Friday, 1 May 2026

অনির ডাইরি মে, ২০২৬

অনির ডাইরি ২৩ শে মে, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 



দিদিভাইয়ের আইবুড়ো বেলার তেমন কোন স্মৃতিই আমার নেই। আবছা সাদাকালো কিছু ছবি শুধু ভেসে বেড়ায় মানসপটে, কুয়াশা মাখা শীতের ভোর, কালো শাল জড়িয়ে পড়তে বসেছে দিদিভাই। "কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন -"। পড়তে পড়তে আনমনে খেলছে লম্বা বিনুনী নিয়ে, প্রভাতী সূর্যের আলো এক চিলতে হীরের নাকছাবিতে প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করছে মায়াবী রামধনু। 


কে যে জ্যাঠাইমার মনে আগুন লাগাল, " এই মেয়ে অসবর্ণ বিবাহ করে পরিবারের মুখে চুনকালি দেবে -"। অসবর্ণ বিবাহ তো ব্যাঁটরার চাটুজ্জে বাড়িতে নতুন কিছু নয়। আমাদের ছোটঠাকুমা ছিলেন বাঁকুড়ার সদগোপ বাড়ির মেয়ে, আমার মা মুর্শিদাবাদের কুলীন কায়স্থ, কৈ বাবা বা ছোটদাদুর মুখে তো কোন কালো দাগ পড়েনি। কিন্তু জ্যাঠাইমা যে বড্ড জেদি। 

জ্যাঠাইমার জেদের কাছে বোধহয় মাথা নত করল খোদ ঈশ্বর, দিদিভাই তখনও ইস্কুলে পড়ে, সবুজ পাড় সাদা শাড়ি আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়। সবুজ ফিতে দিয়ে বাঁধা দুই বিনুনী। স্কুল যাতায়াতের পথেই নজরে পড়ে জনৈক বাবু নিতাই বন্দ্যোপাধ্যায়ের। 


আমাদের সাবেকী বর্মা টিকের সদর দরজায় কড়া নেড়ে আসে বিয়ের সম্বন্ধ। এক দেখাতেই পাকা কথা। নিতাই বাবুর ছোট ছেলে শ্রী সিদ্ধার্থ ব্যানার্জির সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে যায় আমার দিদিভাইয়ের। আমি তখন বছর তিন চার। কিছুই মনে নেই সেসব দিনের কথা। পাকা কথা বলতে নাকি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাকেও। জ্যাঠাইমার নয়নমণি ছিলাম যে আমি। বাইরের ঘরে যখন বার্তালাপে ব্যস্ত গুরুজনেরা, হবু বর বই পড়ার অছিলায় লুকিয়ে ছিল ভিতরের ঘরে। বিনা অনুমতিতেই সেই ঘরে ঢুকি আমি এবং  ভদ্রলোকের বুকের ওপর বসে, মুখ থেকে বই সরিয়ে, একগাল হেসে শুধাই, " হ্যাঁ গো, তুমি আমার জামাইবাবু হবে -"। বিয়ে হওয়া ইস্তক একপক্ষ কাল ছাড়াছাড়াই এই গল্পটা শোনাত দিদিভাই। 


সিদ্ধার্থ ব্যানার্জি যে কবে আমাদের টুলটুল দাদা হয়ে গেল -। চাটুজ্জে বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্তুর। নির্বিকল্প ভরসার কেন্দ্র। আমার বিয়ের সময়ই ধরুন না, শ্বশুরমশাই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ছাপোষা রেজিস্ট্রি হোক। বাবা নারাজ।  "এত জনের বাড়ি নিমন্ত্রিত হয়েছি আমি, আর আমার মেয়ের বিয়েতে কাউকে বলব না -"। বেশ বলবে তো, করবে জাঁকজমক কিন্তু লোকবল কোথায়?  এককালীন যাঁরা বাবার জন্য জান লড়িয়ে দিত তাঁরা সবাই ততোদিনে হেঁপো বুড়ো। অল্পবয়সীরা জর্জরিত আপন জীবন যুদ্ধে। হতোদ্যম হয়ে যখন প্রায় অস্ত্র ত্যাগ করতে উদ্যত বাবা, এমন সময় এসে উদয় হল টুলটুল দাদা। " আরে মেজকাকা ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আমি তো আছি। মনে করুন আমি আপনার বড় ছেলে -"। আমৃত্যু সেই দিনটার কথা ভোলেনি আমার বাবা। 


সদ্য কয়েক মাস আগে নিজের মেয়ের ( আমার একমাত্র বোনঝি) বিয়ে দিয়েছিল টুলটুল দাদা। সেই ফর্দ মিলিয়ে বসত জামাই আর খুড়শ্বশুর। ক্যাটেরার, ডেকরেটর, মেন্যু, বরের গাড়ি, গাড়ি সাজানো, কনে যাত্রীদের বাস থেকে মায় আমার জন্য পার্লারের দিদিও ঠিক করে দিয়েছিল আমার জামাইবাবু থুড়ি টুলটুল দাদা। সতেরো বছর হয়ে গেল তাও মনে হয় এই তো গত কালকের কথা। 


আজ সকাল আটটা নাগাদ যখন মুঠো ফোনে ঝলসে উঠল বোনঝির নামটা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি  চলে গেছে আমাদের টুলটুল দাদা। চোখের সামনে সকাল থেকে ভেসে উঠছে কত যে খণ্ডচিত্র, 


বিয়ের দিন সকাল, সদ্য শেষ হয়েছে গায়ে হলুদ, স্নানঘরে ঢুকে দেখি জল নেই। বেজার মুখে বসে আছি, জোর করে লুচি খাওয়াচ্ছে দিদিভাই, ছুটে এল টুলটুল দাদা, পকেট থেকে এক গোছা নোট বার করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, "দেখছিস তো কি ব্যস্ততায় কাটল দিনগুলো। পরপর দুটো মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি মুখের কথা। তোর জন্য কিছু কিনতে পারিনি রে, এগুলো রাখ, যা ভালো লাগে কিনে নিস -"।


বিয়ের দিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে সাজতে নিয়ে গেল আমায়। ব্রাইডাল মেকাপ শেষে ধরে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরে, " নতুন জীবনে প্রবেশ করতে চলেছিস, ঠাকুরকে প্রণাম কর-"।


তুত্তুরীর জন্মের আগের সন্ধ্যা, ভর্তি হতে যাব পাড়ার নার্সিং হোমে। বেশী না কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। সঙ্গে যাবে শৌভিক আর দিদিভাই। ও হরি, কোথা থেকে গাড়ি নিয়ে হাজির টুলটুল দাদা, " আরে আমি থাকতে তুই হেঁটে যাবি কেন -"। আজকালকার দিনে কে এতটা ভাবে, এতটা করে তাও আবার খুড়তুতো শ্যালিকার জন্য। 

এত ভালোবাসা, এত নির্ভরশীলতার মানুষটা এত অকালে চলে গেল, এই তো মাস দুয়েক আগে বাবাকে হারালাম, আর আজ হারিয়ে ফেললাম পিতৃতুল্য এই মানুষটাকেও। হারিয়ে যাওয়ার আগুন তাহলে ধরে ফেলল আমাদের প্রজন্মটাকেও -


অনির ডাইরি ১৪ই মে, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 



শ্রীমতী তুত্তুরী তখন বছর চারেকের হবেন, ইনি তার থেকে বছর তিনেকের ধেড়ে। দুটোর কারোরই লেখাপড়ার চাপ নেই, ছোটটা তো তখনও নিরক্ষর (অক্ষর পরিচয় হয়েছে, নাম তো লিখতে পারে না)। অফিস থেকে ফিরে দেখি, দুই পিঠোপিঠি ভাইবোনের হল্লায় শিকেয় উঠেছে মায়ের প্যাঁনপ্যানে বাংলা সিরিয়াল, বাবার সান্ধ্যকালীন সমাচার।


প্রায় কান ধরে দুটোকে টিভির ঘর থেকে টেনে এনে বললাম, " আয় একটা খেলা খেলি -"। দুটোতেই কেমন যেন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে মাপল আমায়, একজনের মা তথা আর একজনের পিসি যে মোটেই খেলুড়ে নয় এটা ওদের বুঝতে বাকি নেই। গেঁড়ি ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ আক্রমণাত্বক হয়ে এগিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে বললেন, " কি খেলা?" বললাম, বস না তারপর বলছি। মাটিতে যখন গোল হয়ে বসছি তিনজনায়, তখনও জানি না কি খেলা খেলব। ধেড়েটা সেটা বোধহয় কানে কানে বললও ক্ষুদেটাকে। প্রগাঢ় হল উভয়ের কপালের ভাঁজ, থতমত খেয়ে বললাম, " আমরা সবাই সবার একটা করে গুণ বলব -"। বিশদে বোঝালাম এ ক্ষেত্রে গুণ অর্থে সদ বৈশিষ্ট্য, অঙ্ক নয়। কি ভালো লাগে আমাদের একে অপরের মধ্যে। 


আজ লিখতে বসে মনে হচ্ছে, দৈনন্দিন ক্লেদ মাখা জীবনে হয়তো নিজের কিছু প্রশংসা শুনতে চেয়েছিলাম আমি। কেউ তো বলুক আমি খুব ভালো। তো যাই হোক, ভাইবোন উভয়ের যে সব গুণ সেদিন খুঁজে বার করেছিল, সেটা আর আমি লিখে আপনাদের বিব্রত করতে চাই না। বিশ্বাস করুন, ওগুলো মোটেও গুণ পদবাচ্য নয়। এবার আমার পালা, বুল্লু বাবুকে বললাম, বল দেখি আমার মধ্যে কি ভালো খুঁজে পাস তুই। খিলখিল করে হেসে তিনি বললেন, "পিসি! পিসির চাকরীটা খুব ভালো।"


বিশ্বাস করুন হৃদয় ফেটে সেদিন সত্যিই আট টুকরো হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা নিষ্পাপ ফুলের মত হয়, ছল কপটতা বিবর্জিত। ওর যা মনে হয়েছে ও সেটাই বলেছে। দোষ যদি কারো থেকে থাকে, তাহলে সেটা আমারই। নিশ্চয় আমার আচার আচরণে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে জাঁদরেল আধিকারিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও ব্যর্থ করেছে স্নেহময়ী পিসি হিসেবে ভাইপোর হৃদয়ে জায়গা করে নিতে। মানুষ ব্যর্থতা থেকেই শেখে, আমিও শিখলাম সেদিন। শিখলাম, কিন্তু হাল ছাড়লাম না। দাঁড়া ব্যাটা, তুই কোন ছাড়, তোর বাপ (এবং মাও)ভালোবাসবে আমায়। 


আজ দুপুরে ভদ্রলোক যখন ফোন করলেন বসে বসে পেনশন কেস ছাড়ছি আমি। ফোনটা দেখেই ধড়াস করে উঠল বুকটা। কি আবার হল চাটুজ্জে বাড়িতে। দুরু দুরু বুকে ধরলাম ফোনটা, তিনি বললেন, " পিসি?" বল বাবা। তিনি বললেন, " তোমায় একটা খবর দেওয়ার আছে -"। আমার ভীরু হৃদয় কেঁপে উঠল শুকনো পাতার মত। এইসব কিছু থেকে অনবহিত তিনি স্বভাব সিদ্ধ ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললেন, " আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে -"। হৃদপিণ্ডটা বুঝি লাফিয়ে চলে এল কণ্ঠের কাছে। বুল্লু বাবুর পিতৃদেব অর্থাৎ আমার বড় ভাই মনে করেন তাঁর পুত্র এবং ভাগ্নী দুই মাতব্বর। আমার ধারণা ঠিক তার উল্টো। গরুই চড়াবে দুটোতে এই ভবিষ্যত বাণী আমি প্রায়ই করি। আশা করি বুঝতে পারছেন কেন গুড়গুড়ে ভদ্রলোক আমায় ভালোবাসতেন না এককালে। এমন পিসিকে আবার ভালোবাসা যায় নাকি মশাই, ছ্যা - 


কিন্তু আমার ভবিষ্যৎ বাণীকে সর্বাঙ্গীণ ভুল প্রমাণ করে তিনি কইলেন, যে তিনি প্রায় ৮২% নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। রেজাল্ট বেরোনো মাত্র সেই খবরটা তিনি তার ছোট পিসিকে জানাচ্ছেন, এটা যদি ভালোবাসা না নয়। তাহলে ভালোবাসা কোনটা মশাই। আজ শুধু তিনি ভালো রেজাল্ট করেননি, করেছি আমিও। 


 চাটুজ্জে বাড়ির গুষ্টিতে কেউ কোনদিন তাঁর মত এত নম্বর পায়নি। সেটা বলেই ফেললাম। তিনি কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ সুরে বললেন, "অনেকে আরও অনেক বেশী নম্বর পেয়েছে পিসি -"। নিকুচি করেছে অনেক বেশী নম্বর আর পার্সেন্টেজের, যে পাচ্ছে পাক। ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করুন। আমার চোখে তো তুইই সেরা বাবা, তোর থেকে ভালো কেউ নেই। খুব ভালো থাক বাবা, অনেক অনেক বড় হ, মানুষের মত মানুষ হ। আমার বাপটা দেখে যেতে পারল না নাতির এই সাফল্য এই যা দুঃখ।


 অনির ডাইরি ১লা মে, ২০২৬

#অনিরডাইরি 

বাবা থাকলে, আজ ওদের বিয়ের ৫২ বছর পূর্তি  হত। ঠিক মধ্যরাত্রে ফোন করতাম আমরা। আমি আর তুত্তুরী, তারপর গুঁতিয়ে ফোনটা ধরাতাম শৌভিকের হাতে। জেগে বসেই থাকত বাবা, গর্বিত ভাবে বলত, "থ্যাঙ্ক ইউ"। মা যথারীতি ঘুম ঘুম গলায় বলত, " তাই নাকি? আজ আমাদের বিয়ে হয়েছিল -"। এবারেও মনে ছিল না মায়ের। মনে করাইনি আমিও। শুধু বলেছিলাম, আজ তোমার কাছে খাব। আলাদা কিছু করো না, টিপিক্যাল ঘটি বাড়ির বিউলির ডাল - আলু পোস্ত হলেই হবে। টুকটুক করে অনেক কিছু করিয়েছিল মা, পোস্ত বাটা, মৌরোলা মাছ ভাজা, পুকুরের টাটকা কাতলা মাছের ঝাল, বাড়ির গাছের এঁচোড় চিংড়ি দিয়ে, আমের অম্বল, পায়েস। মা করিয়েছিল থোড়াই, করেছিল তো লতা দি আর ছুটকি। চোখ অপারেশনের পর বেশ কিছুদিন আগুন ধারে যেতে পারেনি লতা দি, আজ তাই আশ মিটিয়ে রান্না করেছে তার সোনা মা (শ্রীমতী তুত্তুরী) এর জন্য। কিনে এনেছে আইসক্রিম ও। 

অনেক গল্প করলাম আমরা। পিসি নেমে এল দোতলা থেকে। সব গল্পের সব বাক্যে একটাই ধ্রুবক, সেটা হল বাবা। আমরা এমন ভাবে কথা বলছিলাম, সমালোচনা করছিলাম, ঠাট্টা করছিলাম বাবাকে নিয়ে যেন বাবা পাশের ঘরেই আছে। এখুনি এসে বসবে ডাইনিং টেবিলে আর বলবে, " আমায় নিয়ে মস্করা হচ্ছে -"। পিসি ছাড়া কেউ কাঁদিনি আমরা, সবাই সবার সামনে লোহার মুখোশ পরে ঘুরেছি। আমরা সবাই যে বীরাঙ্গনা। চলে আসার সময় তুত্তুরীকে বললাম একটা ছবি তুলে দে তো, মায়ের আর আমার। ২০০৮ এ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা ইস্তক প্রতি বছর আজকের দিনে ওদের একটা যুগল ছবি লাগাই আমি। এ বছর বাবা নেই তো কি হয়েছে, আমি তো আছি। আমার মধ্যেই বেঁচে আছে আমার বাবা। মাকে আঁকড়ে ধরে সেটাই বললাম, আমি আছি। আমি সবসময় আছি, আর আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না মা।