অনির ডাইরি ২২শে অক্টোবর, ২০২৫
#অনিরডাইরি #হাওড়ার_টুকিটাকি
মা শুধাল, " বাজারে ভিড় পেলি?" জবাব দিলাম, তেমন নয়। হাওড়ার কালী পুজো, কারণপায়ী মায়ের বাছাদের এই তো সবে ঘুম ভাঙছে। বিরক্তিতে দুই ভ্রু কুঁচকে গেল আমার মুর্শিদাবাদী মায়ের, ঠোঁট মুচড়ে বলল, " সবাই মদ খেয়েছে না?" জবাব দিলাম, সবাই। সব্বাই। একমাত্র আমি বাদে। কি করলাম মা, কালী পুজোতে একটু মদও খেলাম না। মস্করা মারতে ব্যস্ত আমার মন হঠাৎ কু গেয়ে উঠল, ঘুরে দেখি আমার বেতো থপথপে জননী, বিদ্যুৎ গতিতে কখন যেন তুলে নিয়েছে সদ্য ছাড়া একপাটি হাওয়াই চটি।
"কারণ আমি কোন রিস্ক নিই না" বিড়বিড় করতে করতে আবার দৌড়ালাম বাজার। গুণে গুণে আরো এগারো খানা জিনিস কিনে আনতে হবে। তার মধ্যে চিনি, লঙ্কাগুঁড়ো, পাঁপড়, পনীর ইত্যাদি যেমন আছে, তেমনি আছে একখানা প্যান্টুলও। চারদিন পিত্রালয়ে থাকার আনন্দে এমন প্যাকিং করেছি যে প্যান্ট মনে করে আর একটি টিশার্ট নিয়ে চলে এসেছি। এই নিয়ে গতকাল থেকে লড়াই চলছে মায়ের সাথে। মা দু কথা বললে, চারটে কথা শুনিয়ে দিচ্ছি আমিও।
বাবাকে খুশি করার জন্য পাক্কা মোহনবাগান রঙের জামাপ্যান্ট গুছিয়েছিলাম আমি। সবই আমার ইস্টবেঙ্গলী বরের কিনে দেওয়া যদিও। বাড়ি এসে যদি সবুজ মেরুন দুটোই টিশার্ট বেরোয় তো আমি কি করব? তার মানেই আমি অপদার্থ কিভাবে প্রমাণ হয়? বললাম বাপটাকে একটা পুরানো প্যান্ট ধার দাও, তো বলে, " আমার প্যান্ট তোর হবে না।" খুড়তুতো ভাইটার কাছে অবশ্য চাওয়াই যেত, গতকালই বড়মামার ফুল প্যান্ট পরে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল শ্রীমতী তুত্তুরী। চাটুজ্জেরা যেমন ছিটিয়াল হয় আর কি, দিব্যি বাজি ফাটাচ্ছিল (থুড়ি পোড়াচ্ছিল, নো ফাটানো দিস ইয়ার) দুই মামাতো পিসতুতো ভাইবোনে, রেফারি গিরি করছিল বড় মামা। হঠাৎ রাত দশটায় মনে হল, "চল ঠাকুর দেখে আসি। বন্ধুমিলন সংঘ ফ্রিতে আইসক্রিম দিচ্ছে শুনছি -।" কিন্তু শ্রীমতী তুত্তুরী যে হাফ প্যান্ট পরে আছেন, এই পরে এত রাতে বাড়ি থেকে বেরোলে মাম্মাম (তাঁর দিদা) যে চোটে বোম হয়ে যাবে। তাও ঠাকুর দেখা এবং ফ্রিতে আইসক্রিম খাবার এমন বাসনা যে তিনি প্রস্তাব দিলেন, "দু মিনিট দাও বড় মামা, জিন্সটা গলিয়ে এখুনি আসছি।" তো বড়মামা কইলেন, " কুচ পরোয়া নেই, তুই আমার একটা কাচা প্যান্ট পরে নে -"।
সেই পরে তিনি গোটা হাওড়া ঘুরে এসেছেন গত কাল, সাঁটিয়েছেন ফ্রি আইসক্রিম ও। আজ আবার চাইতে একটু লজ্জা লাগল। লতা দি বলে দিয়েছিল, ব্যাঁটরা থানা ছাড়ালেই বাম দিকে সারি দোকান। প্রথমটা থেকেই পেয়ে গেলাম। পকেটওয়ালা প্যান্ট, মাত্র ১৯০/-। এত কম দাম? আমাজন, মিন্ত্রা হলে গালে চড় মেরে ৫০০/৫৫০ টাকা নিয়ে নিত। ব্র্যান্ডেড গুলো তো হাজারের নীচে হয় না দেখি। সন্দিহান হয়ে শুধাই, দাদা আমার হবে তো? লোকটা বেজায় টেনে দেখায় আর মুখে বলে, " তুমি এমন কিছু মোটা নও বাপু।" সাধে হাওড়া আমার প্রিয়তম শহর।
দুই ব্যাগ ভর্তি মাল নিয়ে টোটোয় উঠলাম, না ভর্তি হলে ছাড়বে না। বসে বসে গান শুনছি, " স্ক্যান্ডাল চাই বুঝলে, স্ক্যান্ডাল। নইলে এই সমাজে পুরুষ বলে পাবে না কোন মান -"। ইশ কি ইমমরাল লিরিক্স। সে-ক্সি-স্ট টু। তিনি অবশ্য ভাবলেশহীন, গেয়েই চলেছেন, " লুনা লু লু, কেন তোমার বয়স হয় না ষোল, আমার নাইন্টিন -"। এ বাবা, এতো ageism। আবার ষোল চাইছে -। পলকে থেমে গেল গান, চোখের সামনে এসে দাঁড়ালেন, বিগত এক শতকের সুন্দরতম বাঙালি পুরুষ, মুখে তার ভুবনজয়ী হাসি। পিছনে ভয়ংকর সুরেলা এক বাঙালি ভদ্রলোক, তিনিই গাইছিলেন। জাদুকর তো শুধু ঠোঁট নাড়ছিলেন। কান মুলি, গাও প্রভু গাও।
বাড়ি ফিরে মাকে আশ্বস্ত করি প্রথমে, প্যান্ট পেয়েছি এবং না আমি সস্তা বলে বারমুডা কিনে আনিনি। আর হ্যাঁ এত কষ্ট করেও মোহনবাগান রঙই এনেছি। তারপর মেয়ের সাথে গল্প করতে বসি, এক সুদর্শন আর এক সুরেলা বাঙালি পুরুষের গল্প। দুই ভদ্রলোক আমাকে কদমতলা বাজার থেকে প্রায় বাড়ি অবধি তাড়া করেছেন। যেখানেই দাঁড়িয়েছে টোটো একই গান বেজে চলেছে, এমনকি পাড়ার ঠাকুরের সামনেও, "লুনা লু লু -"। একে যদি কাকতালীয় না বলি, কাকে বলব মশাই।
শ্রীমতী মন দিয়ে শোনেন গান, সিনেমার গপ্প। শোনেন তাঁর দিদিমাও। জাদুকরের কথায় তাঁরও দুই চোখে নামে আবেশ। সুর কাটে কেবল বাবা। তুত্তুরী শেষে বলেই ফেলে, " দাদু এত হিংসে করো না।" রেগে আসর ছেড়ে চলেই যায় বাবা। আমরা তিন কন্যা তখনও মত্ত জাদুকরে। কথায় কথায় ওঠে পুঁথি বাবু আর টাক বাবুর কথা। শ্রীমতী ভ্রু কুঁচকে বলে, " টাক বাবু? ব্রো এতো হেয়ার-ইজম"। এবার ভেবলে যাই আমি, সেটা কি ইজম ভাই। তিনি হেসে গড়িয়ে পড়েন, " যার চুল নেই তাকে চুল নিয়ে খোঁটা দেওয়া। এরকম কিছু আছে কিনা জানি না, মনে হল তাই -।" হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোবো। কি জেনারেশন মাইরি। আর আমার গর্ভধারিনী কিনা কেবল আমার ওপর জুতো হস্ত -

No comments:
Post a Comment