Tuesday, 1 September 2026

অনির ডাইরি সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 অনির ডাইরি ১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬

#অনিরডাইরি



মা যখন বলল, " এই তুই টাকা তুলে আনতে ভুলে গেছিস -,"ঘড়িতে তখন রাত নটা। জানলার কাঁচে জমছে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মিহি জলকণা। কিসের টাকা, প্রশ্ন করতে গিয়ে মনে হল, কপালে করাঘাত করি। আজ মাস পয়লা, মায়ের মাসের খরচের টাকা তুলে দেওয়ার কথা ছিল আমার। ভেবেও ছিলাম, অফিসে এক ফাঁকে তুলে নেব। পাঁচ রকম ঝামেলা যার উৎস এবং বিধেয় দুইই আমি, ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে মাথাটা। তারওপর আবহাওয়াটাও কেমন যেন ভয় দেখানে মার্কা।


জিভ কেটে বলি, পরের দিন যখন আসব, তুলে আনলে হবে না? মা মাথা নাড়ে, হ্যাঁ-না কিছু বুঝি না। সংকুচিত কণ্ঠে বলে, "আজ সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে সব পয়সা ফুরিয়ে গেছে।" মা অমন বলে, আমার মা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, নির্ঘাত ব্যাগ হাতড়ালে কিছু বেরোবে। " দেখো না। দেখো না" বলে উৎসাহিত করি আমি।বেরোয় বটে, গুটি কয়েক একশ, পঞ্চাশ, কুড়ি টাকার নোট। মা বলে, "এতেই হয়ে যাবে।" দেওয়াল থেকে হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে বাবা।

বুড়ো জীবিত থাকাকালীন, কোনদিন এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি মাকে। মা তো কিছুই জানত না, কোথায় আধার কার্ড থাকে আর কোথায় ব্যাঙ্কের বই। মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্সের ফাইল কোনটা, জমির কাগজ কোথায় থাকে। কিছু কিছু জাস্ট মজার ছলেই দেখিয়ে রেখেছিল বাবা আমায়। ভাগ্যে রেখেছিল -


বাবার মত রাখতে পারিনি মাকে আমি, প্রতিদিন চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই। আজই দেখো না। জানলার বাইরে বাড়ল বুঝি বৃষ্টির দাপট, ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে নয়। দেওয়াল থেকে ঝুলন্ত বাবা বুঝি অন্য কিছু কয়। সারাদিন অফিস করা তেল প্যাটপ্যাটে মুখচোখ, উস্কোখুস্কো চুলেই, গলিয়ে নিই বাইরের পোশাক। মা আটকাবার শতেক চেষ্টা করে। খুঁজে বার করে একটা ছোট্ট টিফিন কৌটো, যার মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা জমানো আছে বাবার, অধিকাংশই কুড়ি টাকার নোট, কিছু কয়েন। মা বলে," এতেই হয়ে যাবে আমার। কি আর এমন লাগে -"। টনটন করে আমার চোখ আর গলা, এই বুঝি উপচে যায় নয়ন জলাধার। 


পাড়ার রাস্তাঘাট এর মধ্যেই শুনশান। বৃষ্টিটা না পড়লেও, জমে আছে জল। সাবধানে হাঁটি আমি, কাল এই পোশাকেই অফিস যাব যে। মিটিং আছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত উৎসুক মুখগুলোকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর মুখে হেঁটে যাই মোড়ের মাথা। আমাদের ব্যস্ততম রাজপথ এখন জনশূন্য না হলেও বেশ ফাঁকা। একটা টোটো এসে দাঁড়ায় সামনে, একটি মেয়ে নামে। টোটোয়ালার গন্তব্য অনেক দূর, তবে সামান্য ঘুরে আমায় বাজারে নামিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। সহযাত্রী বাকি তিনজনের দুই জন মহিলা। নির্দ্বিধায় উঠে পড়ি।

ভেজা রাজপথ দিয়ে যেন উড়ে যায় টোটোটা। বাজারের পথ ধরতেই মৃদু প্রতিবাদ করেন একজন সহযাত্রী, " আবার বাজারের রাস্তা নিলে কেন -"। এটিএম এর সামনে নেমে, অভ্যাসবশত দ্রুত গতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাই আমি। পেরোবার পর খেয়াল হয়, রাস্তা এখন একদম ফাঁকা। ATM এর ভিতরে বিশাল লাইন। সর্বনাশ, এত রাতেও! আজ এগারোটা বাজবে নির্ঘাত। সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করি, " ভাই এটা টাকা তোলার লাইন তো?' ছেলেটি জবাব দেয় জমা করার। এতজন মানুষ, এত রাতে টাকা জমা করতে এসেছেন! ভিড়ে জনা দুই মহিলাও আছেন দেখি। বুঝতে পারি, স্থানীয় ব্যবসায়ী। ঝাঁপ ফেলার পর, সারা দিনের উপার্জন জমা করতে এসেছেন -


একটি অল্পবয়সী ছেলে সহৃদয় ভাবে বলে, " ঐ মেশিনটা ফাঁকাই থাকবে, আপনি তুলে নিন।" কেউ প্রতিবাদ করে না। লাইন ভেঙে টাকা তুলি আমি। বেরিয়ে আসার সময় একটু ভয়ভয় লাগে, কেউ কেড়ে নেবে না তো। একটা টোটো যেন আমার প্রতীক্ষাতেই বসে ছিল কোথাও। ঝিমোতে ঝিমোতে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। বাড়ির গলির সামনে এসে যখন নামলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত দশটার ঘর ছুঁই ছুঁই। কত বার, পড়ে ফিরেছি এই সময়। গলির উল্টো দিকে রিক্সাওয়ালাদের শিব মন্দিরের চাতালে বসে থাকত বাবা। একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম দুজনে। হেরে যাবার গল্প বলতাম আমি, জিতে যাবার গল্প শোনাত বাবা। আজ জিতে গেছি, শুধু হারিয়ে গেছে বাবাটাই।

কাল্পনিক বাপের সাথে গল্প করতে করতে পথ হাঁটি, যেখানেই থাকো, শুধু এইটুকু আশীর্বাদ করো, তোমার বউটাকে যেন ভালো রাখতে পারি। বাকি হারজিতে আর আমার কিস্যু যায় আসে না বাবা।

Wednesday, 5 August 2026

অনির ডাইরি ৮ই জুলাই, ২০২৬

 অনির ডাইরি ৮ই জুলাই, ২০২৬

#অনিরডাইরি


সেদিন দুপুরবেলা মা যখন ফোন করেছিল, আমি তখন নব মহাকরণের সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপ ক্যাব ধরছি। চাকা ঘুরেই যাচ্ছে, গাড়ি আর পাচ্ছি না, এমন সময় মায়ের ফোন। পরে করছি বলে কেটে তো দিলাম, গাড়িতে উঠে আর মনে পড়ল না। মনে যখন পড়ল তখন গড়িয়ে গেছে সন্ধ্যা। 


ক্ষমা চাইতে যাবার আগেই ভেসে এল মায়ের উত্তেজিত কণ্ঠ, " আরে আজ ছুটকি কি সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটিয়েছে তুই জানিস -"। ছুটকি মায়ের দুবেলার রান্না করে দেয়, টুকটাক বাজারদোকান করে, ঘর ঝাড়পোঁচ করে আর রাজ্যের গল্প করে। সম্পর্কটা শুধু শ্রম আর পারিশ্রমিকের নয়, সম্পর্কটা ভরসা আর ভালোবাসারও। ছুটকি অঘটনঘটনপটিয়সী বটে, রোগ পুষে রাখতে বড্ড ভালোবাসে, নিজের কিছু হলে হারগিজ ডাক্তারের কাছে যাবে না, ফালতু খরচের ভয়ে। মেরেই ফেলব, কেটেই ফেলব যতক্ষণ না করি। তারওপর আছে ছুটকির ছানা, সেটা আরেক মস্তান, কিছুদিন আগে কানে এমন ইনফেকশন বাঁধিয়ে ছিল যে ডাক্তার বলেছিল পর্দা ফুটো হয়ে যাবে। 

ভাবলাম তেমনি কিছু হবে, অথবা আগুন নিয়ে কিছু, যা গল্প করে রান্না চাপিয়ে। কি হয়েছে শুধাতে হল না, মা নিজেই গড়গড় করে বলে গেল, "আমরা তখন খেতে বসেছি, বললাম দরজা বন্ধ করে যা, এমন বন্ধ করেছে সে আর খুলছেই না। লতা আর আমি চাবি ঘুরিয়ে কত চেষ্টা করলাম।" 

প্রপিতামহের বানানো বাড়িটা হাওয়ামহল বিশেষ, একাধিক দরজা, জিজ্ঞাসা করি সবকটাই কি বন্ধ করে গেছে নাকি? মা নার্ভাস হয়ে বলে, কেবল মুখ্য দরজটাই রুদ্ধ আপাতত। বলি কাঠের মিস্ত্রিকে ফোন করেছ? কাঠের মিস্ত্রি বললে অবশ্য ভদ্রলোককে অপমান করা হবে, ITI থেকে রীতিমত কাঠের কাজ শিখেছেন উনি, আগে টুকটাক খেপ খাটতেন, বর্তমানে বিরাট কন্ট্রাক্টর। অনেক দিনের সম্পর্ক, বাবা বা মা ডাকলে আজও আসেন এবং যত ছোট কাজই হোক করে যান। অবশ্যই তাঁর সময়মত, আজ যেমন মা বহুবার ফোন করেছে, তিনি হয় ধরেননি নয়তো বলেছেন সময় পেলে যাচ্ছি।


মায়ের অসহায়তা অনুভব করতে পারি আমি,প্রায় তুলোয় মুড়ে রেখেছিল বাবা। " তোর বাবা থাকতে এসব কখনও ভাবতে হয়েছে আমাকে? এখন এত দায়দায়িত্ব, রোজই কিছু না কিছু সমস্যা, আমি কিছুই সামলাতে পারি না।" মাকে বেশ লম্বা লেকচার দিয়ে ফোন রাখি সে রাতে। বাবা চলে যাওয়া ইস্তক এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার নৈমিত্তিক কাজ, কখনও মায়ের মনোবল বাড়াই, তো কখনও মেয়ের। নিজের শোকের সময় কোথায়! ভোকাল টনিক খাইয়ে খাইয়ে আমার নিজের ভোকাল কর্ডেই ব্যথা হয়ে গেল। 


পরদিন সকালে আবার শুধাই, কাঠের মিস্ত্রি থুড়ি কন্ট্রাক্টর দাদা কি এসেছে? আসেনি শুনে আবার মনোবল বাড়াই খানিক, এই তো জীবন কালিদা, জীবন তো চলতেই থাকে ইত্যাদি প্রভৃতি। বর্ষায় কাঠ বাড়ে, হয়তো রোদ উঠলে এমনিই খুলে যাবে। আপিস থেকে ফেরার পথে আবার শুধাই, কি অবস্থা। মা বলে, " এখনও আসেনি।" বলি ঠিক আছে, লেগে থাকো, তোমরা অবরুদ্ধ তো নও। আরও কি সব মনোবলবর্ধক বার্তালাপ করি দুজনে, তারপর মা বলে, "হ্যাঁ রে, তোকে কি বলেছি, ছুটকি কাল রাতে দরজাটা খুলে দিয়েছে।"


মানে? কাল রাতে খুলে দিয়েছে, আর তুমি আজ রাত অবধি সেটা আমায় বলোনি? সবথেকে বড় কথা তাহলে কাঠের কাজের দাদাটাকে ফোন করে জ্বালাচ্ছ কেন? মা বলে, " আহা আগের কাজটা ওকে দিয়ে করাইনি তো, তাই ওর গোঁসা হয়েছে বুঝলি। ফোন করে রাগ ভাঙানো দরকার -"। রেগে ফোনটাই কেটে দিই আমি, স্টিয়ারিং হুইলের সামনে তখন হাসতে হাসতে বিষম খাচ্ছে উত্তম। 


হাসি খানিক আমিও। মা চিরদিনই এমন, বিরল লুপ্তপ্রায় প্রজাতি। মা সবার জন্য চিন্তা করে, উদ্বিগ্ন হয়, সবার মানভঞ্জন করতে চায়। উত্তম গাড়ি চালাতে চালাতে বলে, "আপনাদের কথা শুনতে শুনতে আমার কি মনে হচ্ছিল জানেন ম্যাডাম, আপনার মা অনেক ভাগ্যবতী যে ওনার আশেপাশে এত মানুষ আছেন। আমার শাশুড়ির কেউ ছিল না জানেন। কি জাঁদরেল মহিলা ছিল আমার শাশুড়ি, শ্বশুরমশাই হিমোফিলিয়ার রুগী ছিলেন, সংসার ধর্ম করতেই পারতেন না। উনি একাই সব সামলাতেন, দুই মেয়েকে মানুষ করেছেন। শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর মা আর দুই মেয়ে থাকত। তারপর আমার বউ বিয়ে করে চলে এল। ছোট মেয়েকে নিয়ে থাকতেন, তারপর ওর বিয়ের পর একদম একা। তখনই মাথাটা আস্তে আস্তে বিগড়ে গেল। 


আমার বউ আর ছেলে শনিবার করে যেত, আমি রবিবার। সারা সপ্তাহের দোকান বাজার করে দিয়ে আসতাম, রাঁধতও না, খেতও না। চুপচাপ বসে থাকত। পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখতাম আলুতে শিকড় গজিয়ে গেছে। 


কাছেই ওর মাসির বাড়ি একবার একাই চলে গিয়েছিল হাঁটতে হাঁটতে, মাসি সেরাতেই আমার বউকে ফোন করে বলে কি, "তোর মাকে নিয়ে যা।" বিড়বিড় করে বলি, নিজের থেকে পর ভালো। উত্তম বলে," মোটেই ভালো নয় ম্যাডাম। পাড়ার লোক কম অত্যাচার করেছে আমার বউয়ের ওপর। যখন তখন ফোন, তোর মাকে পাগলা গারদে দিয়ে দে। তোর মায়ের জন্য আমরা থাকতে পারছি না। কি করত সেই মানুষটা না, চেনা কাউকে দেখলে দুটো মুড়ি চাইত।" 

শুনতে শুনতে হাকুচ তেঁতো হয়ে ওঠে মন। মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষজন কাজ করতে ভয় পায়। দুটি ভাত রান্না করার চেয়ে চাট্টি মুড়ি দিয়ে জঠরাগ্নি মেটানো সহজ। উত্তম বলে, "আমি একটা জায়গায় ওনাকে ভর্তি ও করে দিয়েছিলাম ম্যাডাম, কিন্তু ওরা অনেক টাকা নেয়। আমি গরীব ড্রাইভার কেমন করে টানব বলুন।" বলি তোমার শালীর বর কিছু, সাহায্য করত না? উত্তম হেসে বলে, " উরি বাপরে, ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে তো ওকে আসতেই দিত না। ওর শ্বশুর শাউরি বরের ধারণা ছিল মায়ের বিধবা ভাতা যখন আমরা নিচ্ছি, তখন মায়ের সব দায়িত্ব আমাদের। আপনিই বলুন ম্যাডাম বিধবা ভাতা কত?" 


তীব্র যানজট মহানগরের প্রবেশ পথে, আমরা গল্প করেই যাই। " আমার বউ রোজ ফোন করত, দুবেলা। সেদিন সকাল থেকে শাশুড়ি মা যখন ফোন তুলল না, ও অনেক কাকুতিমিনতি করে এক কাকিমাকে রাজি করাল একবার দেখে আসার জন্য। তিনি দেখে জানালেন, মারা গেছেন।" ঘটনাক্রম যে আমার অজ্ঞাত তাও নয়, এর আগে একাধিক বার শুনেছি, তাও কেন যে ফাঁকা হয়ে যায় মন আর মাথা। মায়ের ওপর জমে থাকা রাগ আর বিরক্তির জায়গা নেয় তীব্র ভয় , হারিয়ে ফেলার ভয়।মা সারাদিন থতমত খায়, গুলিয়ে ফেলে অনেক কিছু, ভয় পায় তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারে, তাও তো মা আছে। গলা ঝেড়ে নতুন করে নম্বর মেলাই, দেখি আর কি বলার আছে তাঁর।

অনির ডাইরি আগস্ট, ২০২৬

অনির ডাইরি ২২ শে আগস্ট, ২০২৭ 
#অনিরডাইরি 


বন্ধুবান্ধব আমার বরাবরই খুব কম । যাদের গরিষ্ঠাংশই আমার বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী । লেবার সার্ভিসের কয়েকটা ব্যাচমেট, কিছু সিনিয়র -জুনিয়র, কোচিংয়ের পম্পা আর ট্রেনের নবু। আরও কয়েকজন ছিল বটে, বেকার বেলার সাথী। কালের নিয়মে আলাদা হয়ে গেছে পথ, রেখে গেছে লক্ষ লক্ষ সুখস্মৃতি।

আমার বাবার তুলনায় এই সংখ্যাটা নেহাৎ নস্যি। কত যে বন্ধু ছিল বাবার, গুণে শেষ করা যেত না। আমার মতোই যাঁদের গরিষ্ঠাংশই ছিল বাবার ইস্কুলবেলার বন্ধু। বাবাদের স্কুল, "আই আর বেলিয়াস ইনস্টিটিউট, হাওড়া" । সিরিয়া নাকি বাগদাদ থেকে আগত ইহুদী ধনকুবের আইজ্যাক র‍্যাফায়েল বেলিয়াস সাহেব খোদ প্রতিষ্ঠা করেন এই বিদ্যালয়। প্রায় দুই একর জায়গা, দু-দুটো পুষ্করিণী নিয়ে নির্মিত এই স্কুল নিয়ে চূড়ান্ত আত্মশ্লাঘায় ভুগত আমার পিতৃদেব।

যদিও আমাদের স্কুলগ্রুপের সঙ্গে বাবাদের গ্রুপের একটা বড় পার্থক্য ছিল। আমরা সবাই একই বছর মাধ্যমিক পাশ করি । বাবাদের গ্রুপে এমন অনেকে ছিলেন, যাঁরা অনুত্তীর্ণ হয়ে কয়েক বছর পর পাস করেন, অথবা আদৌ পাস করেননি। সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে ড্রপ আউট। আজব গ্রুপ ছিল বাবাদের। শুধুমাত্র ডিগ্রির তারতম্য ছিল তাই নয়, বাবাদের গ্রুপে কেউ ছিলেন লক্ষপতি (আশি নব্বইয়ের দশকে 'কোটি'টা সোনার পাথরবাটির মতো শোনাত)। আবার আমাদের মতন লোকজনেরও অভাব ছিল না, যাদের মাস পয়লাটা পয়লা তারিখেই ফুরিয়ে যেত ।

প্রতি বৃহস্পতি আর শনিবার আড্ডা বসত বাবাদের। একদিন দেবা কাকু আর একদিন সলিল কাকুর বাড়ি। সন্ধে সাতটা থেকে রাত নটা। পৌনে সাতটা বাজলেই চিৎকার জুড়ে দিত সাবেকি লাল ঘোরানো টেলিফোনটা। আমরা কোনোদিন বলতাম, 'শ্যামের বাঁশি ', কোনোদিন বলতাম 'নিশির ডাক'। প্যারালাল লাইন ভুল করে তুলে ফেললেই শোনা যেত দেবা/ সলিল কাকুর গদগদ কণ্ঠস্বর, "কিরে বেরোলি?" ঠিক যেভাবে ডাকে অন্তরা- চৈতালীরা। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর এক নাগাড়ে চলেছে এই আড্ডা। ঝড়-বৃষ্টি-তুফান,বনধ-কার্ফু, আমার বিয়ে, শ্রীমতী তুত্তুরী - যাই হোক না কেন বাবাকে ঠিক ওই নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে খুঁজে পাওয়া যেত না।

এর বাইরে ছিল হিরেন কাকু। এ যুগের ভাষায়, 'বাবার বেস্টি'। জাহাজে রেডিও অফিসারের চাকরি করতেন, বছরের অধিকাংশ সময়টাই সমুদ্রে ভেসে বেড়াতেন ভদ্রলোক। ছুটিতে যখন বাড়ি আসতেন, জোঁকের মতো আটকে থাকতেন বাবার সঙ্গে। আমাদের পুতিগন্ধময় পাঁচশো বছরের বুড়ি শহরটার অলিগলি দিয়ে, টো-টো করে হেঁটে বেড়াত দুজনে, আর কি যে এত গল্প করত।
সেটা বিরানব্বই সাল, তখনও ভাঙেনি বাবরি মসজিদ। পুজোর সময় ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরল হিরেন কাকু। বাকি পুজোটা আমাদের যে কী কেটেছিল, আশা করি বুঝতেই পারছেন। এই নিয়ে দাম্পত্যকলহ, আমার কান্নাকাটির পর বাবা একদিন হিরেন কাকুকে বলেই বসল, 'আমায় এবার ছাড়'। হাহা করে সেদিন হেসেছিল হিরেন কাকু। মাস দুয়েক পর যখন হঠাৎ দুঃসংবাদ এল, আর হিরেন কাকুর জ্যেষ্ঠ পুত্রকে নিয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে হল বাবাকে, যাবার আগে একটা কথাই বলেছিল, "বললাম বলে সত্যিই চলে গেল?" আন্দাবান থেকে হিরেন কাকুর দাহকার্য সেরে বাড়ি ফিরে বাবা বলেছিল, " মর্গে গিয়ে যখন দেখলাম হিরেন শুয়ে আছে, তখন বিশ্বাস হল যে হিরেন তাহলে সত্যিই মারা গেছে।"

এছাড়াও ছিল নকশাল আমলের বন্ধুবান্ধব। যাঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। যাঁরা বেঁচে ছিলেন কেবল আমার বাবার গল্পে। নকশাল পিরিয়ডের জীবিত বন্ধুদের মধ্যে সন্তোষ জেঠু আর গ্যাঁড়া চাঁদু ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বর্গীয় সন্তোষ মিত্র ছিলেন নেতা মানুষ, ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়া পরতেন না। প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক ছিল ওনাদের সাথে। প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়ি, বাজার যাবার পথে নিত্য ঢুঁ মারত বাবাও। গ্যাঁড়া চাঁদু বলে ভদ্রলোককে অবশ্য কোনোদিন স্বচক্ষে দেখিনি আমি। সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে ভদ্রলোক ছিলেন বাবার স্বঘোষিত দেহরক্ষক। তাঁর জন্যই জীবিত ছিল বাবা। নানা মজার মজার ঘটনা ঘটাত লোকটা। প্রায়ই শুধাতাম বাবাকে, যে এই মজাদার লোকটা গেল কোথায়? উত্তর পেতাম, ' আছে, আছে, সব আছে।' তারপর এল সেই দিন, কাকভোরে দৌড়োতে দৌড়োতে এলেন বাবার বিদ্যালয় জীবনের এক সহপাঠী। " সর্বস্ব দিয়ে জমিটা কিনেছিলাম ভাই, আজ ভিত পুজো, এখন ক্লাবের ছেলেরা এসে বলছে, খানিকটা জমি ক্লাবের নামে লিখে না দিলে, বাড়ি বানাতে দেবে না।" ' চল আসছি ', বলে গায়ে একটা জামা গলিয়ে কোথায় যেন বেরিয়ে গেল বাবা। ফিরে এল দুপুর গড়িয়ে, মুখে কোন কথা নেই। সন্ধ্যেবেলা এত মিষ্টি নিয়ে হাজির সেই কাকু, নির্বিঘ্নে মিটেছে সব। ক্লাবের ছেলেগুলোকে শুধু একদিন পেট ভরে মাংস ভাত খাওয়াতে হবে। কাকু বিদায় নেবার পর শুধালাম কীভাবে সম্ভব হল এটা? জবাব এল, 'গ্যাঁড়া চাঁদু'।

এই গ্যাড়া চাঁদু বলে ভদ্রলোকের উপস্থিতির প্রমাণ আরেকবার পেয়েছিলাম । ততোদিনে এসে পড়েছে এই সহস্রাব্দ । রাত তখন এগারোটা। হঠাৎ দৌড়োতে দৌড়োতে এলেন এক পরিচিত ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী। " মেয়ে সকালবেলায় কলেজে বেরিয়ে এখনও বাড়ি ফেরেনি -"। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন, থানাতেও গিয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি ইত্যাদি বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন আইনরক্ষকেরা। ওনার স্ত্রীকে মা - জেঠাইমার ভরসায় রেখে, বাবা বেরিয়ে গেল। তবে এবার আর একা গেল না। ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে গেল। বাড়ি যখন ফিরল তখন প্রায় ভোর হয়, হয়। গ্যাড়া চাঁদুর সৌজন্যে সেইরাতেই সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল মেয়েটির। ফিরিয়ে আনা যায়নি যদিও, ফিরতে চায়নি মেয়েটি। তবে সেতো অন্য গল্প।

এর বাইরে বাবার আর যে দুই বন্ধুর কথা না বললেই নয় তারা হলেন স্বপন কাকু আর সুশীল কাকু । স্বপন কাকু খর্বাকৃতি, কাঠিসার চেহারা। খাদ্য দপ্তরের কেরানি, অকৃতদার। ধপধপে সাদা ধুতিপাঞ্জাবি ছাড়া কিছু পরতেন না। সুশীল কাকু ও খর্বাকৃতি ছিলেন, তবে স্বপন কাকুর মতন অতটা নয় । মিশমিশে কালো গায়ের রঙ। বারোমাস একটাই ফ্যাকাশে হলুদ টিশার্ট আর স্টিল গ্রে প্যান্ট পরে আসতেন। প্রতি রবিবার সকালে আড্ডা বসত এই তিনজনের। সুশীল কাকু আর স্বপন কাকুর বৈশিষ্ট্য ছিল যে এনারা দুজনেই কুষ্ঠিবিচার- হাত দেখা এইসব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। কিন্তু কখনই বাণিজ্যিকভাবে এগুলো প্রয়োগ করতেন না । এদের দুজনেরই বক্তব্য ছিল যে অর্থের বিনিময়ে হাত দেখলে নিজের ভাগ্য থেকে খানিকটা তাদের দিয়ে দিতে হয়। পরিচিত কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে দুইজনেই খুশি খুশি হয়ে তার জবাব দিতেন। প্রায়শ তা অব্যর্থ হত। সেই গল্প শুনে একবার আমার এক পিসিমা গেছেন হাত দেখাতে বাবাদের আড্ডার মাঝে। পিসিমা একা আসেননি, সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর সদ্য মাধ্যমিক পাশ কন্যা । সেই যুগের ডাকসাইটে সুন্দরী, স্কুলে বরাবর প্রথম হওয়া মেয়ে। অসম্ভব উদ্ধত এবং অহংকারী। তিনি যখন শুনলেন যে তার মা দোতলায় গেছেন হাত দেখাতে তিনি গটগট করে দোতলায় উঠে এলেন । সুশীল কাকু বা স্বপন কাকু কাউকেই তাঁর পছন্দ হল না। অপরিচ্ছন্ন, গরীব গুর্ব মানুষ যত। তিনি অত্যন্ত উদ্ধতভাবে বললেন পিসিমাকে, " চলো চালো, যত সব আজেবাজে লোকের সঙ্গে গল্প করতে যাও তুমি"।
সুশীল কাকু বড় পিসিমার হাত দেখছিলেন । দেখতে দেখতে হঠাৎ থেমে গেলেন এবং ওই দিদির দিকে তাকিয়ে বললেন," মা তোমার বড্ড অহংকার হয়ে গেছে । এই অহংকার টিকবে না । তুমি সামনের পরীক্ষাতেই হোঁচট খেয়ে পড়বে । আর তুমি নিজের বিবাহিত জীবনের যে স্বপ্ন দেখেছ, সেটাও সত্যি হবে না । সেখানেও তুমি খুব একটা সুখী হতে পারবে না।"

বছর খানেক বাদে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করতে পারলেন না দিদি । বিয়ে হয়। বিয়ের পর দিদি জানতে পারে যে ওই জামাইবাবুর একজন পূর্ব প্রেমিকা আছেন। ভদ্রমহিলা জামাইবাবুর সহকর্মী। দিদিকে শুনতে হয়, " ও থাকবেই । তুমি মানতে পারলে থাকো -"। এমন হয়তো অনেক বাঙালি বাড়িতেই হয় বা হত, কিন্তু সুশীল কাকুর ঐ অব্যর্থ ভবিষ্যৎবাণী একটা প্রবাদ পরিণত হয় আমাদের পরিবারে।

আজ না বাবা আছে, না বাবার বন্ধুবান্ধব । কিন্তু কোথাও তো আছে । কোথাও না কোথাও নির্ঘাত জমে উঠেছে জমজমাট আড্ডা। একে একে আমরাও গিয়ে হাজির হব সেখানে। তারপর দেখা যাবে, কে বেশি আড্ডাবাজ, বন্ধুবৎসল, বাবা না বাবার মুটকি মেয়েটা ❤️

অনির ডাইরি ১১ ই আগস্ট, ২০২৬
#অনিরডাইরি 




“মা, আঙ্কল কি ভালো গো?” স্নান সেরে বেরোতে না বেরোতেই, তিনি এক গাল হেসে কইলেন।

আঙ্কেল এক দীর্ঘদেহী, গৌরবর্ণ, অতীব সুদর্শন বৃদ্ধ। আমাদের আবাসনের মার্কেটে ভদ্রলোকের একটি দোকান আছে। সেখানে মূলতঃ দুধ, চকোলেট, আইসক্রিম আর কোল্ড ড্রিঙ্ক বিক্রি হয়। আশা করি বুঝতেই পারছেন, আমার কন্যা আঙ্কেলের দোকানের নিত্য খরিদ্দার।
আঙ্কল আদতে সম্ভবত পঞ্চনদের দেশের বাসিন্দা। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ছিলেন, অবসরের পরও এই রাজ্যের মায়া কাটাতে পারেননি। কাবুলিওয়ালাদের মতন পোশাক পরেন, নিভাঁজ, নিখুঁত। ভীষণ কম কথা বলেন এবং তার থেকেও কম হাসেন। ভদ্রলোককে সবাই সমীহ করে চলে।

ব্যতিক্রম আমার কন্যা। দাদুকে হারানো ইস্তক বুড়ো মানুষ দেখলেই তুত্তুরী গলে যায়। তাদের মধ্যে দাদুকে খোঁজে হয়তো। আঙ্কেলের সঙ্গেও গায়ে পড়েই গল্প করে অনেক সময় এবং দাবী করে, আঙ্কেলও নাকি সহমর্মিতা দেখান। আজ আবার কী মাথা খেয়ে এল বুড়োর, কে জানে! আর গেলই বা কখন?

তিনি উৎসাহের আতিশয্যে বলেন, “আরে, তুমি স্নানে ঢুকলে? আমারও মাথাটা সকাল থেকে পড়ে পড়ে ঘেঁটে ছিল, তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি, ফ্রেশ অক্সিজেন নিয়ে আসি।”

এই ভরদুপুরে, খটখটে রোদে তুই অক্সিজেন নিতে গিয়েছিলি? তাও আবার বাজারে! কন্যার বিগলিত মুখচ্ছবি দেখে বলতে গিয়েও বলি না। তিনি সুযোগও দেন না, বলেই যান উচ্ছ্বসিত স্বরে, " গিয়ে দেখি, আঙ্কেল হাফ প্যান্ট পরে বসে আছে-।" এই গরমে পাঠান স্যুট ছেড়ে আঙ্কেল মাঝেমধ্যে হাফ প্যান্ট আর গোলগলা গেঞ্জি পরেন বটে। সে তাঁর ইচ্ছে, তিনি যা খুশি পরুন। 

তুত্তুরী বলে চলে, “আমি তো বাইরে ঘুরঘুর করছিলাম, আঙ্কেলই ডাকল, 'এসো এসো, তোমারও সামনে পরীক্ষা তো?' মাথা যেই নাড়িয়েছি, বলেন কিনা, 'সবাই পরীক্ষার জন্য চকলেট, বিস্কুট, কেক কিনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমার জন্যেও গুছিয়ে রেখেছি।' বলে, মা, একশো টাকার জিনিস, আমায় মাত্র ষাট টাকায় দিয়ে দিল গো!”
শ্রীমতীর হাতে একটি ঝলঝলে প্যাকেট, প্যাকেট ভর্তি কেক, বাউলি, বিস্কুট। তিনি মাসিক হাতখরচ থেকে বেশ অনেকটা খরচ করে কিনে এনেছেন। আদৌ দরকার কিনা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

দ্বিপ্রাহরিক জলখাবার বানাতে বানাতে বলি, “দেখেছে, তোর মাথাটা গোল, দিয়েছে টুপি পরিয়ে। দেখ, নির্ঘাত ডেট এক্সপায়ার হতে বসা জিনিসপত্র। আর তোকে তো বাড়ি থেকে টিফিন বানিয়েই দেওয়া হয়।”

বেলুনে পিন ফোটানোর মতো চুপসে যায় তাঁর মুখটা। "তাই তো?" কিছুক্ষণ নীরব থাকেন, তারপর নালিশের সুরে বলেন, “ছিঃ ছিঃ, আঙ্কেল শেষে আমায় ঠকিয়ে দিল! মা, আমি আর বাজার যাব না।” কেউ তাকে বাজার যেতে বলে না, তিনি নিজেই জোরাজুরি করেন দোকান-বাজার করার দায়িত্ব চেয়ে। 

কয়েক মুহূর্ত পরেই পুনরায় ফিরে আসেন রান্নাঘরে। “মা, শুনে রাখো, আমি আর বাড়ি থেকেই বেরোব না।” এমন অনেক কিছুই আমি নিত্য শুনি। আজও শুনলাম।

আরও কিছু মুহূর্ত কাটে, তিনি আবার আসেন। গলায় এবার সামান্য খুশির ছোঁয়া নিয়ে বলেন, “মা, আমি দেখলাম, বেশিরভাগই ডেট অফ এক্সপায়রি অক্টোবর, নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে।”

ঘুরে তাকাই তাঁর দিকে, কোমরে হাত দিয়ে দুঁদে ইন্সপেক্টর গড়গড়ির মতো শুধাই, “সবগুলো দেখেছিস?” তিনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে যান। খানিক বাদেই ফিরে আসেন অবশ্য, প্যাকেট ভর্তি চকোলেট-বিস্কুট নিয়ে। একটি একটি করে বার করেন, সম্ভাব্য বাতিলের তারিখ পড়েন, গ্যাসের টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখেন। এইভাবে দেখা যায়, কিছু জিনিস সত্যিই নভেম্বর বা ডিসেম্বর অবধি চলবে, গোটা দুই অবশ্য তেইশে আগস্টেই শেষ। তবে তাও তো সময় আছে।

তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, “যাক মা, আঙ্কেল তাহলে ঠকায়নি।” নীরবে মাথা নাড়ি। তিনি তাতে আরও পুলকিত হয়ে বলেন, “ভাবো মা, একশো টাকার জিনিস মাত্র ষাট টাকায়! শুধু কি তাই? দুটো আইসক্রিম কিনলাম, তাতেও আঙ্কেল দশ-দশ কুড়ি টাকা ছাড় দিল।”

মায়ের মুখে কিউমুলোনিম্বাসের ছায়া ঘনাতে দেখে তিনি তড়িঘড়ি বলেন, “একটা তোমার জন্যেও এনেছি। আঙ্কেলকে বললাম, আগের দিন যে ক্যারামেল আইসক্রিম দিয়েছিলেন, আমার মায়ের খুব ভালো লেগেছিল। আজ মা বাড়িতেই আছে, আরও দুটো দিন তো।” মৃদু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে জ্বলন্ত গ্যাসের দিকে ঘুরে যাই, মা হওয়া কি মুখের কথা। বাপরে !





 অনির ডাইরি ৫ই আগস্ট, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



সপ্তাহ দুয়েক ছুটি নিয়েছি। না নিয়ে উপায় ছিল না। ঠিক দুই সপ্তাহপর শুরু হচ্ছে তাঁর দশম শ্রেণীর অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা। আশৈশব, শ্রীমতী তুত্তুরীর কোনো প্রাইভেট টিউটর ছিল না। ক্লাসের শিক্ষক মহাশয় বা দিদিমণি যখন প্রশ্ন করতেন, "কে কতজন গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে যাও," শ্রীমতী সবথেকে জোর গলায় বলতেন যে তিনি শুধুমাত্র তাঁর মায়ের কাছেই পড়েন। নবম শ্রেণিতে উঠে রণে ভঙ্গ দিল তুত্তুরীর জননী। একে তো কম্পিউটার সায়েন্স ব্যাপারটা তাঁর মাথার ওপর দিয়ে গেল, দ্বিতীয়ত বদলির চাকরির সৌজন্যে দ্বিঘণ্ডিত হয়ে গেল আমাদের পরিবার।


শৌভিক আর তুত্তুরী চলে এল মহানগর, ভর্তি হল নতুন স্কুলে, আমি পড়ে রইলাম সেই তাম্রলিপ্ত নগরী। "মরিয়া না মরে রাম" এর মত তাও কামড়ে রইলাম ইংরাজি ভাষা (languag), বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়। ইংরাজি সাহিত্য পড়ানোর দায়িত্ব জবরদস্তি চাপল তুত্তুরীর বাবার কাঁধে। অঙ্ক - পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নের জন্য নিযুক্ত হলেন তিনজন গৃহশিক্ষক। 


 মোটেই খুশি হলেন না শ্রীমতী তুত্তুরী। তিনজনের কাউকেই ওর পছন্দ নয়। ওরা কেউই নাকি মায়ের মতো পড়াতে পারে না। মা কেমন ছ্যাবলামি করতে করতে পড়ায়, বিছানায় গড়াগড়ি খেতে খেতে পড়া চলে, ইতিহাসে মিশে যায় ভূগোল, সাহিত্যের মাঝে আত্মপ্রকাশ করে বিজ্ঞান। নবম শ্রেণী এইভাবে নিমরাজি হয়ে কাটলেও, দশম শ্রেণীতে উঠে তিনি একেবারে বেঁকে বসলেন। "হয় তুমি পড়াও, নয়তো আমি নিজে যা পারব, পড়ব।"


আমরাও দেখলাম, রসায়নের স্যারের মধ্যে বিন্দুমাত্র সিরিয়াসনেস নেই। কখন আসবেন সেটাও শ্রীমতী তুত্তুরীকেই বার বার ফোন বা মেসেজ করে জানতে হয়। ফোন বেজে যায়, শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে। মেসেজ ডেলিভারি হয় না। তারওপর, তাঁর অসাধারণ সময়জ্ঞান। রবিবার তিনটে বলে তিনি আসেন সন্ধ্যা ছটায়। আসেন না অনেকবার, পরের দিন হয়তো মেসেজ করে বলেন, তারপরের দিন আসবেন। এই করতে করতে নবম শ্রেণীর বার্ষিক ইতিহাস পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি রসায়ন পড়াতে এসেছিলেন।


 সময়ের ব্যাপারে তালকাটা হলেও ছেলেটা মানুষ হিসেবে ছিল নিপাট ভালো, গোবেচারা টাইপ। পদার্থবিদ্যার ছেলেটির সময়জ্ঞান টনটনে হলেও বাকিটা একেবারে পচে যাওয়া। 'বুঝিনি' বললেই তিনি রেগে আগুন, তেলে বেগুন। খুঁচিয়ে আমাদের সংসারের নানা কথা জানতে চাইতেন, আমাদের গৃহশ্রমিকদের জাত ধর্ম নিয়ে উল্টোপাল্টা মন্তব্য করতেন। শুধু কি তাই? তিনি কত বড় পুরুষ সিংহ প্রায়ই সেই গল্প শোনাতেন ছাত্রীর কাছে। ভোম্বল মার্কা ছাত্রীটি দেখতে হাবাগোবা হলেও, বাবামায়ের কাছে যে কিছুই গোপন করে না, এটা বুঝি তার বোধগম্য হয়নি। যেদিন তিনি ছাত্রীর সামনে তার উচ্চ বডি কাউন্টের গল্প ফাঁদলেন, সেই রাতেই শৌভিক মেসেজ করে বলল, "ভাই, তোকে আর আসতে হবে না। বেতন তো অগ্রিম দেওয়াই থাকে।" 


 আপাতত ফিজিক্স- কেমিস্ট্রি দুটোই আমার মাথায় চেপেছে বাকি কেবল অঙ্ক। তাই দিয়ে নিত্য অভিযোগ তুত্তুরীর।  "স্যার ভালো, কিন্তু তোমার মতো করে বোঝায় না। আমি কিছুই পারি না" । সেই অঙ্ক নিয়েই বসেছি আমরা। শৌভিক বেরিয়ে গেছে অফিসে। জানলার বাইরে পুরো কালো আকাশ। অঝোরে ঝরছে বারিধারা, ভিতরে ঢুলুঢুলু আমার কন্যা । পড়তে বসলেই ঘুম পায়, শুধু ওনার নয়, আমারও । গতরাতেই তো পরিবেশ বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি নিজেই । ঘুম থেকে উঠে দেখি তিনি গজগজ করছেন,  "আমি লিখছি, আর মা ঘুমাচ্ছে। এটা মা না বিন লাদেন?"  


আজ আমার বলার পালা, কিন্তু বলি না । উল্টে প্রশ্ন করি, 'চা খাবি?' জবাব আসে, না । তাহলে 'কফি'? তিনি বলেন 'ছি'। কফির গন্ধে তাঁর ভয়ানক বিরাগ । তাহলে আমুল স্প্রে গুলে দেব খাবি? চনমনিয়ে ওঠেন তিনি। " দাদুর মতো করে"! আমার শৈশবে যে রাতে ভালো কিছু রান্না হত না, রুটির সাথে আমুল স্প্রে গুলে দিত বাবা। অনেকটা গুঁড়ো দুধ, অল্প চিনি আর নামমাত্র জল।


সহজে গুলতেই চাইত না তখনকার গুঁড়ো দুধ। ড্যালা ড্যালা হয়ে ভাসতো বাটিজুড়ে। কাঁচা খেলে আটকে থাকত মাড়িতে। শ্রীমতী তুত্তুরী শৈশবেও একবার গুলে দিয়েছিল বাবা। বড় মামির কাছে মিল্ক মেড খেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল শিশু তুত্তুরী। " আর একটু দেবে গো -" বলে বড়মামীর পিছন পিছন ঘুরছিল মেয়েটা, দেখে বড় মামা তো হেসেই খুন। "এই খেয়েই গলে গেলি? দাঁড়া, তোকে এমন জিনিস খাওয়াব না-" বলে বাজার থেকে দশ টাকার আমুল স্প্রের প্যাকেট কিনে এনে আমার বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল, "ওকে একটু ওই রকম করে গুলে দাও তো মেজজেঠু, যেমন ভাবে আমাদের গুলে দিতে ছোটবেলায়।"  দাদুর হাতে গুলে দেওয়া, কড়কড়ে চিনি ছড়ানো, ঘন থকথকে আমুল স্প্রের গল্প তুত্তুরীর অন্যতম সুখের শৈশবস্মৃতি। 


বাবার মতো নয়, সাধারণ দুধের মতো গুলে আনি, আধ কাপ করে। আগের মতো না হলেও আজও ভাসে হালকা দুধের ড্যালা। বলি, সরিয়ে রাখ বইপত্র, আমার গায়ে ঠেস দিয়ে বস। তারপর আয়, বৃষ্টি দেখি আমরা। বলি, অল্প অল্প করে চুমুক দে। জলদি শেষ না হয়ে যায় এই অমৃত। সত্যি অমৃতের মতো তারিয়ে তারিয়ে খায় আমার মেয়ে। খেতে খেতে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, "যদি অঙ্কে ফেল করি, তুমি আমায় তাড়িয়ে দেবে না তো?"  শৌভিকের বচন ধার নিয়ে বলি," দূর, পাশ তো সবাই করে, ফেল করাটাই তো আসল কৃতিত্ব বাবু। তুই লড়ে যা- "

Monday, 13 July 2026

তুত্তুরী আর আমি

তুত্তুরী আর আমি ৮ই আগস্ট, ২০২৬



👧🏻 — মা, please let's call it a day.

👩🏻 — আর এক সপ্তাহ পরেই তোর পরীক্ষা, বাবু।

👧🏻 — Math is not mathing and brain is simply not braining.

👩🏻 — অ্যাঁ!

👧🏻 — মানে আমার মাথা চলছে না এবং এই অঙ্কগুলো আমার দ্বারা হচ্ছে না।

👩🏻 — হে ভগবান, এটা কী ভাষা!

👧🏻 — আমরা এই ভাষাতেই কথা বলি। Math is not mathing, Physics is not physicsing, ChatGPT is not ChatGPTing. ChatGPT-কে বললে, ও ঘুরিয়ে বলে, “পুরোযা is not পুরোযাing.” 😁😁


তুত্তুরী আর আমি ২৫ শে জুলাই, ২০২৬


👧🏻 - আমি দেখে নিয়েছি, এ বছর আর তুমি মাঝরাতে আমায় ঘুম থেকে তুলে কোন সারপ্রাইজ দিচ্ছ না। ( আগামী কাল তাঁর জন্মদিন কিনা, প্রতিবছর মধ্যরাতে তাঁকে চমকে দিই নানা উপহারে।) 

👩🏻- (এ বছরের উপহারগুলো আগেই দিয়ে দিয়েছি বটে।তাও শুধাই -) কি করে জানলি? 

👧🏻 - তোমার আমাজন আর মিন্ত্রা অর্ডার হিস্টরি দেখা হয়ে গেছে। গুগল সার্চ হিস্ট্রি চেক করে নিয়েছি। আর বাবাকেও জিজ্ঞাসা করে দেখে নিয়েছি কোথাও কিছু লুকিয়ে রেখেছ কি না। 

👩🏻- হে ভগবান, এটা বাড়ি না জেলখানা ঠাকুর।


 তুত্তুরী আর আমি ১৩ই জুলাই, ২০২৬

( শত খানেক কিলোমিটার দূর থেকে মুঠো ফোনে বার্তালাপ) 


👩🏻 - তোর (WhatsApp) স্টেটাসটা দেখতে পাচ্ছি না তো? 

👧🏻 - আমি কোন স্টেটাস দিইনি।

👩🏻- ওমা কেন? তুই ঠিক আছিস তো 🙈

👧🏻 - What status to post?

👩🏻- কেন, " No mommy at home and I'm বগল বাজাওইং , মোবাইলের পিন্ডি চটকাওইং"  তো লিখতেই পারিস 😁। 

👧🏻 - প্রজেক্ট ডুইং 😡, তোমার এই অমৃত বাণীটা স্ক্রিনশট তুলে স্টেটাস লাগাই দাঁড়াও। কি ভাবে তুমি বাড়ি না থেকেও আমায় জ্বালাতন করো।


তুত্তুরী আর আমি ১০ই জুলাই, ২০২৬


👧🏻- তোমায় না জিজ্ঞাসা করেই তোমার ফোনটা নিয়েছি।

👩🏻 - বাবা রে, কি ফর্মাল, কি বিনয়ী!

👧🏻- essay টার ছবি তুলে Gemini কে পাঠাব। তোমায় পাঠালেই, তুমি বলো, ' cute eatable fingers"। 

👩🏻 - (হেসে) তা বলি বটে। 

👧🏻- আমি ChatGPT কে তোমার মেসেজটা পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কি ব্যধি, যেখানে মানুষের আঙুল খেতে ইচ্ছে করে? ও বলল, এটা Mommy Syndrome।

Saturday, 6 June 2026

অনির ডাইরি জুন ২০২৬

 অনির ডাইরি ৩০শে জুন, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


কৃষ্ণেন্দু আর রীনা ব্রাউন, নাম তো শুনাহি হোগা। মাথার উপরের বিজলি বাতিটা যদি পটাং করে না জ্বলে উঠে থাকে, তাহলে আবার বলি, " এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো -"। আজ্ঞে হ্যাঁ, সেই অমর জুটি। 

এবার ধরুন রীনা ব্রাউন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বটে, কিন্তু তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই। রূপে তিনি পাক্কা শ্বেতাঙ্গিনী। সবাই দেখলেই বলে সেলাম মেমসাহেব। রীনা ব্রাউনের গর্ভধারিণী অর্থাৎ ছায়া দেবী মেয়ের সঙ্গে সাঁট করে টুক করে একদিন পাড়ি দিলেন বিলেত, সেখানে রীনা ব্রাউন নাম এবং ভোল পাল্টে জনগণকে বলতে লাগলেন তিনি খাঁটি ব্রিটিশ, তাঁর জনক পরলোকগত কোন কর্নেল বা মেজর। আর ছায়া দেবী হলেন তাঁর ভারতীয় আয়া। 


বেশ মজা, দিব্যি মজা। বিলেতে গিয়ে রীনা ব্রাউন মস্ত তারকা হয়ে গেলেন। মিটমিটে ব্রিটিশ তারা নয়, ঝাঁ চকচকে হলিউড স্টার। তাহলে এবার কৃষ্ণেন্দুর কি হবে গো - তার আগে বলে রাখি কৃষ্ণেন্দু এখানে কলকাতা পুলিশের একজন টিকটিকি, থুড়ি ডিটেকটিভ। না মোটেই আমার আপনার মত কেলেপনা টিকটিকি নন, খাস বিলেতি সাহেব। আরে মশাই বলছি না, সময়টা ১৯২৭ সাল, কলকাতা পুলিশের নাম তখন এমপিরিয়াল পুলিশ।


কোথায় কলকাতা আর কোথায় হলিউড, তাহলে এবার কৃষ্ণেন্দু আর রীনার মিলন হবে কেমনে? দেখুন গল্পের গরু যদি গাছে উঠতে পারে, আমাদের রীনা ব্রাউন কি কলকাতা আসতে পারে না? পারে না কলকাতা আসতে? ছায়া দেবী সমেত রীনা ব্রাউন এসে পৌঁছলেন কলকাতা ছাড়ুন সুদূর বিষ্ণুপুর, একখান পাতি দিশী ছবির শুটিং করতে। দিশী ছবিতে হলিউডের নায়িকা, মার্কা প্রশ্ন সিম্পলি গিলে ফেলুন -


এবার কথা হল, তেনারা না হয় এলেন বিষ্ণুপুর, কিন্তু এই একশ কোটির দেশে কৃষ্ণেন্দুর সাথে সাক্ষাৎ হয় কেমনে। সুযোগ করে দিলেন সেই অসামান্য ছবির বাঙালি প্রযোজক খোদ, টুকুস করে মরে গিয়ে। মরে মানে এক্কেবারে মার্ডার, গলার নলি কেটে খুন। তো এই খুনের তদন্তভার কার উপর পড়ল বলুন তো -একদম ঠিক আমাদের বিলেতি কৃষ্ণেন্দু। তো তিনি কু ঝিকঝিক করতে করতে রওনা দিলেন বিষ্ণুপুর। সঙ্গে যাকে নিলেন, সেও কৃষ্ণেন্দু। ধরে নেওয়া যাক, তার নাম কৃষ্ণেন্দু নম্বর ২। তিনি অবশ্য এদেশী, বঙ্গসন্তান। এককালে তিনিও ঐ ইম্পেরিয়াল পুলিশের সার্জেন্ট ছিলেন, তখন হাফ প্যান্টু পরতেন, আজকাল ধুতি চাদরে পাক্কা আঁতেল বাঙালি। 

 পরাধীন ভারত তথা কলকাতার প্রেক্ষাপটে এই দিশী বিলেতি দুই পুলিশের দোস্তি আর টানটান রহস্য এই দুইয়ের লোভেই এনাদের বই পড়তাম। তখন অবশ্যি এনারা কৃষ্ণেন্দু টৃষ্ণেন্দু ছিলেন না। নাম ছিল ক্যাপ্টেন সাম উইন্ডহ্যাম আর সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। সেসব এখন অতীত, আপাতত এনারা কৃষ্ণেন্দু ১ আর ২। পঞ্চম বইয়ের শেষে যখন মিথ্যা রাজদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে বাঁচতে সুরেন বাড়ুজ্জে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল (পড়ুন পালিয়েছিল) ভেবেছিলাম আবীর মুখুজ্জের এই সিরিজ এখানেই বুঝি শেষ। 


ও বাবা, ষষ্ঠ বই, তার পোশাকী নাম The Burning Grounds এ দেখি সুরেন বাবু আবার আসিছে ফিরিয়া। এসেছেন তো এসেছেন এক্কেবারে সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু হয়ে। তিনি চার বছর ইউরোপের বিভিন্ন হোটেলে আনাজ কেটে আর রান্না করে খুঁজে পেয়েছেন তাঁর রীনা ব্রাউনকে। কিন্তু ঐ যে ছবি বিশ্বাস বাবা, জানতে পেরেই হুমকি দিলেন, " কি ফিরিঙ্গি নারী বিয়ে করবা, জানো না ওরা ইয়ে করে ইয়ে করে না -"। তো অঞ্জন দত্তের গানের সুরে গলা মিলিয়ে আমাদের সুরেন বাবুও, " বাঙালির ছেলে তাই গলায় গামছা দিয়ে -" পালিয়ে এসেছেন স্বদেশ। কিন্তু মনটা পড়ে আছে সাত সাগর আর তেরো নদীর পারে, তাঁর স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার কাছে। 


যাই হোক গল্পের গরু, ঘোরে ফেরে, চড়ে বেড়ায়। দুই কৃষ্ণেন্দু দুই রীনা ব্রাউন নিয়ে অধম পাঠিকা ভাবে ব্যাপারটা হচ্ছে কি? আমার রহস্য রোমাঞ্চ কুথা গেল। খুনী ধরার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে লেখক টেনে আনেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী নেলি সেনগুপ্তকে। যিনি জন্মসূত্রে ছিলেন বিদেশিনী। এই দম্পতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দুই নম্বর কৃষ্ণেন্দু ঠিক করে সে তার রীনা ব্রাউনের কাছেই ফিরে যাবে। আর প্রথম জন অনেক 'ছুটাদৌড়া ' করে আবিষ্কার করেন সব খুনের পিছনে কলকাঠি নাড়িকা হলেন ছায়া দেবী অর্থাৎ তাঁর রীনা ব্রাউনের জন্মদাত্রী। তাও করতে পারতেন না, যদি না তিনি নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে স্বীকার করতেন। উদ্দেশ্য কন্যার ভারতীয় রক্ত লুকানো। হুঁ হুঁ বাবা, আমেরিকা হল জাত বর্ণ বিদ্বেষীদের দেশ, কেলে রক্ত ওয়ালা কাউকে ওরা হিরোইন বানাবে থোড়াই।


লেঃ পাঠক এবার বসে বসে ভাব, এ কি হল, কেন হল, কবে হল। বছরের শুরুতে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ১২ মাসে অন্তত ১২টা বই পড়ব। বাবার অসুস্থতা এবং হারিয়ে যাওয়ার সৌজন্যে বছর অর্ধেক হতে চললেও এক পাতাও পড়ে উঠতে পারিনি। মন এবং মাথা কিছুটা থিতু হতে ভাবলাম হালকা কিছু দিয়ে শুরু করি, আবীর মুখার্জি আমার প্রিয় লেখক। এর আগের চারটে বইই অসাধারণ লেগেছিল। পঞ্চমটা একটু ঝুল মনে হলেও, এতটা অধঃপতন হয়নি লোকটার। এই বইটা খোলা ইস্তক সুকন্যা বলে যাচ্ছিল, " অনি পড়ো না, সপ্তপদীর বটতলা কপি"। পড়ে মনে হল না শুধু সপ্তপদী লয়, উত্তরফাল্গুনীর পাঞ্চ ও কিছুটা আছে বটেক। আর একটা জিনিস বুঝতে পারলাম সু কেন এত গরীব, ওর কথা গুলো বাসী হয়ে এমন মধুর হয়ে ওঠে যে 😁 (ক্যা*" না ভাই, আম্মো গরীব)


পুনশ্চ - ফ্রাস্টু খেয়ে ভাবছি আসল সপ্তপদীটাই একবার পড়ে ফেলি। এই মওকায় দুই নম্বর বইটাও পড়া হয়ে যাবে। নাকি ফিরে যাব রহস্য রোমাঞ্চের রাণী আগাথা ক্রিস্টির কাছেই। ভাবব খন , আপাতত তো কিছু দিন ওয়েব সিরিজ দেখি।


অনির ডাইরি ২১ শে জুন, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


আজ বুঝি বাবা দিবস! ফি বছর আজকের দিনে বাবাকে নিয়ে এক পাতা ডাইরি লিখতাম, পোস্ট করতাম একটা সোহাগী ছবি। এ বছর তো বাবাটাই আর নেই। ফেসবুকের পাতা জুড়েও কেবল যোগ ব্যায়ামের ছবি। 

মেয়েকে পড়তে বসিয়েছিলাম, বিষয় ইতিহাস। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর অবদান - 


পড়তে, পড়াতে মনে হল, পুস্তক নির্ভর তাত্ত্বিক আলোচনার থেকে, গান্ধী সিনেমাটা দেখলে বোধহয় বেশী ভালো ভাবে বুঝতে পারবে মেয়েটা। শ্রীমতী তুত্তুরী সাধারণত সিনেমা দেখতে একেবারেই চান না। এই প্রজন্মের মনোযোগ ধারণের ক্ষমতা ক্রম হ্রাসমান (সবাই নয় অবশ্যই)। সিনেমা -সিরিজ ছাড়ুন এরা গানও শোনে তো ম্যাশ আপ। পাঁচটা গানের জগাখিচুড়ি। প্রস্তাব দেবার সময় তাই স্বপ্নেও ভাবিনি যে তিনি এককথায় রাজি হয়ে যাবেন। 


শুরু হল স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরোর গান্ধী। তরুণ বেন কিংসলেকে দেখে আমার কন্যা তো পুরো ফিদা। তারওপর রোশন শেঠ। অমরীশ পুরীকে দেখে তো বিশ্বাসই করতে পারছিল না, যে দশ চক্রে ইনিই মোগাম্বো। এক ফাঁকে শৌভিককে বলে আসি, " তোর মেয়ে গান্ধী দেখছে রে, ধরে নে এটাই তোর বাবা দিবসের উপহার।" শ্বশুরমশাই আজ জীবিত থাকলে যে কি খুশিই না হতেন - 


" আর দাদু?" সিনেমা থামিয়ে প্রশ্ন করে তুত্তুরী, এই দাদু মানে আমার বাবা। জবাব দিতে গিয়ে ঢোঁক গিলি আমি। তারপর মাথা নাড়ি। "কেন?"  আবার প্রশ্ন করে তুত্তুরী। অজান্তেই খানিক স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ি আমি, কারণ এই সিনেমায় সুভাষ বোস নেই। "তাই তো", বলে সোজা হয়ে বসে তুত্তুরী। 


কি যে অসম্ভব সুভাষ (মার্জনা করবেন নেতাজী) অনুরাগী ছিল লোকটা। ভগৎ রাম তলোয়ারের জীবনী নিয়ে মিহির বোসের লেখা The Indian Spy: The True Story of the Most Remarkable Secret Agent of World War II, বইটা পড়ে বাবার সঙ্গে নেতাজী চর্চা করতে গিয়েছিলাম। তলোয়ার, যার কোড নেম ছিল সিলভার, নেতাজীকে সাহায্য করেছিল ভারত থেকে আফগানিস্তান হয়ে বার্লিন যেতে। একজন মধ্যবিত্ত নাদুসনুদুস বাঙালি পুরুষের পক্ষে পায়ে হেঁটে, দস্যু পরিবৃত দুর্গম পথ পার হয়ে কাবুল গমন যে কি অপরিসীম কষ্টকর ছিল, প্রতি ছত্রে ছত্রে তুলে ধরেছিলেন লেখক। শুধু কি তাই, রাশিয়ান দূতাবাস জানত যে সুভাষ কাবুলে আছেন, কোথায় আছেন। বার বার দুয়ারে করাঘাত করেছেন নেতাজী, শুধু মাত্র ব্রিটেনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য পাত্তাও দেয়নি রাশিয়া। 


হিটলারও কি খুব পাত্তা দিয়েছিল নাকি? কৃপাপ্রার্থীর মত বসিয়ে রাখা হয়েছে আমাদের জননায়ককে। কে না বিশ্বাসঘাতকতা করেনি সুভাষের সাথে, আমাদের দেশের জনগণ করেনি? লোকটার বুঝি জন্মই হয়েছিল ট্রাজিক হিরো হবার জন্য। মহাভারতের কর্ণ, ইলিয়াডের হেক্টরের মতই আমাদের নেতাজী। আজও মনে আছে শুনতে শুনতে লাল হয়ে উঠেছিল বাবার মুখ। বিশেষত যেখানে আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রসঙ্গ উঠেছিল। কোথা থেকে যেন ছেঁড়া ছেঁড়া একগাদা বই বার করে এনেছিল বাবা। গুপ্ত পত্র, যার ছত্রে ছত্রে অমর হয়ে আছেন নেতাজী। মিহির বোসের প্রামাণ্য গ্রন্থের থেকেও বাবার কাছে অনামা প্রকাশকের ঐ চটি বইগুলো ছিল অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য। 


এতদিনে নিশ্চয় নেতাজীর সাথে দেখা হয়ে গেছে বাবার। হয়ে গেছে চুপড়ি চুপড়ি গপ্প। গুপ্ত বাঙ্কারে, লাল নীল ফাইলে গোপন আছে যে তথ্য সেসব নিশ্চয় এতদিনে তোমার নখদর্পণে বাবা। ভুলে যেও না যেন, জমিয়ে রেখো সব গল্প, সব রটনা, সব ঘটনা। দেখা তো হবেই, হয়তো আজ নয়, হয়তো কয়েক বছর পর, সব শুনব কিন্তু সেদিন। ততোদিন পর্যন্ত খুব ভালো থেকো, চুটিয়ে আড্ডা মারো। তোমার জন্য প্রার্থনা গুলো একই আছে, শুধু ডাইমেনশনটা আমার অজানা, এই যা। আর হ্যাঁ, শুভ বাবা দিবস। আমার চোখে তুমি আজও নম্বর ওয়ান। তুত্তুরীর কাছে, আরও অনেক বেশী  -



অনির ডাইরি ১৯ই জুন, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


ভেজা ভেজা মহানগরের ভোর। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি আমরা মা - মেয়ে। তাঁর ইস্কুলের গাড়ি আসতে আজকে যেন একটু বেশীই দেরী করছে। আজ তাঁর ইতিহাসের ক্লাস টেস্ট আছে, যার অন্যতম বিষয় হল ভারতীয় সংসদ ও সংবিধান। দল ত্যাগ বিরোধী আইন নিয়ে গতরাত থেকে লড়ে যাচ্ছি আমরা, আজও সেই নিয়েই গল্প করছিলাম আমরা। গল্পে গল্পে পড়া আর পড়তে পড়তে গল্প - 


হঠাৎ দুজনেই থেমে গেলাম, আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অন্য একটা স্কুলের বাস, আসেপাশে অপেক্ষারত অন্যান্য বাচ্ছারা লাইন দিয়ে উঠতে গিয়েও উঠছে না। কারণ এক টলটলে বৃদ্ধ। বৃদ্ধের একহাতে সব্জির ব্যাগ অন্য হাতে বন্ধ টু ফোল্ড ছাতা। দৃশ্যতই বৃদ্ধের এক পা লন্ডনে পড়ছে, আরেক পা টোকিও। বারবার বিপজ্জনক ভাবে পিছন দিকে হেলে যাচ্ছেন বৃদ্ধ। কন্ডাক্টর ছেলেটি বাস থেকে নেমে এসে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করল, ধীরে ধীরে যান। বৃদ্ধ তো এমনিতেই শম্বুক গতিতে যাচ্ছে - 


উনি কোনমতে ফুটপাথে উঠে পড়তেই, বাচ্ছা গুলো বাসে উঠে পড়ে। বাস বেরিয়ে যায় দ্রুত গতিতে। আমাদের গাড়ির দেখা নেই, আমরা সেটা নিয়ে ভাবিত ও নই। দুজনে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি বৃদ্ধের দিকে। পড়েই যায় বুঝি লোকটা। কেন যে লাঠি নিয়ে বেরোননি, "দাদুও লাঠি নিতে চাইত না, মনে আছে মা" বলে তুত্তুরী। কিছু বলি না আমি, তুত্তুরী একাই বলে যায়, " দুটো হাতে দুটো জিনিস নেওয়া উচিৎ হয়নি। বাবা বারবার বারণ করত ঠাম্মাকে -", বলতে না বলতেই বৃদ্ধ এমন ভাবে পিছন দিকে হেলে যান, যে মনে হয় মাথা ঠুকে পড়েই গেলেন বুঝি। 

তুত্তুরী আঁতকে উঠে বলে, " তুমি যাও মা, আমার ভীষণ ভয় করছে ওনার জন্য -", মেয়েকে একা বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে যেতে যেন গুঁড়িয়ে যায় বুক,  তাও দৌড়ে যাই মানবিকতার খাতিরে। যা নব্য ধনী এলাকা আমাদের, অধিকাংশই অবাঙালি, বাংলায় বলব না হিন্দিতে বলব ভাবতে ভাবতে, মাতৃভাষাই বেরিয়ে যায় মুখ দিয়ে, " কাকু কোথায় যাবেন? আমি ছেড়ে দিয়ে আসি চলুন -"। 


মুখের মাস্কটা হাফ নেমে গেছে বৃদ্ধের, যা হাঁপাচ্ছেন। ঐ অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে পড়ে আমাকে আপাদমস্তক মাপেন, তারপর বলেন, " তুমি কোথায় যাবে?" যে বন্ধ মস্ত বিপণীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, তার পিছন দিকে আঙুল দেখিয়ে বলি, আমি এখানেই থাকি, মেয়েকে স্কুলের গাড়িতে তুলতে এসেছিলাম। চলুন আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসি। ব্যাগটা কেড়ে নিই বৃদ্ধের হাত থেকে, ছাতাটাও। বৃদ্ধ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে টলটল করতে করতে বলেন, " আসলে আজ লাঠিটা আনিনি তো। ছাতাটা নিলাম বলে, দেখলাম বৃষ্টি হচ্ছে, তাই -"। 


বার দুয়েক আরও টলে যাবার পর, আমি ওনার হাতটাই চেপে ধরি, কনুইয়ের ওপর। আজকের আরামদায়ক ভোরেও ঘামে ভিজে গেছেন বৃদ্ধ। বেশ গৌর বর্ণ, পরণে একটা স্ট্রাইপ টি শার্ট আর প্যান্ট, কোনটাই সস্তা বা মাঝারি দামের নয়। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার কসরৎ করার পরও আমরা দুয়েক পায়ের বেশি এগোই না। আমি বলি, একা একা একদম বেরোবেন না।  বৃদ্ধ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, " আমি পারি। অন্য দিন লাঠিটা থাকে। প্লেনে হাঁটতে পারি, এই উঁচু নীচু তেই সমস্যা। পা দুটো কিছুতেই একদিকে পড়ছে না -"। 

আমরা উঁচুতেই আছি, ফুটপাথের ওপর। সেটি আবার বিপণীর প্রবেশ প্রস্থান অনুসারে কাটা। যাতে গাড়ি ঢুকতে বা বেরোতে কোন সমস্যা না হয়। প্রথম কাটা অংশে আমি তো টুক করে নেমে পড়লাম, ওনাকে আর নামতেই পারি না। দুহাতে ধরে কোনমতে নামিয়ে বলি, রাস্তা ধরে হাঁটি চলুন, তাহলে এত চড়াই উৎরাই ভাঙতে হবে না। বলতে বলতে পিছন ফিরে তাকাই বারবার, মেয়েটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।


বৃদ্ধ আমার কথা শুনে রাস্তার দিকে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ান। দোনামোনা করে বলেন, " রাস্তাটা বড় উঁচু নীচু -" । ঠিক আছে, তাহলে ফুটপাথই ধরি, বৃদ্ধকে যখন চাগিয়ে ফুটপাথে তুললাম, পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল তুত্তুরীর স্কুল বাস। জানলার ধারে বসে হাত নাড়িয়ে গেল মেয়ে। সামান্য কয়েক পা যেতে যেন বছর ঘুরে গেল আমাদের। বৃদ্ধ সংকুচিত হয়ে বলেন, " তোমার বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে না -"। আজ আমার চাইল্ড কেয়ার লিভের শেষ দিন, তাই অফিস যাবার তাড়া নেই। শৌভিক রাত জেগে খেলা দেখে আপাতত গভীর নিদ্রামগ্ন। তাই এখুনি বাড়ি যাবার কোন তাড়া আমার নেই। শুধু পোশাকটা যদি একটু ভালো পরে নামতাম। ভেবেছিলাম মেয়েকে তুলে দিয়েই চলে আসব, তাই বাড়ির রঙ জ্বলে যাওয়া আরামদায়ক টিশার্ট আর লাউঞ্জ প্যান্ট পরেই নেমেছিলাম। 


"ব্যাস আর একটু গেলেই আমাদের আবাসনের গেট, গিয়েই সিকিউরিটিকে ব্যাগটা ধরিয়ে দেব। তোমরা কোন ফ্ল্যাটে থাকো, আমার ফ্ল্যাটের নম্বর এই ।" উফ এই আলাভুলো প্রজন্ম, কেউ এইভাবে অপরিচিত মানুষকে ফ্ল্যাটের নম্বর বলে - আমি যদি চোর ডাকাত হই। 


রাস্তার ধারের গ্রিল ধরে বেশ খানিক হাঁপান বৃদ্ধ, পাশ দিয়ে ছুটে চলে ঘুম ভাঙা শহরটা।  বাজারের সামনে এসে পিঠটা পুরোই বেঁকে যায় ওনার, একটালাফ দিয়ে পিছনে গিয়ে ঠেলে ধরি আমি। বলি একটু বসবেন? বসবেনই বা কোথায়, ফুটপাথ উঁচু করার চক্করে বসার জায়গা সব নষ্ট হয়ে গেছে। বৃদ্ধ তাও থমকে দাঁড়ান, হ্যাংলার মত একফালি জায়গার দিকে তাকিয়ে বলেন, " বসব!" 


আমাদের অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন আরেক ভদ্রলোক, ইনিও বাচ্ছাকে স্কুল বাসে তুলতে নেমেছিলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি, আমার একার শক্তিতে বৃদ্ধকে সামলাতে পারছিলাম না। বিশেষত আবার সামান্য চড়াই যখন সামনে। দুই জনে দুই বগলের তলায় হাত দিয়ে ওনাকে আবাসনে ঢোকাই। "পিঠটা, পিঠটা আবার বেঁকে গেল", হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন বৃদ্ধ। পাশের ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেন ওনাকে। " একি একা বেরিয়েছেন কেন -" বলতে বলতে এগিয়ে আসেন এক প্রৌঢ়। বুঝতে পারি উভয়েই পরিচিত একে অপরের। আমার দিকের হাতটা উনি ধরে নেন। আমি একটু পিছিয়ে এসে দম নিয়ে বৃদ্ধের ব্যাগ আর ছাতাটা প্রৌঢ় ভদ্রলোককে ধরিয়ে এগিয়ে যাই। আর আমার দরকার নেই - 

বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, এই তো জীবন কালী দা, এই ধনী আবাসনে এটাই ঘর ঘর কি কাহানি। পাইপয়সা জমিয়ে সবাই এখানে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, মনের মত করে মানুষ করেছেন সন্তানসন্ততিকে। আজ তারা সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত কিন্তু দূরের নক্ষত্র। ঘরে ঘরে পড়ে আছে নিঃসঙ্গ দম্পতি অথবা বিধবা/ বিপত্নীক মানুষজন। যাদের পাশ দিয়ে স্কুল বাসের মতোই ছুটে চলে যাচ্ছে জীবন।


অনির ডাইরি ১৭ই জুন, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



নিজেকে এতটা সবলা ভাবা আমার উচিৎ হয়নি। এই হাসপাতালে আবার আসা আমার উচিৎ হয়নি। এই তো সেদিনের কথা, ঠিক এইখানেই দাঁড়িয়ে ছিল তুত্তুরী, আমার গা ঘেঁষে। তখনও আমরা দুজনের কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, বাবা আর নেই। আমি বার বার বলছিলাম, " তোকে আমাকে ছেড়ে দাদু কোথাও যেতেই পারে না। দাদু এখানেই আছে, সারা জীবন থাকবে -"। আজ সেকথা ভেবে হাসি পেল। আমি জানি, বাবা আর নেই। কোথাও নেই। 

কি অদ্ভুত বৈপরীত্য আমার মধ্যে। যে বৃদ্ধের ছবি জ্বলজ্বল করে আমার সমস্ত মুঠোফোনের স্ক্রিন জুড়ে, তিনিও তো মানবজন্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং দেহরক্ষা করেছিলেন। আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি তিনি আছেন, হয়তো আমার ডাইমেনশনে নয়, অন্য কোন মাধ্যমে, কিন্তু তিনি আছেন। তাহলে বাবা কেন নেই? 


তপ্ত কফির কাপ হাতে গিয়ে গল্প করছে শৌভিক আর পিসিমণি। প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবার ডায়ালিসিস চলে পিসেমশাইয়ের। সঙ্গে আসেন পিসিশাশুড়ি। দীর্ঘ চার পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে রক্ত পরিশোধনের কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে থাকেন পিসিমণি। বাবা ভর্তি ছিল যে কটা দিন, বরকে ডায়ালিসিস ইউনিটে ঢুকিয়ে দিয়েই আমার কাছে চলে আসত পিসিমণি। গল্প করত, সঙ্গ দিত। পিসিমণির রাগ দুঃখ অভিমানে আমার মাকে খুঁজে পেতাম আমি আর পিসতুতো দেওরের মধ্যে খুঁজে পেতাম নিজেকে। একই চিত্রনাট্য, শুধু বদলে গেছে কুশীলব। 


আজ বহুদিন বাদে এই চত্বরে এসেছি বড়দার সৌজন্যে। বেলা দুটো থেকে অপারেশন ছিল বড়দার, যদিও অন্য হাসপাতালে, তবে সেটাও খুব বেশি দূরে নয়। বলেই রেখেছিলাম, দাদার অপারেশন হলেই আসব পিসিমণির সাথে দেখা করতে। কফি খাব একসাথে, সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর মত। তারপর থেকে বার তিনেক ফোন করেছে পিসিমণি, " জানিস আজ এসে থেকে মনে হচ্ছিল, তোরা যখন আসতিস, কিছুটা সময় কি ভালো কাটত -"। সাড়ে পাঁচটার পর যখন একজনকে কথা বলতে দিল দাদার সাথে আর সেজদা বেরিয়ে এসে বলল, " দাদা তো একদম নর্মাল কথা বলছে রে -", স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে এলাম ঐ হাসপাতাল থেকে এই হাসপাতাল। সঙ্গে করে নিয়ে এলাম পিসির ভাইপোকেও। 


আজকের গল্প জুড়ে রাজা পিসেমশাই একাই, ডায়ালিসিস অন্তে বাড়ি ফেরার পথে একদিন কেমন কাঁপতে লেগেছিল লোকটা, অথবা ইদানীং কেমন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে লোকটা ইত্যাদি প্রভৃতি। শৌভিক বলে, " যতই যাই হোক, রক্তটা শরীর থেকে বার করে, পরিশোধন করে পুনরায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে, সেটা কি মুখের কথা -"। শুনতে শুনতে বাবার মুখটা ভেসে উঠল। ডায়ালিসিস চলছিল সেদিন বাবারও। ঘাড়ের কাছে ফুটো করে টানা হচ্ছিল রক্ত, নাকি ফেরৎ পাঠাচ্ছিল জানি না। রক্তে ভিজে গিয়েছিল ঘাড়ের নীচে রাখা মোটা তুলোর প্যাডটা। কতবার যে ডাকলাম, " বাবা - বাবা - বাবা", একবার সামান্য মাথা ফেরালো, অল্প খুলল চোখ দুটো, তারপর যেন তীব্র যন্ত্রণায় ছোট হয়ে গেল চোখ দুটো, মুখ বেঁকিয়ে মাথা নাড়ল এমন ভাবে মনে হল, এই যাতনা আর নিতে পারছে না। সেদিন রাতে আর বাবাকে সুস্থ করে দেওয়ার প্রার্থনা করতে পারিনি, শুধু বলেছিলাম, " হে প্রভু তুমি যা ভালো বোঝ।" সেই ভোরেই চলে গেল বাবা। 


বাড়ি ফিরে মেয়ের কাছে সেদিনের কথা বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম আজ। আমি অতটাও সবলা নই। তুত্তুরী বলল, " তুমি গেলে কেন ওখানে? যদি আমার ক্ষমতা থাকত, আমি জীবন থেকে ঐ দিনটাই মুছে ফেলতাম।" নীরবে খানিক অশ্রুমোচন করলাম দুজনে। অনুযোগের সুরে তুত্তুরী বলে, "কেউ ভাবেনি যে সেটা আমারও চরম শোকের দিন। আমার সবথেকে বড় বন্ধু আমার পরম আশ্রয়স্থলকে হারিয়েছি আমি। তা নয়, যাঁরা বাড়ি চিনতে পারছে না, তাঁদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এসো, দোকান যাও, দিদাকে সামলাও, দাদুর দিদিকে সামলাও -। আমায় কেউ একটা আহাও বলেনি সেদিন।সবাই মাম্মাম (দিদা)কে নিয়ে ব্যস্ত ছিল।" হেসে বলি, সবল হওয়ার সেটাই তো জ্বালা বাবু। আর আমি তোকে সেটাই করতে বলেছি, যেটা আমি নিজে করেছি। শোক - চোখের জল আমার একান্ত ব্যক্তিগত। তার জন্য অনন্ত জীবন পড়ে আছে। তখন আমাদের একটাই কাজ ছিল, যাঁরা আমাদের দুর্দিনে ছুটে এসেছেন তাঁদের যথোচিত আপ্যায়ন করা।  আমি নিজেও তাই করেছি কিনা বল - 


কিছুক্ষণ অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করে আমাদের মধ্যে, দম নিয়ে বলি, দাঁড়া, বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ছি। অবলা হবার আগে একবার পড়ে নিই। কি পড়ব, বলার আগেই তুত্তুরী চিৎকার করে ওঠে, " না একদম বলবে না, সত্যরে লও, সহজে- "। হেসে বলি, বাবুরে, তুই আমার প্রকৃত আত্মার আত্মীয়। কি করে বুঝলি -। তুত্তুরী আর আমার মাঝে কি অনায়াসে নেমে আসেন তিনি, শুরু হয় "বোঝাপড়া" -

 

" আকাশ তবু সুনীল থাকে,/মধুর ঠেকে ভোরের আলো,

মরণ এলে হঠাৎ দেখি/ মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো। 

যাহার লাগি চক্ষু বুজে/ বহিয়ে দিলাম অশ্রু সাগর

তাহারে বাদ দিয়েও দেখি, বিশ্বভূবন মস্ত ডাগর।"


অনির ডাইরি ৬ই জুন ২০২৬


#অনিরডাইরি 


" নমস্তে স্যার,ম্যাম, ম্যায় প্রমীলা গুপ্তা, আপ কি আজ কি গাইড", খাকি পোশাক পরা শ্যামবর্ণ, ছিমছাম চেহারার  মিষ্টি মেয়েটা এসে আত্মপরিচয় জ্ঞাপন করে যখন জিপসির দরজা খুলল, মনটা একটু দমে গেল। আজ্ঞে না, আমার কোন জেন্ডার বায়াস নাই, তবে " তুক" বায়াস ঘোরতর। এর আগের বার যখন মহিলা গাইড পেয়েছিলাম, তখন আমি ছাড়া সবাই বাঘ দেখতে পেয়েছিল। 


আজ্ঞে হ্যাঁ, জঙ্গলের নাম ছিল পেঞ্চ, গাইড দিদিমণি চিৎকার করেই যাচ্ছিলেন, " উও দেখিয়ে টাইগার, উও দেখিয়ে টাইগার"। আমার বর আর কন্যা ক্যামেরার লেন্স বাড়িয়ে দেখেও নিল, ছবি তুলতে পারল না যদিও দূরত্বের কারণে। আমি ছাতা খালি চোখে কিস্যু দেখতে পাই না। বাঘের পাল নাকি গাছের পিছনে লুকোচুরি খেলছে আর আমি রাগে বিড়বিড় করছি, ভাবুন কি অবস্থা। 


সেবার থেকে ঠিক করেছিলাম আর জঙ্গলে যাবই না। ওসব বাঘ ফাঘ সব গুলগল্প মশাই। কিস্যু থাকে না। একদল লোক ক্যামেরা বাগিয়ে পোজ দেয় আর তাদের দলেরই আরেক পাল লোক বাঘের পোশাক পরে হামাগুড়ি দেয় নির্ঘাত -। গত বছর মে মাসে কানহা গিয়ে আমার সেই বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। প্রখর দাবদাহে চারদিন ধরে সকাল বিকেল ঘুরলাম, গুচ্ছের পয়সার শ্রাদ্ধ হল, মুখ পুড়ে হনুমানের মত কেলে হয়ে গেল। দলে দলে চিতল, সাম্বার, নীলগাই, বারাশিঙ্গা ঘুরছে ফিরছে পোজ দিচ্ছে, কিন্তু কোথায় বাঘ? বাঘ কোথায়?


এবারে আমি একেবারেই বেঁকে বসেছিলাম আসব না বলে। এরা বাপমেয়েতে কিভাবে যে আমায় পটিয়ে ফেলল - । এবারের গন্তব্য বান্ধবগড়, তার আগে ঝটিতি সফর সঞ্জয়ডুবরি জাতীয় অরণ্যে। সঞ্জয়ডুবরির কথা প্রথম শুনি দেবাশীষ দার মুখে। দেবাশীষ দা আমাদের বেড়ু গ্রুপের এক প্রাক্তন সদস্য। কোন এক বিস্মৃতপ্রায় অতীতে, গ্রুপের দেওয়ালে প্রকাশিত হত যে লেখাপত্র তাদের মধ্যে থেকে সেরার সেরা নির্বাচন করতাম আমরা অর্থাৎ রঞ্জন দা, দেবাশীষ দা আর এই অধম। দেবাশীষ দার ব্যাঘ্র প্রীতি ছিল সাংঘাতিক। বাঘ বাড়ছে, কিন্তু সেভাবে জঙ্গল বাড়ছে না, আগামী দিনে তীব্র হবে হিউম্যান- অ্যানিমাল কনফ্লিক্ট, টেরিটোরিয়াল ফাইটে মারা যাবে অনেক বাঘ এই ভবিষ্যৎ বাণী দেবাশীষ দা করত আজ থেকে ধরুন প্রায় এক দশক আগে। লোকটাকে আমরা এত ভালোবাসতাম যে ওনার ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল "টাইগার"।  


দেবাশীষ দা গ্রুপ তো ছাড়লেন, কিন্তু আমরা ওনাকে ছাড়লাম না। আজও যোগাযোগ আছে এবং যখনই আমরা কোন জঙ্গলে যাই, ছবি পোস্ট করি, দেবাশীষ দার অবধারিত মন্তব্য হয়, " একবার সঞ্জয়ডুবরিটা ঘুরে এসো। মৌসি মাকে দেখে এসো। সে বড় মজার বাঘ হে -"। মৌসিমা হল এমন এক বাঘিনী, যে অন্যের সন্তানকে স্তন্যপান করিয়ে বড় করে তুলেছিল। বাঘেদের ধাত্রীপান্না। 


পরিচয় পত্রের গেরো কেটে গাড়ি জঙ্গলে ঢুকল, প্রমীলা গাইড পিছন ফিরে জিজ্ঞাসা করল, " পহেলি বার আয়ে হ্যায়।" আমরা যুগলে জবাব দিলাম এই জঙ্গলে প্রথমবার বটে, তবে মধ্য প্রদেশে এটা আমাদের সপ্তম বা অষ্টমবার। সত্যিই আমরা এমপি পাগল। এমপি আমাদের দ্বিতীয় জন্মভূমি যেন। প্রমীলা বলে, " এত ভালো লেগেছে আমাদের রাজ্য!" শৌভিক বলে, " আব ক্যায়া করে, হিন্দুস্তানের দিল আমাদের দিল জিতে নিয়েছে"। আমি বলি তোমাদের রাজ্যের সব ভালো, খারাপ কেবল বাঘ গুলো। এর আগে আমরা দশটা সাফারি করেছি, তাঁর দর্শন হয়েছে মাত্র তিনবার। এত উন্নাসিক, এত অসভ্য জীব। প্রমীলা হেসে বলে, " আব তো আপকো টাইগার দিখাকে হি ছোড়েঙ্গে ম্যাডাম।" 


আর পাঁচটা সাফারির মত একাকী গাড়ি ঘোরে তার পূর্ব নির্দিষ্ট পথ ধরে। যেখানে দুটো গাড়ির মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়, উভয় গাড়ির ড্রাইভার, গাইড স্থানীয় ভাষায় শুধায়, কিছু পেলে? বিমর্ষ ভাবে মাথা নাড়ে দুপক্ষই। প্রমীলা বলে, " চল না, জলাধারের কাছটা একবার ঘুরে আসি।" জলাধার বলতে অনেকটা নীচে একটা ছোট পাথুরে গর্ত মত, প্রখর দাবদাহে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। কাছাকাছি যেতেই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ও যা রাহি হ্যায় টাইগার।" ঝিলের উল্টো পাড়ে উঁচু টিলার ওপর সত্যিই দেখা গেল একটা বাঘিনীর অবয়ব। শৌভিক চিৎকার করে ওঠে, " জঙ্গলে ঢুকতে না ঢুকতেই বাঘ -"। উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে বাঘিনীর তীব্র গর্জন। বাঘ যাও বা দেখেছি, তার গর্জন ইতিপূর্বে শুনিনি। বিশ্বাস করুন বেশ পিলে চমকানো টাইপ। 


গর্জন করেই বাঘটা গাছপালায় মিশে গেল। প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, "গাড়ি ঘুমাও।" তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল, " ও নামছে জল খাবে বলে। যে পথে নামবে আমরা ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে একদম সামনে থেকে শট পাবেন স্যার।" ঝড়ের গতিতে গাড়ি অনেকটা এগিয়ে একটা ঢালু জায়গায় এসে দাঁড়াল। দুয়েকটা আরও গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এসে শুনল যখন আমরা বাঘ দেখেছি, তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল এদিকে, ওদিকে। এবার তিনি এলেই হয়। আস্তে আস্তে ছ - আটটা গাড়ি চলে এল। সবাই রুদ্ধশ্বাসে বসে আছি, তাঁর আর দেখা নেই। কি হল রে বাবা, পায়ে বাত ধরল নাকি?


 প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট পর প্রমীলা বলল, " স্যার লাগতা হ্যায় ও কাহি ব্যাঠ গেই হ্যায়। চলুন জঙ্গলের অন্য দিক গুলোও দেখে আসি, যদি অন্য কাউকে পাওয়া যায়।" আমার বর নড়তে নারাজ। কোথাও যাব না, এখানেই অপেক্ষা করব - ও ঠিক নামবে। এমন বাঘ পাগল লোক, বাঘ দেখবে বলে বিগত তিন রাত ঘুমায়নি। মানে রোজই নাক ডেকে ঘুমিয়েছে, কিন্তু স্মার্ট ওয়াচ বলেছে ঘুমায়নি আর কি। যাই হোক, কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অপেক্ষা করতে করতে মুখে গামছা চাপা দিয়ে প্রমীলা খানিক ঘুমিয়ে নেয়। ঘুমিয়ে পড়ি আমিও।


রোদের তাত ক্রমেই বাড়ছে। প্রমীলা ঘুমিয়েই যাচ্ছে, ড্রাইভার রামসুখ যাদব কচরমচর করে পান চিবিয়েই যাচ্ছে। আমার বর আর মেয়ে ক্যামেরা তাক করে বসেই আছে। পাশ দিয়ে গাড়ি গুলো আসছে, যাচ্ছে। আমরাই কেবল স্থবির। ড্রাইভার সাহেব একবার বললেন, " সাব এহী পে ব্রেকফাস্ট কর লিজিয়ে -"। শৌচালয়-হাত ধোওয়ার জায়গা ওলা শেডে যেতে যেতে যদি বাঘ পালিয়ে যায়। 


 আমার বরের গলা দিয়ে খাবার নামে কখনও। অগত্যা অভুক্ত বসে বসে মাছি তাড়াই। রাগ করে বলি, " এই শেষ। এবার যদি 'প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে' বাঘ না দেখতে পাই, আর আসব না। আর তোদেরও আসতে দেব না। বলতে না বলতেই কটা গাড়ি ঝড়ের মত আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একটা গাড়ি থেকে ভেসে এল চিৎকার, সামনেই বসে আছে বাঘ। শিকার মেরে খাচ্ছে। এইভাবে কেউ বোকা বানায় মাইরি। 


আমরাও দৌড়াই পড়ি কি মরি করে। গন্তব্যে ইতিমধ্যেই গুচ্ছ গুচ্ছ জিপসি দাঁড়িয়ে গেছে, মেঠো রাস্তার ধারে একটা লাল টিলা। টিলার ওপরে নাকি বসে আছেন মহারানী। তিনি সদ্য তিনটি বাঁদর মেরেছেন। সম্ভবত দুটো বাচ্ছা একটা বড়। এখন তাদের দিয়েই উদরপূর্তি করছেন। বাঁদরের কল শুনে তো আমরা বুঝি বাঘ আসছে, এত সাবধানী হয় ব্যাটারা। হরিণকে সাবধান করে দেয়। সেই বাঁদর কি করে বাঘের শিকার হয়। শৌভিক বলে, " বাঁদরামি করছিল নির্ঘাত -"। 


একেই বোধহয় Déjà vu বলে । সেই সবাই দেখতে পাচ্ছে আমি বাদে। বাঘ নাকি টিলার ওপর গাছের ছায়ায় বসে মহানন্দে মাথা দোলাচ্ছে, ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাচ্ছে - আর আমি দেখছি আকাশ, পাহাড়, জঙ্গল, মানুষ আর গাড়ি। দূরবীনে চোখ লাগিয়ে লাগিয়ে চোখ ব্যথা করে ফেললাম, বুঝতেই পারলাম না কোন গাছের নীচে বসে প্রাতঃরাশ সারছেন তিনি। বিরক্ত হয়ে প্রমীলা কে শুধাই, এটাই কি মৌসীমা? প্রমীলা জবাব দেয়, না, ইনি হলেন মৌসীমার দিদি, নাম T-17। ওরা আদর করে ডাকে লছমি বলে। 

ভাগ্য ক্রমে আজ আমাদের বিয়ের জন্মদিন এবং ১৭ তম জন্মদিন। শৌভিক গদগদ হয়ে বলে, " বিয়ের ১৭ বছরে টি -১৭ দর্শন হল, আহা -"। বিরস মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কেউ চিৎকার করে উঠল, " উঠেছে উঠেছে।" আমার বর আর কন্যা ক্যামেরা তাক করে তৈরি। কিন্তু প্রমীলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, " ভাগা, ভাগা, গাড়ি ভাগা।" একি রে বাবা, সবে লছমিকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে আর এই মেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। 

উড়ন্ত গাড়িতে দাঁড়িয়েই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ভরোসা রাখিয়ে, ও ঐ রাস্তা দিয়েই নামবে জল খেতে। একদম সামনে থেকে দেখাবো।" গাড়ি এসে দাঁড়ালো, আমরা এতক্ষণ যেখানে অপেক্ষা করছিলাম। অন্তত মিনিট সাত দশেক কোথাও কোন শব্দ নেই, মাছিদের ভনভন ছাড়া। তার পরই ছুটে আসতে লাগল একের পর এক গাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে সেরা স্পটটা দখল করে নিয়েছে রামসুখ আর প্রমীলা। 

ধীরে ধীরে অদূরে টিলার মাথায় দেখা যায় তাকে, গদাইলস্করি চালে তিনি নামতে থাকেন। মুখে আধ খাওয়া একটি বাঁদর। খচখচ করে শব্দ করে সম্মিলিত ক্যামেরা কুল। আমার ক্যামেরা নেই। ফোন ও আনিনি মহামান্য আদালতের নির্দেশ মত। আমি তাই প্রাণ ভরে দেখি। তিনি ঢালু পথে নেমে এসে, আমাদের গাড়িটাকে আড়াআড়ি পার করে, আমার দিকে দরজা ঘেঁষে ঢুকে যান জঙ্গলে। আক্ষরিক অর্থেই জুড়িয়ে দিয়ে যান, পুড়িয়ে দিয়ে যান আমার চোখ। আর আমি, জিপসি থেকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে বলি, " মহারাণী তোমারে সেলাম 🙏🏻"

ছবি সৌজন্য - শ্রী Shouvik Bhattacharya

Friday, 1 May 2026

অনির ডাইরি মে, ২০২৬

অনির ডাইরি ২৩ শে মে, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 



দিদিভাইয়ের আইবুড়ো বেলার তেমন কোন স্মৃতিই আমার নেই। আবছা সাদাকালো কিছু ছবি শুধু ভেসে বেড়ায় মানসপটে, কুয়াশা মাখা শীতের ভোর, কালো শাল জড়িয়ে পড়তে বসেছে দিদিভাই। "কোন গুণ নাই তার কপালে আগুন -"। পড়তে পড়তে আনমনে খেলছে লম্বা বিনুনী নিয়ে, প্রভাতী সূর্যের আলো এক চিলতে হীরের নাকছাবিতে প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করছে মায়াবী রামধনু। 


কে যে জ্যাঠাইমার মনে আগুন লাগাল, " এই মেয়ে অসবর্ণ বিবাহ করে পরিবারের মুখে চুনকালি দেবে -"। অসবর্ণ বিবাহ তো ব্যাঁটরার চাটুজ্জে বাড়িতে নতুন কিছু নয়। আমাদের ছোটঠাকুমা ছিলেন বাঁকুড়ার সদগোপ বাড়ির মেয়ে, আমার মা মুর্শিদাবাদের কুলীন কায়স্থ, কৈ বাবা বা ছোটদাদুর মুখে তো কোন কালো দাগ পড়েনি। কিন্তু জ্যাঠাইমা যে বড্ড জেদি। 

জ্যাঠাইমার জেদের কাছে বোধহয় মাথা নত করল খোদ ঈশ্বর, দিদিভাই তখনও ইস্কুলে পড়ে, সবুজ পাড় সাদা শাড়ি আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়। সবুজ ফিতে দিয়ে বাঁধা দুই বিনুনী। স্কুল যাতায়াতের পথেই নজরে পড়ে জনৈক বাবু নিতাই বন্দ্যোপাধ্যায়ের। 


আমাদের সাবেকী বর্মা টিকের সদর দরজায় কড়া নেড়ে আসে বিয়ের সম্বন্ধ। এক দেখাতেই পাকা কথা। নিতাই বাবুর ছোট ছেলে শ্রী সিদ্ধার্থ ব্যানার্জির সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে যায় আমার দিদিভাইয়ের। আমি তখন বছর তিন চার। কিছুই মনে নেই সেসব দিনের কথা। পাকা কথা বলতে নাকি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাকেও। জ্যাঠাইমার নয়নমণি ছিলাম যে আমি। বাইরের ঘরে যখন বার্তালাপে ব্যস্ত গুরুজনেরা, হবু বর বই পড়ার অছিলায় লুকিয়ে ছিল ভিতরের ঘরে। বিনা অনুমতিতেই সেই ঘরে ঢুকি আমি এবং  ভদ্রলোকের বুকের ওপর বসে, মুখ থেকে বই সরিয়ে, একগাল হেসে শুধাই, " হ্যাঁ গো, তুমি আমার জামাইবাবু হবে -"। বিয়ে হওয়া ইস্তক একপক্ষ কাল ছাড়াছাড়াই এই গল্পটা শোনাত দিদিভাই। 


সিদ্ধার্থ ব্যানার্জি যে কবে আমাদের টুলটুল দাদা হয়ে গেল -। চাটুজ্জে বাড়ির জ্যেষ্ঠ পুত্তুর। নির্বিকল্প ভরসার কেন্দ্র। আমার বিয়ের সময়ই ধরুন না, শ্বশুরমশাই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ছাপোষা রেজিস্ট্রি হোক। বাবা নারাজ।  "এত জনের বাড়ি নিমন্ত্রিত হয়েছি আমি, আর আমার মেয়ের বিয়েতে কাউকে বলব না -"। বেশ বলবে তো, করবে জাঁকজমক কিন্তু লোকবল কোথায়?  এককালীন যাঁরা বাবার জন্য জান লড়িয়ে দিত তাঁরা সবাই ততোদিনে হেঁপো বুড়ো। অল্পবয়সীরা জর্জরিত আপন জীবন যুদ্ধে। হতোদ্যম হয়ে যখন প্রায় অস্ত্র ত্যাগ করতে উদ্যত বাবা, এমন সময় এসে উদয় হল টুলটুল দাদা। " আরে মেজকাকা ঘাবড়াচ্ছেন কেন? আমি তো আছি। মনে করুন আমি আপনার বড় ছেলে -"। আমৃত্যু সেই দিনটার কথা ভোলেনি আমার বাবা। 


সদ্য কয়েক মাস আগে নিজের মেয়ের ( আমার একমাত্র বোনঝি) বিয়ে দিয়েছিল টুলটুল দাদা। সেই ফর্দ মিলিয়ে বসত জামাই আর খুড়শ্বশুর। ক্যাটেরার, ডেকরেটর, মেন্যু, বরের গাড়ি, গাড়ি সাজানো, কনে যাত্রীদের বাস থেকে মায় আমার জন্য পার্লারের দিদিও ঠিক করে দিয়েছিল আমার জামাইবাবু থুড়ি টুলটুল দাদা। সতেরো বছর হয়ে গেল তাও মনে হয় এই তো গত কালকের কথা। 


আজ সকাল আটটা নাগাদ যখন মুঠো ফোনে ঝলসে উঠল বোনঝির নামটা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি  চলে গেছে আমাদের টুলটুল দাদা। চোখের সামনে সকাল থেকে ভেসে উঠছে কত যে খণ্ডচিত্র, 


বিয়ের দিন সকাল, সদ্য শেষ হয়েছে গায়ে হলুদ, স্নানঘরে ঢুকে দেখি জল নেই। বেজার মুখে বসে আছি, জোর করে লুচি খাওয়াচ্ছে দিদিভাই, ছুটে এল টুলটুল দাদা, পকেট থেকে এক গোছা নোট বার করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, "দেখছিস তো কি ব্যস্ততায় কাটল দিনগুলো। পরপর দুটো মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি মুখের কথা। তোর জন্য কিছু কিনতে পারিনি রে, এগুলো রাখ, যা ভালো লাগে কিনে নিস -"।


বিয়ের দিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে সাজতে নিয়ে গেল আমায়। ব্রাইডাল মেকাপ শেষে ধরে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরে, " নতুন জীবনে প্রবেশ করতে চলেছিস, ঠাকুরকে প্রণাম কর-"।


তুত্তুরীর জন্মের আগের সন্ধ্যা, ভর্তি হতে যাব পাড়ার নার্সিং হোমে। বেশী না কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। সঙ্গে যাবে শৌভিক আর দিদিভাই। ও হরি, কোথা থেকে গাড়ি নিয়ে হাজির টুলটুল দাদা, " আরে আমি থাকতে তুই হেঁটে যাবি কেন -"। আজকালকার দিনে কে এতটা ভাবে, এতটা করে তাও আবার খুড়তুতো শ্যালিকার জন্য। 

এত ভালোবাসা, এত নির্ভরশীলতার মানুষটা এত অকালে চলে গেল, এই তো মাস দুয়েক আগে বাবাকে হারালাম, আর আজ হারিয়ে ফেললাম পিতৃতুল্য এই মানুষটাকেও। হারিয়ে যাওয়ার আগুন তাহলে ধরে ফেলল আমাদের প্রজন্মটাকেও -


অনির ডাইরি ১৪ই মে, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 



শ্রীমতী তুত্তুরী তখন বছর চারেকের হবেন, ইনি তার থেকে বছর তিনেকের ধেড়ে। দুটোর কারোরই লেখাপড়ার চাপ নেই, ছোটটা তো তখনও নিরক্ষর (অক্ষর পরিচয় হয়েছে, নাম তো লিখতে পারে না)। অফিস থেকে ফিরে দেখি, দুই পিঠোপিঠি ভাইবোনের হল্লায় শিকেয় উঠেছে মায়ের প্যাঁনপ্যানে বাংলা সিরিয়াল, বাবার সান্ধ্যকালীন সমাচার।


প্রায় কান ধরে দুটোকে টিভির ঘর থেকে টেনে এনে বললাম, " আয় একটা খেলা খেলি -"। দুটোতেই কেমন যেন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে মাপল আমায়, একজনের মা তথা আর একজনের পিসি যে মোটেই খেলুড়ে নয় এটা ওদের বুঝতে বাকি নেই। গেঁড়ি ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ আক্রমণাত্বক হয়ে এগিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে বললেন, " কি খেলা?" বললাম, বস না তারপর বলছি। মাটিতে যখন গোল হয়ে বসছি তিনজনায়, তখনও জানি না কি খেলা খেলব। ধেড়েটা সেটা বোধহয় কানে কানে বললও ক্ষুদেটাকে। প্রগাঢ় হল উভয়ের কপালের ভাঁজ, থতমত খেয়ে বললাম, " আমরা সবাই সবার একটা করে গুণ বলব -"। বিশদে বোঝালাম এ ক্ষেত্রে গুণ অর্থে সদ বৈশিষ্ট্য, অঙ্ক নয়। কি ভালো লাগে আমাদের একে অপরের মধ্যে। 


আজ লিখতে বসে মনে হচ্ছে, দৈনন্দিন ক্লেদ মাখা জীবনে হয়তো নিজের কিছু প্রশংসা শুনতে চেয়েছিলাম আমি। কেউ তো বলুক আমি খুব ভালো। তো যাই হোক, ভাইবোন উভয়ের যে সব গুণ সেদিন খুঁজে বার করেছিল, সেটা আর আমি লিখে আপনাদের বিব্রত করতে চাই না। বিশ্বাস করুন, ওগুলো মোটেও গুণ পদবাচ্য নয়। এবার আমার পালা, বুল্লু বাবুকে বললাম, বল দেখি আমার মধ্যে কি ভালো খুঁজে পাস তুই। খিলখিল করে হেসে তিনি বললেন, "পিসি! পিসির চাকরীটা খুব ভালো।"


বিশ্বাস করুন হৃদয় ফেটে সেদিন সত্যিই আট টুকরো হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা নিষ্পাপ ফুলের মত হয়, ছল কপটতা বিবর্জিত। ওর যা মনে হয়েছে ও সেটাই বলেছে। দোষ যদি কারো থেকে থাকে, তাহলে সেটা আমারই। নিশ্চয় আমার আচার আচরণে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে জাঁদরেল আধিকারিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও ব্যর্থ করেছে স্নেহময়ী পিসি হিসেবে ভাইপোর হৃদয়ে জায়গা করে নিতে। মানুষ ব্যর্থতা থেকেই শেখে, আমিও শিখলাম সেদিন। শিখলাম, কিন্তু হাল ছাড়লাম না। দাঁড়া ব্যাটা, তুই কোন ছাড়, তোর বাপ (এবং মাও)ভালোবাসবে আমায়। 


আজ দুপুরে ভদ্রলোক যখন ফোন করলেন বসে বসে পেনশন কেস ছাড়ছি আমি। ফোনটা দেখেই ধড়াস করে উঠল বুকটা। কি আবার হল চাটুজ্জে বাড়িতে। দুরু দুরু বুকে ধরলাম ফোনটা, তিনি বললেন, " পিসি?" বল বাবা। তিনি বললেন, " তোমায় একটা খবর দেওয়ার আছে -"। আমার ভীরু হৃদয় কেঁপে উঠল শুকনো পাতার মত। এইসব কিছু থেকে অনবহিত তিনি স্বভাব সিদ্ধ ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললেন, " আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে -"। হৃদপিণ্ডটা বুঝি লাফিয়ে চলে এল কণ্ঠের কাছে। বুল্লু বাবুর পিতৃদেব অর্থাৎ আমার বড় ভাই মনে করেন তাঁর পুত্র এবং ভাগ্নী দুই মাতব্বর। আমার ধারণা ঠিক তার উল্টো। গরুই চড়াবে দুটোতে এই ভবিষ্যত বাণী আমি প্রায়ই করি। আশা করি বুঝতে পারছেন কেন গুড়গুড়ে ভদ্রলোক আমায় ভালোবাসতেন না এককালে। এমন পিসিকে আবার ভালোবাসা যায় নাকি মশাই, ছ্যা - 


কিন্তু আমার ভবিষ্যৎ বাণীকে সর্বাঙ্গীণ ভুল প্রমাণ করে তিনি কইলেন, যে তিনি প্রায় ৮২% নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। রেজাল্ট বেরোনো মাত্র সেই খবরটা তিনি তার ছোট পিসিকে জানাচ্ছেন, এটা যদি ভালোবাসা না নয়। তাহলে ভালোবাসা কোনটা মশাই। আজ শুধু তিনি ভালো রেজাল্ট করেননি, করেছি আমিও। 


 চাটুজ্জে বাড়ির গুষ্টিতে কেউ কোনদিন তাঁর মত এত নম্বর পায়নি। সেটা বলেই ফেললাম। তিনি কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ সুরে বললেন, "অনেকে আরও অনেক বেশী নম্বর পেয়েছে পিসি -"। নিকুচি করেছে অনেক বেশী নম্বর আর পার্সেন্টেজের, যে পাচ্ছে পাক। ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করুন। আমার চোখে তো তুইই সেরা বাবা, তোর থেকে ভালো কেউ নেই। খুব ভালো থাক বাবা, অনেক অনেক বড় হ, মানুষের মত মানুষ হ। আমার বাপটা দেখে যেতে পারল না নাতির এই সাফল্য এই যা দুঃখ।


 অনির ডাইরি ১লা মে, ২০২৬

#অনিরডাইরি 

বাবা থাকলে, আজ ওদের বিয়ের ৫২ বছর পূর্তি  হত। ঠিক মধ্যরাত্রে ফোন করতাম আমরা। আমি আর তুত্তুরী, তারপর গুঁতিয়ে ফোনটা ধরাতাম শৌভিকের হাতে। জেগে বসেই থাকত বাবা, গর্বিত ভাবে বলত, "থ্যাঙ্ক ইউ"। মা যথারীতি ঘুম ঘুম গলায় বলত, " তাই নাকি? আজ আমাদের বিয়ে হয়েছিল -"। এবারেও মনে ছিল না মায়ের। মনে করাইনি আমিও। শুধু বলেছিলাম, আজ তোমার কাছে খাব। আলাদা কিছু করো না, টিপিক্যাল ঘটি বাড়ির বিউলির ডাল - আলু পোস্ত হলেই হবে। টুকটুক করে অনেক কিছু করিয়েছিল মা, পোস্ত বাটা, মৌরোলা মাছ ভাজা, পুকুরের টাটকা কাতলা মাছের ঝাল, বাড়ির গাছের এঁচোড় চিংড়ি দিয়ে, আমের অম্বল, পায়েস। মা করিয়েছিল থোড়াই, করেছিল তো লতা দি আর ছুটকি। চোখ অপারেশনের পর বেশ কিছুদিন আগুন ধারে যেতে পারেনি লতা দি, আজ তাই আশ মিটিয়ে রান্না করেছে তার সোনা মা (শ্রীমতী তুত্তুরী) এর জন্য। কিনে এনেছে আইসক্রিম ও। 

অনেক গল্প করলাম আমরা। পিসি নেমে এল দোতলা থেকে। সব গল্পের সব বাক্যে একটাই ধ্রুবক, সেটা হল বাবা। আমরা এমন ভাবে কথা বলছিলাম, সমালোচনা করছিলাম, ঠাট্টা করছিলাম বাবাকে নিয়ে যেন বাবা পাশের ঘরেই আছে। এখুনি এসে বসবে ডাইনিং টেবিলে আর বলবে, " আমায় নিয়ে মস্করা হচ্ছে -"। পিসি ছাড়া কেউ কাঁদিনি আমরা, সবাই সবার সামনে লোহার মুখোশ পরে ঘুরেছি। আমরা সবাই যে বীরাঙ্গনা। চলে আসার সময় তুত্তুরীকে বললাম একটা ছবি তুলে দে তো, মায়ের আর আমার। ২০০৮ এ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা ইস্তক প্রতি বছর আজকের দিনে ওদের একটা যুগল ছবি লাগাই আমি। এ বছর বাবা নেই তো কি হয়েছে, আমি তো আছি। আমার মধ্যেই বেঁচে আছে আমার বাবা। মাকে আঁকড়ে ধরে সেটাই বললাম, আমি আছি। আমি সবসময় আছি, আর আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না মা।

Saturday, 11 April 2026

অনির ডাইরি এপ্রিল, ২০২৬

 অনির ডাইরি ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



কবির ভাষায়, "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে" , সেদিন প্রভাতেই মেসেজ করলেন দীপালি দি, " Mem sabai niye aste hobe"। ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা চোদ্দ। অধীর অপেক্ষায় বসে আছি আমরা তিনজনে, হাসপাতাল থেকে কয়েক মিনিট আগেই ফোনটা এসেছে, " কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। আমরা শেষ চেষ্টা করছি -।" ওনারাও জানেন, আমরাও জানি সব লড়াই শেষ। দীপালি দি তো জানেন না, উনি কাক না ডাকা ভোরে উঠে সুখবর দিচ্ছেন ওনাদের ম্যাডামকে। জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিয়ে বলে কথা। লিখছেন, " বাড়ির সবাইকে আনতে হবে ম্যাডাম।" লিখছেন, " আমি অফিস যাব মেম নেমন্তন্ন করতে -"। দীপালি দি আমাদের কোলাঘাট ব্লকের দেরিয়াচক পঞ্চায়েতের SLO। তাঁর জীবনের এই পরম সুখের মুহূর্তটাকে আমার দুঃখ দিয়ে মলিন করতে ইচ্ছে হল না। তাই নীরব রইলাম।


দাহকার্য সেরে প্রথম যেদিন অফিস গেলাম, হক বাবু এসে বললেন, " ম্যাডাম দীপালি খুব কাঁদছে -"। অবাক হয়ে শুধালাম, কেন? কান্নাটা অবশ্য দীপালি দির সাথে সমার্থক। আমি বকলে কাঁদেন, না বকলে কাঁদেন, ভালোবাসলে কাঁদেন, আদর করলে কাঁদেন। আজ কি করলাম রে বাবা! হক বাবু বললেন, " ঐ যে আপনার বাবা মারা গেছেন যেদিন, সেদিন ও আপনাকে ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন করেছে তাই -"। কি আশ্চর্য! আমার বাবার ব্যাপারটা তো ন্যাশনাল নিউজ ছিল না, দীপালি দি জানবেন কি করে! যদিও কোলাঘাটের কৌশিকের সৌজন্যে বেলা দশটার মধ্যেই খবর হয়ে গিয়েছিল SLO গ্রুপে, সে ব্যাটা কি করে জেনেছিল ভগবান জানে। তবে হাসপাতালে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সমবেদনা, সহমর্মিতায় ভেসে গিয়েছিলাম আমি। 


হক বাবু আবার বললেন, " ম্যাডাম অভয় দিলে ও একবার আসতে চাইছে -"। তখনও অশৌচ গা, শুভকাজে আমার অশুভ ছায়া যাতে না পড়ে, বললাম কদিন পরে আসতে বলুন। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সেরে যেদিন অফিস গেলাম, সত্যিই এসে হাজির হলেন দীপালি দি। পরনে সস্তার সিন্থেটিক শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, চোখে চশমা। বেশ করে হাত কচলে, কাঁদ কাঁদ সুরে বলতে গেলেন, " ম্যাডাম আমার খুব ভুল হয়ে গিয়েছিল -"। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এসে কাঁদলে কিন্তু সত্যিই মারব। 


মারধরের ভয় এদের প্রায়ই দেখাই, কেউ ভয় পায় না, সেটা আমার দুর্ভাগ্য। দীপালি দি যেমন, ভেউ ভেউ করে কাঁদলেন না বটে, ফোঁপালেন বিস্তর। বললেন, " আপনি তো জানেন ম্যাডাম, আমার বরের অবস্থা -"। সত্যিই আমি জানি, যে ওনার স্বামী পক্ষাঘাত গ্রস্ত। জানি যে দীপালি দি এবং ওনার ছেলেরা প্রাণপাত করে সেবা করেছেন ভদ্রলোকের।  


জানতে চাই, এখন কেমন আছেন? দীপালি দি বলেন, " আগের থেকে অনেক ভালো ম্যাডাম। লাঠি নিয়ে কিছুটা হাঁটতে পারছে। কিন্তু  -" চোখ মোছেন দীপালি দি। আবার শুরু হয় গল্প, " বাবুকে বললাম, দেখ বাবা, তোর বাবার এই হাল, এখন নমঃ নমঃ করে বিয়েটা করে নে, পরে বড় করে লোক খাইয়ে দেব। তো বাবু বলল,' মা বিয়ে তো মানুষের একবারই হয়।ভরসা রাখো, বাবাকে আমরা ঠিক সামলে নেব' -"। এই অবধি বলেই খেয়াল হয়, " এই যে ম্যাডাম আমার হবু বৌমার ছবি -"। ছবি তো আগেই দেখিয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা, তাও দেখি মিষ্টি মেয়েটার ছবি।


নির্বাচনী দামামায় অফিস যদিও ফাঁকা, তাও যে কজন আছে তাদেরই ডেকে পাঠাই। সবাইকে নিমন্ত্রণ করে যান দীপালি দি, আশ্বস্ত করে যান, " পূজারিকে(রাঁধুনি) বলা আছে মেম, সাড়ে ছটার মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দেব।" সেই মত নির্দিষ্ট দিনে আমরা পৌঁছে তো গেলাম ছটার মধ্যে, গিয়ে দেখি মণ্ডপ শুনশান। দেবারতিকে আমিই জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম, বেচারা এখনও কাউকেই চেনে না। তাতে কি, দুজনে মিলে প্রথমেই গিয়ে হাজির হলাম ফুচকাওয়ালার কাছে। সে সবে টেবিলে মালপত্র নামাচ্ছে। ইশারায় বললে দেরী হবে। লোকজন তেমন নেই, আমরা নিজের বাড়ি মনে করে ঘুরি ফিরি, দেদার সেলফি তুলি। অন্যান্য টেবিল গুলোর পাশ দিয়ে ঘুরে আসি, অনেক রকম স্টার্টার এর আয়োজন আছে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি রেডি হয়নি কিছুই। 


হক বাবু ফোন করেন, " এই দীপালি। কোথায় তুই, ম্যাডাম এসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যে -"। ফোনেই একচোট কেঁদে নেন দীপালি দি। বিয়ের দিন ছেলের মা থোড়াই হুট করে আসতে পারে। আজ্ঞে হ্যাঁ, বিয়ে বৌভাত একই সাথে হচ্ছে আজ। ফুলে ঢাকা গাড়ি চড়ে কনে এসে নামলে তবে সেই গাড়ি যাবে বর আনতে। তবে না আসবে বরের মা। মায়ের নির্দেশে দীপালি দির ছোট ছেলে দৌড়ে আসে সব কাজ ফেলে, আমাদের পিছু পিছু ঘোরে। জমিয়ে ফুচকা খাই আমরা, রঞ্জিত আর আমার কটকটে ঝাল, বাকিদের আঝালা। আসে চিকেন পকোড়া। যেমন নরম তেমন সুস্বাদু। উত্তম খেয়েই বলে," এটা তো দিশি মুরগি -"। কিন্তু হক বাবু মোটে খাবেন না, " হালাল না জানলে খাব নি।" হক বাবু না খেলে আমাদের ভালো লাগে কি -। 


হ্যাংলার মত বিস্তর তাগাদা দিয়ে যখন খেতে বসলাম ঘড়ির কাঁটা ছাড়িয়ে গেছে সাতটার ঘর। আমরাই প্রথম ব্যাচ, আমরা ছাড়া গোটা মণ্ডপে আর কেউ নেই। শাল পাতার থালায়, প্রথমে পড়ে শসা পেঁয়াজের স্যালাড, সাথে আলু ভাজা। গরম ভাত, ফুলকপি মটর শুঁটি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা ঘন মুগের ডাল, মিক্সড ভেজ নামক তরকারি যাতে ছানা থেকে শুরু করে পটল ভাজা, ফুলকপি মায় এঁচোড় পর্যন্ত খুঁজে পেলাম আমি। সাথে দই কাতলা, দিশী মুরগির ঝোল, চাটনি, পাঁপড়, সন্দেশ, কড়া থেকে নামানো গরম পরমান্ন। শেষ পাতে আমুলের আইসক্রিম। এমন নিছক বাঙালি মেন্যু বহুদিন বলা যেতে পারে বহুযুগ পর খেলাম। 


ভুরিভোজ অন্তে বিদায় নেবার পালা। তখনও এসে পৌঁছায়নি দীপালি দি। আসেনি বর ও। উপহারটা তুলে দেওয়া হবে কার হাতে! দীপালি দির কনিষ্ঠ পুত্র বললে, "বৌদির হাতেই দিয়ে যান আজ্ঞে।" নববধূ তখন দরজা বন্ধ করে সবে সাজতে বসেছে। জ্বলছে রিং লাইট, MUA মেয়েটি লাইভ করতে করতে সাজাচ্ছে। কনের মুখে পাউডারের পুরু প্রলেপ, একেই বেকিং বলে বুঝি। উভয়ের কাছেই ক্ষমা চেয়ে নিলাম আমরা, প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলাম নববধূকে। খুব ভালো থেকো। সুখে থেকো। স্টল থেকে দুটো পান মুখে পুরে মহানগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি দীপালি দির ফোন, "মেডাম, আপনাকে তো আপ্যায়নই করতে পেলাম না -" সাথে ফ্যঞ্চ ফ্যাঁচ, মাইরি ছেলের বিয়ের দিন কোন মা কাঁদে, নাহ্ এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আর পারা গেল না। বলেছিলাম না, কান্নাটা দীপালি দির সাথে সমার্থক -


অনির ডাইরি ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



" হ্যালো, কি করছ -", রোজ ফোন করে এই একই কথা বলি, সারা দিনে যতবার ফোন করি, প্রতিবার এই একই কথা বলি। মাও একই রকম ভাবে জবাব দেয়, নির্লিপ্ত, আধা ঘুমন্ত ভাবে, " এই বসে আছি -"। শুধাই, চা খেয়েছ? ওষুধ? ইনহেলার? কেউ ফোন করেছিল? কেউ এসেছিল ইত্যাদি অকাজের কথা। না বললেও হয়, তাও বলি। মুঠো ফোনের এপার থেকে বোঝাই, আমি আছি। 


মা ক্লান্ত সুরে বলে, " আজ নীল -"। বলি জানি তো, করেছি তো। কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে মা শুধায়, কি খাবি? বলি, সাবু। কাল মধ্য রাতে অনুযোগ করেছিলাম বরের কাছে, একটু সাবু এনে দিলি না তো, আগামী কাল নীল যে, খাব কি? তিনি তখন পাত্তাও দেননি বটে, ভোর ছটায় আমাজন থেকে এসে ডেলিভারি দিয়ে গেছে ব্র্যান্ডেড সাবু। দাম দেখে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল, কেন সোহাগ করে বলতে গেলাম, আবাসনের মার্কেটে অর্ধেক দামে পাওয়া যেত। 


আরও অনেক কথা হয়, যেমন আধখানা লাল টুকটুকে তরমুজ যত্ন করে ঠাণ্ডা আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছিলাম, সকালে মেয়েকে স্কুল বাসে তুলে এসে দেখি, বাসন মাজার দিদি তাকে যত্ন করে খোসা ছাড়িয়ে, কেটে রেখেছে। আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল, " আজ তোমাদের নীল না বৌদি? তুমি খাবে তো, তাই কেটে দিয়ে গেলাম।" হায় হায়, এবার আমার বুড়ো শিবকে কি দিই? দিদিকে কিছু বলতে না পারলেও, বরের কাছে এক ঝুড়ি নালিশ করেছিলাম। শীতল কণ্ঠে শৌভিক বলেছিল," কেন ঐ তরমুজ শিব ঠাকুরকে দেওয়া যায় না, মুসলমানের মেয়ে কেটেছে বলে?"


হাসতে হাসতে মাকে বলি, প্রতি বছর নীলের দিন ঠাকুমা কি গল্প শোনাত তোমার মনে আছে মা? সেই যে গো, ভোলে বাবার মন্দিরে আজ এত ভিড় কেন বলে দেখতে এসেছিল এক বিধর্মী বালিকা, জানতে পারা মাত্র তাকে বিতাড়ন করে পাণ্ডার দল। চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় বালিকা, তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায় মন্দিরের দুয়ার। কিছুতে দ্বার খোলেন না মহাদেব, যতক্ষণ না সেই মেয়েটিকে খুঁজে সসম্মানে ফেরৎ নিয়ে আসে মন্দিরের মূল পুরোহিত। ঠাকুমা বলত, সেই বিশেষ মন্দিরে ঠিক বেলা বারোটার সময় প্রথম বাতিটা দেবে এক মোছলমানের মেয়ে, তারপর শুরু হবে মহাদেবের পুজো। 


২০০৫ এ চলে গেছে ঠাকুমা,ভাগ্যে চলে গেছে নইলে একদল বলত কাফের আর এক দল ছাপ্পা মারত সিকুলার বলে। যাই হোক সাতসকালে ঠাকুমার ঝুলি না খুলে বলি, ঠাকুরের কাছে হিন্দু মুসলমান আবার কি, তবে ওমন খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করে কাটা তরমুজ ভোলে বাবাকে দেওয়া যায় না। তাও আবার ফ্রিজে রাখা, কিসের সাথে ঠেকে বসে আছে কে জানে? 


শৌভিক গজগজ করতে করতে নীচে নামে, " আজব নিয়ম, খোসা সমেত দিলে খাবে, খোসা ছাড়িয়ে দিলে খাবে না -"। মুঠো ফোনের ওপাশে মা হেসে গড়াগড়ি যায়, তারপর বলে, " দিদি তোর জন্য কত কি কিনে রাখত বল!" দিদি অর্থাৎ আমার সবেধন নীলমণি পিসি, যিনি সদ্য পেরিয়েছেন নব্বইয়ের ঘর, সত্যি তিনি কিনে রাখতেন - গোটা বেল, পাঁচ ফল, কাঁটাওয়ালা ধুতরো ফল, আকন্দ ফুলের মালা, পিতলের কমণ্ডুলে ভরে নিতেন কাঁচা দুধ আর গঙ্গা জল, তারপর আমায় বগলদাবা করে রওনা দিতেন পাড়ার বুড়ো শিবের মন্দিরে। কি যে ভিড় হয় এই দিনটায় আমাদের মন্দিরে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অবশেষে প্রবেশাধিকার মেলে গর্ভগৃহে। গোল করে শিবকে ঘিরে বসে পুরনারীবৃন্দ, মন্ত্র পড়েন পুরুত ঠাকুর। সবার আগে শিবের মাথায় ঢালা হয় দুধ, গলায় পরানো হয় আকন্দ ফুলের মালিকা, পিনেটের ওপর রাখা হয় বেল, ধুতরো ফল ইত্যাদি। আমরা রাখি, ঠাকুর মশাই সরিয়ে দেন নইলে ফলের চাপে মহাদেবের পাতাল প্রবেশ হবে যে। সবশেষে মিষ্টির বাক্স থেকে একটা করে মিষ্টি তুলে নেন ঠাকুর মশাই, জানতে চান নাম গোত্র। পুজো শেষে বীর দর্পে বাড়ি ফিরি আমরা পিসি ভাইঝি। 


এবছর বাবা নেই,মানসিক ভাবে পিসি শতখণ্ড হয়ে গেছে। আবার বিমর্ষ হয়ে পড়ে মা, চাঙ্গা করতে স্মৃতিচারণ করি আমি, সোনালী দিনের স্মৃতি, যখন বাবা ছিল, ঠাকুমা ছিল, যখন গমগম করত ব্যাঁটরার চাটুজ্জে বাড়ি। যখন নীল এলেই বেলের শরবত বানাত ঠাকুমা, পুত্রবধূদের জন্য। আমরা বলতাম বেলের পানা। বাড়িতেই ছিল বিশাল বেল গাছ। তিনতলা বাড়ির সমান লম্বা। ছাদ থেকে হাত বাড়িয়ে বেলপাতা পাড়ত সবাই। সারা বছর কম বেশী বেল হত গাছটায়, আর গ্রীষ্ম এলে তো ফলের ভারে নুয়ে পড়ত গাছটা। এক হাতে বেল ধরে অন্য হাতে নোড়া দিয়ে পিটিয়ে বেল ভাঙত ঠাকুমা, বলত, " চৈত্র - বোশেখ" মাসে মাটিতে আছড়ে বেল ভাঙতে নেই। শিব ঠাকুরের মাথায় লাগে। 


রোমন্থনে কখন যেন মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে আমার মুখে, মায়ের গলাতেও যেন মেঘ কেটে দেখা দেয় হালকা রোদের ছোঁয়া। ঠাকুমার বেলের পানা বানানোর গল্প ধরি আমি, কেমন যত্ন করে চামচ দিয়ে কুরে কুরে বার করত ভিতরের শাঁস টুকু, কচলে কচলে মেশাত কলসির ঠাণ্ডা জলের সাথে, কাচা ধপধপে সাদা থানের টুকরোয় ছাঁকা হত সেই বেলের ঘোল।আগে থেকেই ভিজিয়ে রাখত চিনি, সামান্য নুন আর সেই সুগার সিরাপ সহযোগে অমৃত হয়ে উঠত বেলের পানা। খরদুপুরে নীলের পুজো দিয়ে ফিরলেই, পুত্রবধূদের হাতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস সহ একগ্লাস করে তুলে দিত ঠাকুমা। 


শুনতে শুনতে দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে মা, করুণ সুরে বলে," এত ভালো মানুষ গুলো কেন যে হারিয়ে গেল -", ছদ্ম ক্ষোভ গলায় মিশিয়ে মাঝপথে মাকে থামিয়ে দিই আমি, " কি বলছ গো, ঠাকুমা বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হত ১১২/১১৩ বছর -", মা থতমত খেয়ে কথা ঘোরায়, " আমার জন্য লুচি তরকারী বানিয়ে রাখতিস তুই।" তা রাখতাম বটে, প্রথম লুচি বানানো এই নীল উপলক্ষ্যে, একটাও গোল হয়নি সেবার। শেষে বাবা বলল, " একটা বাটি দিয়ে কেটে দে ব্যাটাদের গোল গোল করে।" 


সেই বাবার প্রসঙ্গ উঠবেই, যত সরিয়ে রাখতে চাই লোকটাকে, জোর করে সব কথাতেই ঢুকে আসবে লোকটা। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে হাপুস নয়নে কাঁদছিল তুত্তুরী, " আমি আর ঘুমাব না মা। ঘুমোলেই দাদুর স্বপ্ন দেখি, ঘুম ভাঙলেই শূন্যতা।" ঠিক এই ভয়েই রোজ রাতে বলে শুই, একদম আমার স্বপ্নে আসবে না তুমি। তাও আসে, তবে সে অনেককাল পুরান বাবা। যার সাথে হালকা কথা হয়, গল্প হয়,কিন্তু মন খারাপ হয় না। মন খারাপ তো হয় পুজো করার সময়। কি বলব ঠাকুরকে আমি, প্রতিটা প্রার্থনায় জড়িয়ে ছিল যে লোকটা, তাকে বাদ দিয়ে কি চাই আমি? অন্যান্য সময় শক্ত থাকলেও এই একটা সময় নিজেকে সামলাতে পারি না আমি।

আজ তাই কিছু বলিনি ঠাকুরকে, জাস্ট সাজিয়ে দিয়েছি ফল, দুধ, সামান্য দক্ষিণা। যন্ত্রের মত বলেছি মন্ত্র। পুজো শেষে বাতি জ্বালিয়েছি প্রিয়জনদের মঙ্গলার্থে। প্রিয়জন কি আমার কম যাদের অনেককে আবার চোখের সামনে জন্মাতে, বেড়ে উঠতে দেখেছি-দেখছি ভালো থাকুক সবাই। জানলার সামনেটা ভরে উঠেছিল আজ বাতিতে বাতিতে -। সেই গল্প শোনাই মাকে, সব শেষে বলি, বাবার নামেও একটা বাতি দিয়েছি মা, ভেবেছিলাম দেব না। কি হবে দিয়ে - মৃত্যুর পর তো কিছু থাকে না। কিন্তু না জ্বালিয়ে আর নড়তে পারলাম না। যেখানেই থাক, ভালো থাক। ম্রিয়মান গলায় মা বলে, "ভালো করেছিস। খুব ভালো করেছিস। বাবা আছে, অবশ্যই আছে। তোর আশেপাশেই আছে, যা ভালোবাসত তোকে -"


অনির ডাইরি ১১ই এপ্রিল, ২০২৬


#অনিরডাইরি 


দুটো ইঁটের মাঝে এক গোছা পাটকাঠি জ্বেলে তারওপর চাপানো একটা মাটির সরা। সরায় খানিক গঙ্গা জল আর কিছুটা আতপ চাল, একটু ফুটে উঠতেই নামিয়ে নিল পুরুত ঠাকুর। শ্মশানেই থাকেন ভদ্রলোক। কাজ করতে করতেই গল্প করছিলেন, এখন গ্রীষ্ম তাই দিনের বেলাটা ফাঁকাই থাকেন, ভিড় হয় রাতে। শীতকালে ঠিক উল্টো, দিনের বেলায় ভিড় বাড়ে শবদেহ তথা যাত্রীদের। 

আধ সিদ্ধ চালের ওপর খানিক ঘি, মধু, কলা , তিল ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন "এটাকে ভালো করে মাখো"। হাত দিয়ে খানিক মাখার চেষ্টা করে আর পারলাম না, থরথর করে কাঁপছি, এর থেকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনও হয়নি। খুড়তুতো ভাই পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল হাত দিয়ে, সামনে থেকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে বড়দা, তাও পারলাম না, কোন মতে কয়েকবার চটকে দিয়ে দিলাম ভাইয়ের হাতে। 


পুরুত ঠাকুর কইলেন, "এবার যে ঘি মাখাতে হবে মা!" কাকে? বাবাকে? আমি পারব না, কিছুতেই পারব না - টপ করে এক ফোঁটা চোখের জল টেবিলের কাঁচের ওপর এসে পড়াতে হুঁশ ফিরে পাই। কোথায় বাবা - বাবা আর নেই। বাবা মরে গেছে। যখন তখন এটা মনে হয় আর ছলকে যায় আঁখি। গতরাতেই তো, হাওড়া ময়দানে নেমে আর রাস্তা পেরোতে পারছিলাম না, কেবল মনে হচ্ছিল এই তো সেদিন এই তেলেভাজার দোকান থেকে ফাপড়া কিনে নিয়ে গেলাম বাবার জন্য। বাবা বলে গাঠিয়া, সাথে কুরানো কাঁচা পেঁপে সিদ্ধ আর লঙ্কা সিদ্ধ। বড্ড ভালোবাসত বাবা, সেদিন কেমন আমার সাথে বসে চা দিয়ে খেল আর আজ -। 


অফিসে বসে একদম ভাবতে চাই না, তাও মনে পড়ে বুড়োর কথা। চেম্বারে কেউ ঢুকলে হাসি, পিছনে লাগি, গল্প করি, ফাইল ছাড়ি - ঘর ফাঁকা হলেই "ম্যায় ওর মেরি তানহাই "। মাঝে মাঝে পাগলের মত মস্তিষ্ক প্রক্ষালন করি, মুঠো ফোনে বাবার যাবতীয় পুরান রিপোর্ট ঝেড়ে দেখি কোথাও কিছু নির্ঘাত অবহেলা বা ভুল করেছি আমি। আমারই দোষে চলে গেছে বাবা, দোষটা কি সেটা না ধরতে পারা পর্যন্ত শান্তি পাব না। প্রিয় বন্ধু ফোন করে, রোজই করে, কেন করে ভগবান জানে। কখনও কেজো, কখনও অর্থহীন কথা বলি আমরা, আজ যেমন বলেই ফেলি মনের কথা -অপরাধ খুঁজে নিজেকে ফাঁসি দিতে চাই আমি। নির্ঘাত আমার দোষেই চলে যেতে হয়েছে বাবাকে -


বন্ধু বলে, " এটাই স্বাভাবিক। আমারও তাই মনে হয়, আজও। একদিন হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বাবার অক্সিজেনটা ওরা কমিয়ে রেখেছে। ওটাই নাকি নিয়ম, আস্তে আস্তে প্রেসার কমিয়ে রুগীর ফুসফুসকে এডজাস্ট করায় -। সেদিন কিছু বলিনি,বাবা চলে যাবার পর প্রায় মনে হত, কেন বলিনি, বললে হয়তো একটু কষ্ট কম পেত । কে জানে হয়তো আরও কয়েকটা দিন বাঁচত লোকটা -"। আশ্বস্ত করি, একই ঘটনা ঘটছিল আমার বাবার সাথেও, আমি বলেও ছিলাম, ফলাফল লবডঙ্কা।


 জানতে চাই, এই দমচাপা কষ্টের মেয়াদ আর কত দিন? বন্ধু বলে, " জানি না। এতদিন হয়ে গেল বাবা চলে গেছে, আজও একা থাকলে কেঁদে ফেলি বাবার কথা ভেবে।  গয়ায় গিয়ে এত কষ্ট হচ্ছিল কি বলব, হিন্দু ধর্ম মতে গয়ায় পিণ্ডদান করলেই তো মুক্তি, কেবল মনে হচ্ছিল এবার বাবা সত্যিই আমায় ছেড়ে চলে যাবে -"। ঠিক এই একই কথা আমারও মনে হচ্ছিল ঘাট কাজের দিন। 


বন্ধুর সাথে বার্তালাপের মধ্যেই আসে ফোনটা, অচেনা নম্বর, ধরতেই ওদিক থেকে এক বয়স্ক পুরুষ কণ্ঠ বলে ওঠে, "ম্যাডাম? আমাকে কি আপনার মনে আছে, আপনি যখন খড়গপুরে ছিলেন, আমি আপনার ইন্সপেক্টর ছিলাম। আমার নাম প্রশান্ত দাস -"। 


হঠাৎ খুশি হয়ে ওঠে মনটা, হেসে বলি অবশ্যই মনে আছে প্রশান্ত বাবু," পিংলায় ছিলেন না আপনি! কিন্তু ইন্সপেক্টর বলছেন কেন, আমি থাকতে থাকতেই তো আধিকারিক পদে পদোন্নতি হয়েছিল আপনার।" ভদ্রলোক হেসে বলেন, " ম্যাডাম শুনলাম আপনি তমলুকে আছেন, আমি যদি ঘণ্টা দুয়েক পর যাই আপনার সাথে দেখা হতে পারে?" বলি আলবাত পারে, আপনি আসুন তো, দুইয়ের জায়গায় চার ঘণ্টা লাগলেও আমি অপেক্ষা করব। 


ঘণ্টা দুই আড়াই পর, চেম্বারের দরজা ঠেলে যিনি প্রবেশ করলেন, তাঁকে দেখে পলকে মনে হল আমি বুঝি ২০০৭-৮ সালে আছি। একই রকম দেখতে আছেন ভদ্রলোক, মিশমিশে কালো চুলে সামান্য নুন মরিচের ছোঁয়া ছাড়া, সময় বিন্দুমাত্র থাবা বসাতে পারেনি ওনার উপর। বললেন ২০১২ সালে অবসর নিয়েছেন। বাকিটা রামদেব বাবার প্রাণায়াম আর সাথে প্রাতঃভ্রমণের সুফল। অনেক গল্প হল ভদ্রলোকের সাথে, পুরান ভুলে যাওয়া সাদাকালো যুগের গল্প। শৌভিকের খোঁজ নিলেন, তুত্তুরীর বয়স বলে দিলেন নিখুঁত ভাবে। ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে খড়গপুর ছেড়ে এসেছি, আজ এত বছর পরও যে ওনারা আমাকে তথা আমার পরিবারকে মনে রেখেছেন তাতে ধন্য হয়ে গেলাম। বর্তমান অফিসের সকল সহকর্মীকে ডেকে সগর্বে আলাপ করিয়ে দিলাম, দেখ আমার প্রথম ইন্সপেক্টর। আজও ভোলেননি আমায়। লোক মুখে খোঁজ পেয়ে ছুটে এসেছেন - 


প্রশান্ত বাবু গল্প শোনান, তমলুক আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের সাথে ওনার সম্পর্ক অনেক প্রাচীন, ওনার জীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল এই মহকুমায়। আমরা সাগ্রহে জানতে চাই, কোথায়? হেসে বলেন, " ময়না। তবে তখনও ময়না বিডিও অফিস তৈরি হয়নি, একটা ভাড়া বাড়িতে বসতাম আমরা।" জিজ্ঞাসা করি, সেটা কোন সাল? বৃদ্ধ দাড়ি চুলকে বলেন, " ১৯৭৬ থেকে ৮৪ আজ্ঞে -"। হরি হরি, তখন তো আমরা কেউই জন্মাইনি। প্রশান্ত বাবু হেসে কন, " আজ্ঞে, সেই ময়নার সাথে আজকের ময়নার কোন মিল পাবেননি।" একটু আগেই ময়না ব্লকের একটা বিশেষ পঞ্চায়েত এলাকার গল্প হচ্ছিল অফিসে, ময়নার সবথেকে ঝঞ্ঝাটিয়া পঞ্চায়েত ওটা।  শুনেছি মুড়ি মুড়কির মত বোমা পড়ে ওখানে। গণ্ডগোল বাঁধলেই বঁটি কাটারি নিয়ে তেড়ে আসে ওখানকার প্রমীলা বাহিনী। আমি শুধাই, তখনও কি এমন রণপটু ছিল ঐ এলাকার নারী পুরুষ কুল? মারামারি হত? প্রশান্ত বাবু বলে ওঠেন, " বাবারে! একই ছিল ম্যাডাম। তবে তখন যে দুই দলের নামে ঝাড়পিঠ হত স্থানীয়দের মধ্যে, বর্তমান রাজ্য রাজনীতিতে তারা একেবারেই অপাংক্তেয়।" বুঝতে পারি, দল আসে, দল যায়, বদলে না মানুষের প্রকৃতি। ঝামেলা তখনও হত, এখনও হয়, নির্ঘাত ভবিষ্যতেও -। বেলা গড়ায়, প্রশান্ত বাবুকে ঠেলে তুলতে হয়, এবার বাড়ি যান। যাবার আগে অবশ্য ভয় দেখিয়ে গেলেন, " আবার আসব ম্যাডাম -"। মনে মনে বলি, অবশ্যই আসবেন, ভাগ্যিস এলেন, এই অপরিসীম শোকের হাত থেকে কিছুটা তো রেহাই পেলাম।