অনির ডাইরি ৫ই আগস্ট, ২০২৬
#অনিরডাইরি
সপ্তাহ দুয়েক ছুটি নিয়েছি। না নিয়ে উপায় ছিল না। ঠিক দুই সপ্তাহপর শুরু হচ্ছে তাঁর দশম শ্রেণীর অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। আশৈশব, শ্রীমতী তুত্তুরীর কোনো প্রাইভেট টিউটর ছিল না। ক্লাসের শিক্ষক মহাশয় বা দিদিমণি যখন প্রশ্ন করতেন, "কে কতজন গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে যাও," শ্রীমতী সবথেকে জোর গলায় বলতেন যে তিনি শুধুমাত্র তাঁর মায়ের কাছেই পড়েন। নবম শ্রেণিতে উঠে রণে ভঙ্গ দিল তুত্তুরীর জননী। একে তো কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাপারটা তাঁর মাথার ওপর দিয়ে গেল, দ্বিতীয়ত বদলির চাকরির সৌজন্যে দ্বিঘণ্ডিত হয়ে গেল আমাদের পরিবার।
শৌভিক আর তুত্তুরী চলে এল মহানগর, ভর্তি হল নতুন স্কুলে, আমি পড়ে রইলাম সেই তাম্রলিপ্ত নগরী। "মরিয়া না মরে রাম" এর মত তাও কামড়ে রইলাম ইংরাজি ভাষা (languag), বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়। ইংরাজি সাহিত্য পড়ানোর দায়িত্ব জবরদস্তি চাপল তুত্তুরীর বাবার কাঁধে। অঙ্ক - পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের জন্য নিযুক্ত হলেন তিনজন গৃহশিক্ষক।
মোটেই খুশি হলেন না শ্রীমতী তুত্তুরী। তিনজনের কাউকেই ওর পছন্দ নয়। ওরা কেউই নাকি মায়ের মতো পড়াতে পারে না। মা কেমন ছ্যাবলামি করতে করতে পড়ায়, বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে পড়া চলে, ইতিহাসে মিশে যায় ভূগোল, সাহিত্যের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে বিজ্ঞান। নবম শ্রেণী এইভাবে নিমরাজি হয়ে কাটলেও, দশম শ্রেণীতে উঠে তিনি একেবারে বেঁকে বসলেন। "হয় তুমি পড়াও, নয়তো আমি নিজে যা পারব, পড়ব।"
আমরাও দেখলাম, রসায়নের স্যারের মধ্যে বিন্দুমাত্র সিরিয়াসনেস নেই। কখন আসবেন সেটাও শ্রীমতী তুত্তুরীকেই বার বার ফোন বা মেসেজ করে জানতে হয়। ফোন বেজে যায়, শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে। মেসেজ ডেলিভারি হয় না। তারওপর, তাঁর অসাধারণ সময়জ্ঞান। রবিবার তিনটে বলে তিনি আসেন সন্ধ্যা ছটায়। আসেন না অনেকবার, পরের দিন হয়তো মেসেজ করে বলেন, তারপরের দিন আসবেন। এই করতে করতে নবম শ্রেণীর বার্ষিক ইতিহাস পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি রসায়ন পড়াতে এসেছিলেন।
সময়ের ব্যাপারে তালকাটা হলেও ছেলেটা মানুষ হিসেবে ছিল নিপাট ভালো, গোবেচারা টাইপ। পদার্থবিদ্যার ছেলেটির সময়জ্ঞান টনটনে হলেও বাকিটা একেবারে পচে যাওয়া। 'বুঝিনি' বললেই তিনি রেগে আগুন, তেলে বেগুন। খুঁচিয়ে আমাদের সংসারের নানা কথা জানতে চাইতেন, আমাদের গৃহশ্রমিকদের জাত ধর্ম নিয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করতেন। শুধু কি তাই? তিনি কত বড় পুরুষ সিংহ প্রায়ই সেই গল্প শোনাতেন ছাত্রীর কাছে। ভোম্বল মার্কা ছাত্রীটি দেখতে হাবাগোবা হলেও, বাবামায়ের কাছে যে কিছুই গোপন করে না, এটা বুঝি তার বোধগম্য হয়নি। যেদিন তিনি ছাত্রীর সামনে তার উচ্চ বডি কাউন্টের গল্প ফাঁদলেন, সেই রাতেই শৌভিক মেসেজ করে বলল, "ভাই, তোকে আর আসতে হবে না। বেতন তো অগ্রিম দেওয়াই থাকে।"
আপাতত ফিজিক্স- কেমিস্ট্রি দুটোই আমার মাথায় চেপেছে বাকি কেবল অঙ্ক। তাই দিয়ে নিত্য অভিযোগ তুত্তুরীর। "স্যার ভালো, কিন্তু তোমার মতো করে বোঝায় না। আমি কিছুই পারি না" । সেই অঙ্ক নিয়েই বসেছি আমরা। শৌভিক বেরিয়ে গেছে অফিসে। জানলার বাইরে পুরো কালো আকাশ। অঝোরে ঝরছে বারিধারা, ভিতরে ঢুলুঢুলু আমার কন্যা । পড়তে বসলেই ঘুম পায়, শুধু ওনার নয়, আমারও । গতরাতেই তো পরিবেশ বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি নিজেই । ঘুম থেকে উঠে দেখি তিনি গজগজ করছেন, "আমি লিখছি, আর মা ঘুমাচ্ছে। এটা মা না বিন লাদেন?"
আজ আমার বলার পালা, কিন্তু বলি না । উল্টে প্রশ্ন করি, 'চা খাবি?' জবাব আসে, না । তাহলে 'কফি'? তিনি বলেন 'ছি'। কফির গন্ধে তাঁর ভয়ানক বিরাগ । তাহলে আমুল স্প্রে গুলে দেব খাবি? চনমনিয়ে ওঠেন তিনি। " দাদুর মতো করে"! আমার শৈশবে যে রাতে ভালো কিছু রান্না হত না, রুটির সাথে আমুল স্প্রে গুলে দিত বাবা। অনেকটা গুঁড়ো দুধ, অল্প চিনি আর নামমাত্র জল।
সহজে গুলতেই চাইত না তখনকার গুঁড়ো দুধ। ড্যালা ড্যালা হয়ে ভাসতো বাটিজুড়ে। কাঁচা খেলে আটকে থাকত মাড়িতে। শ্রীমতী তুত্তুরী শৈশবেও একবার গুলে দিয়েছিল বাবা। বড় মামির কাছে মিল্ক মেড খেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল শিশু তুত্তুরী। " আর একটু দেবে গো -" বলে বড়মামীর পিছন পিছন ঘুরছিল মেয়েটা, দেখে বড় মামা তো হেসেই খুন। "এই খেয়েই গলে গেলি? দাঁড়া, তোকে এমন জিনিস খাওয়াব না-" বলে বাজার থেকে দশ টাকার আমুল স্প্রের প্যাকেট কিনে এনে আমার বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল, "ওকে একটু ওই রকম করে গুলে দাও তো মেজজেঠু, যেমন ভাবে আমাদের গুলে দিতে ছোটবেলায়।" দাদুর হাতে গুলে দেওয়া, কড়কড়ে চিনি ছড়ানো, ঘন থকথকে আমুল স্প্রের গল্প তুত্তুরীর অন্যতম সুখের শৈশবস্মৃতি।
বাবার মতো নয়, সাধারণ দুধের মতো গুলে আনি, আধ কাপ করে। আগের মতো না হলেও আজও ভাসে হালকা দুধের ড্যালা। বলি, সরিয়ে রাখ বইপত্র, আমার গায়ে ঠেস দিয়ে বস। তারপর আয়, বৃষ্টি দেখি আমরা। বলি, অল্প অল্প করে চুমুক দে। জলদি শেষ না হয়ে যায় এই অমৃত। সত্যি অমৃতের মতো তারিয়ে তারিয়ে খায় আমার মেয়ে। খেতে খেতে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, "যদি অঙ্কে ফেল করি, তুমি আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো?" শৌভিকের বচন ধার নিয়ে বলি," দূর, পাশ তো সবাই করে, ফেল করাটাই তো আসল কৃতিত্ব বাবু। তুই লড়ে যা- "

No comments:
Post a Comment