আর এভাবেই বা কেন শেষবয়সে ফেলে চলে যাবে? শাস্তি দিতে এসেছিল,বুঝলেন কিনা। ” ওণার শেষ কথা গুলো ফোন রেখে দেবার পরও অনেকক্ষণ বাতাসে ঘুরছিল। অফিসে কানাঘুষো শুনেছিলাম বটে, যৌবনে জনৈকা মহিলা সহকর্মীর সাথে ওণার বিবাহ বহির্ভূত প্রণয় এবং তদজনিত ওণার স্ত্রীর মনোবেদনার দাস্তান। মানসিক অবসাদে ভুগে ভুগেই নাকি একদিন টুপ করে ঝরে গিয়েছিলেন প্রৌঢ়া। তবে এই শাস্তি বোধহয় তিনিও কামনা করেননি।