Saturday, 17 January 2026

অনির ডাইরি জানুয়ারি, ২০২৬

 অনির ডাইরি ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



চেম্বারের দরজা খুলে রূপালী পর্দার উত্তম কুমারের মতই দাঁড়াল আমাদের উত্তম। হতাশ অহীন্দ্র চৌধুরীর মত মাথা নাড়লাম আমি। আজ মকর সংক্রান্তি, কথা ছিল একটু তাড়াতাড়ি বেরোব আমি। উত্তম ও তাহলে একটু জলদি ছুটি পেয়ে যাবে। আপাতত সে গুড়ে বালি। গুচ্ছের সমস্যা নিয়ে ঘিরে ধরেছেন এক দঙ্গল মানুষ। 


স্টেশনে এসে যখন নামলাম, প্রগাঢ় হয়েছে সন্ধ্যা।  কোন অ্যাপে দেখাচ্ছে না কোন ট্রেন। খাড়া সিঁড়ি ভেঙে, লম্বা ওভারব্রীজ টপকে হাঁপাতে হাঁপাতে প্লাটফর্মে এসে পৌঁছালাম। একটা ফাঁকা বসার জায়গা পেয়ে খুশি হলাম বটে, সে খুশি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। চতুর্দিকে মশাদের বিক্ষোভ সমাবেশ চলছে - 


 শীতের সন্ধ্যায়, নিঃসঙ্গ প্লাটফর্মে একাকী বসে থাকলে বুকের ভিতরটা কেমন যেন হুহু করে ওঠে। আজ মকর সংক্রান্তি, অন্যান্য বছর অন্তত পাঁচ রকম পিঠে বানাই আমি আর লতা দি। সাথে গুড়ের পায়েস। এ বছর কিছুই হবে না, আমার বাড়ি। আমি ফিরব না যে -।  মা বাড়িতে না থাকলে যা হয়, আজ সকালে মোজা খুঁজে পায়নি তুত্তুরী, গতকালের কাচা আধ ভিজে মোজা পরে স্কুল গেছে। তাতে তাঁর কোন হেলদোল নেই বটে, কিন্তু শুনে ইস্তক মায়ের হৃদয় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে এই যা। পক্ষকাল পর বার্ষিক পরীক্ষা, তাতেই বা কি করবেন কে জানে - 


বছরের শুরু থেকে শয্যাশায়ী বাবা। এবাড়িতেও হবে না কোন উৎসব। ChatGPT কে বললাম, বড্ড মনখারাপ, ট্রেনেরও দেখা নেই, মন ভালো করার মত কিছু বলতে পারো- । তিনি কইলেন, জানো তো অনি, জাপানী নান্দনিক শাস্ত্রে একটা শব্দ আছে, “মা”। এই “মা” মানে জননী বা গর্ভধারিণী নয় কিন্তু, এর অর্থ হল, দুটো ঘটনার মাঝে থমকে দাঁড়ানো কিছু মুহূর্ত। যেখানে শূন্যতা বা ব্যর্থতা থাকে না। থাকে নিছক নীরব অবকাশ, সেখানে  কুসুমিত হয় নতুন সম্ভবনা।  এই মুহূর্তে তুমি সেই “Ma”–এর ভিতর ঢুকে পড়েছ। না নিজের বাড়ি  ফিরতে পারছ, না পৌঁছতে পারছ বাবার কাছে। না ওনাকে রাতারাতি সুস্থ করে তুলতে পারছ, না মেয়েকে যথাযথ দেখাশোনা করতে পারছ-  মাঝখান থেকে রক্তাক্ত করে চলেছ নিজেকে।এই দোদুল্যমানতা সবচেয়ে চাপের। কিন্তু এখানেই সবকিছু শেষ নয় -


ট্রেনের দেখা নেই, মশাদের আক্রমণও থামছে না। পার্শ্ববর্তিনী চটাস চটাস করে মশা মারছেন, তাও রণে ভঙ্গ দিচ্ছে না ব্যাটারা। তিনি আপাদমস্তক কালো বোরখা পরেছেন, আমি কালো সোয়েটার আর কালো জিন্স, ভদ্রমহিলার মতে আমাদের দুজনের কালো পোশাক, মশাগুলোকে আরও চটিয়ে দিচ্ছে। মশারা যে কেন এত বর্ণবিদ্বেষী - 


পুনরায় ChatGPTর সাথে বাক্যালাপে ফিরে যাই, " বলতে পারো, বাবা আবার কবে উঠে বসবে বা মেয়েটা বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ করবে কি না?" তিনি জবাব দিলেন, " দুঃখিত অনি, আমি পারলেও বলব না। এই মুহূর্তে তোমার যা মানসিক অবস্থা, তুমি ভাগ্য ভবিতব্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।" ব্যাঙ্গের সুরে বলি, তাহলে বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতি সম্পর্কেই বলো দেখি, কি ঘটতে চলেছে আগামী দিনে-। 


টুক করে ফুটে ওঠে একটা হাসির ইমোজি, তিনি বলেন, “ইস্টিশনে জিও-পলিটিক্স অনি? চলো তাই সই, যতক্ষণ না তোমার ট্রেন আসে- 


তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসছে বলে যতই হল্লা হোক না কেন, দেখবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোন বড় যুদ্ধ হবে না। কিন্তু অগোচরে বদলে যাবে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র। হস্তান্তরিত হবে ক্ষমতা, বিশ্বজুড়ে রচিত হবে শক্তির নতুন ভারসাম্য। “West ভার্সেস Rest” আর থাকবে না, তৈরি হবে অনেকগুলি ছোট ছোট পাওয়ার সেন্টার। আমেরিকা শক্তিশালীই থাকবে বটে, কিন্তু আগের মতো দাদাগিরি আর চলবে না। চীন মহাশক্তিশালী থাকবে, কিন্তু ব্যস্ত থাকবে নিজেকে নিয়েই। 


উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়ে উঠবে – ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, তুরস্ক আর ব্রাজিল। কলকারখানা, প্রযুক্তিবিদ্যা, ডেটাসেন্টার, ঔষধাদি, ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইত্যাদি সবকিছুতে এই দেশগুলি হয়ে উঠবে সাপ্লাই চেইনের রাজা।


 খুশি হবে শুনে যে  তোমার দেশ প্রবেশ করতে চলেছে, “useful to everyone” ফেজ এ। সবার এখন ভারতকে প্রয়োজন। আমেরিকার ভারতকে চাই -চীনের মোকাবিলায়, ইউরোপের চাই সস্তায় উৎপাদনের জন্য, মধ্যপ্রাচ্যের দরকার সস্তা প্রযুক্তি আর শ্রমিক, আফ্রিকার দরকার ভারতের সস্তা ওষুধপত্র আর পরিকাঠামো। তোমাদের এটা ঝগড়াঝাঁটি নয় বরং দরকষাকষির সময় – 


আগামী দিনে কেউ কাউকে হাতে মারবে না, ভাতে মারবে দেশগুলো। জাহাজ চলাচলের রাস্তা আটকাবে, অ্যাপ নিষিদ্ধ করবে, মুদ্রা কারচুপি, বিরল মৃত্তিকা খনিজ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দিয়ে একে অপরকে অর্থনৈতিক ভাবে চাপে রাখবে দেশগুলো।  এদিক থেকেও ভারত বেশ শক্তিশালী, কারণ ভারত খাদ্যশস্য এবং ওষুধে মোটামুটি স্বনির্ভর, ইঞ্জিনিয়ারদের কোন অভাব নেই এদেশে, সর্বোপরি ভারতের বিপুল জনসংখ্যা-  এমন দেশকে অগ্রাহ্য করে কে?


 আগামী বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে পরিবেশ হয়ে উঠবে একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। যে দেশের হাতে পর্যাপ্ত পানীয় জল, খাদ্য, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস এবং প্রযুক্তি যত বেশী থাকবে, সে হয়ে উঠবে ততো শক্তিধর। ভারত কিন্তু সৌরশক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেনের বড় উৎস। বেশী না, মাত্র ১০–১৫ বছর অপেক্ষা করে যাও, দেখবে এটা হয়ে উঠবে খনিজ তেলের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আগামী বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না  কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্রে কতটা শক্তিধর তাই নিয়ে বরং রেষারেষি হবে AI আর মেধা নিয়ে। যে দেশের তরুণ জনসংখ্যা, ইংরেজি জানা মানুষ, প্রযুক্তি বোঝা মস্তিষ্ক যত বেশী থাকবে, তারা ততোই এগিয়ে থাকবে।"


ট্রেনে উঠতে উঠতে বলি, এটা ভবিষ্যৎ বাণী না কোন রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টো রে?  তবে শুনে মন ভালো হয়ে যায় এটা ঘটনা। আচ্ছা বলো তো প্রতিবেশী দেশের সাথে আর কি কোনদিন আমাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে? তিনি জবাব দেন, " এক কথায় বললে, হ্যাঁ। তবে সে সম্পর্ক মোটেই " বজরঙ্গী ভাইজান" টাইপ হবে না। সম্পর্কের উন্নতি হবে ধীরে ধীরে, স-কৌশলে এবং সেটা কখনই সমান্তর প্রগতিতে নয়।  


উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে ভারতের যত প্রতিবেশী আছে সকলেই খাদ্য, বিদ্যুৎ,পরিবহন , ওষুধ, ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এরাই আবার ভারতকে নিয়ে অসন্তোষে ভোগে। কারণ ভারত বিশাল, বিপুল। যে কোন বড় দেশের আসেপাশে থাকা ছোট দেশগুলি বড়দাকে একটু সন্দেহের চোখেই দেখে। এই দেশগুলো চীনকেও বেশ ভয় করে। অনেকেই চীনের থেকে ধার করে বন্দর, রাস্তা, এয়ারপোর্ট বানিয়েছে। এখন তারা আকন্ঠ নিমজ্জিত ঋণে। সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয়ে কাঁটা। শ্রীলঙ্কা সবথেকে বড় ভুক্তভুগী। নেপাল, মালদ্বীপ, বাংলাদেশও টের পাচ্ছে ধীরে ধীরে। তাই এরা চীনের সাথে সোহাগ তো করতে পারে, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করতে পারে না। 


উল্টো দিকে ভারত আজ অবধি কারো এক ইঞ্চি জমি দখল করেনি, কারো কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য দাবী করেনি। বরং যে যখন বিপদে পড়েছে ভারত খাদ্য, ঔষধ, ভ্যাকসিন, স্যাটেলাইট সার্ভিস, বিদ্যুৎ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।  


প্রতিবেশীদের ভালোবাসা ভারতের চাই না। ভারত চায়, তাদের প্রয়োজন হতে। আগামী ১০/১২ বছরের মধ্যে নেপালকে নির্ভর করতে হবে ভারতের গ্রিডের ওপর, বাংলাদেশ ভারতের বাণিজ্যের ওপর, শ্রীলঙ্কা ভারতীয় পর্যটকদের ওপর, মালদ্বীপ ভারতের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে। ভূটান তো এমনিতেই ভারতের সাথে শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ। এই প্রয়োজন গুলিই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে এক স্থিতাবস্থা তৈরি করবে। 


কোন স্টেশনে যেন থামল ট্রেনটা, মুখ বাড়িয়ে দেখি ফুলেশ্বর। ঘড়িতে প্রায় আটটা, আজ যে কখন বাড়ি ঢুকব।  পুনরায় বার্তালাপে মন দিই, এযেন আমাদের ছোটবেলার দক্ষিণী সিনেমা, সব ভালো হয়ে যায় যার শেষে। সব হারিয়ে যাওয়া ভাই পুনরায় এককাট্টা হয়ে ভিলেনকে পেটায় - একটু বিরক্তি নিয়েই বলি, দেখছ না, কত ঘৃণা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। না বাংলাদেশীরা আমাদের দেখতে পারে, না আমরা ওদের। 


ChatGPT বলে, আরে এত আশাহত হচ্ছ কেন? ওরা মোটেই ভারতকে “ঘৃণা” করে না। কেউই ঘুম থেকে উঠে ভারতকে ঘৃণা করার কথা ভাবে না। আদতে ওরা ভারতকে ভয় পায়।  ভয় - অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া, ভয় ভারতীয় মিডিয়ায় অপমানিত হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া, রাজনৈতিক ভাবে চাপে পড়া নিয়ে। তাই ভারতকে যখন আগ্রাসী মনে হয়,

ওরা নিরাপত্তার খোঁজে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা কোনও আদর্শগত ব্যাপার নয়।

এটা একটা ছোট দেশের টিকে থাকার প্রবৃত্তি।


টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়া ভারতীয়দের শেখায় বাংলাদেশী মাত্রই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, আর বাংলাদেশীদের শেখায়, ভারত অসহিষ্ণু সাম্রাজ্যবাদী দাদাগিরির দেশ। 

তাই সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে এত খারাপ মনে হয়, যদিও বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাস্তবে এখনও অনেক বেশি।

 

স্বল্পমেয়াদে এই সম্পর্কের কোন উন্নতি হবে না।

আগামী ৫–১০ বছর আরও শোরগোল, আরও রাগ, বিদ্বেষ আর মেরুকরণের সময়। তবে মানুষ অনলাইনে একে অপরকে ঘৃণা করলেও —নিশ্চুপে চলতে থাকবে ব্যবসা বাণিজ্য, বাড়বে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা। এইভাবেই টিকে থাকবে ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়া - 


দাসনগরে নেমে টোটো ধরে যখন বাড়ি ঢুকি, ঘড়ির কাঁটা নয় ছুঁইছুঁই। আতঙ্কিত মা বসে আছে দরজা খুলে, অকাতরে ঘুমাচ্ছে বাবা। সারাদিনই ঘুমাচ্ছে।  বাবার চেয়ারটা ফাঁকা, অবহেলায় পড়ে আছে বাবার প্রাণের মুঠো ফোনটা। 


ভগ্ন হৃদয়, উদ্গত অশ্রু গিলে ফেলি টুপ করে,  ভেঙে পড়লে আমার চলবে কেন? লতা দি চা বসায়- মুখের সামনে টিফিন বাক্স খুলে ধরে মা, ভিতরে সারি সারি পাটিসাপটা। কে বানাল, হতভম্ব হয়ে শুধাই আমি। জবাব আসে ছোট মাসি। মা বলে, " হাঁটতে পারছে না পায়ে এত ব্যথা, দুদিন আগে পড়ে গেছে। তাও দৌড়ে এসেছে আজ তুই এখানে ফিরবি শুনে -"। মুঠো ফোনের ওপার থেকে উল্লসিত কন্ঠে তুত্তুরী জানায়, " আমরাও পিঠে খেয়েছি মা।" শাশুড়ি মায়ের বয়স্ক আয়া দিদি বানিয়ে দিয়েছে -। বুকের ভিতর জমে থাকা পাথরটা যেন ধীরে ধীরে সরে যায়, আমার ভাঙা পরিবারেও তাহলে পৌষ পার্বণ হল। দৃষ্টির অগোচরে তাহলে সত্যিই কেউ আছেন, যিনি নিক্তি মেপে হিসাব রাখছেন - কৃত কর্মের। সে মানুষ হোক বা দেশ, আর কি চাই।


অনির ডাইরি ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


ঘরে ঢুকতেই কপাল চুলকে শৌভিক বলল, "ওঃ হোঃ-, তেসরা মার্চ তো ইয়ে"। কি'য়ে রে বাবা। বেশ খানিকটা ঘাবড়েই যাই আমি। ইউরেকা মার্কা একটা মুদ্রা করে তিনি বলেন, " শচীনের ছেলের বিয়ে -"। কোন শচীন? কোন অফিস কলিগ, নাকি বন্ধুবান্ধব। নামটা আগে শুনেছি নাকি?

তিনি বুঝিয়ে দেন, " আরে শচীন তেন্ডুলকার রে। তার ছেলের বিয়ে -"। অর্জুন? সে তো পুঁচকে ছেলে। সারা বড় নয়? " সে আমি জানি না। সারার বিয়ে কেন হচ্ছে না, এটা জিজ্ঞাসা করিনি।" 

ধুৎ বলে মুখ বেঁকাই আমি। যুৎ করে বসে ওয়েব সিরিজটা দেখতে শুরু করব, গায়ের কাছে ঘেঁষে আসে শৌভিক, " ৫ তারিখে রিসেপশন বুঝলি? তিন তারিখে বিয়ে আর পাঁচ তারিখ রিসেপশন।" 

উদ্গত বিরক্তি গিলে, দীর্ঘশ্বাস চেপে, দাঁত কিড়মিড় করে বলি, " তাতে আমার বাপের কি? আমার বাপকে তো নেমন্ত করেনি।" " হুঃ, সেই প্রতিবাদেই যাব না -।" বলে সটান উল্টো দিকে মুখ করে কিন্ডল খুলে বসেন তিনি। 


নিজের মনে খানিক হাসি আমি, মেলার বায়স্কোপের বাক্সের মত চোখের সামনে থেকে সরে সরে যায় কত যে দৃশ্য। ছোপড়ার গদির নীচে লুকিয়ে রাখা কত যে লাল হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের কাটিং। আমাদের বিদ্যালয়, অমিতাভ বচ্চনের মত কেউ ঘোষণা করত না বটে, "প্রতিষ্ঠা - পরম্পরা - অনুশাসন" , কিন্তু হেব্বি কড়া ছিলেন দিদিমণিরা। সেই দিদিমণিদের নাকের ডগায় বসে প্রেমপত্র লিখেছিলাম দুই বন্ধুতে। " যত স্বপ্ন ছিল - যত ভাবনা ছিল সব দিলাম তোমায়, তুমি নেবে কি আমায়, বলো নেবে কি আমায়"। মাইরি লাইন গুলোও ঝাড়া, কি যেন একটা বাংলা সিনেমা থেকে। তাপস পাল আর দেবশ্রী রায় ছিলেন নায়ক- নায়িকা। দুই বন্ধু, দুই তারকাকে। 


দুজনের কারো মাথায় আসেনি, যে সে বা তারা বাংলা পড়তে পারে না। না পারলেই বা কি, শিখে নিবে। প্রেমে মানুষ কত কি করে, আর একটা মারাঠি আর একটা গুজজু ছেলে বাংলা শিখতে পারবে না? প্রতিটা খাতার পিছন পাতা যার সাথে আমাদের নামের বানান যোগ করে " লাভ - লাইক - পিটি-হেট" খেলি সে এটুকু করতে পারবে না আমার/ আমাদের জন্য? পারবে না সে? 


সে না হয় পারল, কিন্তু ঠিকানা? ঠিকানা তো জানি না? যতদিন না ঠিকানা মেলে আনন্দমেলার মধ্যে ঢোকানো থাক চিঠিগুলো। "মন মে হ্যায় বিশ্বাস, পুরা হ্যায় বিশ্বাস" ঠিকানা পেয়েই যাব। প্রকৃত প্রেমকে সাহায্য করতে অবশ্যই এগিয়ে আসবে প্রকৃতি। প্রতি সোমবার জিজ্ঞাসা করতাম বন্ধুকে, " হ্যাঁ রে, ঐ আনন্দমেলাটা বিক্রি করে দেয়নি তো কাকিমা?" নাহ চিঠি সমেত বইটা বিক্রি হল না বটে, তার আগেই এসে পড়ল তার বিয়ের দিনটা। সারা ভারত জুড়ে সেকি হর্ষ আর কলোরোল। কোথায় কোন ছোট শহরের, কোন ডেঁপো বালিকা সকলের অলক্ষ্যে চোখের জলে বালিশ ভেজালো তাতে মাস্টার ব্লাস্টার থুড়ি ক্রিকেটের ঈশ্বরের কি এল গেল। নানা এত অসংবেদনশীল একটা লোকের ছেলের বিয়েতে কি যাওয়া উচিৎ, বলুন তো। সেটাই বলি বরকে, " ঠিক বলেছিস, যাবই না শচীনের ছেলের বিয়েতে।" বই পড়তে পড়তেই জবাব দেয় শৌভিক, " হ্যাঁ, গিফটটাও দেব না।"



স্থান - হাথি সিং জৈন মন্দির, আহমেদাবাদ


অনির গুজরাটের ডাইরি ৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


ঘুমিয়েই পড়েছিলাম আমি, হঠাৎ করে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কি যেন বলছে শৌভিক ড্রাইভার সাহেবকে। আমাদের ড্রাইভারের নাম নরেশ ভাই, আহমেদাবাদে নামা ইস্তক ইনিই আমাদের সারথী। গুজরাট বা গুজরাতিদের সম্পর্কে কিছু পূর্ব ধারণা নিয়ে এসেছিলাম এই রাজ্যে, এসে ইস্তক ধোঁকা খাচ্ছি। না এরা সবাই আম্বানি বা আদানি নয়। ঘোরতর হিসেবী বা বেনিয়াও নয়। বেশ অতিথিবৎসল, সংবেদনশীল এবং সাদাসিধে মনে হয়।একটা প্রশ্ন করলে সাতটা জবাব দেয়। সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত থাকে। নরেশ ভাই যেমন - । সব সময় মুখে একগাল হাসি এবং ভালো মত বাংলা বোঝেন। আমরা নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলার পর নরেশ ভাই একপ্রস্ত ধারাবিবরণী দেন, উনি কি বুঝলেন এবং ঠিক বুঝলেন কিনা। আতঙ্কে প্রায় বঙ্কিমী বাংলায় বার্তালাপ করি আজকাল আমরা। 


ঘুমের রেশ কাটতে বুঝি, নরেশ ভাই বলছেন, " ইয়ে ক্যা দেখো গে সাব, ইয়া কোই নেহি রুখতা, বিচ মে চলো নে।" আর শৌভিক বলছে, " ধুর ব্যাটা, আমি এটা দেখব বলে কখন থেকে ম্যাপ খুলে বসে আছি -। " প্রায় জনশূন্য মন্দির চত্বরে গিয়ে দাঁড়ায় গাড়ি। চাঁদি ফাটা রোদ। গুজরাটে ভদ্রলোকের এক কথা, ঠাণ্ডা কাল বলে কিছু হয় না। সোয়েটার জ্যাকেট গুলো কেন যে মরতে বয়ে এনেছি। 


বিশাল শ্বেত পাথরে তৈরি মুখ্য প্রবেশ দ্বারের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ে অনুপম কারুকার্য খচিত মন্দিররাজি। দুই বৃদ্ধ বসে আছেন গেট আগলে। একজনের সামনে রাখা UPI স্ক্যানার দেখে টিকিট কাটতে যায় শৌভিক। বুড়ো লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলে, " ভগবান জী কো দেখনে কে লিয়ে কোই টিকিট নেহি লাগে গা মালকো। ইয়ে তো দান দক্ষিণা কে লিয়ে রাখা হ্যায়।" তাও বাধ্যতামূলক নয়। যদি কেউ দয়া করেন - 


অপর বৃদ্ধ সিকিউরিটি, পরণে খাকি পোশাক, চোখে পুরু কাঁচের চশমা। তিনি ঠেট গুজরাটিতে অনেক কথা বলছেন তুত্তুরীর সাথে, কিন্তু বেচারা কিছুই বুঝতে পারছে না। এ গুজরাটি অনুপমা বা কিউকি শাস ভি কভি বহু থী সিরিয়ালের, " কেমছ - মজা মা " মার্কা গুজরাটি নয়। এতে মিশে আছে কাথিয়াওয়ারি সুর। বেচারা তুত্তুরী বিস্তর ঘেমে নেয়ে শেষে বলেই ফেলল, " হাম গুজরাট সে নেহি হ্যায় জী।" ভাঙাচোরা হিন্দিতে ভদ্রলোক বললেন, " মাথা দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে যাও। ছবি তুলতে পারো, তবে মূল মন্দিরের ভিতর তুলনা কিন্তু বেটা। সবজায়গায় সিসিটিভি আছে তো, শেঠ জী অফিসে বসে সব নজর রাখেন। দেখতে পেলে আমায় বকবে। চাকরী থেকেই তাড়িয়ে দেবে হয়তো।" শুনেই বাপ বেটি দৌড়ালো গাড়িতে ক্যামেরা রেখে আসতে - 


একটা পুরনো সিন্দুকে রাখা অগুনতি ওড়না, তার দুটো মাথায় জড়িয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। ঢুকতেই যেন জুড়িয়ে গেল তনু মন প্রাণ। সমগ্র চত্বর জুড়ে বিরাজ করছে অখণ্ড শান্তি। কোথাও এক চুল ময়লা নেই। কয়েক শ পায়রা বাস করে মূল মন্দিরের চূড়ায়, মাঝে মাঝেই তারা চক্কর কাটে মন্দিরের ভাগের আকাশটাতে। অথচ মন্দির প্রাঙ্গণ যেন তকতক করছে। 


এটা কোন ঐতিহাসিক মন্দির নয়। বিগত শতকে নির্মিত, সময় লেগেছিল ১৯ বছর। সমগ্র মন্দির জুড়ে চোখ ধাঁধানো শ্বেত পাথরের কারুকাজ। মূল মন্দিরটা জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের উদ্দেশ্যে নির্মিত। তাঁকে ঘিরে চক্রাকারে রয়েছে ৭২ টা ছোট মন্দির। প্রতিটা ছোট মন্দিরের বাইরে একটি করে সাইনবোর্ড/ স্টিকার মারা। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জৈন তীর্থ স্থান তথা মন্দিরের বিবরণ লেখা তাতে। লক্ষ্য করে দেখলাম গরিষ্ঠাংশই রাজস্থানে অবস্থিত।