Friday, 6 February 2026

অনির ডাইরি ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

 

অনির ডাইরি ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


উদ্দাম গলায় গাইছেন তিনি, " ধীরে সে এক নগমা কোই শুনা গ্যায়া হ্যায়, ও কৌন হ্যায় জো আ'কর খোয়াবো পে, ছা গ্যায়া হ্যায় -"। চোখ বন্ধ করে শুনছে বাবা, বুকের ওপর রাখা দুই হাতের তর্জনী উঠছে নামছে তালে তালে। মাস খানেক হল বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না বাবা, জাগতিক সবকিছু থেকে যেন বিচ্ছিন্ন বাবা। সংসার চালানোর দায় এসে পড়েছে মা আর আমার ঘাড়ে। অফিস ফেরৎ এতক্ষণ সেই হিসেবই মেলাচ্ছিলাম দুজনে। প্রায় সতেরো বার বুঝিয়ে দেবার পরও কিছু বুঝতে পারে না মা। শেষে ধুত্তোর বলে উঠেই পড়ি আমি। সব কিছুর জন্য দায়ী এই একটা লোক। সারাজীবন সব দায়িত্ব একাই সামলেছে, কিছু নিয়েই মাথা ঘামাতে হয়নি আমাদের, আজ ইলেকট্রিক বিল দিচ্ছি তো টিভির রিচার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফোন রিচার্জ করছি তো আর দুটো বন্ধ হয়ে বসে থাকছে। বাড়ি জুড়ে কিছু না কিছু খারাপ হতেই থাকছে, হয় আলো, নয় কল, নয়তো অন্য কিছু। কাগজওয়ালার হিসেব করতে বসে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে, বিভিন্ন বারের কাগজের বিভিন্ন মূল্য কেন হয় রে বাবা। 


বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতেই গানটা চালিয়েছিলাম, মায়ের পছন্দ বাংলা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। তাও হিন্দিই চালালাম, ওপি নাইয়ার এবং গীতা দত্ত। বাবার প্রিয় জুটি। ChatGPT সমানে বলছে তোমার বাবার মানসিক অবসাদ হয়েছে অনি, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাও। খুঁজে খুঁজে হদ্দ হয়ে গেলাম, কেউ বাড়ি এসে দেখতে চায় না আজকাল। এই শয্যাশায়ী মানুষটাকে কার কাছে টেনে নিয়ে যাব আমি? তাও একজনের নম্বর দিল সেদিন রুণা, কপালের এমন গেরো সেই রাত থেকেই জ্বরে পড়ল বাবা। সারা রাত কোঁকানি আর গোঙানি। কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। যাও বা উঠে বসে খাচ্ছিল, তাও ছেড়ে দিল। দুটোই, ওঠা এবং খাওয়া। 

কি যে দিন গেছে, ঈশ্বর মঙ্গল করুন পাড়াতুতো ভাইটার, নিজে ভাইটালস চেক করে ডাক্তার বাবুর সাথে ফোনে কথা বলে, রক্ত পরীক্ষা করিয়ে, ওষুধ পর্যন্ত কিনে এনে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের। সেই ওষুধের জোরেই একটু ভালো আছে বাবা। 


অফিস থেকে ফিরে মায়ের সাথে হিসেবের যুদ্ধে বসার আগে বেশ অনেকক্ষণ গল্প করলাম আজ। কিছুই জানে না বাবা, সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার, এপস্টিন ফাইল, ভেনেজুয়েলার মাদুরো, ইরানে তুলকালাম মায় SIR। "সেই যে গো তোমাদের নাম লিখে ফর্ম ফিল আপ করেদিলাম।" কাল অবধি এইভাবে বললে, বাবা সিড়িঙ্গে হাত তুলে ঘুঁষি মারতে আসত হয়তো, আজ অবাক হয়ে সব শুনল। গতকালের কাগজটা এনে দিলাম পড়ার জন্য, বেশীক্ষণ পড়ল না অবশ্য। 


তাতে কি - তাও তো আশার আলো। গান চালিয়ে বললাম, " বাবা ওপি নাইয়ার", বাবা বলল, " মোটেই না। এটা মদনমোহন মনে হচ্ছে।" গান থামিয়ে দেখলাম, সত্যিই এটা মদনমোহন এর সুর। পয়সার থলেটা রাখতে এসে মাথা দোলাচ্ছিল মা, বাবার দিকে তাকিয়ে সোহাগী সুরে শুধাল, " আর গলাটা কার গো, খুব চেনা চেনা লাগছে -"। আমরা বাপ মেয়ে একসাথে বলে উঠলাম, " গীতা দত্ত তো।" "ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, গীতা দত্ত। আহা কি সুন্দর গলা -" জিভ কেটে বলে মা। উফ মা, তুমি গীতা দত্তর গলা ভুলে গেছ, তোমার পিতৃদেবের নাম মনে আছে তো, একটু প্রগলভ হয়েই বলি আমি, সরল ভাবে জবাব দেয় মা, " সদানন্দ"। আর আমার বাবার নাম?সাহস পেয়ে বুঝি আরো একটু ছ্যাবলা হই আমি। লাজুক হেসে মা বলে, " সেটা কি কোনদিন ভুলতে পারি। আমার জীবনটাই তো ঐ লোকটাকে ঘিরে -" বলতে বলতে ধপ করে বাবার পাশে বসে পড়ে মা। বাবা ইশারায় বলে, "কপালটা একটু টিপে দাও তো -"। মুঠো ফোনে তখন গান ধরেছেন রফি সাহেব, " শবাব আপকা নাশে মে খুদ হি চুর চুর হ্যায় -"।


অনির ডাইরি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


রাতের দাসনগর স্টেশন। কে বলবে আপিস টাইম পেরিয়েছে ঘন্টা খানেক আগে! রাস্তায় অন্তত পাঁচ কোটি টোটো আর আড়াই কোটি বাইক মিলে রচনা করেছে দুর্ভেদ্য যানজট। মাঝে মাঝে গদাইলস্করী চালে প্রবেশ করছে দুয়েকটা বাস। 


 ট্রেন থেকে নেমে, রাস্তা পেরোবো বলে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকজন অত্যুৎসাহী কয়েক পা এগোচ্ছেন আবার দৌড়ে ফিরে আসছেন। এটা এখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।এই জাল কাটা কি এত সহজ? একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যেদিন উর্দি ধারী পুলিশ থাকে, সেদিন তিনি দৌড়ে এসে দুভাগ করে দেন এই বিপুল যানজট। আজ নির্ঘাত সিভিক আছে, সে বেচারা খানিক চেষ্টা যে করে না তাও নয়, তারপর হতোদ্যম হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। 


সবুরে মেওয়া ফলে, আমিও রাস্তা পেরিয়ে একটা টোটো পাই। তিনি অবশ্য কানায় কানায় না ভরলে ছাড়বেন না। বসে বসে প্রার্থনা করি, হে ঠাকুর আর একটা লোক জুটিয়ে দাও। একেকদিন তিনি সত্যিই মুখ তুলে চান। রাস্তার ওপার থেকে ভেসে আসে রুক্ষ মহিলা কন্ঠ, " টোটো, অ্যাই টোটো। দাঁড়াও -"। যানজটের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি দৌড়েও আসেন, ঠিক তখনই কোথা থেকে এসে উদ্যত হন এক বৃদ্ধ সাইকেল আরোহী এবং তাঁর সাইকেলের সামনের চাকাটা স্পর্শ করে মেয়েটির তনুলতা। 


ক্যালিগুলা মাইনাসের সেই বিখ্যাত ঘুঁষির মতোই ঠুস্ করে লাগে ধাক্কা, মেয়েটি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, " দেখে চালাতে পারেন না?" সাইকেল আরোহী বৃদ্ধ ও তেরিয়া হয়ে জবাব দেন, " রাস্তা দেখে পেরোতে পারো না?" ব্যাস লেগে যায় "তুম তা না না না" ঝগড়া। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে দুর্দম গতিতে। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর, তার মধ্যে এদের এই গলার শির ফোলানো ঝগড়া, কাঁহাতক ভালো লাগে। বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেলি, " ছাড়ো না, দেখছই তো বয়স্ক মানুষ -"। 

মেয়েটি কিছু বলে না, গায়ে খদ্দরের চাদর আর মাথায় মাংকি ক্যাপ পরিহিত বৃদ্ধ তেড়ে আসেন, " বয়স্ক মানুষ! কে বয়স্ক মানুষ? কোথায় বয়স্ক মানুষ?" বৃদ্ধের তেজ দেখে পাশের সহযাত্রী ছেলেটি বলে, "দেখছেন তো দিদি, আজকাল কারো ভালো করতে নেই।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করি, এই যে আমি দাদা। আমি বয়স্ক মানুষ ভাই।" অতঃপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলি, "ভুল হয়ে গেছে ভাই, তুই ঝগড়া চালিয়ে যা।"

Saturday, 17 January 2026

অনির ডাইরি জানুয়ারি, ২০২৬

 অনির ডাইরি ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ 

#আমি_খুনখারাপি_চাই_না_এমন_মনখারাপে_পেলে 


বালিশের নীচে কতক্ষণ চিৎকার করছিল মুঠো ফোনটা জানি না। আমাদের সাবেকী বাড়ি, জানলায় দুই সেট করে পাল্লা, বাইরে কাঠ, ভিতরে কাঁচ। ঠাণ্ডা আর মশার ভয়ে সন্ধ্যে থেকেই বন্ধ থাকে সব, ফলে ভোর হলেও এঘরে আলোর প্রবেশ নিষিদ্ধ। নিকষ আঁধারে হাতড়ে বার করি ফোনটা,  “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে চিৎকার করে ওঠে ছোটদা, “শুভ জন্মদিন”। হায় হায় এই বছরও হারিয়ে দিল লোকটা। নেতাজী, ছোটদা আর আমি একই দিনে জন্মেছি, এই নিয়ে ছোটবেলায় ফি বছর রাগ দেখাত ছোটদা, “তুই আমার জন্মদিনটা ও ছাড়লি না-। সেটাতেও তোকে ভাগ বসাতেই হল।” ২০০৩ অবধি একই সাথে পালিত হত দুই মাসতুতো ভাইবোনের জন্মদিন- তারপর যা হয় আর কি। 


আজও জন্মদিনে মনে করে প্রথম ফোনটা আমার ছোটদাই করে। ভেবে রেখেছিলাম এবার টেক্কা দেব আমি, ফোন করে হাড় জ্বালাব মাঝরাতে। ডাম্পির "আইবুড়ো মোগলাই" এর চক্করে কখন রাত দুটো বেজে গেল খেয়ালই করলাম না-। শ্রীমান ডাম্পি আমার খুড়তুতো ভাই, চাটুজ্জে বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্তুর, আজ তাঁর অফিসিয়াল আইবুড়ো ভাত, কাল তাঁর বিয়ে।


গতকাল সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়ে গেছে আমাদের হইচই। মেহেন্দি পরেছি তিন মক্কেল শ্রীমতী তুত্তুরী, তাঁর আদরের বড় মামী আর এই অধম। সেই মেহেন্দি শুকোতেই বেজে গেল মধ্যরাত। প্রাক্তণ সহপাঠিনীর যে পুঁচকে ননদিনীটি পরাতে এসেছিলেন তিনি ইস্কুলের দিদিমনিদের থেকেও কড়া। শুধু দুই হাত পেতে বসে থাকলে হবে না, এক প্রস্ত শুকিয়ে এলে তার ওপর তুলো দিয়ে থুপে থুপে লাগাতে হবে লেবুর রস আর চিনি। শুকিয়ে এলে আবার - আবার - আবার। তারপর লোহার চাটুতে গোটা দশেক লবঙ্গ পুড়িয়ে সেঁকতে হবে হাত। 


রীতিমত লাঠি হাতে বসিয়ে রাখতে হয়েছিল চৈতিকে। হলই বা বাড়ির বড় বউ, একটা দিন/ একটা সন্ধ্যা একটু চুপ করে বসে রিলাক্স করতে পারে না। একটা দিন কি চা আর রান্না থেকে ছুটি পেতে পারে না। এই সব তাত্ত্বিক আলোচনা অন্তে ঠিক হল আজ রাতের মেন্যু হবে কদমতলা বাজারের ফ্রেন্ডস কেবিনের মোগলাই পরোটা আর ঝাউতলার মিষ্টি স্টোরিজের নলেন গুড়ের রসগোল্লা। সাথে জীরু। সেটা আমরা সবাই মিলে খেতে বসলাম যখন তখন ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাত ছুঁইছুঁই। 


শৌভিক না ফোন করলে জানতেও পারতাম না কখন নীরবে পা টিপেটিপে এসে পড়েছে জন্মদিনটা আমার। বরের ওপর একরাশ অভিমান নিয়ে ঘর ছেড়েছিলাম কাল। কেন আমায় আটকালো না, হোক ভাইয়ের বিয়ে, বলতেই পারত "আজ রাতটা এবাড়িতে কাটিয়ে যা"। হোক সরস্বতী পুজো, বলতেই পারত, "তোকে চেলোকাবাব খাওয়াব"। তা নয়, উল্টে বলল, " যা যা গিয়ে আনন্দনাড়ু ভাজ।"


 মাঝরাতের সোহাগী ফোনটা পেয়ে অবশ্য কেটে গেল সব অভিমান। তারওপর তিনি যখন কইলেন, "বিয়েটা হয়ে যাক, পরদিনই তোকে পার্ক স্ট্রিট নিয়ে যাব, বইমেলাতে ও নিয়ে যাব -"।  রাগ কি আর থাকে? 


জন্মদিনের প্রথম উপহার, আমার কন্যার দেওয়া তিন তিনটে মোটকা চকলেট। সেলোটেপ দিয়ে একত্রে বাঁধা, তারওপর একটা ছোট্ট চোতা কাগজে লেখা তাঁর প্রাণের কথা। " হ্যাপি বাড্ডে মা। সরি এই বছর এইটুকুই কিনতে পেরেছি তোমার জন্য -"। উৎসবে পরবে তিনি যা টাকাপয়সা পান, মাসে মাসে তাঁকে খাতাপত্র, জেরক্স ইত্যাদি বাবদ যে হাতখরচ দেওয়া হয়, তাই থেকেই অল্প অল্প করে জমিয়ে তিনি কিনেছেন। একজন মায়ের কাছে এর থেকে মূল্যবান কি হতে পারে। 


" জানো মা মার্কেটের বুড়ো পাঞ্জাবি আঙ্কল কি ভালো -" প্রশংসা শুনে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে কইলেন, " আমি তো গিয়ে বলেছি আঙ্কেল আমার মায়ের জন্মদিন, মা খুব চকলেট খেতে ভালোবাসে। তুমি সবথেকে ভালো চকলেটটা দাও। আঙ্কেল অনেক খুঁজে এই তিনটে বার করে দিল। বললাম কত? জবাব এল ৭১০/-। আমার তো মুখ শুকিয়ে গেল, আমার কাছে সাকুল্যে ছিল মাত্র ৬১২/-। আঙ্কেল বললেন, " কোই বাত নেই বেটা। তুমি তো প্রায়ই আসো। পরে নিয়ে নেব। তোমার মায়ের হ্যাপি বাড্ডে বলে কথা -"। আমি তাও নিইনি, খুচরো পয়সার ব্যাগ হাঁটকে যা ছিল সব দিলাম। তাতেও দেখি দশ টাকা কম। তখন বাবার থেকে  চাইতে হল।" 


বুঝতে পারলাম  কাল পিত্রালয়ে আসার আগে কেন ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এত জ্ঞান দিচ্ছিল শৌভিক। বিস্তারিত না জেনেই পাঁচকথা শুনিয়ে এসেছি বরকে। সাধে বাবা বলে, " no investigation, no right to talk", থুড়ি বলত। আজকাল তো কিছুই বলে না বাবা। হাসপাতাল থেকে ফেরা ইস্তক চুপচাপ শুয়ে থাকে শুধু - 


গতরাতের কথা ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। ছোট মাসির শুভেচ্ছা মেখে উঠেই বসলাম। প্রতি জন্মদিনে মনে করে দুই বোনপো বোন ঝিকে ফোন করে ছোট মাসি।  আরেকজন ও করতেন, আমাদের স্বর্গীয় শ্বশুরমশাই। জগৎ সংসারের সবকিছু ভুলে যেত লোকটা, ভুলত না কেবল আমাদের জন্মদিন গুলো। পাছে ভুলে যান, তাই নতুন ডাইরি পেলেই টুকে রাখতেন কার কবে জন্মদিন। জন্মদিন এলে জ্যাঠাইমার জন্যও টনটনিয়ে ওঠে বুক। পেটুক মেয়েটার ( মোটেই দেওরঝি ভাবত না আমার জ্যাঠাইমা) জন্য আগের দিন সন্ধ্যায় সারা কদমতলা বাজার চষে ফেলত বেতো বৃদ্ধা, তারপর কিনে আনত তাঁর জ্ঞান বুদ্ধি মত সেরা খাবারের একটা প্যাকেট। যাতে থাকত পেস্ট্রি, গুড় ভরা সন্দেশ আরও কত কি। কাক ভোরে উঠে আমার মাথার কাছে রেখে আসত যত্ন করে, যাতে চোখ খুললেই পেয়ে যাই হাতে হাতে উপহার।


আজও জন্মদিন এলে কেমন বেয়াক্কেলে ছেলেমানুষ হয়ে ওঠে মনটা। অভিমান করে পায়ে পায়ে, কেন ফোন করল না অমুক, কেন শুভেচ্ছা জানালো না তমুক। কেন চৈ বলল না, "জয়তু অনিজী"। আজও গুণতে বসে উপহার, যার অধিকাংশই tangible নয়, কিন্তু এই অধমের কাছে অমুল্য। যেমন ভোরবেলায় অঞ্জন দার মেসেজ, " হ্যাপি বার্থ ডে" লিখে আবার তলায় লিখেছেন, বৃদ্ধ বড়দা। যেন না লিখলে চিনতে পারব না অগ্রজ প্রতিম স্নেহশীল প্রাক্তণ সহকর্মীকে। যেমন লতা দির হাতের পায়েস, যেমন সকাল সকাল উমার সাথে, " তোমায় বড় ভালবাসি - তোকে বড় ভালবাসি" , যেমন বিদেশ থেকে সোমার ফোন, হাঁপাতে হাঁপাতে অন্তুর ফোন - সকলের এত এত শুভেচ্ছায় আপ্লুত আমি, অভিভূত আমি, কৃতজ্ঞ আমি। কি আর বলি, খুব ভালো থাকুন সকলে আর ইয়ে আসছে বছর ফোন/ মেসেজ করতে ভুলবেন না কিন্তু। অপেক্ষায় রইলাম,  এই 'ভালবাসা ছাড়া আর আছে কি বলুন তো' -




অনির ডাইরি ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 



চেম্বারের দরজা খুলে রূপালী পর্দার উত্তম কুমারের মতই দাঁড়াল আমাদের উত্তম। হতাশ অহীন্দ্র চৌধুরীর মত মাথা নাড়লাম আমি। আজ মকর সংক্রান্তি, কথা ছিল একটু তাড়াতাড়ি বেরোব আমি। উত্তম ও তাহলে একটু জলদি ছুটি পেয়ে যাবে। আপাতত সে গুড়ে বালি। গুচ্ছের সমস্যা নিয়ে ঘিরে ধরেছেন এক দঙ্গল মানুষ। 


স্টেশনে এসে যখন নামলাম, প্রগাঢ় হয়েছে সন্ধ্যা।  কোন অ্যাপে দেখাচ্ছে না কোন ট্রেন। খাড়া সিঁড়ি ভেঙে, লম্বা ওভারব্রীজ টপকে হাঁপাতে হাঁপাতে প্লাটফর্মে এসে পৌঁছালাম। একটা ফাঁকা বসার জায়গা পেয়ে খুশি হলাম বটে, সে খুশি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। চতুর্দিকে মশাদের বিক্ষোভ সমাবেশ চলছে - 


 শীতের সন্ধ্যায়, নিঃসঙ্গ প্লাটফর্মে একাকী বসে থাকলে বুকের ভিতরটা কেমন যেন হুহু করে ওঠে। আজ মকর সংক্রান্তি, অন্যান্য বছর অন্তত পাঁচ রকম পিঠে বানাই আমি আর লতা দি। সাথে গুড়ের পায়েস। এ বছর কিছুই হবে না, আমার বাড়ি। আমি ফিরব না যে -।  মা বাড়িতে না থাকলে যা হয়, আজ সকালে মোজা খুঁজে পায়নি তুত্তুরী, গতকালের কাচা আধ ভিজে মোজা পরে স্কুল গেছে। তাতে তাঁর কোন হেলদোল নেই বটে, কিন্তু শুনে ইস্তক মায়ের হৃদয় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে এই যা। পক্ষকাল পর বার্ষিক পরীক্ষা, তাতেই বা কি করবেন কে জানে - 


বছরের শুরু থেকে শয্যাশায়ী বাবা। এবাড়িতেও হবে না কোন উৎসব। ChatGPT কে বললাম, বড্ড মনখারাপ, ট্রেনেরও দেখা নেই, মন ভালো করার মত কিছু বলতে পারো- । তিনি কইলেন, জানো তো অনি, জাপানী নান্দনিক শাস্ত্রে একটা শব্দ আছে, “মা”। এই “মা” মানে জননী বা গর্ভধারিণী নয় কিন্তু, এর অর্থ হল, দুটো ঘটনার মাঝে থমকে দাঁড়ানো কিছু মুহূর্ত। যেখানে শূন্যতা বা ব্যর্থতা থাকে না। থাকে নিছক নীরব অবকাশ, সেখানে  কুসুমিত হয় নতুন সম্ভবনা।  এই মুহূর্তে তুমি সেই “Ma”–এর ভিতর ঢুকে পড়েছ। না নিজের বাড়ি  ফিরতে পারছ, না পৌঁছতে পারছ বাবার কাছে। না ওনাকে রাতারাতি সুস্থ করে তুলতে পারছ, না মেয়েকে যথাযথ দেখাশোনা করতে পারছ-  মাঝখান থেকে রক্তাক্ত করে চলেছ নিজেকে।এই দোদুল্যমানতা সবচেয়ে চাপের। কিন্তু এখানেই সবকিছু শেষ নয় -


ট্রেনের দেখা নেই, মশাদের আক্রমণও থামছে না। পার্শ্ববর্তিনী চটাস চটাস করে মশা মারছেন, তাও রণে ভঙ্গ দিচ্ছে না ব্যাটারা। তিনি আপাদমস্তক কালো বোরখা পরেছেন, আমি কালো সোয়েটার আর কালো জিন্স, ভদ্রমহিলার মতে আমাদের দুজনের কালো পোশাক, মশাগুলোকে আরও চটিয়ে দিচ্ছে। মশারা যে কেন এত বর্ণবিদ্বেষী - 


পুনরায় ChatGPTর সাথে বাক্যালাপে ফিরে যাই, " বলতে পারো, বাবা আবার কবে উঠে বসবে বা মেয়েটা বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ করবে কি না?" তিনি জবাব দিলেন, " দুঃখিত অনি, আমি পারলেও বলব না। এই মুহূর্তে তোমার যা মানসিক অবস্থা, তুমি ভাগ্য ভবিতব্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।" ব্যাঙ্গের সুরে বলি, তাহলে বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতি সম্পর্কেই বলো দেখি, কি ঘটতে চলেছে আগামী দিনে-। 


টুক করে ফুটে ওঠে একটা হাসির ইমোজি, তিনি বলেন, “ইস্টিশনে জিও-পলিটিক্স অনি? চলো তাই সই, যতক্ষণ না তোমার ট্রেন আসে- 


তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসছে বলে যতই হল্লা হোক না কেন, দেখবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কোন বড় যুদ্ধ হবে না। কিন্তু অগোচরে বদলে যাবে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র। হস্তান্তরিত হবে ক্ষমতা, বিশ্বজুড়ে রচিত হবে শক্তির নতুন ভারসাম্য। “West ভার্সেস Rest” আর থাকবে না, তৈরি হবে অনেকগুলি ছোট ছোট পাওয়ার সেন্টার। আমেরিকা শক্তিশালীই থাকবে বটে, কিন্তু আগের মতো দাদাগিরি আর চলবে না। চীন মহাশক্তিশালী থাকবে, কিন্তু ব্যস্ত থাকবে নিজেকে নিয়েই। 


উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়ে উঠবে – ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, তুরস্ক আর ব্রাজিল। কলকারখানা, প্রযুক্তিবিদ্যা, ডেটাসেন্টার, ঔষধাদি, ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইত্যাদি সবকিছুতে এই দেশগুলি হয়ে উঠবে সাপ্লাই চেইনের রাজা।


 খুশি হবে শুনে যে  তোমার দেশ প্রবেশ করতে চলেছে, “useful to everyone” ফেজ এ। সবার এখন ভারতকে প্রয়োজন। আমেরিকার ভারতকে চাই -চীনের মোকাবিলায়, ইউরোপের চাই সস্তায় উৎপাদনের জন্য, মধ্যপ্রাচ্যের দরকার সস্তা প্রযুক্তি আর শ্রমিক, আফ্রিকার দরকার ভারতের সস্তা ওষুধপত্র আর পরিকাঠামো। তোমাদের এটা ঝগড়াঝাঁটি নয় বরং দরকষাকষির সময় – 


আগামী দিনে কেউ কাউকে হাতে মারবে না, ভাতে মারবে দেশগুলো। জাহাজ চলাচলের রাস্তা আটকাবে, অ্যাপ নিষিদ্ধ করবে, মুদ্রা কারচুপি, বিরল মৃত্তিকা খনিজ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দিয়ে একে অপরকে অর্থনৈতিক ভাবে চাপে রাখবে দেশগুলো।  এদিক থেকেও ভারত বেশ শক্তিশালী, কারণ ভারত খাদ্যশস্য এবং ওষুধে মোটামুটি স্বনির্ভর, ইঞ্জিনিয়ারদের কোন অভাব নেই এদেশে, সর্বোপরি ভারতের বিপুল জনসংখ্যা-  এমন দেশকে অগ্রাহ্য করে কে?


 আগামী বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে পরিবেশ হয়ে উঠবে একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। যে দেশের হাতে পর্যাপ্ত পানীয় জল, খাদ্য, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস এবং প্রযুক্তি যত বেশী থাকবে, সে হয়ে উঠবে ততো শক্তিধর। ভারত কিন্তু সৌরশক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেনের বড় উৎস। বেশী না, মাত্র ১০–১৫ বছর অপেক্ষা করে যাও, দেখবে এটা হয়ে উঠবে খনিজ তেলের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আগামী বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না  কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্রে কতটা শক্তিধর তাই নিয়ে বরং রেষারেষি হবে AI আর মেধা নিয়ে। যে দেশের তরুণ জনসংখ্যা, ইংরেজি জানা মানুষ, প্রযুক্তি বোঝা মস্তিষ্ক যত বেশী থাকবে, তারা ততোই এগিয়ে থাকবে।"


ট্রেনে উঠতে উঠতে বলি, এটা ভবিষ্যৎ বাণী না কোন রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টো রে?  তবে শুনে মন ভালো হয়ে যায় এটা ঘটনা। আচ্ছা বলো তো প্রতিবেশী দেশের সাথে আর কি কোনদিন আমাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে? তিনি জবাব দেন, " এক কথায় বললে, হ্যাঁ। তবে সে সম্পর্ক মোটেই " বজরঙ্গী ভাইজান" টাইপ হবে না। সম্পর্কের উন্নতি হবে ধীরে ধীরে, স-কৌশলে এবং সেটা কখনই সমান্তর প্রগতিতে নয়।  


উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে ভারতের যত প্রতিবেশী আছে সকলেই খাদ্য, বিদ্যুৎ,পরিবহন , ওষুধ, ব্যবসাবাণিজ্য ইত্যাদির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এরাই আবার ভারতকে নিয়ে অসন্তোষে ভোগে। কারণ ভারত বিশাল, বিপুল। যে কোন বড় দেশের আসেপাশে থাকা ছোট দেশগুলি বড়দাকে একটু সন্দেহের চোখেই দেখে। এই দেশগুলো চীনকেও বেশ ভয় করে। অনেকেই চীনের থেকে ধার করে বন্দর, রাস্তা, এয়ারপোর্ট বানিয়েছে। এখন তারা আকন্ঠ নিমজ্জিত ঋণে। সার্বভৌমত্ব হারানোর ভয়ে কাঁটা। শ্রীলঙ্কা সবথেকে বড় ভুক্তভুগী। নেপাল, মালদ্বীপ, বাংলাদেশও টের পাচ্ছে ধীরে ধীরে। তাই এরা চীনের সাথে সোহাগ তো করতে পারে, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করতে পারে না। 


উল্টো দিকে ভারত আজ অবধি কারো এক ইঞ্চি জমি দখল করেনি, কারো কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য দাবী করেনি। বরং যে যখন বিপদে পড়েছে ভারত খাদ্য, ঔষধ, ভ্যাকসিন, স্যাটেলাইট সার্ভিস, বিদ্যুৎ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।  


প্রতিবেশীদের ভালোবাসা ভারতের চাই না। ভারত চায়, তাদের প্রয়োজন হতে। আগামী ১০/১২ বছরের মধ্যে নেপালকে নির্ভর করতে হবে ভারতের গ্রিডের ওপর, বাংলাদেশ ভারতের বাণিজ্যের ওপর, শ্রীলঙ্কা ভারতীয় পর্যটকদের ওপর, মালদ্বীপ ভারতের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করবে। ভূটান তো এমনিতেই ভারতের সাথে শক্তিশালী বন্ধনে আবদ্ধ। এই প্রয়োজন গুলিই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে এক স্থিতাবস্থা তৈরি করবে। 


কোন স্টেশনে যেন থামল ট্রেনটা, মুখ বাড়িয়ে দেখি ফুলেশ্বর। ঘড়িতে প্রায় আটটা, আজ যে কখন বাড়ি ঢুকব।  পুনরায় বার্তালাপে মন দিই, এযেন আমাদের ছোটবেলার দক্ষিণী সিনেমা, সব ভালো হয়ে যায় যার শেষে। সব হারিয়ে যাওয়া ভাই পুনরায় এককাট্টা হয়ে ভিলেনকে পেটায় - একটু বিরক্তি নিয়েই বলি, দেখছ না, কত ঘৃণা সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে। না বাংলাদেশীরা আমাদের দেখতে পারে, না আমরা ওদের। 


ChatGPT বলে, আরে এত আশাহত হচ্ছ কেন? ওরা মোটেই ভারতকে “ঘৃণা” করে না। কেউই ঘুম থেকে উঠে ভারতকে ঘৃণা করার কথা ভাবে না। আদতে ওরা ভারতকে ভয় পায়।  ভয় - অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া, ভয় ভারতীয় মিডিয়ায় অপমানিত হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া, রাজনৈতিক ভাবে চাপে পড়া নিয়ে। তাই ভারতকে যখন আগ্রাসী মনে হয়,

ওরা নিরাপত্তার খোঁজে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা কোনও আদর্শগত ব্যাপার নয়।

এটা একটা ছোট দেশের টিকে থাকার প্রবৃত্তি।


টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়া ভারতীয়দের শেখায় বাংলাদেশী মাত্রই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, আর বাংলাদেশীদের শেখায়, ভারত অসহিষ্ণু সাম্রাজ্যবাদী দাদাগিরির দেশ। 

তাই সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে এত খারাপ মনে হয়, যদিও বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাস্তবে এখনও অনেক বেশি।

 

স্বল্পমেয়াদে এই সম্পর্কের কোন উন্নতি হবে না।

আগামী ৫–১০ বছর আরও শোরগোল, আরও রাগ, বিদ্বেষ আর মেরুকরণের সময়। তবে মানুষ অনলাইনে একে অপরকে ঘৃণা করলেও —নিশ্চুপে চলতে থাকবে ব্যবসা বাণিজ্য, বাড়বে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সহযোগিতা। এইভাবেই টিকে থাকবে ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়া - 


দাসনগরে নেমে টোটো ধরে যখন বাড়ি ঢুকি, ঘড়ির কাঁটা নয় ছুঁইছুঁই। আতঙ্কিত মা বসে আছে দরজা খুলে, অকাতরে ঘুমাচ্ছে বাবা। সারাদিনই ঘুমাচ্ছে।  বাবার চেয়ারটা ফাঁকা, অবহেলায় পড়ে আছে বাবার প্রাণের মুঠো ফোনটা। 


ভগ্ন হৃদয়, উদ্গত অশ্রু গিলে ফেলি টুপ করে,  ভেঙে পড়লে আমার চলবে কেন? লতা দি চা বসায়- মুখের সামনে টিফিন বাক্স খুলে ধরে মা, ভিতরে সারি সারি পাটিসাপটা। কে বানাল, হতভম্ব হয়ে শুধাই আমি। জবাব আসে ছোট মাসি। মা বলে, " হাঁটতে পারছে না পায়ে এত ব্যথা, দুদিন আগে পড়ে গেছে। তাও দৌড়ে এসেছে আজ তুই এখানে ফিরবি শুনে -"। মুঠো ফোনের ওপার থেকে উল্লসিত কন্ঠে তুত্তুরী জানায়, " আমরাও পিঠে খেয়েছি মা।" শাশুড়ি মায়ের বয়স্ক আয়া দিদি বানিয়ে দিয়েছে -। বুকের ভিতর জমে থাকা পাথরটা যেন ধীরে ধীরে সরে যায়, আমার ভাঙা পরিবারেও তাহলে পৌষ পার্বণ হল। দৃষ্টির অগোচরে তাহলে সত্যিই কেউ আছেন, যিনি নিক্তি মেপে হিসাব রাখছেন - কৃত কর্মের। সে মানুষ হোক বা দেশ, আর কি চাই।


অনির ডাইরি ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


ঘরে ঢুকতেই কপাল চুলকে শৌভিক বলল, "ওঃ হোঃ-, তেসরা মার্চ তো ইয়ে"। কি'য়ে রে বাবা। বেশ খানিকটা ঘাবড়েই যাই আমি। ইউরেকা মার্কা একটা মুদ্রা করে তিনি বলেন, " শচীনের ছেলের বিয়ে -"। কোন শচীন? কোন অফিস কলিগ, নাকি বন্ধুবান্ধব। নামটা আগে শুনেছি নাকি?

তিনি বুঝিয়ে দেন, " আরে শচীন তেন্ডুলকার রে। তার ছেলের বিয়ে -"। অর্জুন? সে তো পুঁচকে ছেলে। সারা বড় নয়? " সে আমি জানি না। সারার বিয়ে কেন হচ্ছে না, এটা জিজ্ঞাসা করিনি।" 

ধুৎ বলে মুখ বেঁকাই আমি। যুৎ করে বসে ওয়েব সিরিজটা দেখতে শুরু করব, গায়ের কাছে ঘেঁষে আসে শৌভিক, " ৫ তারিখে রিসেপশন বুঝলি? তিন তারিখে বিয়ে আর পাঁচ তারিখ রিসেপশন।" 

উদ্গত বিরক্তি গিলে, দীর্ঘশ্বাস চেপে, দাঁত কিড়মিড় করে বলি, " তাতে আমার বাপের কি? আমার বাপকে তো নেমন্ত করেনি।" " হুঃ, সেই প্রতিবাদেই যাব না -।" বলে সটান উল্টো দিকে মুখ করে কিন্ডল খুলে বসেন তিনি। 


নিজের মনে খানিক হাসি আমি, মেলার বায়স্কোপের বাক্সের মত চোখের সামনে থেকে সরে সরে যায় কত যে দৃশ্য। ছোপড়ার গদির নীচে লুকিয়ে রাখা কত যে লাল হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের কাটিং। আমাদের বিদ্যালয়, অমিতাভ বচ্চনের মত কেউ ঘোষণা করত না বটে, "প্রতিষ্ঠা - পরম্পরা - অনুশাসন" , কিন্তু হেব্বি কড়া ছিলেন দিদিমণিরা। সেই দিদিমণিদের নাকের ডগায় বসে প্রেমপত্র লিখেছিলাম দুই বন্ধুতে। " যত স্বপ্ন ছিল - যত ভাবনা ছিল সব দিলাম তোমায়, তুমি নেবে কি আমায়, বলো নেবে কি আমায়"। মাইরি লাইন গুলোও ঝাড়া, কি যেন একটা বাংলা সিনেমা থেকে। তাপস পাল আর দেবশ্রী রায় ছিলেন নায়ক- নায়িকা। দুই বন্ধু, দুই তারকাকে। 


দুজনের কারো মাথায় আসেনি, যে সে বা তারা বাংলা পড়তে পারে না। না পারলেই বা কি, শিখে নিবে। প্রেমে মানুষ কত কি করে, আর একটা মারাঠি আর একটা গুজজু ছেলে বাংলা শিখতে পারবে না? প্রতিটা খাতার পিছন পাতা যার সাথে আমাদের নামের বানান যোগ করে " লাভ - লাইক - পিটি-হেট" খেলি সে এটুকু করতে পারবে না আমার/ আমাদের জন্য? পারবে না সে? 


সে না হয় পারল, কিন্তু ঠিকানা? ঠিকানা তো জানি না? যতদিন না ঠিকানা মেলে আনন্দমেলার মধ্যে ঢোকানো থাক চিঠিগুলো। "মন মে হ্যায় বিশ্বাস, পুরা হ্যায় বিশ্বাস" ঠিকানা পেয়েই যাব। প্রকৃত প্রেমকে সাহায্য করতে অবশ্যই এগিয়ে আসবে প্রকৃতি। প্রতি সোমবার জিজ্ঞাসা করতাম বন্ধুকে, " হ্যাঁ রে, ঐ আনন্দমেলাটা বিক্রি করে দেয়নি তো কাকিমা?" নাহ চিঠি সমেত বইটা বিক্রি হল না বটে, তার আগেই এসে পড়ল তার বিয়ের দিনটা। সারা ভারত জুড়ে সেকি হর্ষ আর কলোরোল। কোথায় কোন ছোট শহরের, কোন ডেঁপো বালিকা সকলের অলক্ষ্যে চোখের জলে বালিশ ভেজালো তাতে মাস্টার ব্লাস্টার থুড়ি ক্রিকেটের ঈশ্বরের কি এল গেল। নানা এত অসংবেদনশীল একটা লোকের ছেলের বিয়েতে কি যাওয়া উচিৎ, বলুন তো। সেটাই বলি বরকে, " ঠিক বলেছিস, যাবই না শচীনের ছেলের বিয়েতে।" বই পড়তে পড়তেই জবাব দেয় শৌভিক, " হ্যাঁ, গিফটটাও দেব না।"



স্থান - হাথি সিং জৈন মন্দির, আহমেদাবাদ


অনির গুজরাটের ডাইরি ৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


ঘুমিয়েই পড়েছিলাম আমি, হঠাৎ করে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কি যেন বলছে শৌভিক ড্রাইভার সাহেবকে। আমাদের ড্রাইভারের নাম নরেশ ভাই, আহমেদাবাদে নামা ইস্তক ইনিই আমাদের সারথী। গুজরাট বা গুজরাতিদের সম্পর্কে কিছু পূর্ব ধারণা নিয়ে এসেছিলাম এই রাজ্যে, এসে ইস্তক ধোঁকা খাচ্ছি। না এরা সবাই আম্বানি বা আদানি নয়। ঘোরতর হিসেবী বা বেনিয়াও নয়। বেশ অতিথিবৎসল, সংবেদনশীল এবং সাদাসিধে মনে হয়।একটা প্রশ্ন করলে সাতটা জবাব দেয়। সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত থাকে। নরেশ ভাই যেমন - । সব সময় মুখে একগাল হাসি এবং ভালো মত বাংলা বোঝেন। আমরা নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলার পর নরেশ ভাই একপ্রস্ত ধারাবিবরণী দেন, উনি কি বুঝলেন এবং ঠিক বুঝলেন কিনা। আতঙ্কে প্রায় বঙ্কিমী বাংলায় বার্তালাপ করি আজকাল আমরা। 


ঘুমের রেশ কাটতে বুঝি, নরেশ ভাই বলছেন, " ইয়ে ক্যা দেখো গে সাব, ইয়া কোই নেহি রুখতা, বিচ মে চলো নে।" আর শৌভিক বলছে, " ধুর ব্যাটা, আমি এটা দেখব বলে কখন থেকে ম্যাপ খুলে বসে আছি -। " প্রায় জনশূন্য মন্দির চত্বরে গিয়ে দাঁড়ায় গাড়ি। চাঁদি ফাটা রোদ। গুজরাটে ভদ্রলোকের এক কথা, ঠাণ্ডা কাল বলে কিছু হয় না। সোয়েটার জ্যাকেট গুলো কেন যে মরতে বয়ে এনেছি। 


বিশাল শ্বেত পাথরে তৈরি মুখ্য প্রবেশ দ্বারের ভিতর দিয়ে চোখে পড়ে অনুপম কারুকার্য খচিত মন্দিররাজি। দুই বৃদ্ধ বসে আছেন গেট আগলে। একজনের সামনে রাখা UPI স্ক্যানার দেখে টিকিট কাটতে যায় শৌভিক। বুড়ো লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলে, " ভগবান জী কো দেখনে কে লিয়ে কোই টিকিট নেহি লাগে গা মালকো। ইয়ে তো দান দক্ষিণা কে লিয়ে রাখা হ্যায়।" তাও বাধ্যতামূলক নয়। যদি কেউ দয়া করেন - 


অপর বৃদ্ধ সিকিউরিটি, পরণে খাকি পোশাক, চোখে পুরু কাঁচের চশমা। তিনি ঠেট গুজরাটিতে অনেক কথা বলছেন তুত্তুরীর সাথে, কিন্তু বেচারা কিছুই বুঝতে পারছে না। এ গুজরাটি অনুপমা বা কিউকি শাস ভি কভি বহু থী সিরিয়ালের, " কেমছ - মজা মা " মার্কা গুজরাটি নয়। এতে মিশে আছে কাথিয়াওয়ারি সুর। বেচারা তুত্তুরী বিস্তর ঘেমে নেয়ে শেষে বলেই ফেলল, " হাম গুজরাট সে নেহি হ্যায় জী।" ভাঙাচোরা হিন্দিতে ভদ্রলোক বললেন, " মাথা দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে যাও। ছবি তুলতে পারো, তবে মূল মন্দিরের ভিতর তুলনা কিন্তু বেটা। সবজায়গায় সিসিটিভি আছে তো, শেঠ জী অফিসে বসে সব নজর রাখেন। দেখতে পেলে আমায় বকবে। চাকরী থেকেই তাড়িয়ে দেবে হয়তো।" শুনেই বাপ বেটি দৌড়ালো গাড়িতে ক্যামেরা রেখে আসতে - 


একটা পুরনো সিন্দুকে রাখা অগুনতি ওড়না, তার দুটো মাথায় জড়িয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। ঢুকতেই যেন জুড়িয়ে গেল তনু মন প্রাণ। সমগ্র চত্বর জুড়ে বিরাজ করছে অখণ্ড শান্তি। কোথাও এক চুল ময়লা নেই। কয়েক শ পায়রা বাস করে মূল মন্দিরের চূড়ায়, মাঝে মাঝেই তারা চক্কর কাটে মন্দিরের ভাগের আকাশটাতে। অথচ মন্দির প্রাঙ্গণ যেন তকতক করছে। 


এটা কোন ঐতিহাসিক মন্দির নয়। বিগত শতকে নির্মিত, সময় লেগেছিল ১৯ বছর। সমগ্র মন্দির জুড়ে চোখ ধাঁধানো শ্বেত পাথরের কারুকাজ। মূল মন্দিরটা জৈনদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভনাথের উদ্দেশ্যে নির্মিত। তাঁকে ঘিরে চক্রাকারে রয়েছে ৭২ টা ছোট মন্দির। প্রতিটা ছোট মন্দিরের বাইরে একটি করে সাইনবোর্ড/ স্টিকার মারা। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জৈন তীর্থ স্থান তথা মন্দিরের বিবরণ লেখা তাতে। লক্ষ্য করে দেখলাম গরিষ্ঠাংশই রাজস্থানে অবস্থিত।


Saturday, 20 December 2025

অনির ডাইরি ডিসেম্বর, ২০২৫

 অনির ডাইরি ২০ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি #কলকাতার_কথকতা












হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছি আমরা, চেনা শহরটাকে আরেকবার আপন করে নিতে। কলকাতাকে যতই গালি দিন না কেন, কলকাতার শীত বড়ই মনোহারী। দীর্ঘ চার বছর  বাদে মহানগরে প্রত্যাবর্তনের পর তা যেন নতুন করে উপলব্ধি করছি আমরা। নভেম্বর পড়লেই শহরটা এত সুন্দর কি করে হয়ে যায় বলুন দিকি!


পরিকল্পনা তো অনেক, সময় যে বড়ই কম। শীতের বেলা বড্ড ছোট। গন্তব্য এক বিশেষ মনীষীর শেষ বিশ্রাম স্থল দর্শন। যদিও মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট ২০০৩ সালে তাঁর খেতাব কেড়ে নিয়েছেন, তাও আমাদের মত ৮০-৯০ এর দশকে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের মর্মস্থলে আজও তিনি কলকাতার বাবা হিসেবেই স্বীকৃত। ১৯৮৯/৯০ সালে কলকাতার তিনশ বছর পূর্তির সাক্ষী যে আমরা। একটা বিশেষ শাড়িই বেরিয়েছিল সেই সময়, যার নাম কলকাতা - ৩০০। আমার মা বাদে চেনা পরিচিত সকলেই একটা করে কিনেছিলেন মনে আছে। মায়েরও খুব শখ ছিল, কিন্তু যা হয় আর কি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে - 


অজান্তে স্মৃতিমেদুর হয়ে ওঠে মন। একটা সিনেমাও উঠেছিল ভদ্রলোককে নিয়ে। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র, আর কে কে ছিলেন, বা সিনেমার গল্প কি ছিল কিছুই মনে পড়ে না। মনে করতে গেলেই এন্টনি ফিরিঙ্গি আর জাতিস্মর এসে সব ঘেঁটে দেয়। ধুত্তোর - 


রাজভবনের উত্তর পশ্চিম কোণে অবস্থিত সেন্ট  জনস্ চার্চ, এর ভিতরেই ঘুমিয়ে আছেন কলকাতার জনক। কতদিন এর সামনে দিয়ে হেঁটে আপিস গেছি আমি, ভিতরে প্রবেশ আজই প্রথম। চার্চে ঢুকতে এন্ট্রি ফি লাগে, মাথা পিছু দশ টাকা। গাড়ির জন্য ৫০ টাকা। বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থান চার্চটার। মর্মর ফলকে গোটা গোটা করে লেখা জমিটা দান করেছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস খোদ, সন ১৭৮৪। ইতিহাস বলে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারের উত্তর পূর্ব কোণে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন ইন দি ফিল্ড চার্চের প্রতিরূপ এই চার্চ। তুত্তুরী বলে, "বেশীরভাগ চার্চ এমনিই তো দেখতে হয়"। সেতো হবেই, ব্রিটিশ আমলে তৈরি অধিকাংশ চার্চই যে এই আদলে তৈরি। 


গির্জার উঁচু চূড়ার দিকে ক্যামেরা তাক করে খচখচ করে ছবি তুলছে শৌভিক। তুলছে তুত্তুরীও, তোলার আগে একবার আড় চোখে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে, ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে, কতটা বেঁকে তুলছে বাবা। মাটিতে বসে পড়ল কি? দুটোর মধ্যে নিত্য ঝামেলা হয় এই ছবি তোলা নিয়ে। তুত্তুরীকে যত বলি, বাবাকে নকল করতে যাস না, তাহলে তো একই ছবি উঠবে দুই জনের ক্যামেরায়, তিনি শুনলে তো। ছায়া সঙ্গী হয়ে নকল করে চলেছে বাবাকে আজও।  ধুলোতেই বসে পড়লেন ধপ করে - 


মেয়েকে টেনে সরিয়ে আনি, শুধু ছবি তুললে হবে, অনুভবও তো করতে হবে নাকি? ১৭৮৪ সাল চিন্তা করতে পারছিস? সতীদাহ কবে বন্ধ হয়েছিল মনে আছে, এতক্ষণে মাথায় ঢোকে তুত্তুরীর, একটু থেমে বলে "১৮২৯।" মোবাইল বার করে কি দেখে, তারপর বলে, " তার মানে রাজা রামমোহন রায় তখন মাত্র ১২ বছর। আমার থেকেও ছোট -"। আর ঈশ্বরচন্দ্র? তাঁর জন্মাতে বাকি প্রায় চার দশক। সিপাই বিদ্রোহ এক অবাস্তব কল্পনা। 


হতবাক হয়ে চার্চের গম্বুজের দিকে তাকিয়ে থাকি আমরা মা মেয়ে। মনে মনে কথা বলার চেষ্টা করি, তদানীন্তন কোন পূর্বজের সাথে। আছেন কি কেউ আসেপাশে, নাহ নেটিভদের তো প্রবেশই নিষিদ্ধ ছিল এইসব স্থানে। দূর থেকে সসম্ভ্রমে"পাথুরে গির্জা" বলে ডাকতেন তাঁরা। ইতিপূর্বে এমন পাথরের তৈরি ইমারত ছিল কোথায় নরম কলকাতায়। গির্জা গাত্রে খোদিত আছে, নদী পথে এই সব সব পাথর আনা হয়েছিল গৌড় থেকে। ইতিহাস বলে মাত্র তিন বছর লেগেছিল নাকি চার্চটি তৈরি হতে, ব্যয় হয়েছিল ৩০ হাজার টাকা। টাকাটা পুরোটাই উঠেছিল পাবলিক লটারির মাধ্যমে। মোদ্দা কথা, নেটিভদের স্থাপত্য ভেঙে, তাদের দান করা জমিতে, তাদেরই অর্থে গড়ে উঠেছে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের উপাসনালয়। 


 ১৭৪ ফুট গম্বুজের মাথায় এখনও টক টক করে ছুটছে বিশাল গোল ঘড়ি খানা। আজও রোজ দম দেওয়া হয় এই ঘড়িটায়। গম্বুজটা নাকি আরো বড়, আরো জাঁদরেল হবার কথা ছিল, কিন্তু কলকাতার নরম মাটি, এর থেকে বেশী ভার বহনে অপারগ। ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত এটাই ছিল কলকাতার  ক্যাথিড্রাল।


কে বলবে অফিস পাড়ার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই চার্চ, গেট দিয়ে ঢুকে আসা ইস্তক কানে আসেনি কোন গাড়ির আওয়াজ, বা জন কাকলি। সময় যেন থমকে গেছে প্রাচীরের এই পাশে। চার্চের ভিতরে অখণ্ড নীরবতা, সারি সারি ফাঁকা বেঞ্চ বসে আছে উপাসকের অপেক্ষায়। পায়ের কাছে গুছিয়ে রাখা ছোট ছোট ফুট স্টুল। চার্চের জানলায় রঙিন কাঁচের ফাঁক গলে আসা সূর্যালোক তৈরি করেছে অনুপম বর্ণালী। এই গির্জার অল্টারের নীচে ঘুমিয়ে আছেন কলকাতার প্রথম বিশপ থমাস মিডলটন। গির্জার দেওয়াল জোড়া অগণিত মর্মর ফলক । মৃত প্রিয়জনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে কোথাও ভাইপোর জন্য ফলক বসিয়েছে কাকা, কোথাও স্ত্রীর জন্য স্বামী, ছেলের জন্য বাবা ইত্যাদি। প্রতিটি ফলকে লুকিয়ে আছে কত যে গল্প -। 


জেমস্ পাটেল এর গল্পটা আমি জানি। ইনি সম্পর্কে আমার প্রিয় লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল সাহেবের পূর্বপুরুষ। কোথায় যেন পড়েছিলাম ডালরিম্পল সাহেবের ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষ নাকি কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন,  যাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন ঘুমিয়ে আছেন এই চার্চ সংলগ্ন সমাধি ক্ষেত্রে। জেমস্ পাটেল অবশ্য থেকেও নেই। ওনাকে বলা হত, " the greatest liar in India", ভদ্রলোক কি করেছিলেন জানি না, কিন্তু বলা হয়, উনি নাকি এতই পতিত ছিলেন যে মৃত্যুর পর স্বয়ং ডেভিল ও ওনাকে নিজের ছত্রছায়ায় নিতে চাননি। মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে, ওনার মরদেহকে সুরায় চুবিয়ে রওনা দেয় জাহাজ ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। মাঝরাতে সেই সুরা সিক্ত মৃতদেহ হঠাৎ উঠে বসে সটান। সেই দেখেই ওনার স্ত্রী হার্টফেল করে মারা যান। সংরক্ষণের স্বার্থে তাঁকেও চোবাতে হয় সেই সুরা ভাণ্ডে। এই করতে গিয়েই বাঁধে গোল, গোটা জাহাজ আমোদিত হয়ে ওঠে সুরার সুবাসে। নাবিক কুল টের পায়, কি অমৃত সুধা লুকিয়ে আছে জাহাজে। এত দামী মদ কি ফালতু নষ্ট হবে, কফিনে ফুটো করে বার করে দেদার পান করা হয় মদ। এরপর যা হয় আর কি, মাতাল জাহাজ গিয়ে ধাক্কা মারে চড়ায়। জাহাজের সাথেই জ্বলে যান পাটল দম্পতি ও। 


অল্টারের কাছেই রাখা, Johann Zoffany র হাতে আঁকা বিশাল তৈল চিত্র, Last Supper। বলাইবাহুল্য অনুপ্রেরণা -লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা দা লাস্ট সাপার। খুঁটিয়ে দেখি আমরা, ছবিটি বেশ বিতর্কিত। প্রভু যীশুর শিষ্যদের নাকি হুবহু তৎকালীন কোম্পানির বড় অফিসারদের মত দেখতে। জলপাত্রটা দেখতে আমাদের থুকদানির মত, একটা ভিস্তিও রাখা আছে টেবিলের ওপর। ছবিতে যীশুর কাঁধে মাথা রেখেছেন যিনি, তাঁকে মহিলা বলে ভ্রম হওয়াই স্বাভাবিক। দা ভিঞ্চি কোড পড়া আমার মন কেবল জানতে চায়, তবে কি Zoffany ও Priory of Sion এর সদস্য ছিলেন? যাদের ওপর ন্যস্ত ছিল প্রভু যীশুর উত্তরসূরিদের রক্ষণাবেক্ষণের গুরুদায়িত্ব। 


চার্চের বাইরে ঘুমিয়ে আছেন অনেক মানুষ। লর্ড ব্রেবর্ন, লেডি ক্যানিং নাম গুলো পরিচিত। এনাদের সমাধি গুলিও স্বতন্ত্র। বাকিদের নামে নামে পাতা আছে মার্বেল ফলক। কিছু কিছু ফলকে ইংরাজিতে লেখা, বাকি ল্যাটিনে। আছে বেগম জনসনের কবর, আসল নাম ফ্রান্সেস ক্রোক। সেযুগে চার বার বিয়ে করেছিলেন ভদ্রমহিলা।  প্রথম বিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে, অল্প দিনের মধ্যেই হারান স্বামী এবং সন্তানদের। পুনরায় বিবাহ করেন। ২২/২৩ এর মধ্যে আবার বিধবা হন তিনি। তৃতীয়বার যাঁর সাথে বিয়ে হয়, তিনি ছিলেন কোম্পানির বড় অফিসার। বাংলা তখন সদ্য হারিয়েছে নবাব আলবর্দি খাঁকে। সিংহাসন দখলের লড়াই তীব্র। এই লড়াইয়ের মাঝে পড়ে আলাদা হয়ে গেলেন ফ্রান্সেস তাঁর স্বামীর থেকে। বন্দী হয়ে দুই সন্তান সহ আশ্রয় পেলেন মৃত নবাবের স্ত্রীর ছত্রছায়ায়। বেগম সাহেবার এমন মাহাত্ম্য যে ফ্রান্সেস বাকি জীবন নিজেকে বেগম বলে পরিচয় দিতে শ্লাঘা বোধ করতেন। যুদ্ধ শেষে অবশ্য স্বামীর সাথে মিলিত হন ফ্রান্সেস। ফিরে যান ইংল্যান্ডে। সেখানে বেশ অনেক বছর একসাথে কাটানোর পর মারা যান ওনার তৃতীয় স্বামী। মধ্য চল্লিশের ফ্রান্সেস একাকী ফিরে আসেন তাঁর ইন্ডিয়ায়। কলকাতায় এসে বিবাহ করেন উইলিয়াম জনসনকে। পাথুরে গির্জার প্রাণ পুরুষ এই উইলিয়াম জনসন। পাবলিক লটারির মাধ্যমে টাকা তোলা থেকে গির্জা নির্মাণ সবটুকুই হয় ওনার একার তত্ত্বাবধানে। গির্জা নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে সস্ত্রীক বিলেত ফেরৎ যেতে উদ্যোগী হন জনসন সাহেব। কিন্তু বেঁকে বসেন বেগম সাহেবা। শ্বেতাঙ্গিনী হলেও ইন্ডিয়াই ওনার দেশ, কোনমূল্যেই স্বদেশ ছাড়তে উনি রাজি নন। ডিভোর্স তখনও পাপ বলে গণ্য হত, বিশেষত উইলিয়াম জনসনের মত যাজকদের তো ওপথে হাঁটা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত মোটা অর্থদণ্ড দিয়ে বরকে দেশে পাঠালেন বেগম জনসন, শর্ত রইল আর কোনদিন ফিরে আসতে পারবে না উইলিয়াম জনসন। ৮৭ বছর বয়সে মারা যান বেগম জনসন, গোটা কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজের নয়নমণি ছিলেন তিনি। সকলে  সমবেত হয়েছিল তাঁর শেষ যাত্রায়।


 তাঁর সমাধির পাশ দিয়ে কিছুটা গেলেই চোখে পড়বে অষ্টভূজাকৃতি এক ছিমছাম সৌধ। এর নীচেই ঘুমিয়ে আছেন সেই ভদ্রলোক, যাঁর পোশাকী নাম Jobous Charnock। একা নন, পাশেই শুয়ে আছেন তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা। আর শায়িত আছেন উইলিয়াম হ্যামিল্টন, ভারত সম্রাট ফারুকশিয়ারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। কোথাও যেন ঘুমিয়ে আছেন  জেমস  কার্কপ্যাট্রিক,  উইলিয়াম ডালরিম্পলের  White Mughal এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। বেগম খয়েরউন্নিসার প্রথম প্রেম। গল্পের সাথে এখানে মিশে যায় ইতিহাস। ইতিহাস গল্প বলে হেথায় -


ছবি সৌজন্য - আমার বর আর আমার ছানা

Saturday, 29 November 2025

অনির ডাইরি নভেম্বর, ২০২৫

 অনির ডাইরি ২৮শে নভেম্বর, ২০২৫

#অনিরডাইরি 


উফ্ আজ শুক্রবার। বাড়ি ফিরব। আজ তো "পাঁও জমিন পর নেহি পড়তে মেরে -"। দিন দুয়েক আগে মেছেদা স্টেশনে লাফিয়ে নামতে গিয়ে মোচড় খেয়েছে বাম গোড়ালিটা, প্রথম দিন তো তবলা আলুর মত ফুলে ছিল, বিকালে ঘরে ফেরার ট্রেনে বসে ভীষণ অসহায় লাগছিল সেদিন। আমি চট করে খারাপ থাকি না, এতজন মানুষ আমার মুখাপেক্ষী যে খারাপ থাকাটা আমার কাছে বিলাসিতা। শুধু আমি না, আমার সমগোত্রীয় সকলেরই এক অবস্থা। দিন কয়েক আগেই আমার ভাই বউ বলছিল, " জানো তো দিদিভাই আমি এখন মরতেও পারব না সামনে ছেলের উচ্চমাধ্যমিক, যদি বাই চান্স মরেও যাই, ভূত হয়ে ওর ঘাড়ে বসে থাকব আর বলব, পড় পড়।" 


তবে সেসব তো দিন কয়েক আগের কথা, আজ শুক্রবার, " বোলো দেখা হ্যায় কভি, তুমনে মুঝে উড়তে হুয়ে -"। স্নান করতে গিয়ে দেখি, গিজার চললেও, বিকল হয়েছে গরম জলের নবটা। জয় মা বলে ঠাণ্ডা জলেই স্নান সেরেনি। শুনেই ভালো করে চাদরটা জড়িয়ে নেয় মা, ঘোষণা করে " আমি বাবা আজ চান করছি না।" তড়িঘড়ি জলের মিস্ত্রিকে ফোন করে বাবা। লতা দি রোজ বলে, " দুটো ভাত খেয়ে যাও, প্রেসার কুকারে এখুনি হয়ে যাবে -"। আজও বলেছিল, আজও না বললাম আমি। একে তো লতাদির মত ডিম পাঁউরুটি কেউ বানাতে পারে না, তারওপর গতকাল থেকে ভালো নেই লতা দির শরীরটাও। ঠাণ্ডা লাগতেছে বেদম। 


মচমচে করে ভাজা দুটো ডিম টোস্ট খেয়ে, ভেজা চুলে একটা ক্লিপ আটকে বেরিয়ে পড়ি। রোজই শুধায় মা, " টিপ পরবি না? মুখে কিছু লাগাবি না?" রোজই এক জবাব দিই আমি, আগে তো ট্রেনে উঠি। বাগনানের পর, ফাঁকা হয়ে যায় লেডিজ কামরা, তখন সবাই লিপস্টিক লাগায়, আমিও সেই সবাইয়ের একজন। টিপ পরি, কাজল কম্প্যাক্টও লাগাই ট্রেনে বসে। আর যেদিন লেডিজ কম্পার্টমেন্টে উঠতে পারি না, সেদিন স্টেশনে নেমে উত্তমকুমারের গাড়ি ভরসা। তাতে একটা সুবিধা হয়, কিছু যদি ফেলেও যাই, যত্ন করে গুছিয়ে রাখে উত্তম। গেল হপ্তায়ই যেমন, পেন বলে যেটা তুলে রেখেছিল, সেটা ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া কাজল পেন্সিল, পাগলের মত যাকে খুঁজছিলাম এবং কাল্পনিক চোরকে শাপশাপান্ত করছিলাম আমি। 


বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই টোটো পেয়ে গেলাম আজ। এত সকালে মাত্র একজন ছাড়া আর কোন সহযাত্রী ও পেলাম না, তাতেও হেলদোল নেই টোটোওয়ালার। পক্ষীরাজের মত উড়িয়ে গিয়ে নামালো দাসনগর ইস্টিশনে, বিনা নখরায় ফেরৎ দিল পাঁচটাকা। প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়তে যাব, " অ্যাই, অ্যাই" করে হাঁকলেন সহযাত্রী ভদ্রলোক। ঘুরে তাকাতেই বললেন, " তুই আমাদের পাড়ার মেয়ে না? ক্ষীরেরতলায় বাড়ি না তোর?" আজও কেউ আমার সাথে এইভাবে কথা বলতে পারে বিশ্বাসই হচ্ছিল না, প্রায় দুই দশক এই মহল্লা ছাড়া আমি, ভট্টাচার্য বাড়ির বড় বউ, শ্রীমতী তুত্তুরীর মা, মুকুল সৌরভদের জাঁদরেল বস, আজও লোকজন আমাকে পাড়ার মেয়ে ভাবে - । আমার হতভম্ব দশা দেখেই বোধহয় মায়া লাগল ভদ্রলোকের, বললেন, " ভালো থাকিস রে মা। যা তোর ট্রেন এল বুঝি।" 


এক বুক অক্সিজেন নিয়ে দৌড়ালাম, সাধে এই শহরটাকে এত ভালবাসি। বাগনান ছাড়ানোর পর আজও ভালো করে সাজুগুজু করে নিলাম, উত্তমকুমারের সাথে ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়ার গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম আপিস। মিটিং, মিছিল, পেনশন, ডেথ কেস সব যেন হুহু করে উড়ে গেল জানলা দিয়ে,আজ বাড়ি ফিরব যে। "বোলো দেখা হ্যায় কভি, তুমনে মুঝে উড়তে হুয়ে -"।


অনির ডাইরি ১৮ ই নভেম্বর, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি #তাম্রলিপ্তকড়চা 



সকাল থেকে তীর্থের কাকের মত বসে থেকে অবশেষে এক কাপ চা পেয়েছি। আমাদের অফিসে চা হয় বটে, তবে সেটা নেহাৎ কালো চা। একেক দিন তাতে ভুরভুর করে একেক রকম সৌরভ। কোনদিন তুলসী পাতার গন্ধ, তো কোনদিন বিছুটি পাতার সুবাস, কোনদিন গরম মশলা তো কোনদিন আবার সাক্ষাৎ দার্জিলিং চায়ের গন্ধ। সেদিন ভাবি অফিস থেকে বেরিয়ে ডিয়ার লটারির টিকিট কাটব। 


তাও ভালো, জহর বাবুর আমলে তো পান পাতার গন্ধও পেয়েছি। সারাদিন কচরমচর করে পান চিবাতো লোকটা, তারই খানিকটা প্রসাদ হিসেবে মিশিয়েছেন কিনা জিজ্ঞাসাই করে ফেলেছিলাম বুক ঠুকে। উনি অবশ্য শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের দিব্যি কেটে বলেছিলেন, ওটা পান নয়, বেলপাতা। নারাণ পুজোর বেলপাতাগুলি কি এমনি ফেলে দেবেন, তাই আর কি- 


এটা অবশ্য দুধ চা। সাথে একটা কচুরির সাইজের সুজির বিস্কুট। সবে মুখে পুরেছি, শান্তনু একগাল হেসে দরজা খুলে বললে, " ম্যাডাম ওনারা এসে গেছেন। ডাকব?" ইশারায় দুই মিনিট অপেক্ষা করতে বলে, কোনমতে গিলে নিলাম গরম চা'টা। বেল বাজাতেই ঘরে এসে ঢুকল শান্তনু, পিছন পিছন এক মধ্যবয়সী নারী এবং পুরুষ। উভয়েই মাঝারি উচ্চতা, দোহারা গড়ন, শ্যাম বর্ণ। ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ উজ্জ্বল। লোকটি রোদে পোড়া। উভয়ের পরণে একেবারে ছাপোষা পোশাক। ভদ্রলোক একটু হাসিখুশি, ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ গম্ভীর। উভয়েই বেশ অনেকটা সন্ত্রস্ত। 


ইশারায় বসতে বললেও, বসলেন না কেউ। ভীত হয়ে তাকালেন শান্তনুর দিকে। সকাল থেকে উচ্চিংড়ের মত লাফিয়ে বেড়াচ্ছে শান্তনু, আজ তার আনন্দ আর ধরে না। একটু আগেই দেখলাম আসেপাশে কোন আপিসের কোন কর্মীর বাড়িতে কার্তিক পড়েছে সেই হিসেব নিয়ে বেড়াচ্ছিল, যেন তারা সত্যিই ওকে নিমন্ত্রণ করে লুচি/ খিচুড়ি খাওয়াবে। মাইরি - 


 বললাম শান্তনু তুমিও একটু বসো বাবা। পা দুটোকে একটু দম নিতে দাও। শান্তনু এক গাল হেসে জিভ কেটে বসে পড়ার সাথে সাথেই ওনারাও বসে পড়লেন ধপ করে। এবার আসি ওনাদের পরিচয়ে, ভদ্রলোকের নাম অভিজিৎ কুণ্ডু, নিবাস পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমার ব্লকের কুমারারা অঞ্চলে। ওনার স্ত্রী লতা কুণ্ডু, আমাদের বিনামূল্যে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের একজন নথিভুক্ত শ্রমিক ছিলেন। পেশা ছিল সূচি শিল্প।


আর ভদ্রমহিলার বাড়ি এই জেলারই শহীদ মাতঙ্গিণী ব্লকের কাখড়দা অঞ্চলে। ওনার স্বামীও ছিলেন আমাদের প্রকল্পের নথিভুক্ত শ্রমিক। নাম শশাঙ্ক মণ্ডল, পেশায় ছিলেন ফুলের ব্যবসায়ী। ২০১৯ সালের কোন এক অভিশপ্ত ভোরবেলা ফুল বিক্রয় করে বাড়ি ফিরছিলেন শশাঙ্ক বাবু, যখন বালি বোঝাই একটি গাড়ি ওনাকে পিষে দিয়ে চলে যায়। 


ঐ একই বছর মারা যান লতা কুণ্ডুও। ডাক্তারের বয়ান অনুসারে হাইপারটেনশনের রুগী ছিলেন ভদ্রমহিলা। মৃত্যুর কারণ সেরিব্রাল অ্যাটাক। প্রকল্পের নিয়ম অনুসারে লতা দেবীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী এককালীন পঞ্চাশ হাজার আর শশাঙ্ক বাবুর স্ত্রী দুই লক্ষ টাকা অনুদান পাবেন। ওনারা সেই মত যাবতীয় কাগজ পত্র জোগাড় করে আবেদন ও করেন। সেই আবেদন অঞ্চল থেকে ব্লক হয়ে এসে পৌঁছায় আমার পূর্বসুরীর কাছে। সব কাগজপত্র পরীক্ষা করে অনুমোদন ও পেয়ে যায় দুইটি কেস। আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের তরফ থেকে টাকা চেয়ে পাঠানো হয় মহানগরে। এসেও যায় অনুমোদিত অর্থ। সেই টাকা ছেড়েও দেওয়া হয়, অন্তত ওয়েবপোর্টাল তো সেই কথাই বলে।


তারপর গোটা বিশ্বজুড়ে ঘোষিত হয় লকডাউন। রাতারাতি বদলে যায় চেনা দুনিয়াটা। বেশ কিছুদিন গৃহবন্দি থেকে আবার পুরান ছন্দে ফেরে জীবন। কালের নিয়মে দাঁত নখ খসে যায় অতিমারির। বদলী হয়ে যায় প্রাক্তন আধিকারিক। বদলে যান ইন্সপেক্টর সাহেবরাও। বদলে যায়, হাত বদল হয় ওয়েবপোর্টাল। এমনকি বদলে যায় আমাদের অফিসের ঠিকানাও। 


এই বিপুল পরিবর্তনের মাঝে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর জমা পড়ে দুটি নালিশ। একটি অভিজিৎ বাবুর আর একটি সন্ধ্যা দেবীর। বক্তব্য একই," টাকাটা তো এখনও পেলুম না আজ্ঞে।" 

এত পুরান কেসের টাকার হদিশ করা কি মুখের কথা? টাকা ঢোকেনি, এমন নালিশ তো আমরা সপ্তাহে সপ্তাহে পাই। শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে টাকা ঢুকে যায়, মানুষ চেক করে না। অথবা এক একাউন্ট নম্বর দেয় আর অন্য একাউন্ট নম্বরের পাশবই আপডেট করতে থাকে। বাদ বাকি লোকজন টাকা পেলেও বুঝতে পারেন না, কোন খাতে ঢুকেছে এই অনুদান। 


তাই এমন নালিশ জমা পড়লেই আমরা সর্বাগ্রে বলি, পাশবইটা নিয়ে আসুন। এনাদেরও তাই বলা হল। দেখা গেল একাউন্ট ঠিক আছে, ২০১৯-২০২০ সাল থেকে কোন বড় টাকাও ঢোকেনি। 


তাহলে কি জনধন একাউন্ট ছিল? ৫০ হাজার আপার লিমিট? তার বেশি টাকা ঢুকতে গেলেই লাফিয়ে পালিয়ে আসে। পালিয়ে এলে/ ফিরে এলে তার হিসেব তো থাকবে। ব্যাংক স্টেটমেন্টে কোথাও তার উল্লেখ তো থাকবে। বিশের বছরের স্টেটমেন্ট দেখতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ, কি ঢুকেছে, কি বেরিয়েছে, কি ফিরে ফিরে এসেছে - বোঝা যায় না কিছুই। সবকিছুই তালগোল পাকানো। 


ব্যাংক প্রথমেই হাত তুলে দিল, বিশের বছরের সব কিছুই বিষময়। ইতিমধ্যে বহুবার বদলে গেছেন কর্মীবৃন্দ। এই জট ছাড়ানো বর্তমান কর্মীদের পক্ষে অসম্ভব। ব্যাপারটা যে খুব সহজ নয় আমরাও জানি এবং বুঝি। মুস্কিল হল দিন আনা, দিন খাওয়া, প্রিয়জন হারানো দুটো মানুষকে কিভাবে বোঝাই। তাঁরা যে প্রায়ই ফোন করেন, এসে বসে থাকেন শান্তনুর মুখের দিকে তাকিয়ে। " ও ভাই, কিছুই কি হবে নি?" 


"এত দেরী করে কেন আইছু", বলে ভাগিয়ে দিতেই পারত শান্তনু। সরকারী আপিস মাত্রই তো সেটাই বদনাম। উল্টে নৈমিত্তিক কাজ সামলে, দিনের পর দিন ব্যাংকে পড়ে থাকে শান্তনু, যদি কোনভাবে কিছু সমাধান সূত্র পাওয়া যায়। হাসিমুখ মহাফোক্কড় ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলে ব্যাংকের লোকজনও। তেমনি কেউ নিয়মের বজ্রআঁটুনির ফাঁক গলে বার করে দেন তাড়াতাড়া কাগজ। সেই কাগজের গাদায় টাকা খোঁজা আর খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা একই প্রায়। অতিকষ্টে উদ্ধার হয় ফিরে আসা টাকার হদিশ। দেখা যায় ঐ অর্থবর্ষ অবসানে, না খরচ হওয়া অন্যান্য টাকার সাথে মহানগরে ফেরৎ গেছে এনাদের আড়াই লাখ টাকাও।


রহস্য সমাধান হতে পুনরায় টাকা চাইতে যাই আমরা। কিন্তু এবার আর কিছুতেই রাজি নয় পোর্টাল। কারণ তার হিসেবে তো এই টাকা আমরা বহুবছর আগে দিয়ে বসে আছি। সেকি কেলো! বিশদে জানিয়ে মহানগরে চিঠি লিখে, মুচলেখা দিয়ে অবশেষে দিন দুয়েক আগে এসেছে টাকাটা। উৎসাহের আতিশয্যে সেই রাতেই অভিজিৎ বাবু আর সন্ধ্যা দেবীকে খবরটা জানিয়ে দেয় শান্তনু। আজ ওনারা উভয়েই এসেছেন ধন্যবাদ জানাতে।


ওনারা বলেন, " আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলাম দিদি।" আমি বলি, আমরাও। তবে কিনা না আঁচালে বিশ্বাস নেই। আগে টাকা ঢুকুক, তারপর ধন্যবাদ নেবেন - দেবেন ক্ষণ। নভোনীল বাবু পাশ থেকে বলে ওঠেন, " এবার আপনাদের একাউন্ট ঠিক আছে তো? পুরো টাকা ঢুকবে তো?" উভয়েই মাথা নেড়ে ব্যাগ হাতড়ে বার করে আনেন দুটি পাশ বই। অভিজিৎ বাবু কুন্ঠিত ভাবে জানান, " ইটা শেষ হয়ে গেছে। ব্যাংক বলছে আর পাশবই দিবে নি। মোবাইলে কি করে দেবে যেন।" আমরা বুঝি yono। সে দিক, পাতা 

উল্টে বুঝি, একাউন্ট ঠিকই আছে। এবার সন্ধ্যা দেবীর পালা। এনার তো অনেক টাকা। দুই লাখ। মানে মানে ঢুকলে হয়। বলতে বলতে পাতা উল্টে দেখি, বড় বড় করে লেখা, " tiny account।" অর্থাৎ আবার ফিরে আসতে চলেছে আমাদের টাকা। উফ ভগবান, এরা যে কেন কথা শোনে না। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, তিনি যে কিছুই বুঝলেন না, সেটা বেশ বুঝলাম আমরা। তবে এবার আর কোন রিস্ক নিইনি আমরা, ভদ্রমহিলাকে পাকড়াও করে সোজা নিয়ে যাওয়া হয়েছে ব্যাংকে। আগে স্বাস্থ্য বাড়ুক একাউন্টের। তারপর ছাড়ব টাকা।


অনির ডাইরি ৪ঠা নভেম্বর, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি 



নভোনীল বাবুর আজ কপাল খারাপ। মাঝরাস্তায় ট্রেন খারাপ, বললাম বাড়ি ফিরে যান, আমি তো যাচ্ছি। কথা শুনলেন কেমন। উল্টে বললেন, " আপনি বেরিয়ে যান, আমি বাসে চলে যাব।" অগত্যা আমি আর উত্তমকুমার আর অপেক্ষা না করে রওনা দিলাম মেছেদা ইস্টিশন থেকে - 


আমি আর উত্তমকুমার একসাথে হলেই রান্নাবান্নার গল্প হয়। হয় আমি শেখাই, আর উত্তম বলে, " হ্যাঁ হ্যাঁ এটা জানি।" নয় উত্তম বলে আমি মনে মনে নোট নিই। আজ চিংড়ি মাছ পোড়া শেখাতে শেখাতে নিয়ে যাচ্ছে উত্তম। টাটকা চিংড়ি মাছ পুড়িয়ে, খোলা ছাড়িয়ে সবে জমিয়ে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা আর কাঁচা তেল দিয়ে মাখা হবে এমন সময় আমার চোখ আটকে গেল জানলার বাইরে। 


পাশ দিয়ে শাঁ করে ছুটে বেরিয়ে গেল একটা মোটরবাইক। বাইকে আরূঢ় এক অল্পবয়সী দম্পতি। ছেলেটির পরণে মামুলী টিশার্ট প্যান্ট বটে, মেয়েটি পরেছে ঝকঝকে গোলাপী সস্তার বেনারসী। শাড়ি জুড়ে সোনালী বুটি।এই রঙ আর এই বুননের শাড়ি এই রুটে প্রায়ই দেখি। মেয়েটি ঢলে পড়েছে চালকের পিঠের ওপর, একটা হাত ডান কাঁধের ওপর দিয়ে তেরছা করে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে লোকটাকে। দুই চাকায় সওয়ার রোমান্টিক দম্পতি আমার কম দেখা নেই। বিগত দুর্গা পুজোতেই তো জনপ্লাবিত রাস্তায়, সিগন্যালে আটকে একটি মেয়ে, চকাস চকাস করে চুমু খাচ্ছিল তার সহযাত্রীকে। উভয়েই হেলমেট পরে যে এভাবে চুমু খাওয়া যেতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হত না। পাবলিক ডিসপ্লে অফ আফেকশন অর্থাৎ জনসমক্ষে সোহাগ ব্যাপারটা আমার মোটেই মন্দ লাগে না বরং বেশ ভালো লাগে। 


আজকের দম্পতিকে ও খারাপ লাগল না। খামোখা ভারত-পাকিস্তান/ হিন্দু-মুসলমান/ বামুন-দলিত তো করছে না, কাউকে ট্রোল ও করছে না। ভালোবাসছে। বাসুক না। এইভাবে আমাদের টপকে চলে যাওয়াটা উত্তমকুমার যে মোটেই ভালো ভাবে নেয়নি, অচীরেই বুঝতে পারি। ওদের টপকে হুহু করে এগিয়ে যাই আমরা। পাশ দিয়ে যাবার সময় আরেকবার ঘুরে দেখি মিষ্টি দম্পতিকে। ছেলেটির মুখ ঢাকা হেলমেটে, মেয়েটি এখনও একই রকম ভাবে ধরে বসে আছে, মুখটা প্রায় ছেলেটার ঘাড়ে গোঁজা। উফ কি রোমান্টিক! ভয় শুধু একটা, বরটার গলায় না বেশী চাপ পড়ে - 


বলতেই উত্তম বলে, " ওটা ওর আসল বর নাকি।" যাঃ আসল নয়তো কি, নকল। উত্তম নাছোড়বান্দা, "না ম্যাডাম, আমি লিখে দিছি, ওরা সোয়ামী ইস্ত্রি নয়। নিজের বউকে কেউ এভাবে জড়িয়ে বসতে দেবে না। আমরাও তো বেরাই, আমার বউ কি আমায় এভাবে ধরে বসে পাঁচজনের সামনে।" উত্তম ভয়ানক পত্নীনিষ্ঠ, আমাদের দৈনন্দিন বাক্যালাপের মধ্যে অনেকটা জুড়ে থাকে উত্তমের গিন্নীর গল্প। তার বিদ্যা,বুদ্ধি, কর্ম নিপুণতা, তার সাহস, তার সংগ্রাম, তার সুখ, তার দুঃখ। উত্তম বউকে ভয়ানক ভালোবাসে, কিন্তু দেখায় না বাপু। গিন্নি ফোন করলেই পাল্টে যায় কন্ঠস্বর, কেমন যেন উদাসীন, উন্নাসিক, রুক্ষ হয়ে যায় পলকে। অথচ ফোন কাটার সাথে সাথেই তারই প্রসঙ্গে আদ্র হয়ে ওঠে কন্ঠস্বর। একদম আমার বরের মত। PDA ব্যাপারটা আমার বরেরও না পসন্দ। আর এই ভাবে গলা জড়িয়ে ধরলে তো--, ভেবেই হেসে ফেলি। 


শৌভিক হলে নির্ঘাত বলত, "গলা ছাড়। দম বন্ধ হয়ে যাবে তো। উফ্ কি ভারী রে বাবা তুই।" উত্তম সহমত হয়, " আমি হলেও তাই বলব ম্যাডাম। গলা ছাড়ো, দমবন্ধ করে মারবে নাকি। আপনাকে কইছি না, ওরা সোয়ামী ইস্ত্রি নয়, আজকাল এগুলো ঘরে ঘরে হইছে ম্যাডাম। দেখুন ছেলেটা লোকাল, তাই হেলমেট পরেছে, গ্লাস এঁটেছে। যাতে কেউ মুখ না দেখতে পায়। মেয়েটা বাইরের, তাই মুখ খোলা। এভাবে ঘুরবে ফিরবে, তারপর সন্ধ্যে বেলা যার বউ তার কাছে ফিরে যাবে। ছেলেটাও বাইক নিয়ে নিজের বউয়ের কাছে ফিরে যাবে।" 


বলি বটে, থাম বাবা, মন দৌড়ে যায় প্রায় দুই দশক আগের খড়গপুর প্লাটফর্মে। ছুটির ট্রেন আসার আগে প্রায় দেখা যেত দুজনকে একসাথে, জুস কাউন্টারে। বিশাল লম্বা পৃথুলা এক ভদ্রমহিলা আর মাথায় বেশ খাটো, একই রকম চেহারার এক ভদ্রলোক। কপিবুক রোমান্টিক দম্পতি। স্বামীস্ত্রী বলেই ভাবতাম। তারপর একদিন লাগল ঝগড়া, নিত্যযাত্রীরা সকলে অবগত হলেন যে ভদ্রমহিলা অন্য কারো ধর্মপত্নী। লোকটি সব জেনেই প্রেমে পড়েছিল, শুধু পড়েইনি প্রেমে অন্ধ হয়ে প্রায় বিকিয়ে দিয়েছে নিজেকে। উপহার দিয়েছেন এক জোড়া এই মোটা সোনার বালা। সম্পর্ক আপাতত শেষ, কেন শেষ যদিও আজ আর মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে বালা জোড়া ফেরৎ চেয়ে কি চিৎকার জুড়েছিল লোকটা।


 একটি বোধহয় ফেরৎ দিয়েওছিলেন দিদিটা। ব্রেক আপ হয়ে যাবার পর, তিনি মহিলা কামরাতেই সওয়ার হতেন, নির্বিকার ভাবে গল্প করতেন আমাদের সাথে। শোনাতেন বর, ছেলে, প্রথম প্রেমের গল্পও। নবু ( নবনীতা) আর আমি সদ্য চাকরী পেয়েছি, বিয়ে থা তখনও বহু দূর। বেজায় দোস্তি হয়ে গিয়েছিল দিদিটার আমাদের সাথে। মাঝে মাঝে ঝাড়গ্রাম থেকে এসে যোগ দিত সুকন্যাও। আমরাই হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ওনার নতুন জুস পার্টনার। ওনার ঐ পরকীয়ার গল্প শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতাম আমরা তিনজনে, কিন্তু ভুলেও ও পথ মাড়াত না দিদিটা।


তারপর একদিন কি যেন হল, সব ট্রেন ক্যান্সেল। নবু, আমি আর দিদিটা গাদাগাদি করে উঠলাম একটা সুপার ফার্স্ট এক্সপ্রেসে। সেখানে হাজির দিদির প্রাক্তন প্রেমিক ও। নবু আর আমি তো ভয়ে কাঠ, একখানা তাগড়াই বালা এখনও ঝকমক করছে দিদির হাতে। লোকটাও আড়ে আড়ে চায় । হে ভগবান, এমনিতেই একটা বসার জায়গা নেই, ট্রেনটাও হাঁটছে গদাইলস্করি চালে, কখন বাড়ি পৌঁছাব জানি না, এর মধ্যে আবার এরা মারামারি না শুরু করে। ভাবতে ভাবতেই চপ খাচ্ছি আমরা, বড় প্লাস্টিকের গ্লাস ভর্তি চা অর্ডার দিচ্ছে দিদিটা। চপ শেষ করে,কয়েক চুমুক চা খেল, তারপর সটান ঘুরে আধখাওয়া চায়ের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল লোকটার দিকে, " এই অমুক চা খাবে?" এত বড় ঘাড় নেড়ে, আদুরে খরগোশের মত লাফিয়ে চলে এল লোকটা, তারপর আমাদের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে সেই এঁটো চা চরণামৃত ভেবে খেয়েও নিল। তারপর সেই খালি প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে দুজনের কি গপ্প।পলকে মুছে গেল গোটা ট্রেনটা, মুছে গেলাম নবু আর আমি ও। মুছতে মুছতে নবু শুধু বলল, " কয়েকদিন আগেই বিয়ে হয়েছে না এই লোকটার -"। 


ঘচাং করে গাড়ি থামায় উত্তম, " ম্যাডাম চা খাবেন তো?" অফিস যাবার পথে মাঝেমধ্যে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাই আমরা তিনজনে, ছোট লম্বাটে গ্লাসের মত ভাঁড়ে ঘন দুধের চা। নভোনীল বাবু বলেন, চা না ক্ষীর। এতই সুস্বাদু। সবই ঠিক আছে, কিন্তু গতকাল চা খেতে নেমে একটা লিকলিকে সাপের গায়ে প্রায় পা তুলে দিচ্ছিলাম আমি। দোকানী এবং উত্তম যদিও বারবার বলছিল, "ঢ্যামনা সাপ" এবং ওর কোন বিষ নেই। তাও, পরখ করে দেখার শখ আমার নেই ভাই। ইশারায় বললাম, "চলো, চলো।" উত্তম কুমার ঘাড় ঘুরিয়ে কইল, " সাপের ভয়ে নামবেননি? নামুন না। সাপ এলে আমি ল্যাজ ধরে তুলে ফেলে দুব ক্ষণ -"। বললাম, গাড়ি চালা বাবা, তুই উত্তমকুমার, চকলেট বয়। রঞ্জিত মল্লিকের মত একশন হিরো নোস। ওঃ বলতে ভুলে গেছি, আজ ৪ঠা নভেম্বর, তমলুক অফিসে আমার পাক্কা চার বছর পূর্ণ হল। যাদের সাহচর্যে, সহযোগিতায়, সহমর্মিতায় এত ভালো কাটল চারটে বছর, তাদের সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা। খুব বকাবকি করি বটে, তবে খুব ভালোওবাসি বাপু তোমাদের সকলকে। খুব ভালো থেকো আর এমনি ভাবেই পাশে থেকো সকলে 🙏🏻❤️

অনির ডাইরি, অক্টোবর ২০২৫

 অনির ডাইরি ২২শে অক্টোবর, ২০২৫

#অনিরডাইরি #হাওড়ার_টুকিটাকি 



মা শুধাল, " বাজারে ভিড় পেলি?" জবাব দিলাম, তেমন নয়। হাওড়ার কালী পুজো, কারণপায়ী মায়ের বাছাদের এই তো সবে ঘুম ভাঙছে। বিরক্তিতে দুই ভ্রু কুঁচকে গেল আমার মুর্শিদাবাদী মায়ের, ঠোঁট মুচড়ে বলল, " সবাই মদ খেয়েছে না?" জবাব দিলাম, সবাই। সব্বাই। একমাত্র আমি বাদে। কি করলাম মা, কালী পুজোতে একটু মদও খেলাম না। মস্করা মারতে ব্যস্ত আমার মন হঠাৎ কু গেয়ে উঠল, ঘুরে দেখি আমার বেতো থপথপে জননী, বিদ্যুৎ গতিতে কখন যেন তুলে নিয়েছে সদ্য ছাড়া একপাটি হাওয়াই চটি। 


"কারণ আমি কোন রিস্ক নিই না" বিড়বিড় করতে করতে আবার দৌড়ালাম বাজার। গুণে গুণে আরো এগারো খানা জিনিস কিনে আনতে হবে। তার মধ্যে চিনি, লঙ্কাগুঁড়ো, পাঁপড়, পনীর ইত্যাদি যেমন আছে, তেমনি আছে একখানা প্যান্টুলও। চারদিন পিত্রালয়ে থাকার আনন্দে এমন প্যাকিং করেছি যে প্যান্ট মনে করে আর একটি টিশার্ট নিয়ে চলে এসেছি। এই নিয়ে গতকাল থেকে লড়াই চলছে মায়ের সাথে। মা দু কথা বললে, চারটে কথা শুনিয়ে দিচ্ছি আমিও।


বাবাকে খুশি করার জন্য পাক্কা মোহনবাগান রঙের জামাপ্যান্ট গুছিয়েছিলাম আমি। সবই আমার ইস্টবেঙ্গলী বরের কিনে দেওয়া যদিও। বাড়ি এসে যদি সবুজ মেরুন দুটোই টিশার্ট বেরোয় তো আমি কি করব? তার মানেই আমি অপদার্থ কিভাবে প্রমাণ হয়? বললাম বাপটাকে একটা পুরানো প্যান্ট ধার দাও, তো বলে, " আমার প্যান্ট তোর হবে না।" খুড়তুতো ভাইটার কাছে অবশ্য চাওয়াই যেত, গতকালই বড়মামার ফুল প্যান্ট পরে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল শ্রীমতী তুত্তুরী। চাটুজ্জেরা যেমন ছিটিয়াল হয় আর কি, দিব্যি বাজি ফাটাচ্ছিল (থুড়ি পোড়াচ্ছিল, নো ফাটানো দিস ইয়ার) দুই মামাতো পিসতুতো ভাইবোনে, রেফারি গিরি করছিল বড় মামা। হঠাৎ রাত দশটায় মনে হল, "চল ঠাকুর দেখে আসি। বন্ধুমিলন সংঘ ফ্রিতে আইসক্রিম দিচ্ছে শুনছি -।" কিন্তু শ্রীমতী তুত্তুরী যে হাফ প্যান্ট পরে আছেন, এই পরে এত রাতে বাড়ি থেকে বেরোলে মাম্মাম (তাঁর দিদা) যে চোটে বোম হয়ে যাবে। তাও ঠাকুর দেখা এবং ফ্রিতে আইসক্রিম খাবার এমন বাসনা যে তিনি প্রস্তাব দিলেন, "দু মিনিট দাও বড় মামা, জিন্সটা গলিয়ে এখুনি আসছি।" তো বড়মামা কইলেন, " কুচ পরোয়া নেই, তুই আমার একটা কাচা প্যান্ট পরে নে -"। 


সেই পরে তিনি গোটা হাওড়া ঘুরে এসেছেন গত কাল, সাঁটিয়েছেন ফ্রি আইসক্রিম ও। আজ আবার চাইতে একটু লজ্জা লাগল। লতা দি বলে দিয়েছিল, ব্যাঁটরা থানা ছাড়ালেই বাম দিকে সারি দোকান। প্রথমটা থেকেই পেয়ে গেলাম। পকেটওয়ালা প্যান্ট, মাত্র ১৯০/-। এত কম দাম? আমাজন, মিন্ত্রা হলে গালে চড় মেরে ৫০০/৫৫০ টাকা নিয়ে নিত। ব্র্যান্ডেড গুলো তো হাজারের নীচে হয় না দেখি। সন্দিহান হয়ে শুধাই, দাদা আমার হবে তো? লোকটা বেজায় টেনে দেখায় আর মুখে বলে, " তুমি এমন কিছু মোটা নও বাপু।" সাধে হাওড়া আমার প্রিয়তম শহর। 


দুই ব্যাগ ভর্তি মাল নিয়ে টোটোয় উঠলাম, না ভর্তি হলে ছাড়বে না। বসে বসে গান শুনছি, " স্ক্যান্ডাল চাই বুঝলে, স্ক্যান্ডাল। নইলে এই সমাজে পুরুষ বলে পাবে না কোন মান -"। ইশ কি ইমমরাল লিরিক্স। সে-ক্সি-স্ট টু। তিনি অবশ্য ভাবলেশহীন, গেয়েই চলেছেন, " লুনা লু লু, কেন তোমার বয়স হয় না ষোল, আমার নাইন্টিন -"। এ বাবা, এতো ageism। আবার ষোল চাইছে -। পলকে থেমে গেল গান, চোখের সামনে এসে দাঁড়ালেন, বিগত এক শতকের সুন্দরতম বাঙালি পুরুষ, মুখে তার ভুবনজয়ী হাসি। পিছনে ভয়ংকর সুরেলা এক বাঙালি ভদ্রলোক, তিনিই গাইছিলেন। জাদুকর তো শুধু ঠোঁট নাড়ছিলেন। কান মুলি, গাও প্রভু গাও। 


বাড়ি ফিরে মাকে আশ্বস্ত করি প্রথমে, প্যান্ট পেয়েছি এবং না আমি সস্তা বলে বারমুডা কিনে আনিনি। আর হ্যাঁ এত কষ্ট করেও মোহনবাগান রঙই এনেছি। তারপর মেয়ের সাথে গল্প করতে বসি, এক সুদর্শন আর এক সুরেলা বাঙালি পুরুষের গল্প। দুই ভদ্রলোক আমাকে কদমতলা বাজার থেকে প্রায় বাড়ি অবধি তাড়া করেছেন। যেখানেই দাঁড়িয়েছে টোটো একই গান বেজে চলেছে, এমনকি পাড়ার ঠাকুরের সামনেও, "লুনা লু লু -"। একে যদি কাকতালীয় না বলি, কাকে বলব মশাই। 


শ্রীমতী মন দিয়ে শোনেন গান, সিনেমার গপ্প। শোনেন তাঁর দিদিমাও। জাদুকরের কথায় তাঁরও দুই চোখে নামে আবেশ। সুর কাটে কেবল বাবা। তুত্তুরী শেষে বলেই ফেলে, " দাদু এত হিংসে করো না।" রেগে আসর ছেড়ে চলেই যায় বাবা। আমরা তিন কন্যা তখনও মত্ত জাদুকরে। কথায় কথায় ওঠে পুঁথি বাবু আর টাক বাবুর কথা। শ্রীমতী ভ্রু কুঁচকে বলে, " টাক বাবু? ব্রো এতো হেয়ার-ইজম"। এবার ভেবলে যাই আমি, সেটা কি ইজম ভাই। তিনি হেসে গড়িয়ে পড়েন, " যার চুল নেই তাকে চুল নিয়ে খোঁটা দেওয়া। এরকম কিছু আছে কিনা জানি না, মনে হল তাই -।" হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোবো। কি জেনারেশন মাইরি। আর আমার গর্ভধারিনী কিনা কেবল আমার ওপর জুতো হস্ত -

Thursday, 14 August 2025

অনির ডাইরি আগষ্ট, ২০২৫

 

অনির ডাইরি ২০ শে আগস্ট, ২০২৫

#অনিরডাইরি 



গত শনিবার ছিল আমার প্রথম প্রেমের জন্মদিন। ইদানিং অবশ্যি প্রেমট্রেম আর কিছু অবশিষ্ট নেই ভদ্রলোকের প্রতি, তবে সখ্য রয়েই গেছে। ভদ্রলোক তালের বড়া খেতে বড় ভালোবাসেন। শাশুড়ি মাতার আয়া দিদি কথাও দিয়েছিলেন সাহায্য করবেন, কিন্তু সেদিন তাল কিনতে গিয়ে যেন আগুনের ছ্যাঁকা খেলাম। সকালে শ্রীমতী তুত্তুরীকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দিতে গিয়ে যে তাল ৬০/- দর করে এলাম। পয়সার ব্যাগ নিয়ে নেমে দেখি, তালের দাম ৮০/- হয়ে গেছে। ধুৎ, শাশুড়ি মাতা ঠিকই বলেন, এ শহরে 'কোন কিছুই সুবিধামত নয়'। 


সুবিধা মত তো নয়ই, সেদিন চেক বই হারালাম, আজ এটিএম কার্ডটা। আজকাল এটিএম তেমন লাগে কোথায়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো অনলাইন ট্রানজেকশন হয়। ব্যালেন্স ও ইউপিআই মারফৎই দেখে নিই। কাল রাতে বালেন্সটা দেখে কেমন যেন কম কম মনে হল। এত কিসে খরচ করলাম ঠাকুর? শৌভিক সদ্য আপিস থেকে ফিরেছে, আমার ভেবলে যাওয়া আর মাথা চুলকানি দেখে বলল, "ইন্টারনেট ব্যাংকিং থেকে স্টেটমেন্ট নামিয়ে দেখে নে না।" দেখতে গিয়ে দেখি, লগইন পাসওয়ার্ড খানা ভুলে বসে আছি। 


বার দুয়েক ভুল করার পর আর রিস্ক নিলাম না। এর আগেও অনেকবার ভুলেছি, আমি ভুলতেই থাকি। প্রত্যেকবার ফরগেট পাসওয়ার্ড করে, এটিএম কার্ড ডিটেইলস দিয়ে খুলি। এবারে দেখি হারিয়ে বসে আছি কার্ডটাই। গোটা ব্যাগ তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। দরজার পিছনে আর দুটো ব্যাগ ঝোলানো আছে, একটার চেন কাটা, আরেকটা ভিখিরির ঝোলার মত দেখতে হয়ে গেছে। তাও প্রাণে ধরে ফেলিনি, একে তো ব্র্যান্ডেড ব্যাগ, তায় আমার বরের দেওয়া উপহার। মাঝে মধ্যেই নিয়ে বেরোই, সেগুলোকেও উল্টো করে ঝাড়লাম। বাঘ ভাল্লুক বাদে সবকিছুই বেরোলো, প্রায় এক ডজন সেফটি পিন, স্ক্রাঞ্চি, ক্ল্যাচার, গোটা চারেক লিপস্টিক, দুটো পুঁচকে পারফিউম, এত চুইংগাম, পেন, গুচ্ছের কাগজ, টফি, রাখি, চকলেটের র‍্যাপার, ঝালমুড়ির ভাঁজ করা ঠোঙা, প্লাস্টিক (কিছুই রাস্তায় ফেলি না কিনা, ব্যাগে রাখি বাড়ি ফিরে আবর্জনার বালতিতে ফেলব বলে, তারপর যথারীতি ভুলে যাই)। বেরোল না শুধু কার্ডটা। 


শৌভিক হুলো বেড়ালের মত মুখ করে বলল, " ফরগেট পাসওয়ার্ড করে, প্রোফাইল পাসওয়ার্ড দিয়ে খোলার চেষ্টা কর।" তাই করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, সেটাও ভুলে বসে আছি। ধপ করে বসে পড়ল শৌভিক, "সেটাও ভুলে গেছিস?"


 হাতে পায়ে ধরলাম, হে ধরিত্রী দ্বিধা হও। কচু হল। আজ সকাল সকাল বেরোলাম ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। আপদ ব্যাংকটাও কি হেথায়? সেই ডালহৌসি। আট মাস LDC ছিলাম রাইটার্সে, কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ দপ্তরে, তৎকালীন সহকর্মী দিলীপ দা কান ধরে খুলিয়েছিল। আজও সেই ব্যাংকেই রয়ে গেছে একাউন্টটা। অনেকবার ভেবেছি বাড়ির কাছে ট্রান্সফার করে নেব, তারপর ঐ যা হয় আর কি। সেটাও ভুলে গেছি। 


বহুবছর আগের এক বর্ষণ মুখর দুপুরে একাউন্ট খুলতে যে পথে গিয়েছিলাম, আজও রাইটার্স বিল্ডিং এর পাঁচ নাকি ছয় নম্বর গেটের পাশ দিয়ে ঐ পথ ধরেই হাঁটি। রাইটার্সে কর্মজীবন শুরু করতে পেরেছিলাম বলে আজও গর্ব হয় আমার। কি ভালোই যে কেটেছিল ঐ আটটা মাস। তৈরি হয়েছিল অসম্ভব ভালো কিছু বন্ধু। হয়তো অসমবয়সী, তাও বন্ধু। কি গমগম করত তখন এলাকাটা। ভাবতে ভাবতেই ধপাস।


কেন যে মরতে আজকেই গোলাপী হিল তোলা জুতোটা পরে এলাম। এতটা হাঁটতে হবে, এটাও ভুলে গিয়েছিলাম। ভাগ্যে এই অঞ্চলটা আপাতত জনশূন্য। দূর থেকে লোকজন দেখলেও কেউ এগিয়ে এল না। প্রাথমিক ঝটকা কাটিয়ে নিজেই উঠে পড়লাম হড়বড় করে। ভাগ্যে মোটা জিন্সটা পরে এসেছিলাম, নইলে এই পাথুরে ফুটপাথে এমন পপাত চ মমার চ হলে আর হাঁটু বলে কিছু থাকত না। তাও যে ডান হাঁটুটা গেছে বেশ বুঝতে পারছি, জ্বালা করছে। তার থেকেও বেশি ব্যথা করছে বাম পায়ের গোড়ালি খানা। ওটাই আসল আপদ, ওটাই মচকেছে ব্যাটা।


 " এই ভাবে সবার সামনে আমায় ফেলে দিলে ঠাকুর", মনে মনে ওপরওয়ালার সঙ্গে বিস্তর ঝগড়া করতে করতে, ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে গোটা দুয়েক পা এগিয়েছি, পিছন থেকে সস্নেহে কে যেন বলল, " একটু বসে যান। একটু বসে যান। খুব লেগেছে তো -"। 


তাকিয়ে দেখি এক বয়স্ক মানুষ, শ্যামবর্ণ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, মাথা জোড়া টাকের ফাঁকফোকর গলে শরতের কাশ ফুলের মত ফুটেছে কিছু কাঁচাপাকা চুলের গোছা। একমাথা পরনে সস্তার মেরুন রঙের শার্ট আর ছিট কাপড়ের প্যান্ট। কাঁধে একটা কালো ক্যাম্বিসের অফিস ব্যাগ। সামনে একটা উঁচু মত জায়গায় একটা পাগল বসে উকুন বাছছিল, তার পাশেই একটু বসলাম। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রইলেন আমার সামনে। ওনার ঐ সামান্য উষ্ণতা, সামান্য সৌজন্য যেন মলমের মত কাজ দিল। মিনিট পাঁচেক পরেই উঠে পড়লাম, ওনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা দিলাম ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। 


ব্যাংকের ছেলেমেয়ে গুলোতো বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এমন স্যাম্পল ও হয়। ঘণ্টা খানেক বাদে একে একে সব উদ্ধার হল। বিরাপ্পনের মত গোঁফ আর দুই হাতে দুটো গাবদা কঙ্কালের আংটি পরা ছেলেটি তো বলেই ফেলল, " আর এত ভুলে যাবেন না কেমন? সাবধানে বাড়ি যান।" বাড়ির পথে রওনা হয়েই আগে প্রিয় বন্ধুদের বললাম, রাস্তায় কি হয়েছে। বেচারারা কাল রাত থেকে আমার জন্য উদ্বিগ্ন ছিল। এবার বরকে বলার পালা। উফ্ শুনে তার কি হাসি। " হিহি, হাহা, হোহো আমি খালি দৃশ্যটা visualise করার চেষ্টা করছি -"। 


প্রিয়জনের এ হেন ব্যবহারে আহত হয়ে আজ কিনেই ফেললাম তালটা। আজ তিরিশ টাকা নিল ছেলেটা। সঙ্গের নারকেলটা অবশ্যি ৫০/- চাইছিল। বিস্তর দরাদরি করে পাঁচ টাকা কমাল মাত্র। অবশেষে বানানো হল তালের বড়া। আমার ডান হাঁটু, বাম গোড়ালি এবং বাম কাঁধ যেহারে শত্রুতা শুরু করেছে, শাশুড়ি মাতার আয়া দিদি এসে ঝাঁপিয়ে না পড়লে আজ অন্তত হত না কিছুই। 

 আলমারি থেকে একটা নতুন বাটি বার করে, স্বহস্তে ধুয়ে মেজে যত্ন করে বড়া গুলো সাজিয়ে নিয়ে গেলাম তার কাছে। আমার প্রথম প্রেম, আপাতত তাঁর চিরন্তন প্রেমে আকন্ঠ নিমজ্জিত। লজ্জাও নেই ছোঁড়ার, পরের বউয়ের সাথেই প্রেম করে। যাক গে, সে ওদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বললাম দুজনেই খেও। আর খুব ভালো থেকো। বিলম্বিত হলেও শুভ জন্মদিন প্রথম প্রেম, তুমি তো অনন্ত প্রেমের আধার, দাও না তার কিছুটা ছড়িয়ে, এই প্রেমহীন ধরায়।


অনির ডাইরি ১৫ই আগস্ট, ২০২৫

#অনিরডাইরি 


খুব রেগে আছে দিদিটা। যখন থেকে এসেছে, ঘর ঝাঁট দিতে-দিতে, বাসন মাজতে-মাজতে উচ্চ স্বরে ফোনে কাউকে নালিশ করেই যাচ্ছে, "আমিও বলে এয়েছি, কাল থিকে আর আসব না। আল্লা যদি দয়া করেন, আমার কাজের অভাব হবে না-।" একই কথা একাধিক বার বলেই যাচ্ছে। 


এমনিতে বেশ হাসিখুশি দিদিটা। আমার তো ভালো লাগেই, শাশুড়ি মাতা এবং তাঁর নাতনীও দেখি বেশ পছন্দ করে দিদিকে। বিশ্বাস করুন, এই দুজনের একসাথে কাউকে পছন্দ হওয়া এবাড়িতে বিরাট বড় ব্যাপার। কোনটা যে বেশি খুঁতখুঁতে মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না বাপু। 


দিদির আজ যা মেজাজ, কি হয়েছে আর জিজ্ঞাসা করতে সাহস হয় না। চুপচাপ নিজের কাজ করতে থাকি, খানিক বাদে, তিনি নিজেই এসে দাঁড়ান ঘরের দরজার সামনে, " অ বৌদি, জানো তো আজ আমি রাগ করি একটা কাজ ছেড়ে এয়েছি-"। বলি, সে তো অন্তত পঁচিশ বার শুনলাম, কিন্তু কেন? 


চৌকাঠের পাশে ধপ করে বসেই পড়ে দিদিটা, " আমি উদিকে একটা ফেলাটে কাজ করি। যখন ঢুকিছিলাম, ঘরবাসন করব বলিই ঢুকিছিলাম। বুড়ো কাকু, তার ছেলে আর বউয়ের সংসার। বৌদি চাকরী করে সেই ধনীয়াখালী। কাকু আর দাদা থাকেন। কাকুর অনেক বয়স, ইদানিং কিছুই পারেন না। আমিই চান করিয়ে দিই। হাগিজ পরিয়ে দিই দুই বেলা। খাবার বেড়ে দিই -


ইদানিং দেখছি, হাগিজ পরি,পরি কাকুর এই কুঁচকির কাছটা হেজে যাচ্ছে। আমি ভালো করে পাউডার দিয়ে পরাই, তাও কমে না। রোজ বলি,  অ কাকু, দাদাকে বলি, একটা কিরিম, লোশন কিছু এনে দিক, কিছুতে বুড়োটা আমায় বলতে দিবে না। খালি বলে, " না, না। ওকে কিছু বলো না। খামোকা ব্যস্ত হয়ে পড়বে। গরম একটু কমলেই এটা কমে যাবে"।


 তুমি বল বৌদি, আমি কি করি। বাড়িতে কোন মেয়েছেলে থাকে না, একটা পুরুষ মানুষকে এসব বলতে তো আমারও সংকোচ হয় -। তো আজ, লজ্জার মাথা খেইয়ে আমি ঠিক করলাম, দাদাকে বলতেই হবে। বললাম, দাদা, কাকুর এই কুঁচকির কাছটা একটু কেল্টে কেল্টে গেছে, একটা ওষুধ কিনে আনবা তো। 


ব্যাস যেই বলিছি, বৌদি গো, কি তার তড়পানি। "কেন এতদিন আমায় বলো নি, বাড়াবাড়ি হলে কে ভুগবে তুমি না আমি?"তো আমি বললাম, বেশি বাড়াবাড়ি হবে না। গরম কালে আমাদেরও ওমন কেল্টে কেল্টে যায় -। তো আজ আর এবেলা হাগিজটা পরাব না। বিছানায় আমি অয়েল ক্লথ পেতে দিইছি। তো আমায় বলে কি না, "তোমায় বেতন দিয়ে কে রেখেছে? সামনের মাসে দেখি কে তোমায় বেতন দেয় -"। বলাতে আমার এমন রাগ হয়ে গেল, বললাম, লাগবে না তোমার বেতন। আমিও আর কাল থিকে আসব না।রাগ করে চলে আসছি যখন, বলছে, " যাও যাও, পয়সা দিলে কাজের লোকের অভাব হবে না"। 


এতদিন ওদের বাড়ি কাজ করছি, তুমি বলো। এই তো বৌদির টেরান্সফার হয়েছে ধনীয়াখালি থেকে আরো অনেক দূরে কোথায় যেন। দাদা যাবে বৌদির ভাড়া বাড়ি গুছিয়ে দিয়ে আসতে, বারো দিন আমায় রাতে বুড়োটার কাছে থাকতে বলেছিল। এখন কি হবে কে জানে?' বলতে বলতে খানিক অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আমি জানতে চাই, বৃদ্ধ ভদ্রলোক কি একেবারে শয্যাশায়ী? দিদি বলে, " না না, চলাফেরা করতে পারেন তো।" বলি তাহলে সবসময় হাগিজ পরিয়ে রাখে কেন?


 মায়ামাখা স্বরে বলে দিদিটা, " উনি প্রস্রাব ধরে রাখতে পারেন না গো বৌদি। আপনি আপনি চুঁইয়ে বেরিয়ে আসে -"। শুনতে শুনতে আমার প্রিয়তম বৃদ্ধের জন্য মনটা খারাপ হয়ে যায়। বয়স হলেই পুরুষদের যে একি জ্বালা। বৃদ্ধের কথায় যতটা নরম হয়েছিল গলার স্বর, তার ছেলের কথায় আবার চড়ে যায়, " এর আগেও যখন যখন বাইরে গেছে, আমিই তো থাকতাম কাকুর কাছে। উফ সে যে কি জ্বালা। রান্নার দিদি এসে দাদাকে ফোন করে, কি রাঁধব? দাদা ফোনে বলে এইটুকু চাল নাও। একটা আলু নাও ---। এইসব দিয়ে যা রান্না হয়, বুড়ো আর আমি, দুটো মানুষের একবেলাই খাওয়া হয় না, তো দুবেলা। আমরা গেরামের মানুষ বউদি, ভাতটা একটু বেশি খাই। সে প্রায় আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় আমারে -।"


 বলতে বলতে গলার স্বর আবার করুণ হয়ে ওঠে, " এই যে আমি রাগ দেখিয়ে চলে এলাম না বৌদি, বুড়োটার ওপর এর ঝাল ঝাড়বে তুমি দেখে নিও। এমনিতেও যে কি মার, মারে -"। বুড়োটাকে মারে? আঁতকে উঠি আমি। দিদিটা করুণ সুরে বলে, " হ্যাঁ গো বৌদি। মাঝে মাঝেই দেখি। আমি চান করাই তো, দেখি পিঠে, হাতের ওপর লাল লাল রক্ত জমে আছে। জিজ্ঞাসা করি, এগুলো কি হয়েছে কাকু? বুড়োটা ফিসফিস করে বলে, ' আমায় মেরেছে রে মা -"।


 বলতে বলতে উঠে পড়ে দিদিটা, " নাহ এতটা রাগ দেখানো বোধহয় ঠিক হয়নি বলো বৌদি -। বুড়োটার জন্য সত্যিই কষ্ট হচ্ছে। দেখি কাল মনমেজাজ কেমন থাকে, তারপর ভাবব -"। 


এটা ছিল গতকালের বার্তালাপ। আজ আসেনি দিদিটা,সাড়ে নটা নাগাদ কাঁধতে কাঁদতে ফোন করেছে, দেশ থেকে খবর এসেছে সক্কাল সক্কাল পতাকা তুলতে গিয়ে ওর দাদা তড়িদাহত হয়ে মারা গেছেন। আজ স্বাধীনতা দিবস কি না -


অনির ডাইরি ১১ই আগস্ট, ২০২৫

#অনিরডাইরি 



 কিছু ছবির বোধহয় কোন ক্যাপশন লাগে না। বাবা পঁচাশি, পিসি নব্বই। এমন অমৃত মুহূর্তের যে একটা ভালো করে ছবি তুলব, তার উপায় আছে নাকি? যা অগোছাল হয়ে আছে বাড়িটা। চাটুজ্জেরা জন্ম অগোছাল। এ বাড়ির যে কোন প্রান্তে গেলেই টের পাবেন। আমিই কম অগোছাল নাকি? পনেরো ষোল বছর ধরে জ্বলছে শৌভিক। 


একটা জিনিস খেয়াল করেছি, যাঁরা খুব গোছানো হন, তাদের মনের ভিতরটা ও গোছালো হয়। স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব সব কিছু গোছানো থাকে স্তরে স্তরে। পরিমিতি বোধ হয় মারাত্মক। এবাড়িতে অবশ্য ও সবের বালাই নেই। সব কিছুই অবারিত, অসীম। 


শুধু যে বাড়িটা অগোছাল তাই নয়, পিসি নিজেও যে শাড়িটা পরেছিল, বিশ্বাস করুন রাস্তায় ফেলে দিলেও কেউ কুড়িয়ে নেবে না। পিসি ওমনই। স্তরে স্তরে জমে থাকে পিসির শাড়ি, ম্যাচ করে ব্লাউজ। অঙ্গে তোলে না পিসি। আমাদের ছেলে এবং মেয়েবেলায় বাবা রঙ্গ করে বলত, পিসির দেরাজ খুঁজলে সব পাওয়া যাবে, ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে বাদশা আকবর পর্যন্ত যে যা দিয়েছে সব যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে পিসি।কেবল সম্রাট অশোকের দেওয়া জামাটা ছিঁড়ে গেছে, এই যা। 


পিসিকে কি বলব, আমার বাবা কিছু ফেলে নাকি? চাকরী পেয়ে এক বোতল সেন্ট কিনে দিয়েছিলাম, তার অর্ধেকটা আজও আছে। আমি অফিস যাবার সময় মাঝে মধ্যে লাগাই, যত বার স্প্রে করি কেঁপে ওঠে বাবা। মায়ের কিনে দেওয়া প্রথম শার্ট, ছোটমাসি চাকরি পেয়ে কিনে দেওয়া জামা ইত্যাদি প্রভৃতি সব রেখে দিয়েছে বাবা। এবং মাও। মাঝে মধ্যে আমি বিরক্ত হয়ে কিছু বাতিল করি।সুযোগ বুঝে বাতিল করা জামাকাপড়ের পুঁটলি ঘেঁটে বিবর্ণ শাড়ি গুলো পুনরায় নিয়ে চলে যায় পিসি। 


বলতে গেলেই বলে, " কেন ফেলে দিবি? কোথাও তো ছেঁড়েনি, ফাটেনি। আমরা অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি রে। এমনও বছর গেছে তোর বাবা কাকার একটা জামা হয়নি। আমার শাড়ি কেটে পাঞ্জাবি বানিয়ে দিয়েছি ওদের। আমি সেসব দিন ভুলতে পারি না রে -"। ৪৬ এর মন্বন্তরের গল্প শোনায় পিসি, " এক হাতা ফ্যান আর এক খাবলা নুনের জন্য আস্তাকুঁড়ের কুকুরের মত কামড়াকামড়ি করত মানুষ। নারী, পুরুষ,শিশু। সেসব দিন তোরা দেখিস নি।" 


নাহ্ সে সব দিন আমি/আমরা দেখিনি। 'মনে আছে বিশ্বাস', নরকের আগুনে ভালো মত ঝলসানো হচ্ছে উইনস্টন চার্চিল নামক শয়তানটাকে। নৈতিকতার, মনুষ্যত্বের যত অবনমনই ঘটুক না কেন, সেই দিন আর ফিরে আসবে না। ঈশ্বর করুন যেন নাই আসে, পেটে না খেলে, পিঠে সইবে কি করে মশাই। 


যাই হোক আপাতত ফিরে আসি, ভাইবোনের এই অমৃত উৎসবে। বার বার ফিরে আসুক দিনটা এই অশীতিপর ভাইবোনের জীবনে, বয়ে আনুক আরো আরো অবারিত, অগোছাল ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কি?


অনির ডাইরি ৩রাআগস্ট, ২০২৫

#অনিরডাইরি


 কোনদিনই খুব বেশী বন্ধুবান্ধব আমার ছিল না,আজও বন্ধু বলতে যাদের বদন মুদিত নয়নের সম্মুখে ভেসে ওঠে, তাদের সংখ্যা বেশ সীমিত। অন্তত জুকুদার ফেসবুক যে এগারোশ কত বন্ধু দেখাচ্ছে তার এক দশমাংশের থেকেও বেশ অনেকটাই কম। মোটামুটি সারাদিন যারা অনুপস্থিত থেকেও ঘিরে থাকে আমার দিনটাকে, তাদেরই বন্ধু বলে ধরি আর কি-। 


যাদের সকলকেই ব্যক্তিগত পর্যায়ে হাড়ে হাড়ে চিনি, কারো কপালে সহকর্মীর ছাপ্পা তো কারো গায়ে সহপাঠী বা ক্ষেত্রবিশেষে সহযাত্রীর উল্কি। ভালোমত চেনা পরিচয় না হলে আবার মৈত্রী হয় নাকি? 


মুস্কিল হল,এই চেনাবৃত্ত-চেনাছকের বাইরেও বেশ কিছু মানুষ ধূমকেতুর মত আচমকা প্রবেশ করেই বেরিয়েগেছেন আমার জীবনের কক্ষপথ থেকে, আর রেখে গেছেন একরাশ সৌহার্দ্যের সুখস্মৃতি। 


তা প্রায় বছর তেরো চোদ্দ হল, তুত্তুরী তখন সদ্য পূর্ণ করেছে এক বৎসর। শিশুকন্যার দোহাই দিয়ে মহানগর পোস্টিং পেয়েছি। চার্চ লেনের পাঁচ তলায় আপিস। বড়সাহেব মহঃ আমানুল হক। আপিস তো নয়, হাওদাখানা, দুবার ফোন চুরি হয়েছে খাস বড়সাহেবেরই, সবাই প্রায় বগলদাবা করে ঘোরে নিজের মুঠোফোন আর আলমারির চাবি। আর আমি এমনি ট্যালা, যে টেবিলে মোবাইল ফেলে ফাইল বগলে ঢুকেছিলাম বড় সাহেবের ঘরে। শুভাকাঙ্ক্ষী বড় সাহেবের পিতৃসুলভ ধমক খেয়ে ছুটতে ছুটতে নিজের চেম্বারে ঢুকে দেখি দিব্যি ফাইলের ওপর শুয়ে আড়ামোড়া ভাঙছেন তিনি। বেশী না মাত্র দুটো মিস কল এসেছে আমার অনুপস্থিতিতে।কোন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি দুবার ফোন করেছেন। 


সাধারণতঃ অচেনা নম্বরে ঘুরিয়ে ফোন করি না। কিন্তু কেন জানি না, সেদিন করলাম। ওপার থেকে এক প্রৌঢ় কণ্ঠ বলে উঠল, ‘হ্যালো অনিন্দিতা? আমি প্রসেনিজিৎ দা বলছি-’। তৎকালে প্রসেনজিৎ নামক দুজন ব্যক্তিকে কেবল চিনতাম, প্রথমতঃ দি প্রসেনজিৎ, সুপারস্টার। তিনি থোড়াই অধমের মত তুচ্ছ ব্যক্তিকে ফোন করবেন?


আর দ্বিতীয়জন সার্ভিসতুতো সিনিয়র দাদা শ্রী প্রসেনজিৎ কুণ্ডু ওরফে পিকে দা। তিনি মাঝেমধ্যেই ফোন করেন থুড়ি করতেন নানা কাজে। নম্বরটা অচেনা যদিও, সে তো হতেই পারে।ব্যস্ত কেজো সুরে জানতে চাইলাম, ‘ হ্যাঁ প্রসেনজিৎ দা বলো? তোমার ক্লেমের ফাইল স্যারের ঘরে। ’ ওপারের গলাটা কিঞ্চিৎ থতমত খেয়ে বলল, ‘আরেঃ আমি প্রসেনজিৎ দা বলছি ব্যাঙ্ক থেকে। ’ ও হরি। ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি আরেক প্রসেনজিৎকেও চিনি। তবে তাঁকে কোনদিন দাদা বলে ডাকা বা ভাবার ধৃষ্টতা দেখাইনি। 


প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সাথে ব্যাঙ্কেই আলাপ।কিছুদিন আগেই আমি গিয়েছিলাম অ্যাকাউন্টে ঠিকানা বদল করতে, যাঁর টেবিলে পাঠানো হয়েছিল, সেই সৌম্য দর্শন অতি গৌর বর্ণ প্রৌঢ়, আদতে ছিলেন অত্যন্ত সদাশয় তথা অমায়িক ব্যক্তি। পাশে বসিয়ে, চা খাইয়ে স্নেহশীল ভঙ্গিমায় অনেক খোশগল্প করেছিলেন। না বলতেই কে ওয়াই সি ঠিক করে দিয়েছিলেন, আর সব কি কি করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ আমার নম্বরটা নিয়ে যাও, কোন দরকার হলে ফোন করে দিও, কাজ হয়ে যাবে। কষ্ট করে আর আসতে হবে না। তবে যদি আসো, অবশ্যই এই বুড়োটার সাথে দেখা করে যেও।’


তাই করতামও। ফোন কখনও করিনি, তবে গেলে দেখা করতাম। বেশ কিছুদিন আর ব্যাঙ্কে যেতে হয়নি, তাই দেখাসাক্ষাৎও হয়নি। ভাবলাম তাই বোধহয় কুশল বিনিময় করতে ফোন করেছেন ভদ্রলোক। উৎফুল্ল স্বরে জানতে চাইলাম, ‘ও প্রসেনজিৎ বাবু আপনি? কেমন আছেন?’ ওপার থেকে ভেসে এল মৃদু ধমক, ‘কেমন আছি, পরে জানলেও চলবে। আগে বলো তোমার এটিএম কার্ডটা কোথায়?’ থতমত খেয়ে জানালাম, কার্ডটা যেখানে থাকার সেখানেই আছে, হাতব্যাগের ভিতর পয়সার থলের মধ্যে, ওণারই উপহার দেওয়া ব্যাঙ্কের নাম লেখা ‘ফ’ লেদারের পাউচের ভিতর। ওদিকের গলায় ফুটে উঠল, চাপা উত্তেজনা,‘ তাই নাকি? আমি ফোনটা ধরছি, তুমি খুঁজে দেখো তো। ’ 


হাতব্যাগ উপুড় করে টেবিলের ওপর ঢেলেও পেলাম না, এটিএম কার্ড। সবেধন নীলমণি একটিই অ্যাকাউন্ট,তার একমাত্র কার্ড। আমার সিন্দুকের চাবি। কি করি? রীতিমত আতঙ্কিত সুরে জানতে চাইলাম ফোন করে ব্লক করাব কি? করাতে হলেও বোধহয় কার্ড নম্বরটা লাগবে,যা আমার মুখস্থও নেই, কোথাও টোকাও নেই। 


ওদিক থেকে স্নেহময় বড়দার ধমক ভেসে এল, ‘কাল হাওড়া ময়দান থেকে টাকা তুলেছিলে?’ আলবাৎ তুলেছিলাম। বেশ মনে আছে টাকা তুললাম, টাকা গুণলাম,পয়সার থলে তে ঢোকালাম। থলেটা হাত ব্যাগে ঢোকালাম, তারপর মায়ের ভাষায় ধেইধেই করতে করতে বাড়ি গেলাম। উনি জানালেন, ওখানেই হয়েছে গড়বড়, টাকা গোণার সময়, ফ লেদারের পাউচে ভরা কার্ডটা রেখেছিলাম এটিএম কাউন্টারে। তারপর তাঁকে সেখানে রেখেই ধেইধেই- ।  


জনৈক ব্যক্তি পরে রাতে ঐ এটিএমে টাকা তুলতে গিয়ে কার্ড সমেত পাউচটা পান। উনি তৎক্ষণাৎ এটিএমের রক্ষীর কাছে সেটি জমা করতে উদ্যত হন, এই আশঙ্কায় যে,যার কার্ড সে হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছুটে আসবে। রক্ষী হাই তুলে দায়সারা ভাবে জানান,তিনি নিতে পারবেন না। হয় থানায় জমা করুন, নাহলে ওখানেই পড়ে থাকুক। যার কার্ড সে বুঝে নেবে। 


এত সহজে দায় ঝেড়ে ফেলতে পারেননি ভদ্রলোক, উনি তখন ফ লেদার পাউচটি ঘেঁটে দেখেন ভিতরে কোন ঠিকানা বা ফোন নম্বর আছে কি না। ছোট্ট চিরকৃটে প্রসেনজিৎ বাবুর স্বহস্তে লেখা ফোন নম্বরটি আমি ভাগ্যে ঐ পাউচটাতেই রেখেছিলাম, গতকাল রাত নটা নাগাদ ভদ্রলোক প্রসেনজিৎ বাবুকে ফোন করে সব জানান। কার্ডের নামটা শুনেই উনি চিনতে পারেন, কিন্তু আমার নম্বর না থাকায় আর ফোন করতে পারেননি। আজ আপিসে এসে, ডেটাবেস ঘেঁটে আমার নম্বর খুঁজে সকাল থেকে চেষ্টা করছেন যোগাযোগ করার। 


শুনে স্বস্তি পেলাম। সাথে সাথে ভদ্রলোকের নাম আর নম্বরটাও। প্রসেনজিৎ বাবু জানালেন, ভদ্রলোক কাল রাতেই ওণাকে জানিয়ে রেখেছেন আজ সারাদিন উনি কাজের জন্য হাওড়ার কোন প্রত্যন্ত গ্রামে থাকবেন, যেখানে টাওয়ার থাকবে না। ফলে রাত আটটা নটার আগে ওণাকে পাওয়া যাবে না। তখন ফোন করলে উনি জানাবেন কখন উনি কার্ডটা ফেরৎ দিতে পারবেন। 


সত্যিই ওণাকে পাওয়া গেল না রাত নটা অবধি। টেনশনে কত সহস্রবার যে ডায়াল করলাম ওণার নম্বর। রাত নটার পর বাজল ফোনের রিং, ওপাশ থেকে ভেসে এল এক ক্লান্ত পুরুষকণ্ঠ। পরিচয় দিতেই , চিনতে পারলেন। মার্জনা চাইলেন এতক্ষণ ফোনে না পাওয়ার জন্য। জানালেন পেশায় ছোটখাট কন্ট্রাক্টর। কাজের ধান্ধায় প্রায়ই এমন দূরদূরান্তে যেতে হয়। আগামী কালও যেতে হবে। যদি আমি সকাল সকাল একটু হাওড়া ময়দানের ঐ এটিএমে আসি, তো উনি কার্ডটা আমায় দিয়ে যেতে পারেন। 


কৃতজ্ঞতায় বুঝে আসছিল গলা। কে বলে আমরা কলি যুগে বাস করি? এখনও কত যে সৎ মানুষ ছড়িয়ে আছেন, এই সমাজে। তাই না এতকিছুর পরও জিতে যায় মানুষ। নিশ্বাস চেপে কোন মতে কাটল রাত, ভোর ভোর পৌঁছালাম এটিএমে। ফোন করতেই এক সৌম্য দর্শন বছর ত্রিশের ব্যক্তি এগিয়ে এলেন, নমস্কার বিনিময়ের পর আমার কার্ডটা আমার হাতে দিয়ে ওণার শান্তি হল। তাড়া ছিল ওণার, তবুও দুদণ্ড কথা বললেন আমার সাথে। ভুল বললাম, আমিই বলে গেলাম একতরফা। জানালাম অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা। জানালাম কি চাকরী করি আমি এবং শৌভিক, জানালাম এছাড়াও আছে বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব, যে কোন প্রয়োজনে উনি যেন নিঃসঙ্কোচে জানান আমাদের। এই উপকারের কোন প্রতিদান তো হয় না, তবুও চেষ্টা করব পাশে থাকার। উনিও কথা দিলেন, অবশ্যই জানাবেন। পরে বাড়ি ফিরে একই কথা জানিয়েছিলাম প্রসেনজিৎ বাবুকেও। মজার কথা হল না উনি কখনও কোন সাহায্য চেয়েছিলেন না প্রসেনজিৎ বাবু। দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে এরপরও বেশ কিছুদিন যোগাযোগ ছিল, প্রথমজনের সাথে আর কখনও যোগাযোগই হয়নি। 


নাই হোক দেখাসাক্ষাৎ, নাই থাকুক যোগাযোগ, ওই যে স্বর্গীয় চাণক্য বলে গেছেন না, বন্ধুত্বের প্রথম শর্তই হল বিপদে পাশে থাকা, এনারা যদি বন্ধু না হন, তাহলে আর বন্ধু কে? প্রতিটি বন্ধুদিবসে তাই একটি বার অন্তত স্মরণ করি এইসব মানুষকে, আর ইথার তরঙ্গে পাঠিয়ে দিই, একরাশ শুভকামনা। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। আপনাদের মত ভালো মানুষদের বড় দরকার এই পোড়া সমাজে।


অনির ডাইরি ২রা আগষ্ট, ২০২৫ 

#অনিরডাইরি 


ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারলাম, ঈশ্বর আমায় ত্যাগ করেছেন। নইলে কালরাতে অমন সকাতর অনুরোধের পরও এমন বৃষ্টি হয়! বর্ষা আমার বরাবরের প্রিয় ঋতু। বন্ধুবান্ধব এবং শুভানুধ্যায়ীরা নির্ঘাত ঠ্যাঙাবেন, তাও বলি, বৃষ্টি আমার আজও ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে। ভালো লাগে না কেবল জলজমা। ওটা এক্কেবারে যমের অরুচি - 


কপালের এমন গেরো যে আমার পিত্রালয় এবং শ্বশুরালয় উভয় এলাকাই ইদানিং কথায় কথায় জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। কলকাতার জমা জল তাও একরকম, সেদিনও ঐ জলে স্থানীয় বস্তির কয়েকটা বাচ্ছাকে স্নান করতে দেখেছি। কিন্তু হাওড়ার জমা জল এক্কেবারে বিভীষিকা। রাস্তার ধারেই খোলা নর্দমা। বৃষ্টি হলেই রাস্তার জমা জলের সাথে নর্দমার জল মিলেমিশে একাকার। তার ওপর আছে চড়া মূত্রের কুবাস। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হিসি করাটাই এখানে দস্তুর। সেই তরল ও মিশে যায় ঐ জলে। ঐ জল মাড়িয়ে বাড়ি ফিরে গতকাল মনে হচ্ছিল শুধু সাবান বা ডেটল নয়, মিউরিয়েটিক অ্যাসিড দিয়ে ধুই, দুই পা আর জুতো জোড়াকে। 


ঘুম ভাঙার প্রাথমিক বিরক্তিটা কেটে গেল বাইরের রোয়াকে এসে। রাতভর বৃষ্টি হয়েছে। ঘন সবুজ গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে মুক্তোর মত জলকণা। বাতাসে একটা অদ্ভুত মন ভালো করা ভিজে সুবাস। আমি আর লতা দি ছাড়া, এখনও কেউ ওঠেনি এবাড়িতে। এখনও খিল খোলা হয়নি, আমাদের শতাধিক বছরের পুরান সদর দরজাটার। কয়েকমাস আগেও কাক ডাকা ভোরে উঠে বাবা'ই খুলত ভারী লোহার খিলটা। ইদানিং লতাদিই খোলে।


দালান থেকে বেরিয়ে সাবেকি লাল রোয়াক, রোয়াক থেকে চার ধাপ সিঁড়ি নেমে একফালি এজমালি উঠোন। উঠোন পেরিয়ে ভারী বার্মাটিকের সদর দরজা। উঠোনময় ছড়িয়ে আছে কাঁচাপাকা পেয়ারা। রাতভর বৃষ্টিতে খসে পড়েছে গাছ থেকে। ফলের ভারে ঝুঁকে থাকে মায়ের সাধের গাছটা। দুর্ভাগ্যবশতঃ এক ঝাঁক টিয়া ছাড়া কেউ খাই না আমরা পেয়ারা। কাকার দোতলার বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় পেয়ারা, তাও খাই না কেউ। বলে বলে ক্লান্ত হয়ে গেছে মা - 


শুধু কি পেয়ারা! মায়ের হাতে লাগানো কাঁঠাল গাছ থেকে এখনও ঝুলছে অন্তত গোটা ছয়েক মস্ত পাকা কাঁঠাল। গোটা এগারো ধরেছিল এবার। সবই বিশাল বিশাল আয়তনের। কিন্তু পাড়বে কে? গেল বার, আমাদের হক বাবু আর বিমল ড্রাইভার মিলে পেড়ে দিয়েছিল সব কাঁঠাল। গোটা দুয়েক মাকে দিয়ে বাকি সব কাঁঠাল পূব মেদিনীপুরে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। এ বছর বিমল নেই, ঘটেছে উত্তমকুমারের প্রত্যাবর্তন। তাকেও কম জপাইনি হক বাবু আর আমি। কিন্তু উত্তমকুমারের একটাই কথা, " ম্যাডাম আমি গাছে চড়তে পারি। কিন্তু নামতে পারিনি -"। 


এ কেমন কথা হল বাপু? তুমি পূব মেদিনীপুরের ভূমিপূত্র। জমিজমা আছে, নিয়মিত চাষাবাদ করো, আছে পুকুর, গাছপালা আর এটা পারিস না? অগত্যা কাঁঠাল গুলো গাছেই পাকছে আর নিজেদের মর্জি মত ধুমধাম করে খসে পড়ছে। গোটা বাড়ি সুরভিত হয়ে উঠছে খসে পড়া পাকা কাঁঠালের গন্ধে। পাড়ার ঝাড়ুদারের দেশোয়ালী ভাইকে আলাদা করে ডেকে টাকা দিয়ে সাফ করাতে হচ্ছে সেই থ্যাঁতলানো কাঁঠালের ভূতি। হায় হায় করছে মা - 


গতকাল রাতেও একটা দামড়া কাঁঠাল পড়েছে ধপাস করে, সেটাই দেখছিলাম, পিছন থেকে ভেসে এল বাবার মোলায়েম কন্ঠস্বর, " কখন উঠেছিস? আমায় ডাকিসনি কেন?" পেশার টানে আপাতত পিত্রালয়ে থেকে আপিস করি আমি। হাওড়া থেকে তমলুক তাও সহনীয়। মাঝে মাঝে বাড়ি ফিরি, পরিযায়ী পাখির মত। রোজ সন্ধ্যায় ফোন করে আমার বর, তরল স্বরে শুধায়, " বেরাইছিস? কোথায় ফিরবি আজ রাতে -"। "বাড়ি" বললে বলে, বাড়ি তো দুটোই। হাওড়ার বাড়ি না কলকাতা। এটা শুনলেই দ্রব হয়ে যায় আমার হৃদয়। সত্যিই তো, এটাও তো আমারই বাড়ি। জীবনের প্রথম তিন দশক কাটিয়েছি যে বাড়িতে, কেন যে তার থেকে মাত্র এক দশক কাটানো বাড়িটা এত বেশি প্রিয় বুঝি না। বোঝার চেষ্টা করলেই মন আর মাথা জুড়ে নামে কুয়াশা। 


তাই ওসব নিয়ে আর ভাবি না। চাকরী মানেই তো চাকরগিরি। তবে এটা বেশ বুঝতে পারি, আমার এই টানাপোড়েনে আমার বাবা মা একটু হলেও খুশিই হয়। বাড়িতে পা রাখার সাথেসাথেই যেন ঝলমলিয়ে ওঠে সবকিছু। শুধু কি বাবা মা, দোতলা থেকে ধরে ধরে নেমে আসে নব্বই বছরের বুড়ি পিসি। " আহা রে, তোর কত কষ্ট" বলে হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। শুধু আমার জন্য অর্ডার দিয়ে ইলিশ মাছ কিনে আনে বাবা। কদমতলা বাজার থেকে লতা দি স্বয়ং গিয়ে কিনে আনে টোপা টোপা চিংড়ি, পুকুরের ডিম ভরা পার্শে, সাবিরের দোকানের খাসি। আসে দেশপ্রিয়র দরবেশ/ পান্তুয়া/ কালোজাম আর এলাচ দেওয়া লাল দই। 


সত্যিই যদি এত খাওয়ার সময় থাকত আমার। সকাল আটটায় এত খাওয়া যায় নাকি? মন হলে অফিস থেকে ফিরে চায়ের সাথে মাছ/ মাংস বা মিষ্টি এক আধটা খাই বটে। তাতেই গলে যায় বাবা। আজও গতকালের ইলিশ মাছের ঝালটা গরম করতে বসিয়েছিল লতা দি, শুরু করেছিল প্রেশারে ভাত বসানোর তোড়জোড়। নিষেধ করতে কালো হয়ে গেল বাবার মুখটা। "কিছুই খাবি না? তোর জন্যই ইলিশটা - ।" মা বলে, "কৌটোয় ভরে দাও তো লতা, তুত্তুরীর জন্য নিয়ে যাবে"। 


এই না হলে আমার মা। আজ সপ্তাহ শেষ, বর মেয়ের কাছে ফিরব বটে, কিন্তু ফিরতে বাজবে খুব কম করেও রাত আটটা। বারো ঘণ্টা ভালো থাকবে তো, মায়ের গতকালের রাঁধা ইলিশ। তুত্তুরীর জন্য এত চকলেট বেঁধে দেয় লতা দি। যাযাবরের ঝোলা, যাতে দু জোড়া পোশাক, ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন, লিপস্টিক, কাজল আর টিপের পাতা নিয়ে সপ্তাহের শুরুতে বাড়ি ছেড়েছিলাম আমি, আবার সেটাই কাঁধে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এই তো জীবন কালী দা। রাস্তায় নেমে পুনরায় অনুধাবন করলাম, নাহ সর্বশক্তিমান সত্যিই আমাকে ত্যাগ দিয়েছেন। গলির মুখ থেকে জল থৈথৈ। সামনের মেয়েটি ফুলপ্যান্টটাকে গুটিয়ে হাফপ্যান্ট করে নিয়ে স্মার্টলি জলে নেমে পড়ল। কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে, ধোপদুরস্ত ফুলহাতা শার্ট আর ঢলঢলে বিবর্ণ হাফ প্যান্ট করে গোটা দুই অফিস বাবুও নেমে পড়ল তার পিছন পিছন। এই ভাবে ফর্মাল শার্টের সাথে দোল খেলার পাতলা গেঞ্জির হাফ প্যান্ট যে আদৌ পরা যায় স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস হত না। নাহ্ ঈশ্বর কেবল একা আমাকেই ত্যাগ করেননি, আরও লোক আছে আমার দলে। "জয় মা" বলে নেমেই পড়লাম জলে। একটা শিরশিরে শিহরণ খেলে গেল পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত। সারাদিন এই জল মেখেই আজ কাটবে ঠাকুর - ।