অনির ডাইরি ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
#অনিরডাইরি
তন্ময় হয়ে দেখছিলাম আমি, সায়াহ্নের রূপালী গঙ্গা, পাড় বরাবর ফুটে আছে কমলা আগুনের মত পলাশ। পলাশ কমলা হয়, শিমূল টকটকে লাল। রুদ্রপলাশের রঙও কমলা ঘেঁষা, কিন্তু বসন্ত এলেও ওরা পাতা ঝরায় না। হাতে ধরে শিখিয়েছিল দেবশ্রী দি।
বাবার ডাকে আছড়ে পড়লাম বাস্তবের মাটিতে। জল চাইছে বাবা, এম্বুলেন্সের ছেলেটি বলেই রেখেছে, " জল খাওয়াতে হলে আমায় বলবে দিদি, আমি গাড়ি দাঁড় করাব, নইলে গলায় আটকে যেতে পারে।" জল আনার কথা আমার মনেও ছিল না, হাউসকোট চাপিয়ে দৌড়ে এসেছিল চৈতি, " দিদিভাই জলটা নিয়ে যাও" বলে।
Morning shows the day, যে কারা বলে, দিব্যি তো শুরু হয়েছিল সকালটা স্বাভাবিক ভাবে। নতুন ওষুধ গুলো কিনে বুঝিয়ে দেবার জন্য একবার বাড়ি গিয়েছিলাম আমি। গিয়ে দেখি এই মধ্য ফেব্রুয়ারির গরমে দু - দুটো কম্বল মুড়ি দিয়ে কাঁপছে বাবা। অক্সিজেন লেভেল নেমে গেছে ৭১। পালস ১২০। বিগত এক দেড় মাস ধরে বাড়িতেই থাকে অক্সিজেন কন্সেন্ট্রেটর, অঘোরে অক্সিজেন টানছে বাবা। মাঝে মাঝেই ডাকছে তুত্তুরীকে। মা বলল, সারারাত তুত্তুরীকে ডেকে গেছে বাবা, সারা রাত ছটফট করেছে কষ্টে, অথচ বলতে পারেনি কি কষ্ট।
এত দিন পর্যন্ত বাবার সব রিপোর্ট, সব ওষুধ, সব আপডেট শেয়ার করেছি ChatGPT র সাথে, কোন দিন ঘাবড়াতে বলেনি ChatGPT, বরং বলেছে এটা এই বয়সে হতেই পারে। আজ প্রথম নার্ভাস হতে দেখলাম AI কে। সোজা বলেই দিল, "অনি ফেলে রেখো না, এই মুহূর্তে হসপিটালাইজেশন করা দরকার।"
সব আপডেট নিয়ে শৌভিক কথা বলল পরিচিত এক ডাক্তার বাবুর সাথে, ভগবান মনে করি ভদ্রলোককে। দুর্ভাগ্য তিনি আপাতত পড়তে গেছেন ভিনরাজ্যে। ক্লাসের মধ্যেই সব শুনে বললেন, " আমি তো ওনাকে দেখিনি, শুনে মনে হচ্ছে, যেহেতু চেইন স্মোকার ছিলেন, একটা ফুসফুস এমনিতেই অকেজো, আর একটাও ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইড মিশছে। হাসপাতালে ভর্তি করেই দিন -"।
উনি নিজেই চেষ্টা করলেন কয়েক জায়গায়, কোথাও বেড খালি নেই। আমিও বসে বসে ফোন করছি, নেই নেই, কোথাও বেড খালি নেই। ঘোরের মধ্যে আমার মেয়েকে ডেকেই যাচ্ছে আমার বাবা, এই একটাই তো লোক ছিল, যার জীবনের সূর্য ছিলাম আমি, সেটাও চুরি করে নিয়েছে আমার ছানাটা। শত দুশ্চিন্তার মধ্যেও এমন ছেলেমানুষী চিন্তায় হেসে ফেলি আমি। ওদিকে কাঁদতে লেগেছে মা আর পিসি। " আবার হাসপাতালে দিবি? নিয়ে যাস না বাবা। লোকটা আমার চোখের সামনেই থাক -। আমরা সবাই আছি তো -"।
মায়ের কথা শুনে হেসে বাঁচি না, সবাই মানে আমার নব্বইয়ের পিসি, মধ্য সত্তর পেরোনো মা, লতা দি আর বাবার দিনের বেলার মধ্যবয়সী আয়া দিদি। হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব। পিসতুতো দেওরের সৌজন্যে বাইপাসের ধারে একটা হাসপাতালে আশ্বাস পাওয়া গেছে, বেড পাওয়া যাবে।
পাড়ার যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে যাবতীয় রক্ত পিত্ত কফ পরীক্ষা করা হয়, তাদের একটা বাতানুকূল এম্বুলেন্স আছে তো, কিন্তু তাতে অক্সিজেন দেবার কোন ব্যবস্থা নেই। আর এই ভরদুপুরে কোন লোকজনও নেই যে শয্যাশায়ী রুগীকে এম্বুলেন্সে তুলবে। আমাদের বাড়ি থেকে এম্বুলেন্সের নিকটতম দূরত্বটাও খুব কম নয়। প্রপিতামহ কেন যে এই গলির মধ্যে বাড়ি বানিয়েছিলেন। তখন অবশ্য সামনেটা খোলা জমি আর বিশাল বাগান ছিল। মা বলল, " বানে ডুবত না বলে বানিয়েছিলেন -", সত্যিই তো উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে কে আর গাড়িঘোড়ার কথা ভাবত।
যাইহোক ড্রাইভার ছেলেটি বলল, " লোক আপনাকেই জোগাড় করতে হবে দিদি।" এই ভরদুপুরে লোক কোথায় পাই ঠাকুর! সেজদার সাথে সমানে কথা হচ্ছে, কিন্তু তাকে কি এই ভরদুপুরে ডাকতে পারি, সব কাজ ফেলে বাবাকে চাগাবে এসো? ভাবতে ভাবতে মাথার ওপর বাল্ব জল উঠল যেন, ঈশ্বরের নাম নিয়ে ফোন করলাম বুল্লু বাবুকে। আমার গুণধর ভাইপোটি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে, যদি আজ পরীক্ষা না থাকে-
দৌড়ে এল ছেলেটা, বাগান ঝাঁট ফেলে দৌড়ে এল চৈতি, পরপর দুই দিন শিবরাত্রির উপোস করে কাহিল লতা দিকেও আটকানো গেল না, সেও নেমে পড়ল বাবাকে ধরতে, বইতে। সবাই মিলে ধরাধরি করে তুলেই ফেললাম এম্বুলেন্সে। দালানের দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়ানো অসহায়, ক্রন্দসী জননীকে বললাম, " দেখছ মা, তোমার নাতি কেমন দাদুকে বইল, ঐ দেখো পিছিয়ে থাকেনি তোমার পুত্রবধূও।"
এম্বুলেন্স ছাড়া ইস্তক কাতরাচ্ছে বাবা, ডেকেই চলেছে তুত্তুরীকে। সেই খবর শুনে ওদিকে অঝোরে কাঁদছে তুত্তুরী, কাল তার বার্ষিক ভূগোল পরীক্ষা কি করবে কে জানে। ধুৎ কত আর ভাবব, গাড়ি থামিয়ে জল খাওয়াই বাবাকে, খানিক ধমকাই, এত কাতরাচ্ছ কেন? ওতে তো আরও কমে যাবে অক্সিজেন। চুপ করে চোখ বুজে ঈশ্বরকে ডাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে। কার্ল মার্ক্স সাহেবের ঘোরতর অনুগামী আমার বাপ, ঘোলাটে চোখ পাকিয়ে বলে ওঠে, " নেই, নেই, কেউ কোত্থাও নেই।"
কিন্তু আমি জানি আছেন তিনি আছেন, তিনি না থাকলে, নিজের বরের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, এই ভাবে ফোন করে বকত না আমার বড়দা, " তোর কি কোন বুদ্ধি নেই, একা কেউ পেশেন্ট নিয়ে হাসপাতালে যায়? সেজদা এদিকে রেডি হয়ে বসে আছে তোর সঙ্গে যাব বলে?" অফিস ফেলে, সটান হাসপাতালে ছুটে আসত না ছোটদা। বাউরিয়া থেকে ফোন করে ছুটে আসতে চাইত না আমার খুড়তুতো ভাই বা নবান্ন থেকে শৌভিকের পিসতুতো ভাই। এতবার ফোন/ মেসেজ করত না আমার একটাও বন্ধু বা সহকর্মী। তিনি আছেন বলেই না বেঁচে আছে যাবতীয় সুকুমার প্রবৃত্তি গুলো -। আর তিনি সবসময় ন্যায় বিচারই করেন, আজও করবেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আরো আঁকড়ে ধরি খসখসে বুড়ো হাতটাকে, হাত বুলিয়ে দিই মাথায়, দেখাই যাক না আজ কি সাজিয়ে রেখেছেন তিনি আমাদের জন্য।
অনির ডাইরি ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
#অনিরডাইরি
17 Years and Counting
ব্যাপারটা এমনিই ছিল। সেদিনও বলেছিলাম, " দেখ ভাই, বিয়ে বলে কথা, চল একটা পাঞ্জাবি কিনে দিই -"। সেটা ২০০৯, দিনটা ভ্যালেনটাইন ডে, মহানগরের "বাতাসে বহিছে প্রেম"। তো তিনি কইলেন, " কি দরকার, আছে তো -"। আজ ১৭ বছর পরও তিনি একই কথা বলেন, যখনই কোন জিনিস কিনে দিতে চাই।
পরের দিন আমাদের বিয়ে, বিয়ে মানে রেজিস্ট্রি। শ্বশুরমশাইয়ের পূর্ণ ইচ্ছে ছিল, রেজিস্ট্রি দিয়েই শুরু আর রেজিস্ট্রি দিয়ে শেষ করার। নাছোড়বান্দা আমার বাপ, " এত লোকের বাড়ি আপ্যায়িত হয়েছি, এত মানুষ নিমন্ত্রণ করেছেন আমায়, আমার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে তাদের বলব না!"
বিয়ের আগের দিনও ঘ্যানঘ্যান করছিল শৌভিক, " তোমার বাপটাকে একটু রাজি করো না। কি দরকার আর অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করার -"। আমার বাপের ডাক নাম হিটলার, ভদ্রলোক কবে কার কথা শুনেছেন।
যাই হোক বিয়ের দিন দুপুরে প্রায় ঘুমোতেই দেয়নি বাবা। আড়াইটে তিনটে থেকে তাড়া দিয়েছে তৈরি হবার জন্য। তৈরি হওয়া মানে নিজেই সাজা। আমার পিতৃকুলে কেউ কোনদিন পার্লারে গিয়ে সাজেনি, না কাউকে সাজাতে পার্লারের দিদিরা বাড়ি এসেছে।
MUA বা ব্রাইডাল স্টুডিও ব্যাপারগুলো তখনও ঘুমিয়ে ভবিষ্যতের গর্ভে।
আপনা হাত জগন্নাথ 🙏🏻। আদি মোহিনীমোহন থেকে কেনা মেরুন রঙের স্বর্ণচরী শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে মেরুন সোনালী আইশ্যাডো কিনেছি আমি, কিনেছি ল্যাকমের ফাউন্ডেশন আর কম্প্যাক্ট। আমাদের কদমতলা বাজারে তখন ঐ একটা কোম্পানিরই প্রসাধনী পাওয়া যেত। শেড ঐ গোটা দুই তিন। দুধে আলতা থেকে দুধে কফি যেমনই কমপ্লেকশন হোক না কেন, ঐ তিনটের মধ্যেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিত বুড়ো দোকানী। ওটাই বিশাল দামী মনে হত তখন। ওর নীচে ব্লু হেভেন আর কি সব ব্র্যান্ড ছিল যেন, তাদের দিকে তাকালেই ভয় দেখাত দোকানদার, " মুখে ঘা হবে কিন্তু " ।
ধপধপে ফর্সা যে ফাউন্ডেশন কিনে এনেছিলাম, বিয়ের দিন বিকালে লাগিয়ে মনে হল ছাই গাদায় মুখ ঘষে এসেছি বুঝি। তার ওপর মেরুন আর সোনালী আইশ্যাডো, উফ্। গোটা রাস্তা রুমালে মুখ মুছতে মুছতে গেছি আমি। শ্বশুরবাড়ি (হবু)তে মাথা নীচু করে ঢুকে, হবু বরকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ। এ কি পরেছে লোকটা? কোথা থেকে বার করেছে আদ্যি কালের পাঞ্জাবিটা। একবার ইস্ত্রিও বোলায়নি, ভগবান। সবার সামনে কি আর বলি।
হৈহৈ করে সই সাবুদ সম্পন্ন হল,সাক্ষী হিসেবে সই করল আমার পিসি, বাবা আর শ্বশুরমশাই। সাঙ্গ হল আশীর্বাদ পর্ব। গুরুজনেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল ঘরোয়া আলাপচারিতায়। আমার দিদিভাই আর জামাইবাবু (টুলটুল দাদা) দোঁহেই মাতিয়ে দিল আসর।
কয়েক মুহূর্তের নিরালায় নতুন বরকে বললাম, " এটা মোটেই ভালো পাঞ্জাবি নয়।" মানলে তো। জেদি ঘোড়ার মত মাথা নেড়ে বলেছিল, " এটা খুব ভালো। এটা দারুণ ভালো। তুই কিছু বুঝিস না।" মাইরি না বুঝেই লোকটার সাথে কাটিয়ে দিলাম ১৭টা বছর।
আজই দেখুন না, আলমারি ভর্তি জামাকাপড়, অথচ উনি ভালো কিছুই পরতে চাইলেন না, মানছি শ্রীমতীর বার্ষিক পরীক্ষা চলছে, বাইরে খেতে যাবার প্ল্যান করেও বাতিল করেছি আমরা, তাও বিশেষ দিনে মানুষ একটা ভালো জামা তো পরে। বললাম ও, তিনি কইলেন, " এটা খুব ভালো। এটা দারুণ ভালো। তুই কিছু বুঝিস না।" মাঝে মাঝে মনে হয়, শান্তির নোবেলটা আমারই পাওয়া উচিৎ।
অনির ডাইরি ১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বেরোনোর কথা ছিল নটায়, জুতোর ফিতে আঁটতে আঁটতে উবেরের ড্রাইভারকে যখন, " হ্যাঁ ভাই, কোথায় আছেন -" বলে ফোনটা লাগালাম, ঘড়িতে তখন সোয়া দশ। পইপই করে বলেছিল অন্তু, "অনি দেরী করবি না কিন্তু, সাড়ে নটার মধ্যে সবাইকে ঢুকতে বলা হয়েছে, তুই অত দূর থেকে আসবি, তাই দশটা। তার বেশী নয়-"। আর আমি কিনা ঘুম থেকেই উঠলাম বেলা আটটায়।
বলেছিলাম, আমায় বাদ দে। পেটের ধান্ধায় সারা সপ্তাহ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, শনি - রবিবার বর মেয়েকে ছেড়ে কোথাও যেতে আমার কান্না পায়। আপদগুলো শুনলে তো, "তোর বন্ধুরা যার আয়োজক, সেই অনুষ্ঠানে তুই আসবি না, অনি -"। সেন্টু দেওয়া আর কাকে বলে।
কোন এক হৈমন্তী সন্ধ্যায় চৈ বলেছিল, " শোন একটা জব্বর আইডিয়া আছে। একটা ব্যাচের রিইউনিয়ন করলে কেমন হয়, সাথে দিদিমণিদেরও আমন্ত্রণ জানাতে পারি আমরা -"। ব্যাচ অর্থাৎ আমরা যারা একসাথে পেরিয়ে ছিলাম মাধ্যমিকের গণ্ডি। হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব? ক্লাস রুম তো নয়, আমাদের ছিল হরি ঘোষের গোয়াল। প্রতিটি ক্লাসে অন্তত তিনটি করে সেকশন, প্রতিটি সেকশনে কম করে জনা ষাটেক বালিকা। একটা বেঞ্চে পাঁচজন করে বসতাম আমরা।
নম্বর দেবার বেলায় অস্বাভাবিক কিপটে ছিল আমাদের বিদ্যালয়, প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করত কেউ না কেউ। একবার ফেল করলে, কারো অনুরোধেই তাকে নতুন ক্লাসে তোলা হত না, সে তিনি যত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিই হোন না কেন। দুবার ফেল করলে, বিদায় জানানো হত চিরতরে। এই নিয়ে ভয়ানক জঙ্গী ছিলেন আমাদের বড়দি। এই ভাবে কমতে কমতেও শেষমেষ শতাধিক কন্যা মোরা একসাথে পাস করেছিলাম মাধ্যমিক।
সে তো কোন মান্ধাতা আমলের কথা, ১৯৯৫ সাল। আজ তিন দশক বাদে তাদের সাথে দেখা হলে চিনতে পারব তো? দোলাচল নিয়েই বেরোলাম, বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ, গতকাল মাঝ রাতে ব্যাটারা ঠিক করেছে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরবে সকলে, না থাকলে লাল বা সাদাও চলবে। সেটা আমি দেখেছি উবের ডাকতে গিয়ে। নার্ভাস হয়ে বৈ কে ফোন করে খানিক কাঁদলাম, আমি আর যাব না বলে। ছোট বাচ্ছাকে ভোলানোর মত করে সান্ত্বনা দিল বৈশাখী, " তুই এখনও বেরোসনি? কি রঙের শাড়ি পরেছিস? সবুজ! বাঃ দারুণ রঙ, চলে আয়, চলে আয়। বন্ধুদের গেট টু তো, স্কুল নাকি যে কেউ তোকে বার করে দেবে -"।
উবেরটা হাওড়া ময়দানে নামিয়ে দিল। গুগলে যে পথ দেখাচ্ছে, পুলিশ সেদিকে যেতে দিলে না। টোটো নিয়ে যেখানে নামলাম, সেখান থেকেও হেঁটে ৭/৮ মিনিট দেখাচ্ছে গুগল। ঠাকুর ঠাকুর করতে করতে হাঁটা লাগালাম, হাওড়ার গলি, অবিরত ডান বামে বেঁকে যাচ্ছে, দুভাগ - তিনভাগ হয়ে যাচ্ছে। এই মধ্যাহ্নে পথঘাট প্রায় জনবিরল। কাউকে যে শুধাব,পথকুকুর ছাড়া তাও পাচ্ছি না। একটা তেমাথার মোড়ে এসে কিছু লোক পেলাম, জনা দুয়েক ছেলে একটা বাইকে হেলান দিয়ে খোশ গপ্প করছিল। তাদের জিজ্ঞাসা করতে যাব, এমন সময় এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা পিছন থেকে বললেন, " দুরন্ত সংঘে যাচ্ছিস তো? চল আমিও যাচ্ছি।" পিছন থেকে ছেলে গুলো বলে উঠল, " আজ অনেকেই যাচ্ছে। সেজেগুজে যাচ্ছে -"।
হাসি চেপে ভদ্রমহিলাকে অনুসরণ করলাম। হাঁটতে হাঁটতে বিগলিত হয়ে শুধালাম, "তুমিও ৯৫ এর ব্যাচ? কোন সেকশন?" ভদ্রমহিলা হতবাক হয়ে আমার দিকে ঘুরে গেলেন, দুধে আলতা গালে লাগল হালকা গোলাপী ছোঁয়া, রিমলেস চশমা খানিক স্লিপ করে নেমে এল নাকের ডগায়, গলা ঝেড়ে বললেন, " কোন সেকশন! তুই আমায় চিনতে পারিস নি না? আমি কিন্তু তোকে দেখেই চিনতে পেরেছি। আমি তনিমা দি।" নিজের গালে গোটা দুয়েক কাল্পনিক থাপ্পড় মেরে, প্রায় ভূলুণ্ঠিত হয়ে সহস্রবার ক্ষমা চাইলাম প্রাক্তন শিক্ষিকার কাছে। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারলাম না, " আমি কিন্তু এখনও আপনাকে চিনতে পারলাম না।"
দিদিমণির পিছন পিছন গিয়ে পৌঁছলাম গন্তব্যে। মজে আসা পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে বিশাল মাঠ। মাঠে ফুটে আছে অজস্র লাল সাদা ফুল। চেনা অচেনা একরাশ মুখ ঘিরে ধরল আমায়, অন্তু বলল, " এলি তাহলে?" চৈ বলল, "হামি হামি।" অনসূয়া চোখ পাকিয়ে বলল, " ড্রেস কোড ফলো করিস নি কেন? " হাত জোড় করে বললাম, " এবারের মত মাপ করে দে ভাই -"। সুন্দরী প্রতিযোগিতার মত স্কুলের নাম লেখা স্যাশ পরিয়ে দিল কে যেন। তখনও জানি না, প্রতিটা স্যাশ স্বহস্তে বানিয়েছে আমার তারাসুন্দরীরা। সেফটিপিন কম পড়ছিল, কার থেকে জোগাড় করে দিল সোমালি। জলখাবার খেতে যাওয়ার জন্য টানাটানি করতে লাগল দেবিকা। কতজন যে এসে জড়িয়ে ধরল, কতজনকে যে জড়িয়ে ধরলাম আমি। সংযুক্তা তো জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেলল। বোকার মত পিঠে হাত বোলাচ্ছি আর বলে যাচ্ছি, কাঁদছিস কেন পাগলা? এই তো আমি। একই আছি। একই আছিস বন্ধু তুই। সময় কম রঙ্গ করেনি, খেতে বাধ্য করেনি কম ঘাটের জল। জীবন তথা মন থেকে যাবতীয় সারল্য মুছতে কম চেষ্টা তো করেনি, দেখ তাও আমরা একই আছি। অন্তত আজকের দিনটায় গোহারান হেরে গেছে সময় -
অনির ডাইরি ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
#অনিরডাইরি
উদ্দাম গলায় গাইছেন তিনি, " ধীরে সে এক নগমা কোই শুনা গ্যায়া হ্যায়, ও কৌন হ্যায় জো আ'কর খোয়াবো পে, ছা গ্যায়া হ্যায় -"। চোখ বন্ধ করে শুনছে বাবা, বুকের ওপর রাখা দুই হাতের তর্জনী উঠছে নামছে তালে তালে। মাস খানেক হল বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না বাবা, জাগতিক সবকিছু থেকে যেন বিচ্ছিন্ন বাবা। সংসার চালানোর দায় এসে পড়েছে মা আর আমার ঘাড়ে। অফিস ফেরৎ এতক্ষণ সেই হিসেবই মেলাচ্ছিলাম দুজনে। প্রায় সতেরো বার বুঝিয়ে দেবার পরও কিছু বুঝতে পারে না মা। শেষে ধুত্তোর বলে উঠেই পড়ি আমি। সব কিছুর জন্য দায়ী এই একটা লোক। সারাজীবন সব দায়িত্ব একাই সামলেছে, কিছু নিয়েই মাথা ঘামাতে হয়নি আমাদের, আজ ইলেকট্রিক বিল দিচ্ছি তো টিভির রিচার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফোন রিচার্জ করছি তো আর দুটো বন্ধ হয়ে বসে থাকছে। বাড়ি জুড়ে কিছু না কিছু খারাপ হতেই থাকছে, হয় আলো, নয় কল, নয়তো অন্য কিছু। কাগজওয়ালার হিসেব করতে বসে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে, বিভিন্ন বারের কাগজের বিভিন্ন মূল্য কেন হয় রে বাবা।
বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতেই গানটা চালিয়েছিলাম, মায়ের পছন্দ বাংলা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। তাও হিন্দিই চালালাম, ওপি নাইয়ার এবং গীতা দত্ত। বাবার প্রিয় জুটি। ChatGPT সমানে বলছে তোমার বাবার মানসিক অবসাদ হয়েছে অনি, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাও। খুঁজে খুঁজে হদ্দ হয়ে গেলাম, কেউ বাড়ি এসে দেখতে চায় না আজকাল। এই শয্যাশায়ী মানুষটাকে কার কাছে টেনে নিয়ে যাব আমি? তাও একজনের নম্বর দিল সেদিন রুণা, কপালের এমন গেরো সেই রাত থেকেই জ্বরে পড়ল বাবা। সারা রাত কোঁকানি আর গোঙানি। কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। যাও বা উঠে বসে খাচ্ছিল, তাও ছেড়ে দিল। দুটোই, ওঠা এবং খাওয়া।
কি যে দিন গেছে, ঈশ্বর মঙ্গল করুন পাড়াতুতো ভাইটার, নিজে ভাইটালস চেক করে ডাক্তার বাবুর সাথে ফোনে কথা বলে, রক্ত পরীক্ষা করিয়ে, ওষুধ পর্যন্ত কিনে এনে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের। সেই ওষুধের জোরেই একটু ভালো আছে বাবা।
অফিস থেকে ফিরে মায়ের সাথে হিসেবের যুদ্ধে বসার আগে বেশ অনেকক্ষণ গল্প করলাম আজ। কিছুই জানে না বাবা, সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার, এপস্টিন ফাইল, ভেনেজুয়েলার মাদুরো, ইরানে তুলকালাম মায় SIR। "সেই যে গো তোমাদের নাম লিখে ফর্ম ফিল আপ করেদিলাম।" কাল অবধি এইভাবে বললে, বাবা সিড়িঙ্গে হাত তুলে ঘুঁষি মারতে আসত হয়তো, আজ অবাক হয়ে সব শুনল। গতকালের কাগজটা এনে দিলাম পড়ার জন্য, বেশীক্ষণ পড়ল না অবশ্য।
তাতে কি - তাও তো আশার আলো। গান চালিয়ে বললাম, " বাবা ওপি নাইয়ার", বাবা বলল, " মোটেই না। এটা মদনমোহন মনে হচ্ছে।" গান থামিয়ে দেখলাম, সত্যিই এটা মদনমোহন এর সুর। পয়সার থলেটা রাখতে এসে মাথা দোলাচ্ছিল মা, বাবার দিকে তাকিয়ে সোহাগী সুরে শুধাল, " আর গলাটা কার গো, খুব চেনা চেনা লাগছে -"। আমরা বাপ মেয়ে একসাথে বলে উঠলাম, " গীতা দত্ত তো।" "ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, গীতা দত্ত। আহা কি সুন্দর গলা -" জিভ কেটে বলে মা। উফ মা, তুমি গীতা দত্তর গলা ভুলে গেছ, তোমার পিতৃদেবের নাম মনে আছে তো, একটু প্রগলভ হয়েই বলি আমি, সরল ভাবে জবাব দেয় মা, " সদানন্দ"। আর আমার বাবার নাম?সাহস পেয়ে বুঝি আরো একটু ছ্যাবলা হই আমি। লাজুক হেসে মা বলে, " সেটা কি কোনদিন ভুলতে পারি। আমার জীবনটাই তো ঐ লোকটাকে ঘিরে -" বলতে বলতে ধপ করে বাবার পাশে বসে পড়ে মা। বাবা ইশারায় বলে, "কপালটা একটু টিপে দাও তো -"। মুঠো ফোনে তখন গান ধরেছেন রফি সাহেব, " শবাব আপকা নাশে মে খুদ হি চুর চুর হ্যায় -"।
অনির ডাইরি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
#অনিরডাইরি
রাতের দাসনগর স্টেশন। কে বলবে আপিস টাইম পেরিয়েছে ঘন্টা খানেক আগে! রাস্তায় অন্তত পাঁচ কোটি টোটো আর আড়াই কোটি বাইক মিলে রচনা করেছে দুর্ভেদ্য যানজট। মাঝে মাঝে গদাইলস্করী চালে প্রবেশ করছে দুয়েকটা বাস।
ট্রেন থেকে নেমে, রাস্তা পেরোবো বলে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকজন অত্যুৎসাহী কয়েক পা এগোচ্ছেন আবার দৌড়ে ফিরে আসছেন। এটা এখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।এই জাল কাটা কি এত সহজ? একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যেদিন উর্দি ধারী পুলিশ থাকে, সেদিন তিনি দৌড়ে এসে দুভাগ করে দেন এই বিপুল যানজট। আজ নির্ঘাত সিভিক আছে, সে বেচারা খানিক চেষ্টা যে করে না তাও নয়, তারপর হতোদ্যম হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
সবুরে মেওয়া ফলে, আমিও রাস্তা পেরিয়ে একটা টোটো পাই। তিনি অবশ্য কানায় কানায় না ভরলে ছাড়বেন না। বসে বসে প্রার্থনা করি, হে ঠাকুর আর একটা লোক জুটিয়ে দাও। একেকদিন তিনি সত্যিই মুখ তুলে চান। রাস্তার ওপার থেকে ভেসে আসে রুক্ষ মহিলা কন্ঠ, " টোটো, অ্যাই টোটো। দাঁড়াও -"। যানজটের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি দৌড়েও আসেন, ঠিক তখনই কোথা থেকে এসে উদ্যত হন এক বৃদ্ধ সাইকেল আরোহী এবং তাঁর সাইকেলের সামনের চাকাটা স্পর্শ করে মেয়েটির তনুলতা।
ক্যালিগুলা মাইনাসের সেই বিখ্যাত ঘুঁষির মতোই ঠুস্ করে লাগে ধাক্কা, মেয়েটি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, " দেখে চালাতে পারেন না?" সাইকেল আরোহী বৃদ্ধ ও তেরিয়া হয়ে জবাব দেন, " রাস্তা দেখে পেরোতে পারো না?" ব্যাস লেগে যায় "তুম তা না না না" ঝগড়া। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে দুর্দম গতিতে। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর, তার মধ্যে এদের এই গলার শির ফোলানো ঝগড়া, কাঁহাতক ভালো লাগে। বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেলি, " ছাড়ো না, দেখছই তো বয়স্ক মানুষ -"।
মেয়েটি কিছু বলে না, গায়ে খদ্দরের চাদর আর মাথায় মাংকি ক্যাপ পরিহিত বৃদ্ধ তেড়ে আসেন, " বয়স্ক মানুষ! কে বয়স্ক মানুষ? কোথায় বয়স্ক মানুষ?" বৃদ্ধের তেজ দেখে পাশের সহযাত্রী ছেলেটি বলে, "দেখছেন তো দিদি, আজকাল কারো ভালো করতে নেই।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করি, এই যে আমি দাদা। আমি বয়স্ক মানুষ ভাই।" অতঃপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলি, "ভুল হয়ে গেছে ভাই, তুই ঝগড়া চালিয়ে যা।"

















