অনির ডাইরি ৮ই জুলাই, ২০২৬
#অনিরডাইরি
সেদিন দুপুরবেলা মা যখন ফোন করেছিল, আমি তখন নব মহাকরণের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপ ক্যাব ধরছি। চাকা ঘুরেই যাচ্ছে, গাড়ি আর পাচ্ছি না, এমন সময় মায়ের ফোন। পরে করছি বলে কেটে তো দিলাম, গাড়িতে উঠে আর মনে পড়ল না। মনে যখন পড়ল তখন গড়িয়ে গেছে সন্ধ্যা।
ক্ষমা চাইতে যাবার আগেই ভেসে এল মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠ, " আরে আজ ছুটকি কি সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটিয়েছে তুই জানিস -"। ছুটকি মায়ের দুবেলার রান্না করে দেয়, টুকটাক বাজারদোকান করে, ঘর ঝাড়পোঁচ করে আর রাজ্যের গল্প করে। সম্পর্কটা শুধু শ্রম আর পারিশ্রমিকের নয়, সম্পর্কটা ভরসা আর ভালোবাসারও। ছুটকি অঘটনঘটনপটিয়সী বটে, রোগ পুষে রাখতে বড্ড ভালোবাসে, নিজের কিছু হলে হারগিজ ডাক্তারের কাছে যাবে না, ফালতু খরচের ভয়ে। মেরেই ফেলব, কেটেই ফেলব যতক্ষণ না করি। তারওপর আছে ছুটকির ছানা, সেটা আরেক মস্তান, কিছুদিন আগে কানে এমন ইনফেকশন বাঁধিয়ে ছিল যে ডাক্তার বলেছিল পর্দা ফুটো হয়ে যাবে।
ভাবলাম তেমনি কিছু হবে, অথবা আগুন নিয়ে কিছু, যা গল্প করে রান্না চাপিয়ে। কি হয়েছে শুধাতে হল না, মা নিজেই গড়গড় করে বলে গেল, "আমরা তখন খেতে বসেছি, বললাম দরজা বন্ধ করে যা, এমন বন্ধ করেছে সে আর খুলছেই না। লতা আর আমি চাবি ঘুরিয়ে কত চেষ্টা করলাম।"
প্রপিতামহের বানানো বাড়িটা হাওয়ামহল বিশেষ, একাধিক দরজা, জিজ্ঞাসা করি সবকটাই কি বন্ধ করে গেছে নাকি? মা নার্ভাস হয়ে বলে, কেবল মুখ্য দরজটাই রুদ্ধ আপাতত। বলি কাঠের মিস্ত্রিকে ফোন করেছ? কাঠের মিস্ত্রি বললে অবশ্য ভদ্রলোককে অপমান করা হবে, ITI থেকে রীতিমত কাঠের কাজ শিখেছেন উনি, আগে টুকটাক খেপ খাটতেন, বর্তমানে বিরাট কন্ট্রাক্টর। অনেক দিনের সম্পর্ক, বাবা বা মা ডাকলে আজও আসেন এবং যত ছোট কাজই হোক করে যান। অবশ্যই তাঁর সময়মত, আজ যেমন মা বহুবার ফোন করেছে, তিনি হয় ধরেননি নয়তো বলেছেন সময় পেলে যাচ্ছি।
মায়ের অসহায়তা অনুভব করতে পারি আমি,প্রায় তুলোয় মুড়ে রেখেছিল বাবা। " তোর বাবা থাকতে এসব কখনও ভাবতে হয়েছে আমাকে? এখন এত দায়দায়িত্ব, রোজই কিছু না কিছু সমস্যা, আমি কিছুই সামলাতে পারি না।" মাকে বেশ লম্বা লেকচার দিয়ে ফোন রাখি সে রাতে। বাবা চলে যাওয়া ইস্তক এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার নৈমিত্তিক কাজ, কখনও মায়ের মনোবল বাড়াই, তো কখনও মেয়ের। নিজের শোকের সময় কোথায়! ভোকাল টনিক খাইয়ে খাইয়ে আমার নিজের ভোকাল কর্ডেই ব্যথা হয়ে গেল।
পরদিন সকালে আবার শুধাই, কাঠের মিস্ত্রি থুড়ি কন্ট্রাক্টর দাদা কি এসেছে? আসেনি শুনে আবার মনোবল বাড়াই খানিক, এই তো জীবন কালিদা, জীবন তো চলতেই থাকে ইত্যাদি প্রভৃতি। বর্ষায় কাঠ বাড়ে, হয়তো রোদ উঠলে এমনিই খুলে যাবে। আপিস থেকে ফেরার পথে আবার শুধাই, কি অবস্থা। মা বলে, " এখনও আসেনি।" বলি ঠিক আছে, লেগে থাকো, তোমরা অবরুদ্ধ তো নও। আরও কি সব মনোবলবর্ধক বার্তালাপ করি দুজনে, তারপর মা বলে, "হ্যাঁ রে, তোকে কি বলেছি, ছুটকি কাল রাতে দরজাটা খুলে দিয়েছে।"
মানে? কাল রাতে খুলে দিয়েছে, আর তুমি আজ রাত অবধি সেটা আমায় বলোনি? সবথেকে বড় কথা তাহলে কাঠের কাজের দাদাটাকে ফোন করে জ্বালাচ্ছ কেন? মা বলে, " আহা আগের কাজটা ওকে দিয়ে করাইনি তো, তাই ওর গোঁসা হয়েছে বুঝলি। ফোন করে রাগ ভাঙানো দরকার -"। রেগে ফোনটাই কেটে দিই আমি, স্টিয়ারিং হুইলের সামনে তখন হাসতে হাসতে বিষম খাচ্ছে উত্তম।
হাসি খানিক আমিও। মা চিরদিনই এমন, বিরল লুপ্তপ্রায় প্রজাতি। মা সবার জন্য চিন্তা করে, উদ্বিগ্ন হয়, সবার মানভঞ্জন করতে চায়। উত্তম গাড়ি চালাতে চালাতে বলে, "আপনাদের কথা শুনতে শুনতে আমার কি মনে হচ্ছিল জানেন ম্যাডাম, আপনার মা অনেক ভাগ্যবতী যে ওনার আশেপাশে এত মানুষ আছেন। আমার শাশুড়ির কেউ ছিল না জানেন। কি জাঁদরেল মহিলা ছিল আমার শাশুড়ি, শ্বশুরমশাই হিমোফিলিয়ার রুগী ছিলেন, সংসার ধর্ম করতেই পারতেন না। উনি একাই সব সামলাতেন, দুই মেয়েকে মানুষ করেছেন। শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর মা আর দুই মেয়ে থাকত। তারপর আমার বউ বিয়ে করে চলে এল। ছোট মেয়েকে নিয়ে থাকতেন, তারপর ওর বিয়ের পর একদম একা। তখনই মাথাটা আস্তে আস্তে বিগড়ে গেল।
আমার বউ আর ছেলে শনিবার করে যেত, আমি রবিবার। সারা সপ্তাহের দোকান বাজার করে দিয়ে আসতাম, রাঁধতও না, খেতও না। চুপচাপ বসে থাকত। পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখতাম আলুতে শিকড় গজিয়ে গেছে।
কাছেই ওর মাসির বাড়ি একবার একাই চলে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে, মাসি সেরাতেই আমার বউকে ফোন করে বলে কি, "তোর মাকে নিয়ে যা।" বিড়বিড় করে বলি, নিজের থেকে পর ভালো। উত্তম বলে," মোটেই ভালো নয় ম্যাডাম। পাড়ার লোক কম অত্যাচার করেছে আমার বউয়ের ওপর। যখন তখন ফোন, তোর মাকে পাগলা গারদে দিয়ে দে। তোর মায়ের জন্য আমরা থাকতে পারছি না। কি করত সেই মানুষটা না, চেনা কাউকে দেখলে দুটো মুড়ি চাইত।"
শুনতে শুনতে হাকুচ তেঁতো হয়ে ওঠে মন। মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষজন কাজ করতে ভয় পায়। দুটি ভাত রান্না করার চেয়ে চাট্টি মুড়ি দিয়ে জঠরাগ্নি মেটানো সহজ। উত্তম বলে, "আমি একটা জায়গায় ওনাকে ভর্তি ও করে দিয়েছিলাম ম্যাডাম, কিন্তু ওরা অনেক টাকা নেয়। আমি গরীব ড্রাইভার কেমন করে টানব বলুন।" বলি তোমার শালীর বর কিছু, সাহায্য করত না? উত্তম হেসে বলে, " উরি বাপরে, ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে তো ওকে আসতেই দিত না। ওর শ্বশুর শাউরি বরের ধারণা ছিল মায়ের বিধবা ভাতা যখন আমরা নিচ্ছি, তখন মায়ের সব দায়িত্ব আমাদের। আপনিই বলুন ম্যাডাম বিধবা ভাতা কত?"
তীব্র যানজট মহানগরের প্রবেশ পথে, আমরা গল্প করেই যাই। " আমার বউ রোজ ফোন করত, দুবেলা। সেদিন সকাল থেকে শাশুড়ি মা যখন ফোন তুলল না, ও অনেক কাকুতিমিনতি করে এক কাকিমাকে রাজি করাল একবার দেখে আসার জন্য। তিনি দেখে জানালেন, মারা গেছেন।" ঘটনাক্রম যে আমার অজ্ঞাত তাও নয়, এর আগে একাধিক বার শুনেছি, তাও কেন যে ফাঁকা হয়ে যায় মন আর মাথা। মায়ের ওপর জমে থাকা রাগ আর বিরক্তির জায়গা নেয় তীব্র ভয় , হারিয়ে ফেলার ভয়।মা সারাদিন থতমত খায়, গুলিয়ে ফেলে অনেক কিছু, ভয় পায় তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারে, তাও তো মা আছে। গলা ঝেড়ে নতুন করে নম্বর মেলাই, দেখি আর কি বলার আছে তাঁর।
No comments:
Post a Comment