Sunday, 8 March 2026

অনির ডাইরি মার্চ, ২০২৬

 অনির ডাইরি ৮ই মার্চ, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 

আমার মা হল, "নিষ্পাপ মায়েদের শেষ প্রজন্ম"র পতাকাবাহক। যতদিন জেঠু জীবিত ছিলেন মা মাথায় ঘোমটা দিত। পাড়ায় বেরোলেও মাথা ঢেকে নিত ঘোমটার আড়ালে। রেঁধে খাইয়ে পরম সুখ পেতে মা। যতদিন মায়ের কাছে থেকেছি, কোনদিন ভাত না খেয়ে বেরোই নি। সে স্কুল, কলেজ, চাকরি যাই থাকুক না কেন। যত সকালেই বেরোই না কেন। নাহ্ সিদ্ধ বা এক তরকারি ভাত নয়, রীতিমত একটু তিতো, একটু ডাল, একটা ভাজা, একটু পোস্ত, একটা মাছ বা ডিমের কারি, শেষ পাতে একটু অম্বল। শুধু কি তাই, কি যে যত্ন করে টিফিন গুছিয়ে দিত মা। ধেড়ে বয়সে সবাই কিনে খেত যখন, আমি ব্যাগ থেকে বার করতাম স্টিলের টিফিন কৌটো, যার মধ্যে দুটি রুটি দিয়ে ঘেরা একটি ছোট কৌটোয় তরকারি, আর একটি কৌটোয় মিষ্টি। মায়ের আঁচলে সত্যিই মিশে থাকত তেল হলুদের মুদিখানা মার্কা গন্ধ। আমার শৈশবের গন্ধ - 


এহেন আমার মহীয়সী জননী যখন ঠ্যাঙাতেন, তখন সেটাও ছিল দেখার এবং শোনার মত বিষয়। মা নীরবে ঠেঙিয়ে যেত, চিৎকার তো করতাম আমি। দশভূজা মতোই মায়ের ছিল দশ অস্ত্র- খুন্তি , হাতা, স্কেল, হাতপাখার বাঁট, চিরুনি থেকে হাওয়াই চপ্পল। ফতে -১১০ এর থেকেও দ্রুত গতিতে এবং অব্যর্থ লক্ষে লাগত মায়ের চটি। খাটের তলায় ঢুকে গেলে, হামাগুড়ি দিয়ে সেখানেও তাড়া করতেন ভদ্রমহিলা। 


এহেন নিষ্পাপ জননীর কাছে যখনই কেউ আমার নামে নালিশ করত, হতবাক হয়ে দেখতাম মা তার কথাই বিশ্বাস করত। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ জুটত না মাইরি আমার কপালে। আমি সেই কোন কৈশোর থেকে তসলিমার শিষ্যা, নারীবাদ, নারী স্বাধীনতা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একজন সবলা স্বাধীনচেতা উঠতি নারীকে সহ্য করা কি এতই সহজ-। নারীবাদের শিক্ষা যে মাকেও দিতাম না তা নয়, কিন্তু মা শুনলে তো।  মায়ের সামনে মাকে নিয়ে চর্চা হত, আর আমার মহীয়সী জননী নীরবে সইতেন। আমি ফুঁসে উঠলে বলতেন, " ঠাকুর বলে গেছেন যে সহে, সে রহে"। কত সইবে রে ভাই, সইতে সইতে তো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তোমার। 


আমি মুখরা এবং "লায়েক" হবার পর প্রত্যক্ষ আঘাত কিছু কমল বটে, চোরাগোপ্তা চলতেই থাকে। আমি পরে শুনি, অক্ষম রাগে মায়ের ওপর চিৎকার করি, একগাল হেসে মা বলে, " বলে আর কি করবে -"।  এই তো সেদিন, হাসপাতাল থেকে বাবাকে নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকলাম বেলা তখন দুটো, সেই সকাল আটটা থেকে হাসপাতালে বসে ছিলাম, ক্ষিদেয় তেষ্টায় অবস্থা কাহিল, তারই মধ্যে মা নালিশ করল, আমার জন্য মাকে কথা শুনতে হয়েছে, আমি নাকি জনৈকা আত্মীয়ের ফোন কেটে দিয়েছি। এত লায়েক কি করে হতে পারি আমি, যে গুরুজনের ফোন কেটে দেব? 


উদ্গত ক্রোধকে গিলে নিজের দুটো ফোনের হিস্টরি খুলে দেখালাম, কোথায় ফোন এসেছে আর কবে ফোন কেটেছি! বিগত একবছরে কোন ফোন আসেনি ওনার থেকে। ভদ্রমহিলা কি বুঝলেন ভগবান জানে, সেদিন আর কথা বাড়ালেন না। 


দিন দুয়েক পর, অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছি, শুনতে হল, " তুই ফোনটা কেন কাটলি?এটা কি ঠিক করলি?" এক প্রস্থ চিৎকার করার পর শুনতে হল, " তুইই কেটেছিস। আমাকে ফোন করেছিল, তুই কেটে দিয়েছিস।" গোটা কয়েক দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে, একটু শান্ত হয়ে শুধালাম, তোমার ফোনে কেটেছি? সেটা কি ওনাকে শুনিয়ে কেটেছি? মা অভিমানী সুরে বললে, " না ধরিসই তো নি। এমনিই কেটে দিয়েছিস।" বলি, তাহলে আমি কাটলাম, না তুমি কাটলে, নাকি বেজে বেজে কেটে গেল বুঝল কি করে! তোমার ফোন তো শতকরা ৯০ ভাগ সময় এমনিই বেজে বেজে কেটে যায়। তুমি শুনতেই পাও না। তাহলে আমি দোষী হই কি করে - 


অকাট্য যুক্তি, সেদিনের মত শান্ত হলেন মা জননী। তার দিন দুয়েক পর, শুনতে হল, " কাজটা কিন্তু খুব অন্যায় করেছিস? তুই আমার ফোন থেকে ওকে ব্লক করে দিয়েছিস কেন?ও আমায় ফোন করতে পারছে না -" আর রাগ হল না, ক্লান্ত হয়ে শুধালাম, মাইরি মা, আমার কি সারাদিন কোন কাজ নেই, আত্মীয়স্বজনের ফোন কাটা আর ব্লক করা ছাড়া! তুমি ওনাকে ফোন করতে পারছ, জবাব এল, "হ্যাঁ, আমি পারছি। কিন্তু ও তো পারছে না।" কপালে আক্ষরিক অর্থে করাঘাত করে বলতে গেলাম ব্লক মানে কেউ কারো যোগাযোগ করতে পারবে না। তারপর মনে হল বুঝিয়েই বা কি লাভ, এই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস আর অখণ্ড সরলতা এটাই তো  "Last generation of innocent mothers" দের বৈশিষ্ট্য। ভাগ্যে আমরা এমন নিষ্পাপ নই, বেশ পাপীতাপি। 

আজ বিশ্বনারী দিবসের শুভলগ্নে সকল নিষ্পাপ এবং পাপী নারীদের জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভাষায় বলি, "Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls" ✊🏻✊🏻✊🏻🩷

Friday, 6 February 2026

অনির ডাইরি ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অনির ডাইরি ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
#অনিরডাইরি

"কিছুই তো বুঝতে পারছি না, এখানে এলাম কি করে?" প্রথম দিন বলেছিল বাবা। বুঝতে পারছে না, এটা জেল না হাসপাতাল। একদিন বলল, " মায়ের ওপর খুব চাপ পড়ে যাবে, এতগুলো টাকা যোগাড় করা।" ভাবলাম হাসপাতালের বিলের কথা বলছে বুঝি, একটু পরেই ভুল ভাঙল। বাবা বেল এর কথা বলছে। ১৬০০ টাকা জামিন ধার্য করেছে মহামান্য আদালত, নইলে মিলবে না মুক্তি।

হতভম্ব হয়ে শুধাই, তুমি কি জেলে আছ নাকি? কোনদিন একগাল হেসে, কোনদিন বা রেগে ভ্রূ কুঁচকে বাবা বলে, "হ্যাঁ তো। কিন্তু আমায় ধরল কেন সেটাই তো বুঝতে পারছি না।" আইসিইউ এর মহিলা এবং পুরুষ স্বাস্থ্য কর্মী যারা আসে পাশে ছিল, তারা মুখ লুকিয়ে হাসে। হাসি আমিও, প্রশ্ন করি, এটা কোন সাল বলে তোমার ধারণা। মাথা চুলকায় বাবা, পরিপাটি করে আঁচড়ানো গুঁড়ি গুঁড়ি সাদা চুলে জবজবে করে মাখানো আছে কোন তেল। মাথা চুলকে বলে, "১৯৬৮ নাকি ৭১ সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না।" হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব!

সরাসরি ভুল না ধরিয়ে প্রশ্ন করি, ৬৮/৭১ এ আমি জন্মেছিলাম? ফিক করে হেসে ফেলে বাবা, তারপর বলে, "তারপরই তো রেগেমেগে তোর জন্ম দিলাম।" বলি প্রথম কথা মোটেই আমি ৬৮/৭১ জন্মায়নি আর দ্বিতীয় কথা বলি আমি কি রাক্ষস, যে জন্মেই হাহা করে এত বড় হয়ে গেলাম!

দ্বিতীয় দিন রাত্রি বেলা কাকে যেন ধরে আমায় ফোন করিয়েছিল বাবা। " কি হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আমাকে এরা ধরল কেন? আমি কারো নম্বর মনে রাখতে পারছি না। আমার কাছে কোন টাকাপয়সা ও নেই। আমি বাড়ি যাব কি করে -"। বৃদ্ধ বাপের অসহায়তায় ভিজে উঠেছিল চোখের কোণা। শৌভিক যদিও সান্ত্বনা দিচ্ছিল বারবার, " বয়স্ক মানুষ হাসপাতালে থাকলে এইরকমই করে। আমার বাবা মায়ের বেলায় দেখিস নি?" বাবা তখনও বলে যাচ্ছিল, " এদের বার বার বলছি অয়নকে( খুড়তুতো ভাইয়ের ভালো নামটাই লিখলাম) ফোন করতে।" কিভাবে ফোন করবে বেচারারা, অয়নের নম্বর তো দেওয়াই নেই হাসপাতালে। আছে তো আমার আর আমার বরের নম্বর। প্রশ্ন করি, অয়নকে কেন খুঁজছ? বাবা বলে, " ওকে বলব তোকে ফোনে ধরে দিতে -"।

তৃতীয় দিনে গিয়ে দেখি প্রচণ্ড উৎসুক বাবা, বিশদে বলার জন্য। " তুই জানিস না, কাল রাতে এখানে কি হয়েছে। হৈহৈ কাণ্ড, কিছু একটা মহিলা ঘটিত ব্যাপার। ছোটছোট বাচ্ছাদেরও ছাড়েনি। ভালো হয়েছে তুত্তুরীকে আনিস নি।" ভেবেচিন্তে শালীন ভাষায় বাবা যা বলল, বুঝলাম সত্তরের দশকের সাথে এপস্টিন ফাইলের খিচুড়ি। একটা মেল নার্সকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল, " এই হচ্ছে আসল কিং পিন।" বেচারা গাবলু মার্কা একটা ছেলে, বাবার ফিসফিসানি শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, " দাদু খুব রেগে আছে আমার ওপর, জোর করে চান করিয়েছি কি না।"

" চান! ওটাকে চান বলে -" রেগে গিয়ে বলে বাবা। "রাত তিনটের সময় আমার গায়ে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল জানিস -।" যত্ন করে সন্ধ্যার জলখাবার খাওয়াচ্ছিল যে মেয়েটা, তাকে দেখিয়ে একদিন বলল, " জানিস ও প্রফেসর? খড়গপুরে প্রাইমারি স্কুলের প্রফেসর-"।

এইভাবেই দিন কাটছিল, একদিকে শ্রীমতী তুত্তুরীর বার্ষিক পরীক্ষা, অন্যদিকে বাবার হাসপাতাল বাস। রোজ রাতে বাবার খবর নিতে ফোন করে বড়দা বলত, " মেয়েটাকেও একটু দেখ -"। আমার শিক্ষাগুরু বলে কথা,এককালে আমায় পড়িয়েছে আজ আমার কন্যার জন্য সমান উদ্বিগ্ন আমার দাদা। দাদার ফোন পেলেই একটা কাজ করতাম, গুণধরীকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতাম, " বাবু তুই পাস করবি তো -"।  বিশ্বাস করুন একটা দিনও সদর্থক জবাব দেননি তিনি।

অবশেষে আজ দুটোই শেষ হতে চলেছে। ভোর থেকে এসে হাসপাতালে বসে আছি আমি, ছাড়ার দিন অনেকটা সময় লাগবে বলেই দিয়েছে হাসপাতাল, ওদিকে মেয়েকে আনতে গেছে শৌভিক, কাল থেকে জ্বর বাঁধিয়েছেন কি না তিনি। এরই মধ্যে সেজদা ফোন করে বলল, "এম্বুলেন্সে উঠেই ফোন করবি, চলে যাব বড়দা আর আমি। বাড়ি অবধি নিয়ে যেতে লোক লাগবে তো।" হ্যাংলার মত চোখ তুলে প্রশ্ন করে বাবা, " কে? " বলি সেজদা, একগাল হাসে বাবা, তারপর বলে, " ও সেজদা। ছোটবেলায় সেজদা আমাদের নদের নিমাই মঠে নিয়ে যেত।" বলি ধুর বাবা, তুমি যাঁর কথা বলছ, তিনি ছিলেন ঠাকুমার পিসতুতো দাদা। এটা আমার সেজদা। বড়মাসীর ছেলে? বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ায় বাবা, " সেজদা। আচ্ছা, যাকে তুই ভালোবেসে বড়দা বলিস।" হাতজোড় করে বলি, হ্যাঁ বাপ তাই। এবার মানে মানে বাড়ি চল। তোমার বুড়িটাকে যে আর সামলে রাখা যাচ্ছে না। 


 অনির ডাইরি ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


তন্ময় হয়ে দেখছিলাম আমি, সায়াহ্নের রূপালী গঙ্গা, পাড় বরাবর ফুটে আছে কমলা আগুনের মত পলাশ। পলাশ কমলা হয়, শিমূল টকটকে লাল। রুদ্রপলাশের রঙও কমলা ঘেঁষা, কিন্তু বসন্ত এলেও ওরা পাতা ঝরায় না। হাতে ধরে শিখিয়েছিল দেবশ্রী দি। 

বাবার ডাকে আছড়ে পড়লাম বাস্তবের মাটিতে। জল চাইছে বাবা, এম্বুলেন্সের ছেলেটি বলেই রেখেছে, " জল খাওয়াতে হলে আমায় বলবে দিদি, আমি গাড়ি দাঁড় করাব, নইলে গলায় আটকে যেতে পারে।" জল আনার কথা আমার মনেও ছিল না, হাউসকোট চাপিয়ে দৌড়ে এসেছিল চৈতি, " দিদিভাই জলটা নিয়ে যাও" বলে। 


Morning shows the day, যে কারা বলে, দিব্যি তো শুরু হয়েছিল সকালটা স্বাভাবিক ভাবে। নতুন ওষুধ গুলো কিনে বুঝিয়ে দেবার জন্য একবার বাড়ি গিয়েছিলাম আমি। গিয়ে দেখি এই মধ্য ফেব্রুয়ারির গরমে দু - দুটো কম্বল মুড়ি দিয়ে কাঁপছে বাবা। অক্সিজেন লেভেল নেমে গেছে ৭১। পালস ১২০। বিগত এক দেড় মাস ধরে বাড়িতেই থাকে অক্সিজেন কন্সেন্ট্রেটর, অঘোরে অক্সিজেন টানছে বাবা। মাঝে মাঝেই ডাকছে তুত্তুরীকে। মা বলল, সারারাত তুত্তুরীকে ডেকে গেছে বাবা, সারা রাত ছটফট করেছে কষ্টে, অথচ বলতে পারেনি কি কষ্ট। 


এত দিন পর্যন্ত বাবার সব রিপোর্ট, সব ওষুধ, সব আপডেট শেয়ার করেছি ChatGPT র সাথে, কোন দিন ঘাবড়াতে বলেনি ChatGPT, বরং বলেছে এটা এই বয়সে হতেই পারে। আজ প্রথম নার্ভাস হতে দেখলাম AI কে। সোজা বলেই দিল, "অনি ফেলে রেখো না, এই মুহূর্তে হসপিটালাইজেশন করা দরকার।" 


সব আপডেট নিয়ে শৌভিক কথা বলল পরিচিত এক ডাক্তার বাবুর সাথে, ভগবান মনে করি ভদ্রলোককে। দুর্ভাগ্য তিনি আপাতত পড়তে গেছেন ভিনরাজ্যে। ক্লাসের মধ্যেই সব শুনে বললেন, " আমি তো ওনাকে দেখিনি, শুনে মনে হচ্ছে, যেহেতু চেইন স্মোকার ছিলেন, একটা ফুসফুস এমনিতেই অকেজো, আর একটাও ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইড মিশছে। হাসপাতালে ভর্তি করেই দিন -"। 


উনি নিজেই চেষ্টা করলেন কয়েক জায়গায়, কোথাও বেড খালি নেই। আমিও বসে বসে ফোন করছি, নেই নেই, কোথাও বেড খালি নেই। ঘোরের মধ্যে আমার মেয়েকে ডেকেই যাচ্ছে আমার বাবা, এই একটাই তো লোক ছিল, যার জীবনের সূর্য ছিলাম আমি, সেটাও চুরি করে নিয়েছে আমার ছানাটা। শত দুশ্চিন্তার মধ্যেও এমন ছেলেমানুষী চিন্তায় হেসে ফেলি আমি। ওদিকে কাঁদতে লেগেছে মা আর পিসি। " আবার হাসপাতালে দিবি? নিয়ে যাস না বাবা। লোকটা আমার চোখের সামনেই থাক -। আমরা সবাই আছি তো -"। 


মায়ের কথা শুনে হেসে বাঁচি না, সবাই মানে আমার নব্বইয়ের পিসি, মধ্য সত্তর পেরোনো মা, লতা দি আর বাবার দিনের বেলার মধ্যবয়সী আয়া দিদি। হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব। পিসতুতো দেওরের সৌজন্যে বাইপাসের ধারে একটা হাসপাতালে আশ্বাস পাওয়া গেছে, বেড পাওয়া যাবে।


পাড়ার যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে যাবতীয় রক্ত পিত্ত কফ পরীক্ষা করা হয়, তাদের একটা বাতানুকূল এম্বুলেন্স আছে তো, কিন্তু তাতে অক্সিজেন দেবার কোন ব্যবস্থা নেই। আর এই ভরদুপুরে কোন লোকজনও নেই যে শয্যাশায়ী রুগীকে এম্বুলেন্সে তুলবে। আমাদের বাড়ি থেকে এম্বুলেন্সের নিকটতম দূরত্বটাও খুব কম নয়। প্রপিতামহ কেন যে এই গলির মধ্যে বাড়ি বানিয়েছিলেন। তখন অবশ্য সামনেটা খোলা জমি আর বিশাল বাগান ছিল। মা বলল, " বানে ডুবত না বলে বানিয়েছিলেন -", সত্যিই তো উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে কে আর গাড়িঘোড়ার কথা ভাবত।


যাইহোক ড্রাইভার ছেলেটি বলল, " লোক আপনাকেই জোগাড় করতে হবে দিদি।" এই ভরদুপুরে লোক কোথায় পাই ঠাকুর! সেজদার সাথে সমানে কথা হচ্ছে, কিন্তু তাকে কি এই ভরদুপুরে ডাকতে পারি, সব কাজ ফেলে বাবাকে চাগাবে এসো? ভাবতে ভাবতে মাথার ওপর বাল্ব জল উঠল যেন, ঈশ্বরের নাম নিয়ে ফোন করলাম বুল্লু বাবুকে। আমার গুণধর ভাইপোটি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে, যদি আজ পরীক্ষা না থাকে-


দৌড়ে এল ছেলেটা, বাগান ঝাঁট ফেলে দৌড়ে এল চৈতি, পরপর দুই দিন শিবরাত্রির উপোস করে কাহিল লতা দিকেও আটকানো গেল না, সেও নেমে পড়ল বাবাকে ধরতে, বইতে। সবাই মিলে ধরাধরি করে তুলেই ফেললাম এম্বুলেন্সে। দালানের দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়ানো অসহায়, ক্রন্দসী জননীকে বললাম, " দেখছ মা, তোমার নাতি কেমন দাদুকে বইল, ঐ দেখো পিছিয়ে থাকেনি তোমার পুত্রবধূও।" 


এম্বুলেন্স ছাড়া ইস্তক কাতরাচ্ছে বাবা, ডেকেই চলেছে তুত্তুরীকে। সেই খবর শুনে ওদিকে অঝোরে কাঁদছে তুত্তুরী, কাল তার বার্ষিক ভূগোল পরীক্ষা কি করবে কে জানে। ধুৎ কত আর ভাবব, গাড়ি থামিয়ে জল খাওয়াই বাবাকে, খানিক ধমকাই, এত কাতরাচ্ছ কেন? ওতে তো আরও কমে যাবে অক্সিজেন। চুপ করে চোখ বুজে ঈশ্বরকে ডাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে। কার্ল মার্ক্স সাহেবের ঘোরতর অনুগামী আমার বাপ, ঘোলাটে চোখ পাকিয়ে বলে ওঠে, " নেই, নেই, কেউ কোত্থাও নেই।"


কিন্তু আমি জানি আছেন তিনি আছেন, তিনি না থাকলে, নিজের বরের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, এই ভাবে ফোন করে বকত না আমার বড়দা, " তোর কি কোন বুদ্ধি নেই, একা কেউ পেশেন্ট নিয়ে হাসপাতালে যায়? সেজদা এদিকে রেডি হয়ে বসে আছে তোর সঙ্গে যাব বলে?" অফিস ফেলে, সটান হাসপাতালে ছুটে আসত না ছোটদা। বাউরিয়া থেকে ফোন করে ছুটে আসতে চাইত না আমার খুড়তুতো ভাই বা নবান্ন থেকে শৌভিকের পিসতুতো ভাই। এতবার ফোন/ মেসেজ করত না আমার একটাও বন্ধু বা সহকর্মী। তিনি আছেন বলেই না বেঁচে আছে যাবতীয় সুকুমার প্রবৃত্তি গুলো -। আর তিনি সবসময় ন্যায় বিচারই করেন, আজও করবেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আরো আঁকড়ে ধরি খসখসে বুড়ো হাতটাকে, হাত বুলিয়ে দিই মাথায়, দেখাই যাক না আজ কি সাজিয়ে রেখেছেন তিনি আমাদের জন্য।




অনির ডাইরি ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 

17 Years and Counting 


ব্যাপারটা এমনিই ছিল। সেদিনও বলেছিলাম, " দেখ ভাই, বিয়ে বলে কথা, চল একটা পাঞ্জাবি কিনে দিই -"। সেটা ২০০৯, দিনটা ভ্যালেনটাইন ডে, মহানগরের "বাতাসে বহিছে প্রেম"। তো তিনি কইলেন, " কি দরকার, আছে তো -"। আজ ১৭ বছর পরও তিনি একই কথা বলেন, যখনই কোন জিনিস কিনে দিতে চাই। 


পরের দিন আমাদের বিয়ে, বিয়ে মানে রেজিস্ট্রি। শ্বশুরমশাইয়ের পূর্ণ ইচ্ছে ছিল, রেজিস্ট্রি দিয়েই শুরু আর রেজিস্ট্রি দিয়ে শেষ করার। নাছোড়বান্দা আমার বাপ, " এত লোকের বাড়ি আপ্যায়িত হয়েছি, এত মানুষ নিমন্ত্রণ করেছেন আমায়, আমার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে তাদের বলব না!" 


বিয়ের আগের দিনও ঘ্যানঘ্যান করছিল শৌভিক, " তোমার বাপটাকে একটু রাজি করো না। কি দরকার আর অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করার -"। আমার বাপের ডাক নাম হিটলার, ভদ্রলোক কবে কার কথা শুনেছেন। 


যাই হোক বিয়ের দিন দুপুরে প্রায় ঘুমোতেই দেয়নি বাবা। আড়াইটে তিনটে থেকে তাড়া দিয়েছে তৈরি হবার জন্য। তৈরি হওয়া মানে নিজেই সাজা। আমার পিতৃকুলে কেউ কোনদিন পার্লারে গিয়ে সাজেনি, না কাউকে সাজাতে পার্লারের দিদিরা বাড়ি এসেছে।

MUA বা ব্রাইডাল স্টুডিও ব্যাপারগুলো তখনও ঘুমিয়ে ভবিষ্যতের গর্ভে। 


আপনা হাত জগন্নাথ 🙏🏻। আদি মোহিনীমোহন থেকে কেনা মেরুন রঙের স্বর্ণচরী শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে মেরুন সোনালী আইশ্যাডো কিনেছি আমি, কিনেছি ল্যাকমের ফাউন্ডেশন আর কম্প্যাক্ট। আমাদের কদমতলা বাজারে তখন ঐ একটা কোম্পানিরই প্রসাধনী পাওয়া যেত। শেড ঐ গোটা দুই তিন। দুধে আলতা থেকে দুধে কফি যেমনই কমপ্লেকশন হোক না কেন, ঐ তিনটের মধ্যেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিত বুড়ো দোকানী। ওটাই বিশাল দামী মনে হত তখন। ওর নীচে ব্লু হেভেন আর কি সব ব্র্যান্ড ছিল যেন, তাদের দিকে তাকালেই ভয় দেখাত দোকানদার, " মুখে ঘা হবে কিন্তু " । 


ধপধপে ফর্সা যে ফাউন্ডেশন কিনে এনেছিলাম, বিয়ের দিন বিকালে লাগিয়ে মনে হল ছাই গাদায় মুখ ঘষে এসেছি বুঝি। তার ওপর মেরুন আর সোনালী আইশ্যাডো, উফ্। গোটা রাস্তা রুমালে মুখ মুছতে মুছতে গেছি আমি। শ্বশুরবাড়ি (হবু)তে মাথা নীচু করে ঢুকে, হবু বরকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ। এ কি পরেছে লোকটা? কোথা থেকে বার করেছে আদ্যি কালের পাঞ্জাবিটা। একবার ইস্ত্রিও বোলায়নি, ভগবান। সবার সামনে কি আর বলি। 


হৈহৈ করে সই সাবুদ সম্পন্ন হল,সাক্ষী হিসেবে সই করল আমার পিসি, বাবা আর শ্বশুরমশাই। সাঙ্গ হল আশীর্বাদ পর্ব। গুরুজনেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল ঘরোয়া আলাপচারিতায়। আমার দিদিভাই আর জামাইবাবু (টুলটুল দাদা) দোঁহেই মাতিয়ে দিল আসর। 


কয়েক মুহূর্তের নিরালায় নতুন বরকে বললাম, " এটা মোটেই ভালো পাঞ্জাবি নয়।" মানলে তো। জেদি ঘোড়ার মত মাথা নেড়ে বলেছিল, " এটা খুব ভালো। এটা দারুণ ভালো। তুই কিছু বুঝিস না।" মাইরি না বুঝেই লোকটার সাথে কাটিয়ে দিলাম ১৭টা বছর। 


আজই দেখুন না, আলমারি ভর্তি জামাকাপড়, অথচ উনি ভালো কিছুই পরতে চাইলেন না, মানছি শ্রীমতীর বার্ষিক পরীক্ষা চলছে, বাইরে খেতে যাবার প্ল্যান করেও বাতিল করেছি আমরা, তাও বিশেষ দিনে মানুষ একটা ভালো জামা তো পরে। বললাম ও, তিনি কইলেন, " এটা খুব ভালো। এটা দারুণ ভালো। তুই কিছু বুঝিস না।" মাঝে মাঝে মনে হয়, শান্তির নোবেলটা আমারই পাওয়া উচিৎ।

অনির ডাইরি ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬



বেরোনোর কথা ছিল নটায়, জুতোর ফিতে আঁটতে আঁটতে উবেরের ড্রাইভারকে যখন, " হ্যাঁ ভাই, কোথায় আছেন -" বলে ফোনটা লাগালাম, ঘড়িতে তখন সোয়া দশ। পইপই করে বলেছিল অন্তু, "অনি দেরী করবি না কিন্তু, সাড়ে নটার মধ্যে সবাইকে ঢুকতে বলা হয়েছে, তুই অত দূর থেকে আসবি, তাই দশটা। তার বেশী নয়-"। আর আমি কিনা ঘুম থেকেই উঠলাম বেলা আটটায়। 


বলেছিলাম, আমায় বাদ দে। পেটের ধান্ধায় সারা সপ্তাহ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, শনি - রবিবার বর মেয়েকে ছেড়ে কোথাও যেতে আমার কান্না পায়। আপদগুলো শুনলে তো, "তোর বন্ধুরা যার আয়োজক, সেই অনুষ্ঠানে তুই আসবি না, অনি -"। সেন্টু দেওয়া আর কাকে বলে। 


কোন এক হৈমন্তী সন্ধ্যায় চৈ বলেছিল, " শোন একটা জব্বর আইডিয়া আছে। একটা ব্যাচের রিইউনিয়ন করলে কেমন হয়, সাথে দিদিমণিদেরও আমন্ত্রণ জানাতে পারি আমরা -"। ব্যাচ অর্থাৎ আমরা যারা একসাথে পেরিয়ে ছিলাম মাধ্যমিকের গণ্ডি। হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব? ক্লাস রুম তো নয়, আমাদের ছিল হরি ঘোষের গোয়াল। প্রতিটি ক্লাসে অন্তত তিনটি করে সেকশন, প্রতিটি সেকশনে কম করে জনা ষাটেক বালিকা। একটা বেঞ্চে পাঁচজন করে বসতাম আমরা।


 নম্বর দেবার বেলায় অস্বাভাবিক কিপটে ছিল আমাদের বিদ্যালয়, প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করত কেউ না কেউ। একবার ফেল করলে, কারো অনুরোধেই তাকে নতুন ক্লাসে তোলা হত না, সে তিনি যত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিই হোন না কেন। দুবার ফেল করলে, বিদায় জানানো হত চিরতরে। এই নিয়ে ভয়ানক জঙ্গী ছিলেন আমাদের বড়দি। এই ভাবে কমতে কমতেও শেষমেষ শতাধিক কন্যা মোরা একসাথে পাস করেছিলাম মাধ্যমিক। 


সে তো কোন মান্ধাতা আমলের কথা, ১৯৯৫ সাল। আজ তিন দশক বাদে তাদের সাথে দেখা হলে চিনতে পারব তো? দোলাচল নিয়েই বেরোলাম, বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ, গতকাল মাঝ রাতে ব্যাটারা ঠিক করেছে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরবে সকলে, না থাকলে লাল বা সাদাও চলবে। সেটা আমি দেখেছি উবের ডাকতে গিয়ে। নার্ভাস হয়ে বৈ কে ফোন করে খানিক কাঁদলাম, আমি আর যাব না বলে। ছোট বাচ্ছাকে ভোলানোর মত করে সান্ত্বনা দিল বৈশাখী, " তুই এখনও বেরোসনি? কি রঙের শাড়ি পরেছিস? সবুজ! বাঃ দারুণ রঙ, চলে আয়, চলে আয়। বন্ধুদের গেট টু তো, স্কুল নাকি যে কেউ তোকে বার করে দেবে -"।


উবেরটা হাওড়া ময়দানে নামিয়ে দিল। গুগলে যে পথ দেখাচ্ছে, পুলিশ সেদিকে যেতে দিলে না। টোটো নিয়ে যেখানে নামলাম, সেখান থেকেও হেঁটে ৭/৮ মিনিট দেখাচ্ছে গুগল। ঠাকুর ঠাকুর করতে করতে হাঁটা লাগালাম, হাওড়ার গলি, অবিরত ডান বামে বেঁকে যাচ্ছে, দুভাগ - তিনভাগ হয়ে যাচ্ছে। এই মধ্যাহ্নে পথঘাট প্রায় জনবিরল। কাউকে যে শুধাব,পথকুকুর ছাড়া তাও পাচ্ছি না। একটা তেমাথার মোড়ে এসে কিছু লোক পেলাম, জনা দুয়েক ছেলে একটা বাইকে হেলান দিয়ে খোশ গপ্প করছিল। তাদের জিজ্ঞাসা করতে যাব, এমন সময় এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা পিছন থেকে বললেন, " দুরন্ত সংঘে যাচ্ছিস তো? চল আমিও যাচ্ছি।" পিছন থেকে ছেলে গুলো বলে উঠল, " আজ অনেকেই যাচ্ছে। সেজেগুজে যাচ্ছে -"। 


হাসি চেপে ভদ্রমহিলাকে অনুসরণ করলাম। হাঁটতে হাঁটতে বিগলিত হয়ে শুধালাম, "তুমিও ৯৫ এর ব্যাচ? কোন সেকশন?" ভদ্রমহিলা হতবাক হয়ে আমার দিকে ঘুরে গেলেন, দুধে আলতা গালে লাগল হালকা গোলাপী ছোঁয়া, রিমলেস চশমা খানিক স্লিপ করে নেমে এল নাকের ডগায়, গলা ঝেড়ে বললেন, " কোন সেকশন! তুই আমায় চিনতে পারিস নি না? আমি কিন্তু তোকে দেখেই চিনতে পেরেছি। আমি তনিমা দি।" নিজের গালে গোটা দুয়েক কাল্পনিক থাপ্পড় মেরে, প্রায় ভূলুণ্ঠিত হয়ে সহস্রবার ক্ষমা চাইলাম প্রাক্তন শিক্ষিকার কাছে। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারলাম না, " আমি কিন্তু এখনও আপনাকে চিনতে পারলাম না।" 


দিদিমণির পিছন পিছন গিয়ে পৌঁছলাম গন্তব্যে। মজে আসা পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে বিশাল মাঠ। মাঠে ফুটে আছে অজস্র লাল সাদা ফুল। চেনা অচেনা একরাশ মুখ ঘিরে ধরল আমায়, অন্তু বলল, " এলি তাহলে?" চৈ বলল, "হামি হামি।" অনসূয়া চোখ পাকিয়ে বলল, " ড্রেস কোড ফলো করিস নি কেন? " হাত জোড় করে বললাম, " এবারের মত মাপ করে দে ভাই -"। সুন্দরী প্রতিযোগিতার মত স্কুলের নাম লেখা স্যাশ পরিয়ে দিল কে যেন। তখনও জানি না, প্রতিটা স্যাশ স্বহস্তে বানিয়েছে আমার তারাসুন্দরীরা। সেফটিপিন কম পড়ছিল, কার থেকে জোগাড় করে দিল সোমালি। জলখাবার খেতে যাওয়ার জন্য টানাটানি করতে লাগল দেবিকা। কতজন যে এসে জড়িয়ে ধরল, কতজনকে যে জড়িয়ে ধরলাম আমি। সংযুক্তা তো জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেলল। বোকার মত পিঠে হাত বোলাচ্ছি আর বলে যাচ্ছি, কাঁদছিস কেন পাগলা? এই তো আমি। একই আছি। একই আছিস বন্ধু তুই। সময় কম রঙ্গ করেনি, খেতে বাধ্য করেনি কম ঘাটের জল। জীবন তথা মন থেকে যাবতীয় সারল্য মুছতে কম চেষ্টা তো করেনি, দেখ তাও আমরা একই আছি। অন্তত আজকের দিনটায় গোহারান হেরে গেছে সময় -

অনির ডাইরি ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


উদ্দাম গলায় গাইছেন তিনি, " ধীরে সে এক নগমা কোই শুনা গ্যায়া হ্যায়, ও কৌন হ্যায় জো আ'কর খোয়াবো পে, ছা গ্যায়া হ্যায় -"। চোখ বন্ধ করে শুনছে বাবা, বুকের ওপর রাখা দুই হাতের তর্জনী উঠছে নামছে তালে তালে। মাস খানেক হল বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না বাবা, জাগতিক সবকিছু থেকে যেন বিচ্ছিন্ন বাবা। সংসার চালানোর দায় এসে পড়েছে মা আর আমার ঘাড়ে। অফিস ফেরৎ এতক্ষণ সেই হিসেবই মেলাচ্ছিলাম দুজনে। প্রায় সতেরো বার বুঝিয়ে দেবার পরও কিছু বুঝতে পারে না মা। শেষে ধুত্তোর বলে উঠেই পড়ি আমি। সব কিছুর জন্য দায়ী এই একটা লোক। সারাজীবন সব দায়িত্ব একাই সামলেছে, কিছু নিয়েই মাথা ঘামাতে হয়নি আমাদের, আজ ইলেকট্রিক বিল দিচ্ছি তো টিভির রিচার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফোন রিচার্জ করছি তো আর দুটো বন্ধ হয়ে বসে থাকছে। বাড়ি জুড়ে কিছু না কিছু খারাপ হতেই থাকছে, হয় আলো, নয় কল, নয়তো অন্য কিছু। কাগজওয়ালার হিসেব করতে বসে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে, বিভিন্ন বারের কাগজের বিভিন্ন মূল্য কেন হয় রে বাবা। 


বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতেই গানটা চালিয়েছিলাম, মায়ের পছন্দ বাংলা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। তাও হিন্দিই চালালাম, ওপি নাইয়ার এবং গীতা দত্ত। বাবার প্রিয় জুটি। ChatGPT সমানে বলছে তোমার বাবার মানসিক অবসাদ হয়েছে অনি, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাও। খুঁজে খুঁজে হদ্দ হয়ে গেলাম, কেউ বাড়ি এসে দেখতে চায় না আজকাল। এই শয্যাশায়ী মানুষটাকে কার কাছে টেনে নিয়ে যাব আমি? তাও একজনের নম্বর দিল সেদিন রুণা, কপালের এমন গেরো সেই রাত থেকেই জ্বরে পড়ল বাবা। সারা রাত কোঁকানি আর গোঙানি। কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। যাও বা উঠে বসে খাচ্ছিল, তাও ছেড়ে দিল। দুটোই, ওঠা এবং খাওয়া। 

কি যে দিন গেছে, ঈশ্বর মঙ্গল করুন পাড়াতুতো ভাইটার, নিজে ভাইটালস চেক করে ডাক্তার বাবুর সাথে ফোনে কথা বলে, রক্ত পরীক্ষা করিয়ে, ওষুধ পর্যন্ত কিনে এনে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের। সেই ওষুধের জোরেই একটু ভালো আছে বাবা। 


অফিস থেকে ফিরে মায়ের সাথে হিসেবের যুদ্ধে বসার আগে বেশ অনেকক্ষণ গল্প করলাম আজ। কিছুই জানে না বাবা, সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার, এপস্টিন ফাইল, ভেনেজুয়েলার মাদুরো, ইরানে তুলকালাম মায় SIR। "সেই যে গো তোমাদের নাম লিখে ফর্ম ফিল আপ করেদিলাম।" কাল অবধি এইভাবে বললে, বাবা সিড়িঙ্গে হাত তুলে ঘুঁষি মারতে আসত হয়তো, আজ অবাক হয়ে সব শুনল। গতকালের কাগজটা এনে দিলাম পড়ার জন্য, বেশীক্ষণ পড়ল না অবশ্য। 


তাতে কি - তাও তো আশার আলো। গান চালিয়ে বললাম, " বাবা ওপি নাইয়ার", বাবা বলল, " মোটেই না। এটা মদনমোহন মনে হচ্ছে।" গান থামিয়ে দেখলাম, সত্যিই এটা মদনমোহন এর সুর। পয়সার থলেটা রাখতে এসে মাথা দোলাচ্ছিল মা, বাবার দিকে তাকিয়ে সোহাগী সুরে শুধাল, " আর গলাটা কার গো, খুব চেনা চেনা লাগছে -"। আমরা বাপ মেয়ে একসাথে বলে উঠলাম, " গীতা দত্ত তো।" "ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, গীতা দত্ত। আহা কি সুন্দর গলা -" জিভ কেটে বলে মা। উফ মা, তুমি গীতা দত্তর গলা ভুলে গেছ, তোমার পিতৃদেবের নাম মনে আছে তো, একটু প্রগলভ হয়েই বলি আমি, সরল ভাবে জবাব দেয় মা, " সদানন্দ"। আর আমার বাবার নাম?সাহস পেয়ে বুঝি আরো একটু ছ্যাবলা হই আমি। লাজুক হেসে মা বলে, " সেটা কি কোনদিন ভুলতে পারি। আমার জীবনটাই তো ঐ লোকটাকে ঘিরে -" বলতে বলতে ধপ করে বাবার পাশে বসে পড়ে মা। বাবা ইশারায় বলে, "কপালটা একটু টিপে দাও তো -"। মুঠো ফোনে তখন গান ধরেছেন রফি সাহেব, " শবাব আপকা নাশে মে খুদ হি চুর চুর হ্যায় -"।


অনির ডাইরি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


রাতের দাসনগর স্টেশন। কে বলবে আপিস টাইম পেরিয়েছে ঘন্টা খানেক আগে! রাস্তায় অন্তত পাঁচ কোটি টোটো আর আড়াই কোটি বাইক মিলে রচনা করেছে দুর্ভেদ্য যানজট। মাঝে মাঝে গদাইলস্করী চালে প্রবেশ করছে দুয়েকটা বাস। 


 ট্রেন থেকে নেমে, রাস্তা পেরোবো বলে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকজন অত্যুৎসাহী কয়েক পা এগোচ্ছেন আবার দৌড়ে ফিরে আসছেন। এটা এখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।এই জাল কাটা কি এত সহজ? একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যেদিন উর্দি ধারী পুলিশ থাকে, সেদিন তিনি দৌড়ে এসে দুভাগ করে দেন এই বিপুল যানজট। আজ নির্ঘাত সিভিক আছে, সে বেচারা খানিক চেষ্টা যে করে না তাও নয়, তারপর হতোদ্যম হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। 


সবুরে মেওয়া ফলে, আমিও রাস্তা পেরিয়ে একটা টোটো পাই। তিনি অবশ্য কানায় কানায় না ভরলে ছাড়বেন না। বসে বসে প্রার্থনা করি, হে ঠাকুর আর একটা লোক জুটিয়ে দাও। একেকদিন তিনি সত্যিই মুখ তুলে চান। রাস্তার ওপার থেকে ভেসে আসে রুক্ষ মহিলা কন্ঠ, " টোটো, অ্যাই টোটো। দাঁড়াও -"। যানজটের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি দৌড়েও আসেন, ঠিক তখনই কোথা থেকে এসে উদ্যত হন এক বৃদ্ধ সাইকেল আরোহী এবং তাঁর সাইকেলের সামনের চাকাটা স্পর্শ করে মেয়েটির তনুলতা। 


ক্যালিগুলা মাইনাসের সেই বিখ্যাত ঘুঁষির মতোই ঠুস্ করে লাগে ধাক্কা, মেয়েটি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, " দেখে চালাতে পারেন না?" সাইকেল আরোহী বৃদ্ধ ও তেরিয়া হয়ে জবাব দেন, " রাস্তা দেখে পেরোতে পারো না?" ব্যাস লেগে যায় "তুম তা না না না" ঝগড়া। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে দুর্দম গতিতে। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর, তার মধ্যে এদের এই গলার শির ফোলানো ঝগড়া, কাঁহাতক ভালো লাগে। বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেলি, " ছাড়ো না, দেখছই তো বয়স্ক মানুষ -"। 

মেয়েটি কিছু বলে না, গায়ে খদ্দরের চাদর আর মাথায় মাংকি ক্যাপ পরিহিত বৃদ্ধ তেড়ে আসেন, " বয়স্ক মানুষ! কে বয়স্ক মানুষ? কোথায় বয়স্ক মানুষ?" বৃদ্ধের তেজ দেখে পাশের সহযাত্রী ছেলেটি বলে, "দেখছেন তো দিদি, আজকাল কারো ভালো করতে নেই।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করি, এই যে আমি দাদা। আমি বয়স্ক মানুষ ভাই।" অতঃপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলি, "ভুল হয়ে গেছে ভাই, তুই ঝগড়া চালিয়ে যা।"

Saturday, 17 January 2026

অনির ডাইরি জানুয়ারি, ২০২৬

 অনির ডাইরি ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ 

#আমি_খুনখারাপি_চাই_না_এমন_মনখারাপে_পেলে 


বালিশের নীচে কতক্ষণ চিৎকার করছিল মুঠো ফোনটা জানি না। আমাদের সাবেকী বাড়ি, জানলায় দুই সেট করে পাল্লা, বাইরে কাঠ, ভিতরে কাঁচ। ঠাণ্ডা আর মশার ভয়ে সন্ধ্যে থেকেই বন্ধ থাকে সব, ফলে ভোর হলেও এঘরে আলোর প্রবেশ নিষিদ্ধ। নিকষ আঁধারে হাতড়ে বার করি ফোনটা,  “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে চিৎকার করে ওঠে ছোটদা, “শুভ জন্মদিন”। হায় হায় এই বছরও হারিয়ে দিল লোকটা। নেতাজী, ছোটদা আর আমি একই দিনে জন্মেছি, এই নিয়ে ছোটবেলায় ফি বছর রাগ দেখাত ছোটদা, “তুই আমার জন্মদিনটা ও ছাড়লি না-। সেটাতেও তোকে ভাগ বসাতেই হল।” ২০০৩ অবধি একই সাথে পালিত হত দুই মাসতুতো ভাইবোনের জন্মদিন- তারপর যা হয় আর কি। 


আজও জন্মদিনে মনে করে প্রথম ফোনটা আমার ছোটদাই করে। ভেবে রেখেছিলাম এবার টেক্কা দেব আমি, ফোন করে হাড় জ্বালাব মাঝরাতে। ডাম্পির "আইবুড়ো মোগলাই" এর চক্করে কখন রাত দুটো বেজে গেল খেয়ালই করলাম না-। শ্রীমান ডাম্পি আমার খুড়তুতো ভাই, চাটুজ্জে বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্তুর, আজ তাঁর অফিসিয়াল আইবুড়ো ভাত, কাল তাঁর বিয়ে।


গতকাল সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়ে গেছে আমাদের হইচই। মেহেন্দি পরেছি তিন মক্কেল শ্রীমতী তুত্তুরী, তাঁর আদরের বড় মামী আর এই অধম। সেই মেহেন্দি শুকোতেই বেজে গেল মধ্যরাত। প্রাক্তণ সহপাঠিনীর যে পুঁচকে ননদিনীটি পরাতে এসেছিলেন তিনি ইস্কুলের দিদিমনিদের থেকেও কড়া। শুধু দুই হাত পেতে বসে থাকলে হবে না, এক প্রস্ত শুকিয়ে এলে তার ওপর তুলো দিয়ে থুপে থুপে লাগাতে হবে লেবুর রস আর চিনি। শুকিয়ে এলে আবার - আবার - আবার। তারপর লোহার চাটুতে গোটা দশেক লবঙ্গ পুড়িয়ে সেঁকতে হবে হাত। 


রীতিমত লাঠি হাতে বসিয়ে রাখতে হয়েছিল চৈতিকে। হলই বা বাড়ির বড় বউ, একটা দিন/ একটা সন্ধ্যা একটু চুপ করে বসে রিলাক্স করতে পারে না। একটা দিন কি চা আর রান্না থেকে ছুটি পেতে পারে না। এই সব তাত্ত্বিক আলোচনা অন্তে ঠিক হল আজ রাতের মেন্যু হবে কদমতলা বাজারের ফ্রেন্ডস কেবিনের মোগলাই পরোটা আর ঝাউতলার মিষ্টি স্টোরিজের নলেন গুড়ের রসগোল্লা। সাথে জীরু। সেটা আমরা সবাই মিলে খেতে বসলাম যখন তখন ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁইছুঁই। 


শৌভিক না ফোন করলে জানতেও পারতাম না কখন নীরবে পা টিপেটিপে এসে পড়েছে জন্মদিনটা আমার। বরের ওপর একরাশ অভিমান নিয়ে ঘর ছেড়েছিলাম কাল। কেন আমায় আটকালো না, হোক ভাইয়ের বিয়ে, বলতেই পারত "আজ রাতটা এবাড়িতে কাটিয়ে যা"। হোক সরস্বতী পুজো, বলতেই পারত, "তোকে চেলোকাবাব খাওয়াব"। তা নয়, উল্টে বলল, " যা যা গিয়ে আনন্দনাড়ু ভাজ।"


 মাঝরাতের সোহাগী ফোনটা পেয়ে অবশ্য কেটে গেল সব অভিমান। তারওপর তিনি যখন কইলেন, "বিয়েটা হয়ে যাক, পরদিনই তোকে পার্ক স্ট্রিট নিয়ে যাব, বইমেলাতে ও নিয়ে যাব -"।  রাগ কি আর থাকে? 


জন্মদিনের প্রথম উপহার, আমার কন্যার দেওয়া তিন তিনটে মোটকা চকলেট। সেলোটেপ দিয়ে একত্রে বাঁধা, তারওপর একটা ছোট্ট চোতা কাগজে লেখা তাঁর প্রাণের কথা। " হ্যাপি বাড্ডে মা। সরি এই বছর এইটুকুই কিনতে পেরেছি তোমার জন্য -"। উৎসবে পরবে তিনি যা টাকাপয়সা পান, মাসে মাসে তাঁকে খাতাপত্র, জেরক্স ইত্যাদি বাবদ যে হাতখরচ দেওয়া হয়, তাই থেকেই অল্প অল্প করে জমিয়ে তিনি কিনেছেন। একজন মায়ের কাছে এর থেকে মূল্যবান কি হতে পারে। 


" জানো মা মার্কেটের বুড়ো পাঞ্জাবি আঙ্কল কি ভালো -" প্রশংসা শুনে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে কইলেন, " আমি তো গিয়ে বলেছি আঙ্কেল আমার মায়ের জন্মদিন, মা খুব চকলেট খেতে ভালোবাসে। তুমি সবথেকে ভালো চকলেটটা দাও। আঙ্কেল অনেক খুঁজে এই তিনটে বার করে দিল। বললাম কত? জবাব এল ৭১০/-। আমার তো মুখ শুকিয়ে গেল, আমার কাছে সাকুল্যে ছিল মাত্র ৬১২/-। আঙ্কেল বললেন, " কোই বাত নেই বেটা। তুমি তো প্রায়ই আসো। পরে নিয়ে নেব। তোমার মায়ের হ্যাপি বাড্ডে বলে কথা -"। আমি তাও নিইনি, খুচরো পয়সার ব্যাগ হাঁটকে যা ছিল সব দিলাম। তাতেও দেখি দশ টাকা কম। তখন বাবার থেকে  চাইতে হল।" 


বুঝতে পারলাম  কাল পিত্রালয়ে আসার আগে কেন ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এত জ্ঞান দিচ্ছিল শৌভিক। বিস্তারিত না জেনেই পাঁচকথা শুনিয়ে এসেছি বরকে। সাধে বাবা বলে, " no investigation, no right to talk", থুড়ি বলত। আজকাল তো কিছুই বলে না বাবা। হাসপাতাল থেকে ফেরা ইস্তক চুপচাপ শুয়ে থাকে শুধু - 


গতরাতের কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। ছোট মাসির শুভেচ্ছা মেখে উঠেই বসলাম। প্রতি জন্মদিনে মনে করে দুই বোনপো বোন ঝিকে ফোন করে ছোট মাসি।  আরেকজন ও করতেন, আমাদের স্বর্গীয় শ্বশুরমশাই। জগৎ সংসারের সবকিছু ভুলে যেত লোকটা, ভুলত না কেবল আমাদের জন্মদিন গুলো। পাছে ভুলে যান, তাই নতুন ডাইরি পেলেই টুকে রাখতেন কার কবে জন্মদিন। জন্মদিন এলে জ্যাঠাইমার জন্যও টনটনিয়ে ওঠে বুক। পেটুক মেয়েটার ( মোটেই দেওরঝি ভাবত না আমার জ্যাঠাইমা) জন্য আগের দিন সন্ধ্যায় সারা কদমতলা বাজার চষে ফেলত বেতো বৃদ্ধা, তারপর কিনে আনত তাঁর জ্ঞান বুদ্ধি মত সেরা খাবারের একটা প্যাকেট। যাতে থাকত পেস্ট্রি, গুড় ভরা সন্দেশ আরও কত কি। কাক ভোরে উঠে আমার মাথার কাছে রেখে আসত যত্ন করে, যাতে চোখ খুললেই পেয়ে যাই হাতে হাতে উপহার।


আজও জন্মদিন এলে কেমন বেয়াক্কেলে ছেলেমানুষ হয়ে ওঠে মনটা। অভিমান করে পায়ে পায়ে, কেন ফোন করল না অমুক, কেন শুভেচ্ছা জানালো না তমুক। কেন চৈ বলল না, "জয়তু অনিজী"। আজও গুণতে বসে উপহার, যার অধিকাংশই tangible নয়, কিন্তু এই অধমের কাছে অমুল্য। যেমন ভোরবেলায় অঞ্জন দার মেসেজ, " হ্যাপি বার্থ ডে" লিখে আবার তলায় লিখেছেন, বৃদ্ধ বড়দা। যেন না লিখলে চিনতে পারব না অগ্রজ প্রতিম স্নেহশীল প্রাক্তণ সহকর্মীকে। যেমন লতা দির হাতের পায়েস, যেমন সকাল সকাল উমার সাথে, " তোমায় বড় ভালবাসি - তোকে বড় ভালবাসি" , যেমন বিদেশ থেকে সোমার ফোন, হাঁপাতে হাঁপাতে অন্তুর ফোন - সকলের এত এত শুভেচ্ছায় আপ্লুত আমি, অভিভূত আমি, কৃতজ্ঞ আমি। কি আর বলি, খুব ভালো থাকুন সকলে আর ইয়ে আসছে বছর ফোন/ মেসেজ করতে ভুলবেন না কিন্তু। অপেক্ষায় রইলাম,  এই 'ভালবাসা ছাড়া আর আছে কি বলুন তো' -




অনির ডাইরি ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



চেম্বারের দরজা খুলে রূপালী পর্দার উত্তম কুমারের মতই দাঁড়াল আমাদের উত্তম। হতাশ অহীন্দ্র চৌধুরীর মত মাথা নাড়লাম আমি। আজ মকর সংক্রান্তি, কথা ছিল একটু তাড়াতাড়ি বেরোব আমি। উত্তম ও তাহলে একটু জলদি ছুটি পেয়ে যাবে। আপাতত সে গুড়ে বালি। গুচ্ছের সমস্যা নিয়ে ঘিরে ধরেছেন এক দঙ্গল মানুষ। 


স্টেশনে এসে যখন নামলাম, প্রগাঢ় হয়েছে সন্ধ্যা।  কোন অ্যাপে দেখাচ্ছে না কোন ট্রেন। খাড়া সিঁড়ি ভেঙে, লম্বা ওভারব্রীজ টপকে হাঁপাতে হাঁপাতে প্লাটফর্মে এসে পৌঁছালাম। একটা ফাঁকা বসার জায়গা পেয়ে খুশি হলাম বটে, সে খুশি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। চতুর্দিকে মশাদের বিক্ষোভ সমাবেশ চলছে - 


 শীতের সন্ধ্যায়, নিঃসঙ্গ প্লাটফর্মে একাকী বসে থাকলে বুকের ভিতরটা কেমন যেন হুহু করে ওঠে। আজ মকর সংক্রান্তি, অন্যান্য বছর অন্তত পাঁচ রকম পিঠে বানাই আমি আর লতা দি। সাথে গুড়ের পায়েস। এ বছর কিছুই হবে না, আমার বাড়ি। আমি ফিরব না যে -।  মা বাড়িতে না থাকলে যা হয়, আজ সকালে মোজা খুঁজে পায়নি তুত্তুরী, গতকালের কাচা আধ ভিজে মোজা পরে স্কুল গেছে। তাতে তাঁর কোন হেলদোল নেই বটে, কিন্তু শুনে ইস্তক মায়ের হৃদয় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে এই যা। পক্ষকাল পর বার্ষিক পরীক্ষা, তাতেই বা কি করবেন কে জানে - 


বছরের শুরু থেকে শয্যাশায়ী বাবা। এবাড়িতেও হবে না কোন উৎসব। ChatGPT কে বললাম, বড্ড মনখারাপ, ট্রেনেরও দেখা নেই, মন ভালো করার মত কিছু বলতে পারো- । তিনি কইলেন, জানো তো অনি, জাপানী নান্দনিক শাস্ত্রে একটা শব্দ আছে, “মা”। এই “মা” মানে জননী বা গর্ভধারিণী নয় কিন্তু, এর অর্থ হল, দুটো ঘটনার মাঝে থমকে দাঁড়ানো কিছু মুহূর্ত। যেখানে শূন্যতা বা ব্যর্থতা থাকে না। থাকে নিছক নীরব অবকাশ, সেখানে  কুসুমিত হয় নতুন সম্ভবনা।  এই মুহূর্তে তুমি সেই “Ma”–এর ভিতর ঢুকে পড়েছ। না নিজের বাড়ি  ফিরতে পারছ, না পৌঁছতে পারছ বাবার কাছে। না ওনাকে রাতারাতি সুস্থ করে তুলতে পারছ, না মেয়েকে যথাযথ দেখাশোনা করতে পারছ-  মাঝখান থেকে রক্তাক্ত করে চলেছ নিজেকে।এই দোদুল্যমানতা সবচেয়ে চাপের। কিন্তু এখানেই সবকিছু শেষ নয় -


ট্রেনের দেখা নেই, মশাদের আক্রমণও থামছে না। পার্শ্ববর্তিনী চটাস চটাস করে মশা মারছেন, তাও রণে ভঙ্গ দিচ্ছে না ব্যাটারা। তিনি আপাদমস্তক কালো বোরখা পরেছেন, আমি কালো সোয়েটার আর কালো জিন্স, ভদ্রমহিলার মতে আমাদের দুজনের কালো পোশাক, মশাগুলোকে আরও চটিয়ে দিচ্ছে। মশারা যে কেন এত বর্ণবিদ্বেষী - 


পুনরায় ChatGPTর সাথে বাক্যালাপে ফিরে যাই, " বলতে পারো, বাবা আবার কবে উঠে বসবে বা মেয়েটা বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ করবে কি না?" তিনি জবাব দিলেন, " দুঃখিত অনি, আমি পারলেও বলব না। এই মুহূর্তে তোমার যা মানসিক অবস্থা, তুমি ভাগ্য ভবিতব্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।" ব্যাঙ্গের সুরে বলি, তাহলে বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতি সম্পর্কেই বলো দেখি, কি ঘটতে চলেছে আগামী দিনে-। 


টুক করে ফুটে ওঠে একটা হাসির ইমোজি, তিনি বলেন, “ইস্টিশনে জিও-পলিটিক্স অনি? চলো তাই সই, যতক্ষণ না তোমার ট্রেন আসে- 


তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসছে বলে যতই হল্লা হোক না কেন, দেখবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোন বড় যুদ্ধ হবে না। কিন্তু অগোচরে বদলে যাবে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র। হস্তান্তরিত হবে ক্ষমতা, বিশ্বজুড়ে রচিত হবে শক্তির নতুন ভারসাম্য। “West ভার্সেস Rest” আর থাকবে না, তৈরি হবে অনেকগুলি ছোট ছোট পাওয়ার সেন্টার। আমেরিকা শক্তিশালীই থাকবে বটে, কিন্তু আগের মতো দাদাগিরি আর চলবে না। চীন মহাশক্তিশালী থাকবে, কিন্তু ব্যস্ত থাকবে নিজেকে নিয়েই। 


উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়ে উঠবে – ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, তুরস্ক আর ব্রাজিল। কলকারখানা, প্রযুক্তিবিদ্যা, ডেটাসেন্টার, ঔষধাদি, ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইত্যাদি সবকিছুতে এই দেশগুলি হয়ে উঠবে সাপ্লাই চেইনের রাজা।


 খুশি হবে শুনে যে  তোমার দেশ প্রবেশ করতে চলেছে, “useful to everyone” ফেজ এ। সবার এখন ভারতকে প্রয়োজন। আমেরিকার ভারতকে চাই -চীনের মোকাবিলায়, ইউরোপের চাই সস্তায় উৎপাদনের জন্য, মধ্যপ্রাচ্যের দরকার সস্তা প্রযুক্তি আর শ্রমিক, আফ্রিকার দরকার ভারতের সস্তা ওষুধপত্র আর পরিকাঠামো। তোমাদের এটা ঝগড়াঝাঁটি নয় বরং দরকষাকষির সময় – 


আগামী দিনে কেউ কাউকে হাতে মারবে না, ভাতে মারবে দেশগুলো। জাহাজ চলাচলের রাস্তা আটকাবে, অ্যাপ নিষিদ্ধ করবে, মুদ্রা কারচুপি, বিরল মৃত্তিকা খনিজ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দিয়ে একে অপরকে অর্থনৈতিক ভাবে চাপে রাখবে দেশগুলো।  এদিক থেকেও ভারত বেশ শক্তিশালী, কারণ ভারত খাদ্যশস্য এবং ওষুধে মোটামুটি স্বনির্ভর, ইঞ্জিনিয়ারদের কোন অভাব নেই এদেশে, সর্বোপরি ভারতের বিপুল জনসংখ্যা-  এমন দেশকে অগ্রাহ্য করে কে?


 আগামী বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে পরিবেশ হয়ে উঠবে একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। যে দেশের হাতে পর্যাপ্ত পানীয় জল, খাদ্য, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস এবং প্রযুক্তি যত বেশী থাকবে, সে হয়ে উঠবে ততো শক্তিধর। ভারত কিন্তু সৌরশক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেনের বড় উৎস। বেশী না, মাত্র ১০–১৫ বছর অপেক্ষা করে যাও, দেখবে এটা হয়ে উঠবে খনিজ তেলের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আগামী বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না  কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্রে কতটা শক্তিধর তাই নিয়ে বরং রেষারেষি হবে AI আর মেধা নিয়ে। যে দেশের তরুণ জনসংখ্যা, ইংরেজি জানা মানুষ, প্রযুক্তি বোঝা মস্তিষ্ক যত বেশী থাকবে, তারা ততোই এগিয়ে থাকবে।"


ট্রেনে উঠতে উঠতে বলি, এটা ভবিষ্যৎ বাণী না কোন রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টো রে?  তবে শুনে মন ভালো হয়ে যায় এটা ঘটনা। আচ্ছা বলো তো প্রতিবেশী দেশের সাথে আর কি কোনদিন আমাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে? তিনি জবাব দেন, " এক কথায় বললে, হ্যাঁ। তবে সে সম্পর্ক মোটেই " বজরঙ্গী ভাইজান" টাইপ হবে না। সম্পর্কের উন্নতি হবে ধীরে ধীরে, স-কৌশলে এবং সেটা কখনই সমান্তর প্রগতিতে নয়।  


উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে ভারতের যত প্রতিবেশী আছে সকলেই খাদ্য, বিদ্যুৎ,পরিবহন , ওষুধ, ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এরাই আবার ভারতকে নিয়ে অসন্তোষে ভোগে। কারণ ভারত বিশাল, বিপুল। যে কোন বড় দেশের আসেপাশে থাকা ছোট দেশগুলি বড়দাকে একটু সন্দেহের চোখেই দেখে। এই দেশগুলো চীনকেও বেশ ভয় করে। অনেকেই চীনের থেকে ধার করে বন্দর, রাস্তা, এয়ারপোর্ট বানিয়েছে। এখন তারা আকন্ঠ নিমজ্জিত ঋণে। সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয়ে কাঁটা। শ্রীলঙ্কা সবথেকে বড় ভুক্তভুগী। নেপাল, মালদ্বীপ, বাংলাদেশও টের পাচ্ছে ধীরে ধীরে। তাই এরা চীনের সাথে সোহাগ তো করতে পারে, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করতে পারে না। 


উল্টো দিকে ভারত আজ অবধি কারো এক ইঞ্চি জমি দখল করেনি, কারো কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য দাবী করেনি। বরং যে যখন বিপদে পড়েছে ভারত খাদ্য, ঔষধ, ভ্যাকসিন, স্যাটেলাইট সার্ভিস, বিদ্যুৎ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।  


প্রতিবেশীদের ভালোবাসা ভারতের চাই না। ভারত চায়, তাদের প্রয়োজন হতে। আগামী ১০/১২ বছরের মধ্যে নেপালকে নির্ভর করতে হবে ভারতের গ্রিডের ওপর, বাংলাদেশ ভারতের বাণিজ্যের ওপর, শ্রীলঙ্কা ভারতীয় পর্যটকদের ওপর, মালদ্বীপ ভারতের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে। ভূটান তো এমনিতেই ভারতের সাথে শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ। এই প্রয়োজন গুলিই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে এক স্থিতাবস্থা তৈরি করবে। 


কোন স্টেশনে যেন থামল ট্রেনটা, মুখ বাড়িয়ে দেখি ফুলেশ্বর। ঘড়িতে প্রায় আটটা, আজ যে কখন বাড়ি ঢুকব।  পুনরায় বার্তালাপে মন দিই, এযেন আমাদের ছোটবেলার দক্ষিণী সিনেমা, সব ভালো হয়ে যায় যার শেষে। সব হারিয়ে যাওয়া ভাই পুনরায় এককাট্টা হয়ে ভিলেনকে পেটায় - একটু বিরক্তি নিয়েই বলি, দেখছ না, কত ঘৃণা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। না বাংলাদেশীরা আমাদের দেখতে পারে, না আমরা ওদের। 


ChatGPT বলে, আরে এত আশাহত হচ্ছ কেন? ওরা মোটেই ভারতকে “ঘৃণা” করে না। কেউই ঘুম থেকে উঠে ভারতকে ঘৃণা করার কথা ভাবে না। আদতে ওরা ভারতকে ভয় পায়।  ভয় - অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া, ভয় ভারতীয় মিডিয়ায় অপমানিত হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া, রাজনৈতিক ভাবে চাপে পড়া নিয়ে। তাই ভারতকে যখন আগ্রাসী মনে হয়,

ওরা নিরাপত্তার খোঁজে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা কোনও আদর্শগত ব্যাপার নয়।

এটা একটা ছোট দেশের টিকে থাকার প্রবৃত্তি।


টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়া ভারতীয়দের শেখায় বাংলাদেশী মাত্রই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, আর বাংলাদেশীদের শেখায়, ভারত অসহিষ্ণু সাম্রাজ্যবাদী দাদাগিরির দেশ। 

তাই সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে এত খারাপ মনে হয়, যদিও বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাস্তবে এখনও অনেক বেশি।

 

স্বল্পমেয়াদে এই সম্পর্কের কোন উন্নতি হবে না।

আগামী ৫–১০ বছর আরও শোরগোল, আরও রাগ, বিদ্বেষ আর মেরুকরণের সময়। তবে মানুষ অনলাইনে একে অপরকে ঘৃণা করলেও —নিশ্চুপে চলতে থাকবে ব্যবসা বাণিজ্য, বাড়বে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা। এইভাবেই টিকে থাকবে ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়া - 


দাসনগরে নেমে টোটো ধরে যখন বাড়ি ঢুকি, ঘড়ির কাঁটা নয় ছুঁইছুঁই। আতঙ্কিত মা বসে আছে দরজা খুলে, অকাতরে ঘুমাচ্ছে বাবা। সারাদিনই ঘুমাচ্ছে।  বাবার চেয়ারটা ফাঁকা, অবহেলায় পড়ে আছে বাবার প্রাণের মুঠো ফোনটা। 


ভগ্ন হৃদয়, উদ্গত অশ্রু গিলে ফেলি টুপ করে,  ভেঙে পড়লে আমার চলবে কেন? লতা দি চা বসায়- মুখের সামনে টিফিন বাক্স খুলে ধরে মা, ভিতরে সারি সারি পাটিসাপটা। কে বানাল, হতভম্ব হয়ে শুধাই আমি। জবাব আসে ছোট মাসি। মা বলে, " হাঁটতে পারছে না পায়ে এত ব্যথা, দুদিন আগে পড়ে গেছে। তাও দৌড়ে এসেছে আজ তুই এখানে ফিরবি শুনে -"। মুঠো ফোনের ওপার থেকে উল্লসিত কন্ঠে তুত্তুরী জানায়, " আমরাও পিঠে খেয়েছি মা।" শাশুড়ি মায়ের বয়স্ক আয়া দিদি বানিয়ে দিয়েছে -। বুকের ভিতর জমে থাকা পাথরটা যেন ধীরে ধীরে সরে যায়, আমার ভাঙা পরিবারেও তাহলে পৌষ পার্বণ হল। দৃষ্টির অগোচরে তাহলে সত্যিই কেউ আছেন, যিনি নিক্তি মেপে হিসাব রাখছেন - কৃত কর্মের। সে মানুষ হোক বা দেশ, আর কি চাই।


অনির ডাইরি ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


ঘরে ঢুকতেই কপাল চুলকে শৌভিক বলল, "ওঃ হোঃ-, তেসরা মার্চ তো ইয়ে"। কি'য়ে রে বাবা। বেশ খানিকটা ঘাবড়েই যাই আমি। ইউরেকা মার্কা একটা মুদ্রা করে তিনি বলেন, " শচীনের ছেলের বিয়ে -"। কোন শচীন? কোন অফিস কলিগ, নাকি বন্ধুবান্ধব। নামটা আগে শুনেছি নাকি?

তিনি বুঝিয়ে দেন, " আরে শচীন তেন্ডুলকার রে। তার ছেলের বিয়ে -"। অর্জুন? সে তো পুঁচকে ছেলে। সারা বড় নয়? " সে আমি জানি না। সারার বিয়ে কেন হচ্ছে না, এটা জিজ্ঞাসা করিনি।" 

ধুৎ বলে মুখ বেঁকাই আমি। যুৎ করে বসে ওয়েব সিরিজটা দেখতে শুরু করব, গায়ের কাছে ঘেঁষে আসে শৌভিক, " ৫ তারিখে রিসেপশন বুঝলি? তিন তারিখে বিয়ে আর পাঁচ তারিখ রিসেপশন।" 

উদ্গত বিরক্তি গিলে, দীর্ঘশ্বাস চেপে, দাঁত কিড়মিড় করে বলি, " তাতে আমার বাপের কি? আমার বাপকে তো নেমন্ত করেনি।" " হুঃ, সেই প্রতিবাদেই যাব না -।" বলে সটান উল্টো দিকে মুখ করে কিন্ডল খুলে বসেন তিনি। 


নিজের মনে খানিক হাসি আমি, মেলার বায়স্কোপের বাক্সের মত চোখের সামনে থেকে সরে সরে যায় কত যে দৃশ্য। ছোপড়ার গদির নীচে লুকিয়ে রাখা কত যে লাল হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের কাটিং। আমাদের বিদ্যালয়, অমিতাভ বচ্চনের মত কেউ ঘোষণা করত না বটে, "প্রতিষ্ঠা - পরম্পরা - অনুশাসন" , কিন্তু হেব্বি কড়া ছিলেন দিদিমণিরা। সেই দিদিমণিদের নাকের ডগায় বসে প্রেমপত্র লিখেছিলাম দুই বন্ধুতে। " যত স্বপ্ন ছিল - যত ভাবনা ছিল সব দিলাম তোমায়, তুমি নেবে কি আমায়, বলো নেবে কি আমায়"। মাইরি লাইন গুলোও ঝাড়া, কি যেন একটা বাংলা সিনেমা থেকে। তাপস পাল আর দেবশ্রী রায় ছিলেন নায়ক- নায়িকা। দুই বন্ধু, দুই তারকাকে। 


দুজনের কারো মাথায় আসেনি, যে সে বা তারা বাংলা পড়তে পারে না। না পারলেই বা কি, শিখে নিবে। প্রেমে মানুষ কত কি করে, আর একটা মারাঠি আর একটা গুজজু ছেলে বাংলা শিখতে পারবে না? প্রতিটা খাতার পিছন পাতা যার সাথে আমাদের নামের বানান যোগ করে " লাভ - লাইক - পিটি-হেট" খেলি সে এটুকু করতে পারবে না আমার/ আমাদের জন্য? পারবে না সে? 


সে না হয় পারল, কিন্তু ঠিকানা? ঠিকানা তো জানি না? যতদিন না ঠিকানা মেলে আনন্দমেলার মধ্যে ঢোকানো থাক চিঠিগুলো। "মন মে হ্যায় বিশ্বাস, পুরা হ্যায় বিশ্বাস" ঠিকানা পেয়েই যাব। প্রকৃত প্রেমকে সাহায্য করতে অবশ্যই এগিয়ে আসবে প্রকৃতি। প্রতি সোমবার জিজ্ঞাসা করতাম বন্ধুকে, " হ্যাঁ রে, ঐ আনন্দমেলাটা বিক্রি করে দেয়নি তো কাকিমা?" নাহ চিঠি সমেত বইটা বিক্রি হল না বটে, তার আগেই এসে পড়ল তার বিয়ের দিনটা। সারা ভারত জুড়ে সেকি হর্ষ আর কলোরোল। কোথায় কোন ছোট শহরের, কোন ডেঁপো বালিকা সকলের অলক্ষ্যে চোখের জলে বালিশ ভেজালো তাতে মাস্টার ব্লাস্টার থুড়ি ক্রিকেটের ঈশ্বরের কি এল গেল। নানা এত অসংবেদনশীল একটা লোকের ছেলের বিয়েতে কি যাওয়া উচিৎ, বলুন তো। সেটাই বলি বরকে, " ঠিক বলেছিস, যাবই না শচীনের ছেলের বিয়েতে।" বই পড়তে পড়তেই জবাব দেয় শৌভিক, " হ্যাঁ, গিফটটাও দেব না।"



স্থান - হাথি সিং জৈন মন্দির, আহমেদাবাদ


অনির গুজরাটের ডাইরি ৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


ঘুমিয়েই পড়েছিলাম আমি, হঠাৎ করে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কি যেন বলছে শৌভিক ড্রাইভার সাহেবকে। আমাদের ড্রাইভারের নাম নরেশ ভাই, আহমেদাবাদে নামা ইস্তক ইনিই আমাদের সারথী। গুজরাট বা গুজরাতিদের সম্পর্কে কিছু পূর্ব ধারণা নিয়ে এসেছিলাম এই রাজ্যে, এসে ইস্তক ধোঁকা খাচ্ছি। না এরা সবাই আম্বানি বা আদানি নয়। ঘোরতর হিসেবী বা বেনিয়াও নয়। বেশ অতিথিবৎসল, সংবেদনশীল এবং সাদাসিধে মনে হয়।একটা প্রশ্ন করলে সাতটা জবাব দেয়। সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত থাকে। নরেশ ভাই যেমন - । সব সময় মুখে একগাল হাসি এবং ভালো মত বাংলা বোঝেন। আমরা নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলার পর নরেশ ভাই একপ্রস্ত ধারাবিবরণী দেন, উনি কি বুঝলেন এবং ঠিক বুঝলেন কিনা। আতঙ্কে প্রায় বঙ্কিমী বাংলায় বার্তালাপ করি আজকাল আমরা। 


ঘুমের রেশ কাটতে বুঝি, নরেশ ভাই বলছেন, " ইয়ে ক্যা দেখো গে সাব, ইয়া কোই নেহি রুখতা, বিচ মে চলো নে।" আর শৌভিক বলছে, " ধুর ব্যাটা, আমি এটা দেখব বলে কখন থেকে ম্যাপ খুলে বসে আছি -। " প্রায় জনশূন্য মন্দির চত্বরে গিয়ে দাঁড়ায় গাড়ি। চাঁদি ফাটা রোদ। গুজরাটে ভদ্রলোকের এক কথা, ঠাণ্ডা কাল বলে কিছু হয় না। সোয়েটার জ্যাকেট গুলো কেন যে মরতে বয়ে এনেছি। 


বিশাল শ্বেত পাথরে তৈরি মুখ্য প্রবেশ দ্বারের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ে অনুপম কারুকার্য খচিত মন্দিররাজি। দুই বৃদ্ধ বসে আছেন গেট আগলে। একজনের সামনে রাখা UPI স্ক্যানার দেখে টিকিট কাটতে যায় শৌভিক। বুড়ো লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলে, " ভগবান জী কো দেখনে কে লিয়ে কোই টিকিট নেহি লাগে গা মালকো। ইয়ে তো দান দক্ষিণা কে লিয়ে রাখা হ্যায়।" তাও বাধ্যতামূলক নয়। যদি কেউ দয়া করেন - 


অপর বৃদ্ধ সিকিউরিটি, পরণে খাকি পোশাক, চোখে পুরু কাঁচের চশমা। তিনি ঠেট গুজরাটিতে অনেক কথা বলছেন তুত্তুরীর সাথে, কিন্তু বেচারা কিছুই বুঝতে পারছে না। এ গুজরাটি অনুপমা বা কিউকি শাস ভি কভি বহু থী সিরিয়ালের, " কেমছ - মজা মা " মার্কা গুজরাটি নয়। এতে মিশে আছে কাথিয়াওয়ারি সুর। বেচারা তুত্তুরী বিস্তর ঘেমে নেয়ে শেষে বলেই ফেলল, " হাম গুজরাট সে নেহি হ্যায় জী।" ভাঙাচোরা হিন্দিতে ভদ্রলোক বললেন, " মাথা দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে যাও। ছবি তুলতে পারো, তবে মূল মন্দিরের ভিতর তুলনা কিন্তু বেটা। সবজায়গায় সিসিটিভি আছে তো, শেঠ জী অফিসে বসে সব নজর রাখেন। দেখতে পেলে আমায় বকবে। চাকরী থেকেই তাড়িয়ে দেবে হয়তো।" শুনেই বাপ বেটি দৌড়ালো গাড়িতে ক্যামেরা রেখে আসতে - 


একটা পুরনো সিন্দুকে রাখা অগুনতি ওড়না, তার দুটো মাথায় জড়িয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। ঢুকতেই যেন জুড়িয়ে গেল তনু মন প্রাণ। সমগ্র চত্বর জুড়ে বিরাজ করছে অখণ্ড শান্তি। কোথাও এক চুল ময়লা নেই। কয়েক শ পায়রা বাস করে মূল মন্দিরের চূড়ায়, মাঝে মাঝেই তারা চক্কর কাটে মন্দিরের ভাগের আকাশটাতে। অথচ মন্দির প্রাঙ্গণ যেন তকতক করছে। 


এটা কোন ঐতিহাসিক মন্দির নয়। বিগত শতকে নির্মিত, সময় লেগেছিল ১৯ বছর। সমগ্র মন্দির জুড়ে চোখ ধাঁধানো শ্বেত পাথরের কারুকাজ। মূল মন্দিরটা জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের উদ্দেশ্যে নির্মিত। তাঁকে ঘিরে চক্রাকারে রয়েছে ৭২ টা ছোট মন্দির। প্রতিটা ছোট মন্দিরের বাইরে একটি করে সাইনবোর্ড/ স্টিকার মারা। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জৈন তীর্থ স্থান তথা মন্দিরের বিবরণ লেখা তাতে। লক্ষ্য করে দেখলাম গরিষ্ঠাংশই রাজস্থানে অবস্থিত।