Saturday, 29 November 2025

অনির ডাইরি নভেম্বর, ২০২৫

 অনির ডাইরি ২৮শে নভেম্বর, ২০২৫

#অনিরডাইরি 


উফ্ আজ শুক্রবার। বাড়ি ফিরব। আজ তো "পাঁও জমিন পর নেহি পড়তে মেরে -"। দিন দুয়েক আগে মেছেদা স্টেশনে লাফিয়ে নামতে গিয়ে মোচড় খেয়েছে বাম গোড়ালিটা, প্রথম দিন তো তবলা আলুর মত ফুলে ছিল, বিকালে ঘরে ফেরার ট্রেনে বসে ভীষণ অসহায় লাগছিল সেদিন। আমি চট করে খারাপ থাকি না, এতজন মানুষ আমার মুখাপেক্ষী যে খারাপ থাকাটা আমার কাছে বিলাসিতা। শুধু আমি না, আমার সমগোত্রীয় সকলেরই এক অবস্থা। দিন কয়েক আগেই আমার ভাই বউ বলছিল, " জানো তো দিদিভাই আমি এখন মরতেও পারব না সামনে ছেলের উচ্চমাধ্যমিক, যদি বাই চান্স মরেও যাই, ভূত হয়ে ওর ঘাড়ে বসে থাকব আর বলব, পড় পড়।" 


তবে সেসব তো দিন কয়েক আগের কথা, আজ শুক্রবার, " বোলো দেখা হ্যায় কভি, তুমনে মুঝে উড়তে হুয়ে -"। স্নান করতে গিয়ে দেখি, গিজার চললেও, বিকল হয়েছে গরম জলের নবটা। জয় মা বলে ঠাণ্ডা জলেই স্নান সেরেনি। শুনেই ভালো করে চাদরটা জড়িয়ে নেয় মা, ঘোষণা করে " আমি বাবা আজ চান করছি না।" তড়িঘড়ি জলের মিস্ত্রিকে ফোন করে বাবা। লতা দি রোজ বলে, " দুটো ভাত খেয়ে যাও, প্রেসার কুকারে এখুনি হয়ে যাবে -"। আজও বলেছিল, আজও না বললাম আমি। একে তো লতাদির মত ডিম পাঁউরুটি কেউ বানাতে পারে না, তারওপর গতকাল থেকে ভালো নেই লতা দির শরীরটাও। ঠাণ্ডা লাগতেছে বেদম। 


মচমচে করে ভাজা দুটো ডিম টোস্ট খেয়ে, ভেজা চুলে একটা ক্লিপ আটকে বেরিয়ে পড়ি। রোজই শুধায় মা, " টিপ পরবি না? মুখে কিছু লাগাবি না?" রোজই এক জবাব দিই আমি, আগে তো ট্রেনে উঠি। বাগনানের পর, ফাঁকা হয়ে যায় লেডিজ কামরা, তখন সবাই লিপস্টিক লাগায়, আমিও সেই সবাইয়ের একজন। টিপ পরি, কাজল কম্প্যাক্টও লাগাই ট্রেনে বসে। আর যেদিন লেডিজ কম্পার্টমেন্টে উঠতে পারি না, সেদিন স্টেশনে নেমে উত্তমকুমারের গাড়ি ভরসা। তাতে একটা সুবিধা হয়, কিছু যদি ফেলেও যাই, যত্ন করে গুছিয়ে রাখে উত্তম। গেল হপ্তায়ই যেমন, পেন বলে যেটা তুলে রেখেছিল, সেটা ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া কাজল পেন্সিল, পাগলের মত যাকে খুঁজছিলাম এবং কাল্পনিক চোরকে শাপশাপান্ত করছিলাম আমি। 


বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই টোটো পেয়ে গেলাম আজ। এত সকালে মাত্র একজন ছাড়া আর কোন সহযাত্রী ও পেলাম না, তাতেও হেলদোল নেই টোটোওয়ালার। পক্ষীরাজের মত উড়িয়ে গিয়ে নামালো দাসনগর ইস্টিশনে, বিনা নখরায় ফেরৎ দিল পাঁচটাকা। প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়তে যাব, " অ্যাই, অ্যাই" করে হাঁকলেন সহযাত্রী ভদ্রলোক। ঘুরে তাকাতেই বললেন, " তুই আমাদের পাড়ার মেয়ে না? ক্ষীরেরতলায় বাড়ি না তোর?" আজও কেউ আমার সাথে এইভাবে কথা বলতে পারে বিশ্বাসই হচ্ছিল না, প্রায় দুই দশক এই মহল্লা ছাড়া আমি, ভট্টাচার্য বাড়ির বড় বউ, শ্রীমতী তুত্তুরীর মা, মুকুল সৌরভদের জাঁদরেল বস, আজও লোকজন আমাকে পাড়ার মেয়ে ভাবে - । আমার হতভম্ব দশা দেখেই বোধহয় মায়া লাগল ভদ্রলোকের, বললেন, " ভালো থাকিস রে মা। যা তোর ট্রেন এল বুঝি।" 


এক বুক অক্সিজেন নিয়ে দৌড়ালাম, সাধে এই শহরটাকে এত ভালবাসি। বাগনান ছাড়ানোর পর আজও ভালো করে সাজুগুজু করে নিলাম, উত্তমকুমারের সাথে ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়ার গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম আপিস। মিটিং, মিছিল, পেনশন, ডেথ কেস সব যেন হুহু করে উড়ে গেল জানলা দিয়ে,আজ বাড়ি ফিরব যে। "বোলো দেখা হ্যায় কভি, তুমনে মুঝে উড়তে হুয়ে -"।


অনির ডাইরি ১৮ ই নভেম্বর, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি #তাম্রলিপ্তকড়চা 



সকাল থেকে তীর্থের কাকের মত বসে থেকে অবশেষে এক কাপ চা পেয়েছি। আমাদের অফিসে চা হয় বটে, তবে সেটা নেহাৎ কালো চা। একেক দিন তাতে ভুরভুর করে একেক রকম সৌরভ। কোনদিন তুলসী পাতার গন্ধ, তো কোনদিন বিছুটি পাতার সুবাস, কোনদিন গরম মশলা তো কোনদিন আবার সাক্ষাৎ দার্জিলিং চায়ের গন্ধ। সেদিন ভাবি অফিস থেকে বেরিয়ে ডিয়ার লটারির টিকিট কাটব। 


তাও ভালো, জহর বাবুর আমলে তো পান পাতার গন্ধও পেয়েছি। সারাদিন কচরমচর করে পান চিবাতো লোকটা, তারই খানিকটা প্রসাদ হিসেবে মিশিয়েছেন কিনা জিজ্ঞাসাই করে ফেলেছিলাম বুক ঠুকে। উনি অবশ্য শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের দিব্যি কেটে বলেছিলেন, ওটা পান নয়, বেলপাতা। নারাণ পুজোর বেলপাতাগুলি কি এমনি ফেলে দেবেন, তাই আর কি- 


এটা অবশ্য দুধ চা। সাথে একটা কচুরির সাইজের সুজির বিস্কুট। সবে মুখে পুরেছি, শান্তনু একগাল হেসে দরজা খুলে বললে, " ম্যাডাম ওনারা এসে গেছেন। ডাকব?" ইশারায় দুই মিনিট অপেক্ষা করতে বলে, কোনমতে গিলে নিলাম গরম চা'টা। বেল বাজাতেই ঘরে এসে ঢুকল শান্তনু, পিছন পিছন এক মধ্যবয়সী নারী এবং পুরুষ। উভয়েই মাঝারি উচ্চতা, দোহারা গড়ন, শ্যাম বর্ণ। ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল। লোকটি রোদে পোড়া। উভয়ের পরণে একেবারে ছাপোষা পোশাক। ভদ্রলোক একটু হাসিখুশি, ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ গম্ভীর। উভয়েই বেশ অনেকটা সন্ত্রস্ত। 


ইশারায় বসতে বললেও, বসলেন না কেউ। ভীত হয়ে তাকালেন শান্তনুর দিকে। সকাল থেকে উচ্চিংড়ের মত লাফিয়ে বেড়াচ্ছে শান্তনু, আজ তার আনন্দ আর ধরে না। একটু আগেই দেখলাম আসেপাশে কোন আপিসের কোন কর্মীর বাড়িতে কার্তিক পড়েছে সেই হিসেব নিয়ে বেড়াচ্ছিল, যেন তারা সত্যিই ওকে নিমন্ত্রণ করে লুচি/ খিচুড়ি খাওয়াবে। মাইরি - 


 বললাম শান্তনু তুমিও একটু বসো বাবা। পা দুটোকে একটু দম নিতে দাও। শান্তনু এক গাল হেসে জিভ কেটে বসে পড়ার সাথে সাথেই ওনারাও বসে পড়লেন ধপ করে। এবার আসি ওনাদের পরিচয়ে, ভদ্রলোকের নাম অভিজিৎ কুণ্ডু, নিবাস পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমার ব্লকের কুমারারা অঞ্চলে। ওনার স্ত্রী লতা কুণ্ডু, আমাদের বিনামূল্যে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের একজন নথিভুক্ত শ্রমিক ছিলেন। পেশা ছিল সূচি শিল্প।


আর ভদ্রমহিলার বাড়ি এই জেলারই শহীদ মাতঙ্গিণী ব্লকের কাখড়দা অঞ্চলে। ওনার স্বামীও ছিলেন আমাদের প্রকল্পের নথিভুক্ত শ্রমিক। নাম শশাঙ্ক মণ্ডল, পেশায় ছিলেন ফুলের ব্যবসায়ী। ২০১৯ সালের কোন এক অভিশপ্ত ভোরবেলা ফুল বিক্রয় করে বাড়ি ফিরছিলেন শশাঙ্ক বাবু, যখন বালি বোঝাই একটি গাড়ি ওনাকে পিষে দিয়ে চলে যায়। 


ঐ একই বছর মারা যান লতা কুণ্ডুও। ডাক্তারের বয়ান অনুসারে হাইপারটেনশনের রুগী ছিলেন ভদ্রমহিলা। মৃত্যুর কারণ সেরিব্রাল অ্যাটাক। প্রকল্পের নিয়ম অনুসারে লতা দেবীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী এককালীন পঞ্চাশ হাজার আর শশাঙ্ক বাবুর স্ত্রী দুই লক্ষ টাকা অনুদান পাবেন। ওনারা সেই মত যাবতীয় কাগজ পত্র জোগাড় করে আবেদন ও করেন। সেই আবেদন অঞ্চল থেকে ব্লক হয়ে এসে পৌঁছায় আমার পূর্বসুরীর কাছে। সব কাগজপত্র পরীক্ষা করে অনুমোদন ও পেয়ে যায় দুইটি কেস। আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের তরফ থেকে টাকা চেয়ে পাঠানো হয় মহানগরে। এসেও যায় অনুমোদিত অর্থ। সেই টাকা ছেড়েও দেওয়া হয়, অন্তত ওয়েবপোর্টাল তো সেই কথাই বলে।


তারপর গোটা বিশ্বজুড়ে ঘোষিত হয় লকডাউন। রাতারাতি বদলে যায় চেনা দুনিয়াটা। বেশ কিছুদিন গৃহবন্দি থেকে আবার পুরান ছন্দে ফেরে জীবন। কালের নিয়মে দাঁত নখ খসে যায় অতিমারির। বদলী হয়ে যায় প্রাক্তন আধিকারিক। বদলে যান ইন্সপেক্টর সাহেবরাও। বদলে যায়, হাত বদল হয় ওয়েবপোর্টাল। এমনকি বদলে যায় আমাদের অফিসের ঠিকানাও। 


এই বিপুল পরিবর্তনের মাঝে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর জমা পড়ে দুটি নালিশ। একটি অভিজিৎ বাবুর আর একটি সন্ধ্যা দেবীর। বক্তব্য একই," টাকাটা তো এখনও পেলুম না আজ্ঞে।" 

এত পুরান কেসের টাকার হদিশ করা কি মুখের কথা? টাকা ঢোকেনি, এমন নালিশ তো আমরা সপ্তাহে সপ্তাহে পাই। শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে টাকা ঢুকে যায়, মানুষ চেক করে না। অথবা এক একাউন্ট নম্বর দেয় আর অন্য একাউন্ট নম্বরের পাশবই আপডেট করতে থাকে। বাদ বাকি লোকজন টাকা পেলেও বুঝতে পারেন না, কোন খাতে ঢুকেছে এই অনুদান। 


তাই এমন নালিশ জমা পড়লেই আমরা সর্বাগ্রে বলি, পাশবইটা নিয়ে আসুন। এনাদেরও তাই বলা হল। দেখা গেল একাউন্ট ঠিক আছে, ২০১৯-২০২০ সাল থেকে কোন বড় টাকাও ঢোকেনি। 


তাহলে কি জনধন একাউন্ট ছিল? ৫০ হাজার আপার লিমিট? তার বেশি টাকা ঢুকতে গেলেই লাফিয়ে পালিয়ে আসে। পালিয়ে এলে/ ফিরে এলে তার হিসেব তো থাকবে। ব্যাংক স্টেটমেন্টে কোথাও তার উল্লেখ তো থাকবে। বিশের বছরের স্টেটমেন্ট দেখতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ, কি ঢুকেছে, কি বেরিয়েছে, কি ফিরে ফিরে এসেছে - বোঝা যায় না কিছুই। সবকিছুই তালগোল পাকানো। 


ব্যাংক প্রথমেই হাত তুলে দিল, বিশের বছরের সব কিছুই বিষময়। ইতিমধ্যে বহুবার বদলে গেছেন কর্মীবৃন্দ। এই জট ছাড়ানো বর্তমান কর্মীদের পক্ষে অসম্ভব। ব্যাপারটা যে খুব সহজ নয় আমরাও জানি এবং বুঝি। মুস্কিল হল দিন আনা, দিন খাওয়া, প্রিয়জন হারানো দুটো মানুষকে কিভাবে বোঝাই। তাঁরা যে প্রায়ই ফোন করেন, এসে বসে থাকেন শান্তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে। " ও ভাই, কিছুই কি হবে নি?" 


"এত দেরী করে কেন আইছু", বলে ভাগিয়ে দিতেই পারত শান্তনু। সরকারী আপিস মাত্রই তো সেটাই বদনাম। উল্টে নৈমিত্তিক কাজ সামলে, দিনের পর দিন ব্যাংকে পড়ে থাকে শান্তনু, যদি কোনভাবে কিছু সমাধান সূত্র পাওয়া যায়। হাসিমুখ মহাফোক্কড় ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলে ব্যাংকের লোকজনও। তেমনি কেউ নিয়মের বজ্রআঁটুনির ফাঁক গলে বার করে দেন তাড়াতাড়া কাগজ। সেই কাগজের গাদায় টাকা খোঁজা আর খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা একই প্রায়। অতিকষ্টে উদ্ধার হয় ফিরে আসা টাকার হদিশ। দেখা যায় ঐ অর্থবর্ষ অবসানে, না খরচ হওয়া অন্যান্য টাকার সাথে মহানগরে ফেরৎ গেছে এনাদের আড়াই লাখ টাকাও।


রহস্য সমাধান হতে পুনরায় টাকা চাইতে যাই আমরা। কিন্তু এবার আর কিছুতেই রাজি নয় পোর্টাল। কারণ তার হিসেবে তো এই টাকা আমরা বহুবছর আগে দিয়ে বসে আছি। সেকি কেলো! বিশদে জানিয়ে মহানগরে চিঠি লিখে, মুচলেখা দিয়ে অবশেষে দিন দুয়েক আগে এসেছে টাকাটা। উৎসাহের আতিশয্যে সেই রাতেই অভিজিৎ বাবু আর সন্ধ্যা দেবীকে খবরটা জানিয়ে দেয় শান্তনু। আজ ওনারা উভয়েই এসেছেন ধন্যবাদ জানাতে।


ওনারা বলেন, " আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলাম দিদি।" আমি বলি, আমরাও। তবে কিনা না আঁচালে বিশ্বাস নেই। আগে টাকা ঢুকুক, তারপর ধন্যবাদ নেবেন - দেবেন ক্ষণ। নভোনীল বাবু পাশ থেকে বলে ওঠেন, " এবার আপনাদের একাউন্ট ঠিক আছে তো? পুরো টাকা ঢুকবে তো?" উভয়েই মাথা নেড়ে ব্যাগ হাতড়ে বার করে আনেন দুটি পাশ বই। অভিজিৎ বাবু কুন্ঠিত ভাবে জানান, " ইটা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাংক বলছে আর পাশবই দিবে নি। মোবাইলে কি করে দেবে যেন।" আমরা বুঝি yono। সে দিক, পাতা 

উল্টে বুঝি, একাউন্ট ঠিকই আছে। এবার সন্ধ্যা দেবীর পালা। এনার তো অনেক টাকা। দুই লাখ। মানে মানে ঢুকলে হয়। বলতে বলতে পাতা উল্টে দেখি, বড় বড় করে লেখা, " tiny account।" অর্থাৎ আবার ফিরে আসতে চলেছে আমাদের টাকা। উফ ভগবান, এরা যে কেন কথা শোনে না। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, তিনি যে কিছুই বুঝলেন না, সেটা বেশ বুঝলাম আমরা। তবে এবার আর কোন রিস্ক নিইনি আমরা, ভদ্রমহিলাকে পাকড়াও করে সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছে ব্যাংকে। আগে স্বাস্থ্য বাড়ুক একাউন্টের। তারপর ছাড়ব টাকা।


অনির ডাইরি ৪ঠা নভেম্বর, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি 



নভোনীল বাবুর আজ কপাল খারাপ। মাঝরাস্তায় ট্রেন খারাপ, বললাম বাড়ি ফিরে যান, আমি তো যাচ্ছি। কথা শুনলেন কেমন। উল্টে বললেন, " আপনি বেরিয়ে যান, আমি বাসে চলে যাব।" অগত্যা আমি আর উত্তমকুমার আর অপেক্ষা না করে রওনা দিলাম মেছেদা ইস্টিশন থেকে - 


আমি আর উত্তমকুমার একসাথে হলেই রান্নাবান্নার গল্প হয়। হয় আমি শেখাই, আর উত্তম বলে, " হ্যাঁ হ্যাঁ এটা জানি।" নয় উত্তম বলে আমি মনে মনে নোট নিই। আজ চিংড়ি মাছ পোড়া শেখাতে শেখাতে নিয়ে যাচ্ছে উত্তম। টাটকা চিংড়ি মাছ পুড়িয়ে, খোলা ছাড়িয়ে সবে জমিয়ে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর কাঁচা তেল দিয়ে মাখা হবে এমন সময় আমার চোখ আটকে গেল জানলার বাইরে। 


পাশ দিয়ে শাঁ করে ছুটে বেরিয়ে গেল একটা মোটরবাইক। বাইকে আরূঢ় এক অল্পবয়সী দম্পতি। ছেলেটির পরণে মামুলী টিশার্ট প্যান্ট বটে, মেয়েটি পরেছে ঝকঝকে গোলাপী সস্তার বেনারসী। শাড়ি জুড়ে সোনালী বুটি।এই রঙ আর এই বুননের শাড়ি এই রুটে প্রায়ই দেখি। মেয়েটি ঢলে পড়েছে চালকের পিঠের ওপর, একটা হাত ডান কাঁধের ওপর দিয়ে তেরছা করে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে লোকটাকে। দুই চাকায় সওয়ার রোমান্টিক দম্পতি আমার কম দেখা নেই। বিগত দুর্গা পুজোতেই তো জনপ্লাবিত রাস্তায়, সিগন্যালে আটকে একটি মেয়ে, চকাস চকাস করে চুমু খাচ্ছিল তার সহযাত্রীকে। উভয়েই হেলমেট পরে যে এভাবে চুমু খাওয়া যেতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হত না। পাবলিক ডিসপ্লে অফ আফেকশন অর্থাৎ জনসমক্ষে সোহাগ ব্যাপারটা আমার মোটেই মন্দ লাগে না বরং বেশ ভালো লাগে। 


আজকের দম্পতিকে ও খারাপ লাগল না। খামোখা ভারত-পাকিস্তান/ হিন্দু-মুসলমান/ বামুন-দলিত তো করছে না, কাউকে ট্রোল ও করছে না। ভালোবাসছে। বাসুক না। এইভাবে আমাদের টপকে চলে যাওয়াটা উত্তমকুমার যে মোটেই ভালো ভাবে নেয়নি, অচীরেই বুঝতে পারি। ওদের টপকে হুহু করে এগিয়ে যাই আমরা। পাশ দিয়ে যাবার সময় আরেকবার ঘুরে দেখি মিষ্টি দম্পতিকে। ছেলেটির মুখ ঢাকা হেলমেটে, মেয়েটি এখনও একই রকম ভাবে ধরে বসে আছে, মুখটা প্রায় ছেলেটার ঘাড়ে গোঁজা। উফ কি রোমান্টিক! ভয় শুধু একটা, বরটার গলায় না বেশী চাপ পড়ে - 


বলতেই উত্তম বলে, " ওটা ওর আসল বর নাকি।" যাঃ আসল নয়তো কি, নকল। উত্তম নাছোড়বান্দা, "না ম্যাডাম, আমি লিখে দিছি, ওরা সোয়ামী ইস্ত্রি নয়। নিজের বউকে কেউ এভাবে জড়িয়ে বসতে দেবে না। আমরাও তো বেরাই, আমার বউ কি আমায় এভাবে ধরে বসে পাঁচজনের সামনে।" উত্তম ভয়ানক পত্নীনিষ্ঠ, আমাদের দৈনন্দিন বাক্যালাপের মধ্যে অনেকটা জুড়ে থাকে উত্তমের গিন্নীর গল্প। তার বিদ্যা,বুদ্ধি, কর্ম নিপুণতা, তার সাহস, তার সংগ্রাম, তার সুখ, তার দুঃখ। উত্তম বউকে ভয়ানক ভালোবাসে, কিন্তু দেখায় না বাপু। গিন্নি ফোন করলেই পাল্টে যায় কন্ঠস্বর, কেমন যেন উদাসীন, উন্নাসিক, রুক্ষ হয়ে যায় পলকে। অথচ ফোন কাটার সাথে সাথেই তারই প্রসঙ্গে আদ্র হয়ে ওঠে কন্ঠস্বর। একদম আমার বরের মত। PDA ব্যাপারটা আমার বরেরও না পসন্দ। আর এই ভাবে গলা জড়িয়ে ধরলে তো--, ভেবেই হেসে ফেলি। 


শৌভিক হলে নির্ঘাত বলত, "গলা ছাড়। দম বন্ধ হয়ে যাবে তো। উফ্ কি ভারী রে বাবা তুই।" উত্তম সহমত হয়, " আমি হলেও তাই বলব ম্যাডাম। গলা ছাড়ো, দমবন্ধ করে মারবে নাকি। আপনাকে কইছি না, ওরা সোয়ামী ইস্ত্রি নয়, আজকাল এগুলো ঘরে ঘরে হইছে ম্যাডাম। দেখুন ছেলেটা লোকাল, তাই হেলমেট পরেছে, গ্লাস এঁটেছে। যাতে কেউ মুখ না দেখতে পায়। মেয়েটা বাইরের, তাই মুখ খোলা। এভাবে ঘুরবে ফিরবে, তারপর সন্ধ্যে বেলা যার বউ তার কাছে ফিরে যাবে। ছেলেটাও বাইক নিয়ে নিজের বউয়ের কাছে ফিরে যাবে।" 


বলি বটে, থাম বাবা, মন দৌড়ে যায় প্রায় দুই দশক আগের খড়গপুর প্লাটফর্মে। ছুটির ট্রেন আসার আগে প্রায় দেখা যেত দুজনকে একসাথে, জুস কাউন্টারে। বিশাল লম্বা পৃথুলা এক ভদ্রমহিলা আর মাথায় বেশ খাটো, একই রকম চেহারার এক ভদ্রলোক। কপিবুক রোমান্টিক দম্পতি। স্বামীস্ত্রী বলেই ভাবতাম। তারপর একদিন লাগল ঝগড়া, নিত্যযাত্রীরা সকলে অবগত হলেন যে ভদ্রমহিলা অন্য কারো ধর্মপত্নী। লোকটি সব জেনেই প্রেমে পড়েছিল, শুধু পড়েইনি প্রেমে অন্ধ হয়ে প্রায় বিকিয়ে দিয়েছে নিজেকে। উপহার দিয়েছেন এক জোড়া এই মোটা সোনার বালা। সম্পর্ক আপাতত শেষ, কেন শেষ যদিও আজ আর মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে বালা জোড়া ফেরৎ চেয়ে কি চিৎকার জুড়েছিল লোকটা।


 একটি বোধহয় ফেরৎ দিয়েওছিলেন দিদিটা। ব্রেক আপ হয়ে যাবার পর, তিনি মহিলা কামরাতেই সওয়ার হতেন, নির্বিকার ভাবে গল্প করতেন আমাদের সাথে। শোনাতেন বর, ছেলে, প্রথম প্রেমের গল্পও। নবু ( নবনীতা) আর আমি সদ্য চাকরী পেয়েছি, বিয়ে থা তখনও বহু দূর। বেজায় দোস্তি হয়ে গিয়েছিল দিদিটার আমাদের সাথে। মাঝে মাঝে ঝাড়গ্রাম থেকে এসে যোগ দিত সুকন্যাও। আমরাই হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ওনার নতুন জুস পার্টনার। ওনার ঐ পরকীয়ার গল্প শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতাম আমরা তিনজনে, কিন্তু ভুলেও ও পথ মাড়াত না দিদিটা।


তারপর একদিন কি যেন হল, সব ট্রেন ক্যান্সেল। নবু, আমি আর দিদিটা গাদাগাদি করে উঠলাম একটা সুপার ফার্স্ট এক্সপ্রেসে। সেখানে হাজির দিদির প্রাক্তন প্রেমিক ও। নবু আর আমি তো ভয়ে কাঠ, একখানা তাগড়াই বালা এখনও ঝকমক করছে দিদির হাতে। লোকটাও আড়ে আড়ে চায় । হে ভগবান, এমনিতেই একটা বসার জায়গা নেই, ট্রেনটাও হাঁটছে গদাইলস্করি চালে, কখন বাড়ি পৌঁছাব জানি না, এর মধ্যে আবার এরা মারামারি না শুরু করে। ভাবতে ভাবতেই চপ খাচ্ছি আমরা, বড় প্লাস্টিকের গ্লাস ভর্তি চা অর্ডার দিচ্ছে দিদিটা। চপ শেষ করে,কয়েক চুমুক চা খেল, তারপর সটান ঘুরে আধখাওয়া চায়ের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল লোকটার দিকে, " এই অমুক চা খাবে?" এত বড় ঘাড় নেড়ে, আদুরে খরগোশের মত লাফিয়ে চলে এল লোকটা, তারপর আমাদের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে সেই এঁটো চা চরণামৃত ভেবে খেয়েও নিল। তারপর সেই খালি প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে দুজনের কি গপ্প।পলকে মুছে গেল গোটা ট্রেনটা, মুছে গেলাম নবু আর আমি ও। মুছতে মুছতে নবু শুধু বলল, " কয়েকদিন আগেই বিয়ে হয়েছে না এই লোকটার -"। 


ঘচাং করে গাড়ি থামায় উত্তম, " ম্যাডাম চা খাবেন তো?" অফিস যাবার পথে মাঝেমধ্যে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাই আমরা তিনজনে, ছোট লম্বাটে গ্লাসের মত ভাঁড়ে ঘন দুধের চা। নভোনীল বাবু বলেন, চা না ক্ষীর। এতই সুস্বাদু। সবই ঠিক আছে, কিন্তু গতকাল চা খেতে নেমে একটা লিকলিকে সাপের গায়ে প্রায় পা তুলে দিচ্ছিলাম আমি। দোকানী এবং উত্তম যদিও বারবার বলছিল, "ঢ্যামনা সাপ" এবং ওর কোন বিষ নেই। তাও, পরখ করে দেখার শখ আমার নেই ভাই। ইশারায় বললাম, "চলো, চলো।" উত্তম কুমার ঘাড় ঘুরিয়ে কইল, " সাপের ভয়ে নামবেননি? নামুন না। সাপ এলে আমি ল্যাজ ধরে তুলে ফেলে দুব ক্ষণ -"। বললাম, গাড়ি চালা বাবা, তুই উত্তমকুমার, চকলেট বয়। রঞ্জিত মল্লিকের মত একশন হিরো নোস। ওঃ বলতে ভুলে গেছি, আজ ৪ঠা নভেম্বর, তমলুক অফিসে আমার পাক্কা চার বছর পূর্ণ হল। যাদের সাহচর্যে, সহযোগিতায়, সহমর্মিতায় এত ভালো কাটল চারটে বছর, তাদের সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা। খুব বকাবকি করি বটে, তবে খুব ভালোওবাসি বাপু তোমাদের সকলকে। খুব ভালো থেকো আর এমনি ভাবেই পাশে থেকো সকলে 🙏🏻❤️

অনির ডাইরি, অক্টোবর ২০২৫

 অনির ডাইরি ২২শে অক্টোবর, ২০২৫

#অনিরডাইরি #হাওড়ার_টুকিটাকি 



মা শুধাল, " বাজারে ভিড় পেলি?" জবাব দিলাম, তেমন নয়। হাওড়ার কালী পুজো, কারণপায়ী মায়ের বাছাদের এই তো সবে ঘুম ভাঙছে। বিরক্তিতে দুই ভ্রু কুঁচকে গেল আমার মুর্শিদাবাদী মায়ের, ঠোঁট মুচড়ে বলল, " সবাই মদ খেয়েছে না?" জবাব দিলাম, সবাই। সব্বাই। একমাত্র আমি বাদে। কি করলাম মা, কালী পুজোতে একটু মদও খেলাম না। মস্করা মারতে ব্যস্ত আমার মন হঠাৎ কু গেয়ে উঠল, ঘুরে দেখি আমার বেতো থপথপে জননী, বিদ্যুৎ গতিতে কখন যেন তুলে নিয়েছে সদ্য ছাড়া একপাটি হাওয়াই চটি। 


"কারণ আমি কোন রিস্ক নিই না" বিড়বিড় করতে করতে আবার দৌড়ালাম বাজার। গুণে গুণে আরো এগারো খানা জিনিস কিনে আনতে হবে। তার মধ্যে চিনি, লঙ্কাগুঁড়ো, পাঁপড়, পনীর ইত্যাদি যেমন আছে, তেমনি আছে একখানা প্যান্টুলও। চারদিন পিত্রালয়ে থাকার আনন্দে এমন প্যাকিং করেছি যে প্যান্ট মনে করে আর একটি টিশার্ট নিয়ে চলে এসেছি। এই নিয়ে গতকাল থেকে লড়াই চলছে মায়ের সাথে। মা দু কথা বললে, চারটে কথা শুনিয়ে দিচ্ছি আমিও।


বাবাকে খুশি করার জন্য পাক্কা মোহনবাগান রঙের জামাপ্যান্ট গুছিয়েছিলাম আমি। সবই আমার ইস্টবেঙ্গলী বরের কিনে দেওয়া যদিও। বাড়ি এসে যদি সবুজ মেরুন দুটোই টিশার্ট বেরোয় তো আমি কি করব? তার মানেই আমি অপদার্থ কিভাবে প্রমাণ হয়? বললাম বাপটাকে একটা পুরানো প্যান্ট ধার দাও, তো বলে, " আমার প্যান্ট তোর হবে না।" খুড়তুতো ভাইটার কাছে অবশ্য চাওয়াই যেত, গতকালই বড়মামার ফুল প্যান্ট পরে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল শ্রীমতী তুত্তুরী। চাটুজ্জেরা যেমন ছিটিয়াল হয় আর কি, দিব্যি বাজি ফাটাচ্ছিল (থুড়ি পোড়াচ্ছিল, নো ফাটানো দিস ইয়ার) দুই মামাতো পিসতুতো ভাইবোনে, রেফারি গিরি করছিল বড় মামা। হঠাৎ রাত দশটায় মনে হল, "চল ঠাকুর দেখে আসি। বন্ধুমিলন সংঘ ফ্রিতে আইসক্রিম দিচ্ছে শুনছি -।" কিন্তু শ্রীমতী তুত্তুরী যে হাফ প্যান্ট পরে আছেন, এই পরে এত রাতে বাড়ি থেকে বেরোলে মাম্মাম (তাঁর দিদা) যে চোটে বোম হয়ে যাবে। তাও ঠাকুর দেখা এবং ফ্রিতে আইসক্রিম খাবার এমন বাসনা যে তিনি প্রস্তাব দিলেন, "দু মিনিট দাও বড় মামা, জিন্সটা গলিয়ে এখুনি আসছি।" তো বড়মামা কইলেন, " কুচ পরোয়া নেই, তুই আমার একটা কাচা প্যান্ট পরে নে -"। 


সেই পরে তিনি গোটা হাওড়া ঘুরে এসেছেন গত কাল, সাঁটিয়েছেন ফ্রি আইসক্রিম ও। আজ আবার চাইতে একটু লজ্জা লাগল। লতা দি বলে দিয়েছিল, ব্যাঁটরা থানা ছাড়ালেই বাম দিকে সারি দোকান। প্রথমটা থেকেই পেয়ে গেলাম। পকেটওয়ালা প্যান্ট, মাত্র ১৯০/-। এত কম দাম? আমাজন, মিন্ত্রা হলে গালে চড় মেরে ৫০০/৫৫০ টাকা নিয়ে নিত। ব্র্যান্ডেড গুলো তো হাজারের নীচে হয় না দেখি। সন্দিহান হয়ে শুধাই, দাদা আমার হবে তো? লোকটা বেজায় টেনে দেখায় আর মুখে বলে, " তুমি এমন কিছু মোটা নও বাপু।" সাধে হাওড়া আমার প্রিয়তম শহর। 


দুই ব্যাগ ভর্তি মাল নিয়ে টোটোয় উঠলাম, না ভর্তি হলে ছাড়বে না। বসে বসে গান শুনছি, " স্ক্যান্ডাল চাই বুঝলে, স্ক্যান্ডাল। নইলে এই সমাজে পুরুষ বলে পাবে না কোন মান -"। ইশ কি ইমমরাল লিরিক্স। সে-ক্সি-স্ট টু। তিনি অবশ্য ভাবলেশহীন, গেয়েই চলেছেন, " লুনা লু লু, কেন তোমার বয়স হয় না ষোল, আমার নাইন্টিন -"। এ বাবা, এতো ageism। আবার ষোল চাইছে -। পলকে থেমে গেল গান, চোখের সামনে এসে দাঁড়ালেন, বিগত এক শতকের সুন্দরতম বাঙালি পুরুষ, মুখে তার ভুবনজয়ী হাসি। পিছনে ভয়ংকর সুরেলা এক বাঙালি ভদ্রলোক, তিনিই গাইছিলেন। জাদুকর তো শুধু ঠোঁট নাড়ছিলেন। কান মুলি, গাও প্রভু গাও। 


বাড়ি ফিরে মাকে আশ্বস্ত করি প্রথমে, প্যান্ট পেয়েছি এবং না আমি সস্তা বলে বারমুডা কিনে আনিনি। আর হ্যাঁ এত কষ্ট করেও মোহনবাগান রঙই এনেছি। তারপর মেয়ের সাথে গল্প করতে বসি, এক সুদর্শন আর এক সুরেলা বাঙালি পুরুষের গল্প। দুই ভদ্রলোক আমাকে কদমতলা বাজার থেকে প্রায় বাড়ি অবধি তাড়া করেছেন। যেখানেই দাঁড়িয়েছে টোটো একই গান বেজে চলেছে, এমনকি পাড়ার ঠাকুরের সামনেও, "লুনা লু লু -"। একে যদি কাকতালীয় না বলি, কাকে বলব মশাই। 


শ্রীমতী মন দিয়ে শোনেন গান, সিনেমার গপ্প। শোনেন তাঁর দিদিমাও। জাদুকরের কথায় তাঁরও দুই চোখে নামে আবেশ। সুর কাটে কেবল বাবা। তুত্তুরী শেষে বলেই ফেলে, " দাদু এত হিংসে করো না।" রেগে আসর ছেড়ে চলেই যায় বাবা। আমরা তিন কন্যা তখনও মত্ত জাদুকরে। কথায় কথায় ওঠে পুঁথি বাবু আর টাক বাবুর কথা। শ্রীমতী ভ্রু কুঁচকে বলে, " টাক বাবু? ব্রো এতো হেয়ার-ইজম"। এবার ভেবলে যাই আমি, সেটা কি ইজম ভাই। তিনি হেসে গড়িয়ে পড়েন, " যার চুল নেই তাকে চুল নিয়ে খোঁটা দেওয়া। এরকম কিছু আছে কিনা জানি না, মনে হল তাই -।" হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোবো। কি জেনারেশন মাইরি। আর আমার গর্ভধারিনী কিনা কেবল আমার ওপর জুতো হস্ত -