Wednesday, 5 August 2026

অনির ডাইরি ৮ই জুলাই, ২০২৬

 অনির ডাইরি ৮ই জুলাই, ২০২৬

#অনিরডাইরি


সেদিন দুপুরবেলা মা যখন ফোন করেছিল, আমি তখন নব মহাকরণের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপ ক্যাব ধরছি। চাকা ঘুরেই যাচ্ছে, গাড়ি আর পাচ্ছি না, এমন সময় মায়ের ফোন। পরে করছি বলে কেটে তো দিলাম, গাড়িতে উঠে আর মনে পড়ল না। মনে যখন পড়ল তখন গড়িয়ে গেছে সন্ধ্যা। 


ক্ষমা চাইতে যাবার আগেই ভেসে এল মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠ, " আরে আজ ছুটকি কি সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটিয়েছে তুই জানিস -"। ছুটকি মায়ের দুবেলার রান্না করে দেয়, টুকটাক বাজারদোকান করে, ঘর ঝাড়পোঁচ করে আর রাজ্যের গল্প করে। সম্পর্কটা শুধু শ্রম আর পারিশ্রমিকের নয়, সম্পর্কটা ভরসা আর ভালোবাসারও। ছুটকি অঘটনঘটনপটিয়সী বটে, রোগ পুষে রাখতে বড্ড ভালোবাসে, নিজের কিছু হলে হারগিজ ডাক্তারের কাছে যাবে না, ফালতু খরচের ভয়ে। মেরেই ফেলব, কেটেই ফেলব যতক্ষণ না করি। তারওপর আছে ছুটকির ছানা, সেটা আরেক মস্তান, কিছুদিন আগে কানে এমন ইনফেকশন বাঁধিয়ে ছিল যে ডাক্তার বলেছিল পর্দা ফুটো হয়ে যাবে। 

ভাবলাম তেমনি কিছু হবে, অথবা আগুন নিয়ে কিছু, যা গল্প করে রান্না চাপিয়ে। কি হয়েছে শুধাতে হল না, মা নিজেই গড়গড় করে বলে গেল, "আমরা তখন খেতে বসেছি, বললাম দরজা বন্ধ করে যা, এমন বন্ধ করেছে সে আর খুলছেই না। লতা আর আমি চাবি ঘুরিয়ে কত চেষ্টা করলাম।" 

প্রপিতামহের বানানো বাড়িটা হাওয়ামহল বিশেষ, একাধিক দরজা, জিজ্ঞাসা করি সবকটাই কি বন্ধ করে গেছে নাকি? মা নার্ভাস হয়ে বলে, কেবল মুখ্য দরজটাই রুদ্ধ আপাতত। বলি কাঠের মিস্ত্রিকে ফোন করেছ? কাঠের মিস্ত্রি বললে অবশ্য ভদ্রলোককে অপমান করা হবে, ITI থেকে রীতিমত কাঠের কাজ শিখেছেন উনি, আগে টুকটাক খেপ খাটতেন, বর্তমানে বিরাট কন্ট্রাক্টর। অনেক দিনের সম্পর্ক, বাবা বা মা ডাকলে আজও আসেন এবং যত ছোট কাজই হোক করে যান। অবশ্যই তাঁর সময়মত, আজ যেমন মা বহুবার ফোন করেছে, তিনি হয় ধরেননি নয়তো বলেছেন সময় পেলে যাচ্ছি।


মায়ের অসহায়তা অনুভব করতে পারি আমি,প্রায় তুলোয় মুড়ে রেখেছিল বাবা। " তোর বাবা থাকতে এসব কখনও ভাবতে হয়েছে আমাকে? এখন এত দায়দায়িত্ব, রোজই কিছু না কিছু সমস্যা, আমি কিছুই সামলাতে পারি না।" মাকে বেশ লম্বা লেকচার দিয়ে ফোন রাখি সে রাতে। বাবা চলে যাওয়া ইস্তক এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার নৈমিত্তিক কাজ, কখনও মায়ের মনোবল বাড়াই, তো কখনও মেয়ের। নিজের শোকের সময় কোথায়! ভোকাল টনিক খাইয়ে খাইয়ে আমার নিজের ভোকাল কর্ডেই ব্যথা হয়ে গেল। 


পরদিন সকালে আবার শুধাই, কাঠের মিস্ত্রি থুড়ি কন্ট্রাক্টর দাদা কি এসেছে? আসেনি শুনে আবার মনোবল বাড়াই খানিক, এই তো জীবন কালিদা, জীবন তো চলতেই থাকে ইত্যাদি প্রভৃতি। বর্ষায় কাঠ বাড়ে, হয়তো রোদ উঠলে এমনিই খুলে যাবে। আপিস থেকে ফেরার পথে আবার শুধাই, কি অবস্থা। মা বলে, " এখনও আসেনি।" বলি ঠিক আছে, লেগে থাকো, তোমরা অবরুদ্ধ তো নও। আরও কি সব মনোবলবর্ধক বার্তালাপ করি দুজনে, তারপর মা বলে, "হ্যাঁ রে, তোকে কি বলেছি, ছুটকি কাল রাতে দরজাটা খুলে দিয়েছে।"


মানে? কাল রাতে খুলে দিয়েছে, আর তুমি আজ রাত অবধি সেটা আমায় বলোনি? সবথেকে বড় কথা তাহলে কাঠের কাজের দাদাটাকে ফোন করে জ্বালাচ্ছ কেন? মা বলে, " আহা আগের কাজটা ওকে দিয়ে করাইনি তো, তাই ওর গোঁসা হয়েছে বুঝলি। ফোন করে রাগ ভাঙানো দরকার -"। রেগে ফোনটাই কেটে দিই আমি, স্টিয়ারিং হুইলের সামনে তখন হাসতে হাসতে বিষম খাচ্ছে উত্তম। 


হাসি খানিক আমিও। মা চিরদিনই এমন, বিরল লুপ্তপ্রায় প্রজাতি। মা সবার জন্য চিন্তা করে, উদ্বিগ্ন হয়, সবার মানভঞ্জন করতে চায়। উত্তম গাড়ি চালাতে চালাতে বলে, "আপনাদের কথা শুনতে শুনতে আমার কি মনে হচ্ছিল জানেন ম্যাডাম, আপনার মা অনেক ভাগ্যবতী যে ওনার আশেপাশে এত মানুষ আছেন। আমার শাশুড়ির কেউ ছিল না জানেন। কি জাঁদরেল মহিলা ছিল আমার শাশুড়ি, শ্বশুরমশাই হিমোফিলিয়ার রুগী ছিলেন, সংসার ধর্ম করতেই পারতেন না। উনি একাই সব সামলাতেন, দুই মেয়েকে মানুষ করেছেন। শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর মা আর দুই মেয়ে থাকত। তারপর আমার বউ বিয়ে করে চলে এল। ছোট মেয়েকে নিয়ে থাকতেন, তারপর ওর বিয়ের পর একদম একা। তখনই মাথাটা আস্তে আস্তে বিগড়ে গেল। 


আমার বউ আর ছেলে শনিবার করে যেত, আমি রবিবার। সারা সপ্তাহের দোকান বাজার করে দিয়ে আসতাম, রাঁধতও না, খেতও না। চুপচাপ বসে থাকত। পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখতাম আলুতে শিকড় গজিয়ে গেছে। 


কাছেই ওর মাসির বাড়ি একবার একাই চলে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে, মাসি সেরাতেই আমার বউকে ফোন করে বলে কি, "তোর মাকে নিয়ে যা।" বিড়বিড় করে বলি, নিজের থেকে পর ভালো। উত্তম বলে," মোটেই ভালো নয় ম্যাডাম। পাড়ার লোক কম অত্যাচার করেছে আমার বউয়ের ওপর। যখন তখন ফোন, তোর মাকে পাগলা গারদে দিয়ে দে। তোর মায়ের জন্য আমরা থাকতে পারছি না। কি করত সেই মানুষটা না, চেনা কাউকে দেখলে দুটো মুড়ি চাইত।" 

শুনতে শুনতে হাকুচ তেঁতো হয়ে ওঠে মন। মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষজন কাজ করতে ভয় পায়। দুটি ভাত রান্না করার চেয়ে চাট্টি মুড়ি দিয়ে জঠরাগ্নি মেটানো সহজ। উত্তম বলে, "আমি একটা জায়গায় ওনাকে ভর্তি ও করে দিয়েছিলাম ম্যাডাম, কিন্তু ওরা অনেক টাকা নেয়। আমি গরীব ড্রাইভার কেমন করে টানব বলুন।" বলি তোমার শালীর বর কিছু, সাহায্য করত না? উত্তম হেসে বলে, " উরি বাপরে, ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে তো ওকে আসতেই দিত না। ওর শ্বশুর শাউরি বরের ধারণা ছিল মায়ের বিধবা ভাতা যখন আমরা নিচ্ছি, তখন মায়ের সব দায়িত্ব আমাদের। আপনিই বলুন ম্যাডাম বিধবা ভাতা কত?" 


তীব্র যানজট মহানগরের প্রবেশ পথে, আমরা গল্প করেই যাই। " আমার বউ রোজ ফোন করত, দুবেলা। সেদিন সকাল থেকে শাশুড়ি মা যখন ফোন তুলল না, ও অনেক কাকুতিমিনতি করে এক কাকিমাকে রাজি করাল একবার দেখে আসার জন্য। তিনি দেখে জানালেন, মারা গেছেন।" ঘটনাক্রম যে আমার অজ্ঞাত তাও নয়, এর আগে একাধিক বার শুনেছি, তাও কেন যে ফাঁকা হয়ে যায় মন আর মাথা। মায়ের ওপর জমে থাকা রাগ আর বিরক্তির জায়গা নেয় তীব্র ভয় , হারিয়ে ফেলার ভয়।মা সারাদিন থতমত খায়, গুলিয়ে ফেলে অনেক কিছু, ভয় পায় তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারে, তাও তো মা আছে। গলা ঝেড়ে নতুন করে নম্বর মেলাই, দেখি আর কি বলার আছে তাঁর।

অনির ডাইরি আগস্ট, ২০২৬

অনির ডাইরি ২২ শে আগস্ট, ২০২৭ 
#অনিরডাইরি 


বন্ধুবান্ধব আমার বরাবরই খুব কম । যাদের গরিষ্ঠাংশই আমার বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী । লেবার সার্ভিসের কয়েকটা ব্যাচমেট, কিছু সিনিয়র -জুনিয়র, কোচিংয়ের পম্পা আর ট্রেনের নবু। আরও কয়েকজন ছিল বটে, বেকার বেলার সাথী। কালের নিয়মে আলাদা হয়ে গেছে পথ, রেখে গেছে লক্ষ লক্ষ সুখস্মৃতি।

আমার বাবার তুলনায় এই সংখ্যাটা নেহাৎ নস্যি। কত যে বন্ধু ছিল বাবার, গুণে শেষ করা যেত না। আমার মতোই যাঁদের গরিষ্ঠাংশই ছিল বাবার ইস্কুলবেলার বন্ধু। বাবাদের স্কুল, "আই আর বেলিয়াস ইনস্টিটিউট, হাওড়া" । সিরিয়া নাকি বাগদাদ থেকে আগত ইহুদী ধনকুবের আইজ্যাক র‍্যাফায়েল বেলিয়াস সাহেব খোদ প্রতিষ্ঠা করেন এই বিদ্যালয়। প্রায় দুই একর জায়গা, দু-দুটো পুষ্করিণী নিয়ে নির্মিত এই স্কুল নিয়ে চূড়ান্ত আত্মশ্লাঘায় ভুগত আমার পিতৃদেব।

যদিও আমাদের স্কুলগ্রুপের সঙ্গে বাবাদের গ্রুপের একটা বড় পার্থক্য ছিল। আমরা সবাই একই বছর মাধ্যমিক পাশ করি । বাবাদের গ্রুপে এমন অনেকে ছিলেন, যাঁরা অনুত্তীর্ণ হয়ে কয়েক বছর পর পাস করেন, অথবা আদৌ পাস করেননি। সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে ড্রপ আউট। আজব গ্রুপ ছিল বাবাদের। শুধুমাত্র ডিগ্রির তারতম্য ছিল তাই নয়, বাবাদের গ্রুপে কেউ ছিলেন লক্ষপতি (আশি নব্বইয়ের দশকে 'কোটি'টা সোনার পাথরবাটির মতো শোনাত)। আবার আমাদের মতন লোকজনেরও অভাব ছিল না, যাদের মাস পয়লাটা পয়লা তারিখেই ফুরিয়ে যেত ।

প্রতি বৃহস্পতি আর শনিবার আড্ডা বসত বাবাদের। একদিন দেবা কাকু আর একদিন সলিল কাকুর বাড়ি। সন্ধে সাতটা থেকে রাত নটা। পৌনে সাতটা বাজলেই চিৎকার জুড়ে দিত সাবেকি লাল ঘোরানো টেলিফোনটা। আমরা কোনোদিন বলতাম, 'শ্যামের বাঁশি ', কোনোদিন বলতাম 'নিশির ডাক'। প্যারালাল লাইন ভুল করে তুলে ফেললেই শোনা যেত দেবা/ সলিল কাকুর গদগদ কণ্ঠস্বর, "কিরে বেরোলি?" ঠিক যেভাবে ডাকে অন্তরা- চৈতালীরা। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর এক নাগাড়ে চলেছে এই আড্ডা। ঝড়-বৃষ্টি-তুফান,বনধ-কার্ফু, আমার বিয়ে, শ্রীমতী তুত্তুরী - যাই হোক না কেন বাবাকে ঠিক ওই নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যেত না।

এর বাইরে ছিল হিরেন কাকু। এ যুগের ভাষায়, 'বাবার বেস্টি'। জাহাজে রেডিও অফিসারের চাকরি করতেন, বছরের অধিকাংশ সময়টাই সমুদ্রে ভেসে বেড়াতেন ভদ্রলোক। ছুটিতে যখন বাড়ি আসতেন, জোঁকের মতো আটকে থাকতেন বাবার সঙ্গে। আমাদের পুতিগন্ধময় পাঁচশো বছরের বুড়ি শহরটার অলিগলি দিয়ে, টো-টো করে হেঁটে বেড়াত দুজনে, আর কি যে এত গল্প করত।
সেটা বিরানব্বই সাল, তখনও ভাঙেনি বাবরি মসজিদ। পুজোর সময় ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরল হিরেন কাকু। বাকি পুজোটা আমাদের যে কী কেটেছিল, আশা করি বুঝতেই পারছেন। এই নিয়ে দাম্পত্যকলহ, আমার কান্নাকাটির পর বাবা একদিন হিরেন কাকুকে বলেই বসল, 'আমায় এবার ছাড়'। হাহা করে সেদিন হেসেছিল হিরেন কাকু। মাস দুয়েক পর যখন হঠাৎ দুঃসংবাদ এল, আর হিরেন কাকুর জ্যেষ্ঠ পুত্রকে নিয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে হল বাবাকে, যাবার আগে একটা কথাই বলেছিল, "বললাম বলে সত্যিই চলে গেল?" আন্দাবান থেকে হিরেন কাকুর দাহকার্য সেরে বাড়ি ফিরে বাবা বলেছিল, " মর্গে গিয়ে যখন দেখলাম হিরেন শুয়ে আছে, তখন বিশ্বাস হল যে হিরেন তাহলে সত্যিই মারা গেছে।"

এছাড়াও ছিল নকশাল আমলের বন্ধুবান্ধব। যাঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। যাঁরা বেঁচে ছিলেন কেবল আমার বাবার গল্পে। নকশাল পিরিয়ডের জীবিত বন্ধুদের মধ্যে সন্তোষ জেঠু আর গ্যাঁড়া চাঁদু ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বর্গীয় সন্তোষ মিত্র ছিলেন নেতা মানুষ, ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়া পরতেন না। প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক ছিল ওনাদের সাথে। প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়ি, বাজার যাবার পথে নিত্য ঢুঁ মারত বাবাও। গ্যাঁড়া চাঁদু বলে ভদ্রলোককে অবশ্য কোনোদিন স্বচক্ষে দেখিনি আমি। সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে ভদ্রলোক ছিলেন বাবার স্বঘোষিত দেহরক্ষক। তাঁর জন্যই জীবিত ছিল বাবা। নানা মজার মজার ঘটনা ঘটাত লোকটা। প্রায়ই শুধাতাম বাবাকে, যে এই মজাদার লোকটা গেল কোথায়? উত্তর পেতাম, ' আছে, আছে, সব আছে।' তারপর এল সেই দিন, কাকভোরে দৌড়োতে দৌড়োতে এলেন বাবার বিদ্যালয় জীবনের এক সহপাঠী। " সর্বস্ব দিয়ে জমিটা কিনেছিলাম ভাই, আজ ভিত পুজো, এখন ক্লাবের ছেলেরা এসে বলছে, খানিকটা জমি ক্লাবের নামে লিখে না দিলে, বাড়ি বানাতে দেবে না।" ' চল আসছি ', বলে গায়ে একটা জামা গলিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল বাবা। ফিরে এল দুপুর গড়িয়ে, মুখে কোন কথা নেই। সন্ধ্যেবেলা এত মিষ্টি নিয়ে হাজির সেই কাকু, নির্বিঘ্নে মিটেছে সব। ক্লাবের ছেলেগুলোকে শুধু একদিন পেট ভরে মাংস ভাত খাওয়াতে হবে। কাকু বিদায় নেবার পর শুধালাম কীভাবে সম্ভব হল এটা? জবাব এল, 'গ্যাঁড়া চাঁদু'।

এই গ্যাড়া চাঁদু বলে ভদ্রলোকের উপস্থিতির প্রমাণ আরেকবার পেয়েছিলাম । ততোদিনে এসে পড়েছে এই সহস্রাব্দ । রাত তখন এগারোটা। হঠাৎ দৌড়োতে দৌড়োতে এলেন এক পরিচিত ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী। " মেয়ে সকালবেলায় কলেজে বেরিয়ে এখনও বাড়ি ফেরেনি -"। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন, থানাতেও গিয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি ইত্যাদি বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন আইনরক্ষকেরা। ওনার স্ত্রীকে মা - জেঠাইমার ভরসায় রেখে, বাবা বেরিয়ে গেল। তবে এবার আর একা গেল না। ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে গেল। বাড়ি যখন ফিরল তখন প্রায় ভোর হয়, হয়। গ্যাড়া চাঁদুর সৌজন্যে সেইরাতেই সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল মেয়েটির। ফিরিয়ে আনা যায়নি যদিও, ফিরতে চায়নি মেয়েটি। তবে সেতো অন্য গল্প।

এর বাইরে বাবার আর যে দুই বন্ধুর কথা না বললেই নয় তারা হলেন স্বপন কাকু আর সুশীল কাকু । স্বপন কাকু খর্বাকৃতি, কাঠিসার চেহারা। খাদ্য দপ্তরের কেরানি, অকৃতদার। ধপধপে সাদা ধুতিপাঞ্জাবি ছাড়া কিছু পরতেন না। সুশীল কাকু ও খর্বাকৃতি ছিলেন, তবে স্বপন কাকুর মতন অতটা নয় । মিশমিশে কালো গায়ের রঙ। বারোমাস একটাই ফ্যাকাশে হলুদ টিশার্ট আর স্টিল গ্রে প্যান্ট পরে আসতেন। প্রতি রবিবার সকালে আড্ডা বসত এই তিনজনের। সুশীল কাকু আর স্বপন কাকুর বৈশিষ্ট্য ছিল যে এনারা দুজনেই কুষ্ঠিবিচার- হাত দেখা এইসব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। কিন্তু কখনই বাণিজ্যিকভাবে এগুলো প্রয়োগ করতেন না । এদের দুজনেরই বক্তব্য ছিল যে অর্থের বিনিময়ে হাত দেখলে নিজের ভাগ্য থেকে খানিকটা তাদের দিয়ে দিতে হয়। পরিচিত কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে দুইজনেই খুশি খুশি হয়ে তার জবাব দিতেন। প্রায়শ তা অব্যর্থ হত। সেই গল্প শুনে একবার আমার এক পিসিমা গেছেন হাত দেখাতে বাবাদের আড্ডার মাঝে। পিসিমা একা আসেননি, সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর সদ্য মাধ্যমিক পাশ কন্যা । সেই যুগের ডাকসাইটে সুন্দরী, স্কুলে বরাবর প্রথম হওয়া মেয়ে। অসম্ভব উদ্ধত এবং অহংকারী। তিনি যখন শুনলেন যে তার মা দোতলায় গেছেন হাত দেখাতে তিনি গটগট করে দোতলায় উঠে এলেন । সুশীল কাকু বা স্বপন কাকু কাউকেই তাঁর পছন্দ হল না। অপরিচ্ছন্ন, গরীব গুর্ব মানুষ যত। তিনি অত্যন্ত উদ্ধতভাবে বললেন পিসিমাকে, " চলো চালো, যত সব আজেবাজে লোকের সঙ্গে গল্প করতে যাও তুমি"।
সুশীল কাকু বড় পিসিমার হাত দেখছিলেন । দেখতে দেখতে হঠাৎ থেমে গেলেন এবং ওই দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন," মা তোমার বড্ড অহংকার হয়ে গেছে । এই অহংকার টিকবে না । তুমি সামনের পরীক্ষাতেই হোঁচট খেয়ে পড়বে । আর তুমি নিজের বিবাহিত জীবনের যে স্বপ্ন দেখেছ, সেটাও সত্যি হবে না । সেখানেও তুমি খুব একটা সুখী হতে পারবে না।"

বছর খানেক বাদে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করতে পারলেন না দিদি । বিয়ে হয়। বিয়ের পর দিদি জানতে পারে যে ওই জামাইবাবুর একজন পূর্ব প্রেমিকা আছেন। ভদ্রমহিলা জামাইবাবুর সহকর্মী। দিদিকে শুনতে হয়, " ও থাকবেই । তুমি মানতে পারলে থাকো -"। এমন হয়তো অনেক বাঙালি বাড়িতেই হয় বা হত, কিন্তু সুশীল কাকুর ঐ অব্যর্থ ভবিষ্যৎবাণী একটা প্রবাদ পরিণত হয় আমাদের পরিবারে।

আজ না বাবা আছে, না বাবার বন্ধুবান্ধব । কিন্তু কোথাও তো আছে । কোথাও না কোথাও নির্ঘাত জমে উঠেছে জমজমাট আড্ডা। একে একে আমরাও গিয়ে হাজির হব সেখানে। তারপর দেখা যাবে, কে বেশি আড্ডাবাজ, বন্ধুবৎসল, বাবা না বাবার মুটকি মেয়েটা ❤️

অনির ডাইরি ১১ ই আগস্ট, ২০২৬
#অনিরডাইরি 




“মা, আঙ্কল কি ভালো গো?” স্নান সেরে বেরোতে না বেরোতেই, তিনি এক গাল হেসে কইলেন।

আঙ্কেল এক দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণ, অতীব সুদর্শন বৃদ্ধ। আমাদের আবাসনের মার্কেটে ভদ্রলোকের একটি দোকান আছে। সেখানে মূলতঃ দুধ, চকোলেট, আইসক্রিম আর কোল্ড ড্রিঙ্ক বিক্রি হয়। আশা করি বুঝতেই পারছেন, আমার কন্যা আঙ্কেলের দোকানের নিত্য খরিদ্দার।
আঙ্কল আদতে সম্ভবত পঞ্চনদের দেশের বাসিন্দা। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ছিলেন, অবসরের পরও এই রাজ্যের মায়া কাটাতে পারেননি। কাবুলিওয়ালাদের মতন পোশাক পরেন, নিভাঁজ, নিখুঁত। ভীষণ কম কথা বলেন এবং তার থেকেও কম হাসেন। ভদ্রলোককে সবাই সমীহ করে চলে।

ব্যতিক্রম আমার কন্যা। দাদুকে হারানো ইস্তক বুড়ো মানুষ দেখলেই তুত্তুরী গলে যায়। তাদের মধ্যে দাদুকে খোঁজে হয়তো। আঙ্কেলের সঙ্গেও গায়ে পড়েই গল্প করে অনেক সময় এবং দাবী করে, আঙ্কেলও নাকি সহমর্মিতা দেখান। আজ আবার কী মাথা খেয়ে এল বুড়োর, কে জানে! আর গেলই বা কখন?

তিনি উৎসাহের আতিশয্যে বলেন, “আরে, তুমি স্নানে ঢুকলে? আমারও মাথাটা সকাল থেকে পড়ে পড়ে ঘেঁটে ছিল, তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি, ফ্রেশ অক্সিজেন নিয়ে আসি।”

এই ভরদুপুরে, খটখটে রোদে তুই অক্সিজেন নিতে গিয়েছিলি? তাও আবার বাজারে! কন্যার বিগলিত মুখচ্ছবি দেখে বলতে গিয়েও বলি না। তিনি সুযোগও দেন না, বলেই যান উচ্ছ্বসিত স্বরে, " গিয়ে দেখি, আঙ্কেল হাফ প্যান্ট পরে বসে আছে-।" এই গরমে পাঠান স্যুট ছেড়ে আঙ্কেল মাঝেমধ্যে হাফ প্যান্ট আর গোলগলা গেঞ্জি পরেন বটে। সে তাঁর ইচ্ছে, তিনি যা খুশি পরুন। 

তুত্তুরী বলে চলে, “আমি তো বাইরে ঘুরঘুর করছিলাম, আঙ্কেলই ডাকল, 'এসো এসো, তোমারও সামনে পরীক্ষা তো?' মাথা যেই নাড়িয়েছি, বলেন কিনা, 'সবাই পরীক্ষার জন্য চকলেট, বিস্কুট, কেক কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমার জন্যেও গুছিয়ে রেখেছি।' বলে, মা, একশো টাকার জিনিস, আমায় মাত্র ষাট টাকায় দিয়ে দিল গো!”
শ্রীমতীর হাতে একটি ঝলঝলে প্যাকেট, প্যাকেট ভর্তি কেক, বাউলি, বিস্কুট। তিনি মাসিক হাতখরচ থেকে বেশ অনেকটা খরচ করে কিনে এনেছেন। আদৌ দরকার কিনা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

দ্বিপ্রাহরিক জলখাবার বানাতে বানাতে বলি, “দেখেছে, তোর মাথাটা গোল, দিয়েছে টুপি পরিয়ে। দেখ, নির্ঘাত ডেট এক্সপায়ার হতে বসা জিনিসপত্র। আর তোকে তো বাড়ি থেকে টিফিন বানিয়েই দেওয়া হয়।”

বেলুনে পিন ফোটানোর মতো চুপসে যায় তাঁর মুখটা। "তাই তো?" কিছুক্ষণ নীরব থাকেন, তারপর নালিশের সুরে বলেন, “ছিঃ ছিঃ, আঙ্কেল শেষে আমায় ঠকিয়ে দিল! মা, আমি আর বাজার যাব না।” কেউ তাকে বাজার যেতে বলে না, তিনি নিজেই জোরাজুরি করেন দোকান-বাজার করার দায়িত্ব চেয়ে। 

কয়েক মুহূর্ত পরেই পুনরায় ফিরে আসেন রান্নাঘরে। “মা, শুনে রাখো, আমি আর বাড়ি থেকেই বেরোব না।” এমন অনেক কিছুই আমি নিত্য শুনি। আজও শুনলাম।

আরও কিছু মুহূর্ত কাটে, তিনি আবার আসেন। গলায় এবার সামান্য খুশির ছোঁয়া নিয়ে বলেন, “মা, আমি দেখলাম, বেশিরভাগই ডেট অফ এক্সপায়রি অক্টোবর, নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে।”

ঘুরে তাকাই তাঁর দিকে, কোমরে হাত দিয়ে দুঁদে ইন্সপেক্টর গড়গড়ির মতো শুধাই, “সবগুলো দেখেছিস?” তিনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান। খানিক বাদেই ফিরে আসেন অবশ্য, প্যাকেট ভর্তি চকোলেট-বিস্কুট নিয়ে। একটি একটি করে বার করেন, সম্ভাব্য বাতিলের তারিখ পড়েন, গ্যাসের টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখেন। এইভাবে দেখা যায়, কিছু জিনিস সত্যিই নভেম্বর বা ডিসেম্বর অবধি চলবে, গোটা দুই অবশ্য তেইশে আগস্টেই শেষ। তবে তাও তো সময় আছে।

তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, “যাক মা, আঙ্কেল তাহলে ঠকায়নি।” নীরবে মাথা নাড়ি। তিনি তাতে আরও পুলকিত হয়ে বলেন, “ভাবো মা, একশো টাকার জিনিস মাত্র ষাট টাকায়! শুধু কি তাই? দুটো আইসক্রিম কিনলাম, তাতেও আঙ্কেল দশ-দশ কুড়ি টাকা ছাড় দিল।”

মায়ের মুখে কিউমুলোনিম্বাসের ছায়া ঘনাতে দেখে তিনি তড়িঘড়ি বলেন, “একটা তোমার জন্যেও এনেছি। আঙ্কেলকে বললাম, আগের দিন যে ক্যারামেল আইসক্রিম দিয়েছিলেন, আমার মায়ের খুব ভালো লেগেছিল। আজ মা বাড়িতেই আছে, আরও দুটো দিন তো।” মৃদু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে জ্বলন্ত গ্যাসের দিকে ঘুরে যাই, মা হওয়া কি মুখের কথা। বাপরে !





 অনির ডাইরি ৫ই আগস্ট, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



সপ্তাহ দুয়েক ছুটি নিয়েছি। না নিয়ে উপায় ছিল না। ঠিক দুই সপ্তাহপর শুরু হচ্ছে তাঁর দশম শ্রেণীর অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। আশৈশব, শ্রীমতী তুত্তুরীর কোনো প্রাইভেট টিউটর ছিল না। ক্লাসের শিক্ষক মহাশয় বা দিদিমণি যখন প্রশ্ন করতেন, "কে কতজন গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে যাও," শ্রীমতী সবথেকে জোর গলায় বলতেন যে তিনি শুধুমাত্র তাঁর মায়ের কাছেই পড়েন। নবম শ্রেণিতে উঠে রণে ভঙ্গ দিল তুত্তুরীর জননী। একে তো কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাপারটা তাঁর মাথার ওপর দিয়ে গেল, দ্বিতীয়ত বদলির চাকরির সৌজন্যে দ্বিঘণ্ডিত হয়ে গেল আমাদের পরিবার।


শৌভিক আর তুত্তুরী চলে এল মহানগর, ভর্তি হল নতুন স্কুলে, আমি পড়ে রইলাম সেই তাম্রলিপ্ত নগরী। "মরিয়া না মরে রাম" এর মত তাও কামড়ে রইলাম ইংরাজি ভাষা (languag), বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়। ইংরাজি সাহিত্য পড়ানোর দায়িত্ব জবরদস্তি চাপল তুত্তুরীর বাবার কাঁধে। অঙ্ক - পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের জন্য নিযুক্ত হলেন তিনজন গৃহশিক্ষক। 


 মোটেই খুশি হলেন না শ্রীমতী তুত্তুরী। তিনজনের কাউকেই ওর পছন্দ নয়। ওরা কেউই নাকি মায়ের মতো পড়াতে পারে না। মা কেমন ছ্যাবলামি করতে করতে পড়ায়, বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে পড়া চলে, ইতিহাসে মিশে যায় ভূগোল, সাহিত্যের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে বিজ্ঞান। নবম শ্রেণী এইভাবে নিমরাজি হয়ে কাটলেও, দশম শ্রেণীতে উঠে তিনি একেবারে বেঁকে বসলেন। "হয় তুমি পড়াও, নয়তো আমি নিজে যা পারব, পড়ব।"


আমরাও দেখলাম, রসায়নের স্যারের মধ্যে বিন্দুমাত্র সিরিয়াসনেস নেই। কখন আসবেন সেটাও শ্রীমতী তুত্তুরীকেই বার বার ফোন বা মেসেজ করে জানতে হয়। ফোন বেজে যায়, শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে। মেসেজ ডেলিভারি হয় না। তারওপর, তাঁর অসাধারণ সময়জ্ঞান। রবিবার তিনটে বলে তিনি আসেন সন্ধ্যা ছটায়। আসেন না অনেকবার, পরের দিন হয়তো মেসেজ করে বলেন, তারপরের দিন আসবেন। এই করতে করতে নবম শ্রেণীর বার্ষিক ইতিহাস পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি রসায়ন পড়াতে এসেছিলেন।


 সময়ের ব্যাপারে তালকাটা হলেও ছেলেটা মানুষ হিসেবে ছিল নিপাট ভালো, গোবেচারা টাইপ। পদার্থবিদ্যার ছেলেটির সময়জ্ঞান টনটনে হলেও বাকিটা একেবারে পচে যাওয়া। 'বুঝিনি' বললেই তিনি রেগে আগুন, তেলে বেগুন। খুঁচিয়ে আমাদের সংসারের নানা কথা জানতে চাইতেন, আমাদের গৃহশ্রমিকদের জাত ধর্ম নিয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করতেন। শুধু কি তাই? তিনি কত বড় পুরুষ সিংহ প্রায়ই সেই গল্প শোনাতেন ছাত্রীর কাছে। ভোম্বল মার্কা ছাত্রীটি দেখতে হাবাগোবা হলেও, বাবামায়ের কাছে যে কিছুই গোপন করে না, এটা বুঝি তার বোধগম্য হয়নি। যেদিন তিনি ছাত্রীর সামনে তার উচ্চ বডি কাউন্টের গল্প ফাঁদলেন, সেই রাতেই শৌভিক মেসেজ করে বলল, "ভাই, তোকে আর আসতে হবে না। বেতন তো অগ্রিম দেওয়াই থাকে।" 


 আপাতত ফিজিক্স- কেমিস্ট্রি দুটোই আমার মাথায় চেপেছে বাকি কেবল অঙ্ক। তাই দিয়ে নিত্য অভিযোগ তুত্তুরীর।  "স্যার ভালো, কিন্তু তোমার মতো করে বোঝায় না। আমি কিছুই পারি না" । সেই অঙ্ক নিয়েই বসেছি আমরা। শৌভিক বেরিয়ে গেছে অফিসে। জানলার বাইরে পুরো কালো আকাশ। অঝোরে ঝরছে বারিধারা, ভিতরে ঢুলুঢুলু আমার কন্যা । পড়তে বসলেই ঘুম পায়, শুধু ওনার নয়, আমারও । গতরাতেই তো পরিবেশ বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি নিজেই । ঘুম থেকে উঠে দেখি তিনি গজগজ করছেন,  "আমি লিখছি, আর মা ঘুমাচ্ছে। এটা মা না বিন লাদেন?"  


আজ আমার বলার পালা, কিন্তু বলি না । উল্টে প্রশ্ন করি, 'চা খাবি?' জবাব আসে, না । তাহলে 'কফি'? তিনি বলেন 'ছি'। কফির গন্ধে তাঁর ভয়ানক বিরাগ । তাহলে আমুল স্প্রে গুলে দেব খাবি? চনমনিয়ে ওঠেন তিনি। " দাদুর মতো করে"! আমার শৈশবে যে রাতে ভালো কিছু রান্না হত না, রুটির সাথে আমুল স্প্রে গুলে দিত বাবা। অনেকটা গুঁড়ো দুধ, অল্প চিনি আর নামমাত্র জল।


সহজে গুলতেই চাইত না তখনকার গুঁড়ো দুধ। ড্যালা ড্যালা হয়ে ভাসতো বাটিজুড়ে। কাঁচা খেলে আটকে থাকত মাড়িতে। শ্রীমতী তুত্তুরী শৈশবেও একবার গুলে দিয়েছিল বাবা। বড় মামির কাছে মিল্ক মেড খেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল শিশু তুত্তুরী। " আর একটু দেবে গো -" বলে বড়মামীর পিছন পিছন ঘুরছিল মেয়েটা, দেখে বড় মামা তো হেসেই খুন। "এই খেয়েই গলে গেলি? দাঁড়া, তোকে এমন জিনিস খাওয়াব না-" বলে বাজার থেকে দশ টাকার আমুল স্প্রের প্যাকেট কিনে এনে আমার বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল, "ওকে একটু ওই রকম করে গুলে দাও তো মেজজেঠু, যেমন ভাবে আমাদের গুলে দিতে ছোটবেলায়।"  দাদুর হাতে গুলে দেওয়া, কড়কড়ে চিনি ছড়ানো, ঘন থকথকে আমুল স্প্রের গল্প তুত্তুরীর অন্যতম সুখের শৈশবস্মৃতি। 


বাবার মতো নয়, সাধারণ দুধের মতো গুলে আনি, আধ কাপ করে। আগের মতো না হলেও আজও ভাসে হালকা দুধের ড্যালা। বলি, সরিয়ে রাখ বইপত্র, আমার গায়ে ঠেস দিয়ে বস। তারপর আয়, বৃষ্টি দেখি আমরা। বলি, অল্প অল্প করে চুমুক দে। জলদি শেষ না হয়ে যায় এই অমৃত। সত্যি অমৃতের মতো তারিয়ে তারিয়ে খায় আমার মেয়ে। খেতে খেতে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, "যদি অঙ্কে ফেল করি, তুমি আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো?"  শৌভিকের বচন ধার নিয়ে বলি," দূর, পাশ তো সবাই করে, ফেল করাটাই তো আসল কৃতিত্ব বাবু। তুই লড়ে যা- "