অনির ডাইরি ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
পুজো এলেই কেন যে এত ভালো হয়ে যায় মনটা। হবার তো কথা নয়, একটু আগেই তো পুজো করতে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। বাবাকে ছাড়া প্রথম পুজো -। এই মুহূর্তে লিখতে লিখতেও ভরে উঠছে আঁখিদ্বয়। কিন্তু আমি যে শক্তপোক্ত সবলা নারী, যাকে ফিরিঙ্গি ভাষায় বলে, strong independent woman, শোক আঁকড়ে বসে থাকাটা আমার কাছে বিলাসিতা।
আমার বর কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছে, মাঝে মধ্যে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হলেও, আর ভাসবে না দখিনবঙ্গ। এ বছরের মত বিদায় নিয়েছে বর্ষা রাণী। তাই তো আকাশে বাতাসে শরতের এমন দাপাদাপি। কি যে ঝকঝকে আজকের আকাশটা, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়ির আলমারি খুলি। লাল কালো তাঁতের শাড়িটার বয়স অন্তত বছর ত্রিশ, হয়তো বা আরও বেশি। মায়ের শাড়ি। কিন্তু আর কোনদিন পরবে না মা। লালের ছোঁয়া আছে যে।
বাবাকে নিয়ে শেষ যেদিন ফিরেছিলাম এ বাড়িতে, মাকে দেখে চিনতে পারিনি। এত সিঁদুর পরেছে কেন মা? পরে বলেছিলাম শৌভিককে, আর কোনদিন পরতে পারবে না বলে বোধহয় মা পুরো সিঁদুর কৌটো উল্টে নিয়েছিল মাথায়। পরে শুনেছিলাম, অন্য সধবা মহিলারা পরিয়ে দিয়েছিল মাকে। সেটাই নাকি নিয়ম - । আলতাও নাকি পরাতে গিয়েছিল কেউ, বাঘের মত লাফিয়ে আটকায় আমার নব্বই উত্তীর্ণ বুড়ি পিসি। তখনও এসে পৌঁছাইনি আমরা।
বেশি ক্ষণ বসিনি সেদিন, বড়দা আর শৌভিক সমানে তাড়া দিচ্ছিল, যতক্ষণ থাকবে বাবা, ততো কাঁদবে মা আর পিসি। তারপর এদেরই না হাসপাতালে পাঠাতে হয়। সেদিনও শোক করার বিলাসিতা ছিল না আমার, চোখ মুছছি আর ভাবছি, কিসের পর কি করব। কারা কারা যেন এসে জড়িয়ে ধরছিল, কারা যেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সব বুঝতে পারছি কিন্তু কিছুই অনুভব করছি না যেন আমি।
চিরকালের মাথা গরম, আবেগে ভেসে যাওয়া আমি, বরফের মত ঠাণ্ডা মাথায় ফোন ধরছি, পথ নির্দেশ বলছি। তুত্তুরীকে নির্দেশ দিচ্ছি, "দিদিকে (পিসি) সামলা।" বাইরের ঘরের এক কোণে, নিঃসঙ্গ একটা চেয়ারে কপালে হাত দিয়ে বসে আছে পিসি। মৃদু কাঁপছে মাঝে মাঝে। সবাই মাকে সামলাচ্ছে, আমায় সান্ত্বনা দিচ্ছে, তুত্তুরীকে আদর করছে - আমার বুড়ি পিসিও যে সব হারালো, তার পাশে কেউ নেই।
আমি পিঠে হাত রাখতেই ডুকরে উঠল পিসি। কিন্তু আমার যে সময় নেই। আমায় যে যেতে হবে। ভোর পাঁচটায় খবর পেয়েই খুড়তুতো ভাইকে বলছিলাম, "আমি এসব পারব না রে -। তুই করে দিস।" দিদিভাই আটকাল, " বোন, আমিও করেছি। আমাদের বাবাদের আমরা একটা করে সন্তান। এটুকু তো ওদের প্রাপ্য।" বড়দাও যখন একই কথা বলল, আর ফেলতে পারলাম না। ভাই পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, শুধু বললাম, "তুই থাকিস কিন্তু। আমি একা পারব না রে। তুই আমায় ছুঁয়ে থাকিস -"। একহাত বাড়িয়ে তখনই আমায় জড়িয়ে ধরেছিল ভাই, ভালো করে ঘেঁটে দিয়েছিল উস্কোখুস্কো মাথার চুল।
এবার বেরোবার পালা, মা আকুলিবিকুলি করতে করতে বেরিয়ে এল, ৫২ বছরের বিবাহিত জীবন, দুই বছরের প্রেম। বিগত ৫৪ বছর ধরে বাবাই ছিল মায়ের অ্যাটলাস। আর মা, বাবার আকাশ। আজ অ্যাটলাস নেই, ভেঙে চুরে দুমড়ে যাচ্ছে আকাশ। " বাবাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিস -" কাঁদতে কাঁদতে বলল মা, রবারের কিটোর স্ট্র্যাপ আটকাতে আটকাতে, ফিরে তাকালাম আমি, বুকের তুফান, চোখের জলোচ্ছ্বাসের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে, জাঁদরেল আধিকারিকের গলায় বললাম, " তোমাকে যেমন দেখে যাচ্ছি, ফিরে এসে তোমায় যেন তেমন দেখতে পাই।"
পাশ থেকে খপ করে মায়ের হাতটা চেপে ধরল আমার মেয়ে, সে বড় কঠিন জিনিস, আমার থেকে অনেক বেশী সবল, আমার কথা মা না বুঝলেও সে বুঝেছে।
পরে অনেকে আমায় বলেছিল, " বাপরে তোর মেয়ে পুরো বাঘের মত আগলে রেখেছিল তোর মাকে। যখনই কেউ গয়না খুলতে বলেছে, ঝাঁপিয়ে পড়েছে তোর মেয়ে। সাদা শাড়ি বার করতে গিয়েছিল তোর মা, তুত্তুরী পুরো কাঁপিয়ে দিয়েছে বাড়ি। আমরা বলতে গেলাম, থাক না তুত্তুরী আজকের দিনটা, ঘুরিয়ে জবাব দিয়েছে, 'উঁহু, মা কি বলে গেছে, যেমন ভাবে মামমাম (দিদা)কে দেখে গেছে, ফিরে এসেও তেমনি ভাবেই দেখবে -'"। কেউ ঘষে, ঘষে সিঁদুর তুলতে পারেনি মায়ের, কেউ শাঁখা পলা ভাঙতে পারেনি মায়ের। আটকেছে আমার মেয়ে। যা করার মা নিজেই করেছে -
ফিরে এসে শোকাতুর মাকে দেখে দুঃখ তো পেয়েছি, কিন্তু বুক ফেটে যায়নি।বিবর্ণ হলেও রঙিন শাড়ি পরেছিল মা, শাঁখা পলা গুলো আলগোছে খুলে রাখলেও, চুড়িগুলো ছিল হাতে। গলায় ছিল ফিনফিনে হারটাও। ভেঙে পড়তে দিইনি বাবার আকাশকে আমরা।
অনির ডায়েরি, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডায়েরি
লোকটা যে আমি নিতান্তই ভুলভাল, সেটা অনেককাল আগেই বুঝেছিলাম। শুধু ভুলভালই নই, তালকানাও বটে। নইলে কেউ ওমন হাত পা নেড়ে জাঁদরেল দিদিমণির সমালোচনা করে। তখন আমি ক্লাস ফোর, তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের ছাত্রী। সাদা জামা, লাল বেল্ট বেঁধে ইস্কুলে যাই। আগের রাতে লাল ফিতে দিয়ে কলা বিনুনী করে দেয় মা, পরদিন ভোরে, বাবার হাত ধরে, লাফাতে লাফাতে আর গরুর কান নাড়ার মত করে বিনুনী দোলাতে দোলাতে ইস্কুল যাই আমি।
চতুর্থ শ্রেণীতে উঠে হঠাৎ কী শখ হল, জেদ ধরলাম নাক বেঁধাব! প্রাথমিক ভাবে বাবা এবং মা দুজনেই আটকানোর চেষ্টা করল। শেষমেশ আমার জেদের কাছে হার মেনে, বেঁধানো হল নাক। নাক বেঁধানোর পর কোন একদিন নাকে রিং পরিয়ে ইস্কুলে পাঠিয়েছিল মা, জনৈকা দিদিমণি, যাঁকে আমরা আবডালে শ্রীমতী ভয়ঙ্করী বলে সম্বোধন করতাম, সেদিনই আমাকে সর্বসমক্ষে ডেকে বসলেন, " এই যে নোলকবালা - "। সেই অপমান কি ভোলা যায় বলুন দিকি।
সামনাসামনি কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না বলে কি আড়ালে গাল দিব নি? তেমনি দিচ্ছিলুম আর কি। সেদিন আমাদের ক্লাস ছাড়া গরু, ঐ পিরিয়ডের দিদিমণি ( আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা বাংলা মিডিয়াম, আমরা ঐ নামেই সম্বোধন করতাম শিক্ষিকাদের) অনুপস্থিত ছিলেন। পাশের ক্লাস থেকে শ্রীমতী ভয়ংকরী এসে হিমশীতল কণ্ঠে বলে গেলেন, " চিংড়ি মাছের বাজার যেন না বসে -"।
প্রাথমিক ভাবে ফিসফিস করেই কথা বলছিলাম সকলে, তারপর যা হয়। পাশ্ববর্তিনীর কাছে অনুযোগ করছিলাম, " এই অমুক দিদি না একদম ভুলভাল লোক জানিস তো।" বিশ্বাস করুন, মাক্কালী আমি একা অনুযোগ করছিলাম না। ও নিজেও বাজে কথা বলছিল শ্রদ্ধেয়া দিদিমণির নামে। কিন্তু যেই আমি বললাম, অমনি তিনি ভিজে বেড়ালের মত বলেন কি, "ওরম বলে না অনি।" আমারও জেদ চেপে গেল, বুঝিয়েই ছাড়ব। একেবারে সুকুমার রায়ের ভাষায়, " না বুঝবি তো মগজে তোর গজাল মেরে গোঁজাবো" র টোনে বললাম, "বলে না মানে। আলবাৎ বলে। এক নম্বরের ভুলভাল লোক।"
আমার উত্তুঙ্গ জেদ দেখে সহপাঠিনী আড়ষ্ট হয়ে বললে, " ছি অনি, কারো সম্বন্ধে অমন বলতে নেই। বিশেষত তিনি যদি তোর পিছনেই দাঁড়িয়ে থাকেন -"। আর বলতে হল না, শিরদাঁড়া দিয়ে যেন বয়ে গেল হিম শীতল স্রোত, ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, সত্যিই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। পুরু ফ্রেমের চশমার ওপারে ধকধক করছে দুটি জ্বলন্ত চোখ। শীতল কণ্ঠে শুধালেন, " কে ভুলভাল লোক?" হে ঈশ্বর ইয়ের রং বদলে দিও না, বাড়ি গেলে মা পিটিয়ে ছাতু করে দেবে। কোনমতে শরীরের সব শক্তি গলায় এনে বললাম, " এই যে আমি।" গোটা ক্লাস চুপ, কি হয়, কি হয়। কিন্তু তিনি কিছু কইলেন না, নিজের ক্লাসে ফিরে যেতে যেতে শুধু বললেন, " তোমরা স্কুলে পড়তে আসো না মাছের বাজার বসাতে -"।
আজ বহুবছর বাদে সেই একই অনুভূতি হল, যখন শৌভিকের চোখের দিকে তাকালাম। দিন কয়েক আগে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয়েছি, এবার থেকে আমার বর যা বলবে, আমি তাই খাব। যেটা খেতে নিষেধ করবে, 'তাহা স্পর্শও করিব না।' তাছাড়া আর উপায়ই বা কি -। একই খাবার খাই দুজনে, একই কসরত করি, একজন একই রকম থেকে যায় বছরের পর বছর, আর আমার কথা আর বলেই কাজ নেই। শৌভিকের বক্তব্য হল, তার প্রধান এবং একমাত্র কারণ আমার মিষ্টি প্রিয়তা। বাড়িতে মিষ্টি আনা বহুদিন বন্ধ, অফিসে টুকটাক খেলেও (মানে কেউ যদি খাওয়ায় দয়া পরবশ হয়ে আর কি) বাড়িতে নৈব নৈব চ।
এহেন অ- মিষ্টি বাড়িতে কাল অনেক মিষ্টি নিয়ে এসেছেন শাশুড়ি মাতা। কি অপূর্ব সব দেখতে, খেতে কেমন কি জানি। আমি তো খাইনি। ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনম হলে, চোখে দেখে সিকি ভোজন তো হবেই - তাই দেখছিলাম মন দিয়ে। শৌভিক দয়াপরবশ হয়েই বোধহয় বলল, " আচ্ছা একটা খা -। মালপো নয়, আমসত্ত্ব রোল খেতে পারিস।" ভিক্ষার চাল কাঁড়া, আকাঁড়া। লাফিয়ে একটা গোদা দেখে রোল তুলে নিলাম। এক কামড়, দু কামড়, আবেশে বুজে এল চোখ। তারপরই মনে হল, ভিতরের মালটা কি? সন্দেশ নাকি ক্ষীরের কিছু, পাটে পাটে খুলেই ফেললাম রোলটা -। শৌভিকের প্রবল ধমকে আবার পাট করেও ফেললাম অবশ্য পরক্ষণে। তারপর বললাম, " কাল অফিসে টিফিনে চাঁদা তুলে বোঁদে মুড়ি খাওয়া হবে - খাব তো? মানে আমিই প্রস্তাবক কিনা। এখন না খেলে কেমন বাজে দেখতে লাগবে না? " তুই একটা অসহ্য হ্যাংলা" বলতে বলতে শৌভিক যখন উঠে গেল, পলকে মনে হল, সময়ের চাকা বুঝি পাক খেয়ে আমায় আবার চতুর্থ শ্রেণীতেই এনে ফেলল -। সেদিনও ভুলভাল ছিলাম, আজও-
অনির ডাইরি ২৩ শের সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সম্প্রতি উত্তম কুমারের দাদু মারা গেছেন (যাঁরা উত্তমকুমার কে চেনেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, উত্তম আমাদের অফিসিয়াল ড্রাইভার)। দাদুর বয়স কত হয়েছিল, দাদুর শ্রাদ্ধ উপলক্ষে ক ঘর কুটুম নিমন্ত্রিত হয়েছে, আমন্ত্রিতের সংখ্যা কেমন সাড়ে ছয়শ ছাড়িয়ে সাতশ এর দিকে এগোচ্ছে এই নিয়ে গল্প করতে করতে অফিস যাচ্ছিলাম উত্তম আর আমি। এমন সময় শ্রীমতী ভয়ংকরীর মেসেজ, " কবিতা মাসি তোমার মঙ্গলসূত্রটাকে একটা বক্সে ঢুকিয়ে দিল -"।
সস্তার ঝুটো মঙ্গলসূত্র, কাল বাড়ি ফিরে বেড সাইড টেবিলে খুলে রেখেছিলাম বটে। কোন বাক্স জিজ্ঞাসা করার আগেই মুঠো ফোনে ফুটে উঠল বাক্সটার ছবি।
মেয়ে নয় তো, লেডি ফেলুদা, মনে মনে ভাবি। ভাবতে না ভাবতেই মুঠো ফোনে ঝলসে ওঠে তাঁর বার্তা, " তোমাকে একবার ফোন করব -"। বাপরে, এতো অনুরোধ নয়, এ হল শমন। পড়ি কি মরি করে ফোন করি, মনে মনে প্রস্তুত হই, কবিতা মাসির নামে আরও সমালোচনা শোনার জন্য - ।
তিনি ফোন ধরে বলেন, " সরি মা, তোমাকে বিরক্ত করার জন্য। কিন্তু এই মাত্র এমন কিছু হল, তোমাকে না জানিয়ে পারলাম না।" কি হল, শুধাতে হয় না, তিনি নিজেই বলে ওঠেন, " নীচে মার্কেটে গিয়েছিলাম, মৌরি কিনতে। সেখানে একটা লোক আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। বুড়ো লোক। একদম দাদুর মত। উনি কিনলেন দু বোতল আসিড, এক বোতল পাঁউরুটি, আর আধ কিলো চাল -"।
মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলি, "এক বোতল পাঁউরুটি? ঘন্টু কোথাকার।" তিনি হেসে গড়িয়ে পড়েন। " সরি, এক পাউন্ড পাঁউরুটি। দোকানের লোকটাকে বললেন, দুটো ব্যাগে দাও। যাতে দুহাতে বইতে পারি। ঠিক দাদুর মত বলল মা -"। মেয়েটা আজও সব জায়গায়, আমার বাবাকে খোঁজে। রাখির দিন একটা রাখি কিনে মার্কেটের বুড়ো আইসক্রিমওয়ালা আঙ্কেলকে বেঁধে এসেছিল। বাড়ি ফিরে গল্প করেছিল, " আঙ্কেলকে বললাম, প্রতি বছর আমার দাদুকে রাখি পরাতাম। এ বছর তো দাদু নেই। আপনাকে পরালে আপনি কিছু মনে করবেন?"
আজ আবার কি করল এই বুড়োটাকে কে জানে! তিনি খুশি খুশি স্বরে বলে চলেন, " ভদ্রলোক দাদুর মতোই টুকটুক করে হাঁটছিলেন, যেই আমি পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেছি, উনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ' তোমার চুলটা খুব সুন্দর।'"
এই রে, এই জন্যই মেয়েটাকে বলি, সব বুড়ো মানুষ মাত্রই দাদু নয়। বয়স্ক মানুষদের মধ্যেও নানা বিকৃতি থাকে। কে জানে কার পাল্লায় পড়ল আমার ভোম্বল মার্কা মেয়েটা।
তিনি বলেই চলেন, " আমি তো তেমন সোশ্যাল নয়, তাই অপ্রস্তুত ভাবে হেসে বললাম, ' ইয়ে মানে থ্যাংক ইউ।' উনি বললেন, একদম আমার নাতনির মত। ওর বয়স দশ। তোমাকে দেখে ওর কথা খুব মনে পড়ছে - জানো দিন দুয়েক আগেও আমি ওর কাছে ছিলাম।' আমি একটু আগ্রহ দেখিয়ে বললাম, কোথায় থাকে আপনার নাতনী? উনি বললেন, আমেরিকায়। আমি ছয় মাস ওর কাছে ছিলাম। কিন্তু আর থাকতে দিল না। কি নাকি নিয়ম হয়েছে - ছয় মাসের বেশি থাকা যাবে না। খুব কষ্ট হচ্ছিল এবার ওকে ছেড়ে আসতে। আর যেতে পারব কি না কে জানে?' আমি বললাম, ' হ্যাঁ টিকিটের যা দাম, আর জার্নিও তো অনেকটা -'। উনি বললেন, 'পাক্কা আঠাশ ঘণ্টা। এই বয়সে আর ঐ ধকল নিতে পারি না।' অনেকটা রাস্তা গল্প করতে করতে এলাম দুজনে। খুব ভালো লাগল মা।"
ফোনটা রেখে চুপ করে বসে থাকি, চলমান বাহনের জানলার বাইরে সরে সরে যায়, বদলে বদলে যায় দৃশ্যপট। আমার মেয়েটা যে সব বুড়ো মানুষের মধ্যে তার দাদুকে খোঁজে, সে আমি জানি। হয়তো সেই বৃদ্ধ ও মানুষটাও আমার মেয়ের মধ্যে তার নাতনিটাকে খুঁজে পেয়েছিলেন। অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য, মলম তো লাগল উভয়ের ক্ষতে, " ঝুঠাই সহি"।
অনির ডাইরি ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
ভোররাত থেকে বলছিল শৌভিক, " তোকে আজ আর যেতে হবে না।" গতরাতে নাকি আকাশ ভেঙে পড়েছিল আমাদের মহল্লায়, যেমন মুষলধারে বৃষ্টি, তেমন বজ্রপাত। মুহুর্মুহু বাজ পড়ার শব্দে ঘুমোতে পারেনি শৌভিক, আমি অবশ্য কিছুই টের পাইনি।
তবে সকাল বেলা যখন পর্যায়ক্রমে ডুব মারল বাসন মাজার দিদি আর ফেল হল আমাজনের ডেলিভারি, বাইরে যে বিকট জল জমেছে, বুঝতে অসুবিধা হল না।
শৌভিক আবার বলল, " যাস না।" সাধ করে চেয়ে নেওয়া কলকাতা ট্রেনিং, আমার মত যাঁরা মহানগর বা তার আশেপাশের বাসিন্দা আর কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, এমন একেকটা ট্রেনিংয়ের মাহাত্ম্য তাঁরাই বুঝবেন।
তাই বলে এত জল! ভাগ্যে শাড়ি পরিনি, তুত্তুরী যে কেন হাফপ্যান্ট পরতে বলছিল বেশ বোঝা যায়। জলে ডোবা ফুটপাথ ধরে হেঁটে গিয়ে উঁচু বাসস্ট্যান্ড। উঠে হাঁটু অবধি প্যান্ট গোটালাম দুই জন। বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে শৌভিকের আপিসের গাড়ি। জল উত্তরোত্তর বাড়ছে। পাশ দিয়ে জল ছিটিয়ে যেতে গিয়ে খারাপ হয়ে গেল একটা ভলভো বাস, তার ঢেউয়ে ভিজে গেল হাঁটুর ওপরে গুটিয়ে রাখা প্যান্ট ও।
ফুটপাথ শেষ হবার আগে রিক্সা ধরার চেষ্টা করল শৌভিক, কেউ যেতে রাজি নয়। ফুটপাথ থেকে নামতেই জল উঠে এল গোড়ালি আর হাঁটুর মাঝামাঝি। শৌভিক ঘুরে বলল, " ফিরে যা, ভালো কথা বলছি।" বললাম, চল দুজনেই ফিরে যাই, তাতে তিনি নারাজ। আমার বর আপিস না গেলে কি এই বিশ্ব সংসার চলবে মশাই, ধড়াম করে থেমে যাবে না সবকিছু। কপাল গুণে ঠিক এই সময়েই পেয়ে গেলাম একটা রিক্সা। সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে দাবী করল আশি টাকা।
আমার বর ইতিমধ্যে জল ঠেলে এগিয়ে গেছে বেশ খানিকটা। জল আপাতত ওর হাঁটু অবধি, দর করার আমার কোন অবকাশ নেই।
কিছুটা যেতেই খারাপ হয়ে গেল রিক্সার ব্যাটারি। রিক্সাটাও এমন গর্তে আটকে পড়ল যে সেই শৌভিকেই নেমে ঠেলতে হল। আমায় কেউ নামতে বলেনি, আমি নামিও নি। নির্ঘাত কোমর জল হবে।
গাড়িতে উঠে বাকি পথটা বরের মুণ্ডুপাত করতে করতেই গেলাম। কে বলেছে এমন দিনে অফিস যেতেই হবে? না গেলে কি হবে? তোকে কে কর্মচারী রত্ন পুরস্কার দিয়েছে আমায় দেখা ইত্যাদি প্রভৃতি।
পারিপার্শ্বিক অব্যবস্থা, বরের গোঁয়ার্তুমি আর ভেজা পোশাকের অস্বাচ্ছন্দ্য দূর হয়ে গেল ট্রেনারকে দেখে। " তুমি পড়াবে বি দি!" শ্রীমতী বিদিশা ভট্টাচার্য, নার্ভাস ভাবে হেসে নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে তোলে খানিক। মাথার চুলে আঙুল চালায়। হাসি চেপে ছাত্রী সুলভ গম্ভীর হই আমি, খুব ভালো করেই জানি, এইসব পড়ানো/ ট্রেনিং দেওয়া এই ভদ্রমহিলার দুই চক্ষের বিষ। ভরা মিটিংয়ের এক কোণায় লুকিয়ে, মুঠো ফোনে বই পড়েন ভদ্রমহিলা। জনসমক্ষে ধারা বিবরণী দিতে যে কালঘাম ছুটছে বেশ বুঝি।
কিন্তু ঐ আর কি, আমরা সবাই হুকুমের চাকর। অচীরেই এই রাজ্যে লাঘু হতে চলেছে নতুন শ্রম আইন। OSH কোড (অকুপেশনাল সেফটি এন্ড হ্যাজার্ডস কোড), সেই নিয়েই আজকের সেশন। ১৩ টা পুরাতন আইনকে একত্রিত করে তৈরি এই আইন নিয়ে বিশদে পড়া এবং শোনা হয়।
সেশন শেষে ফিসফিস করে বলি, " সিসিডি যাবে?" ক্লাসের মধ্যেই বসে খুঁজছিলাম আসেপাশে কোথায় ভালো কফিশপ আছে। বি দি একগাল হেসে বলে, " হ্যাঁ চল। কতদিন কোথাও বসি না।"
বেরোবার আগে স্টেট লেবার ইনস্টিটিউটের একেবারে ঘরোয়া এবং আন্তরিক লাঞ্চে বসতেই হয়। বড় যত্ন করে খাওয়ায় এরা। ভাত - সব্জি দিয়ে ঘন মুগের ডাল- ঝুরি আলুভাজা - দই দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি আলু পটলের তরকারি - দই কাতলার পেটি - খেজুর আমসত্ত্ব দিয়ে টমেটোর চাটনি - পাঁপড় - বাটারস্কচ সন্দেশ হয়ে মুখ শুদ্ধি অবধি সবকটাই ১০/১০। খুব সামান্য খাই আমরা। কফি খেতে হবে যে।
এবার গুটিগুটি বেরিয়ে যাওয়ার পালা। নামতে যাব দেখি দুই ইনস্পেক্টর সহ গুটিগুটি উঠে আসছে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জয়িতা। মাইরি এই ভাবে কেউ রাউন্ড মেরে ভয় দেখায়? বি দি দায়িত্ব নিয়ে, মিষ্টি করে হেসে বলে, " একটু কফি খেয়ে আসি, অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা -"।
অনির ডাইরি ১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
মা যখন বলল, " এই তুই টাকা তুলে আনতে ভুলে গেছিস -,"ঘড়িতে তখন রাত নটা। জানলার কাঁচে জমছে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মিহি জলকণা। কিসের টাকা, প্রশ্ন করতে গিয়ে মনে হল, কপালে করাঘাত করি। আজ মাস পয়লা, মায়ের মাসের খরচের টাকা তুলে দেওয়ার কথা ছিল আমার। ভেবেও ছিলাম, অফিসে এক ফাঁকে তুলে নেব। পাঁচ রকম ঝামেলা যার উৎস এবং বিধেয় দুইই আমি, ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে মাথাটা। তারওপর আবহাওয়াটাও কেমন যেন ভয় দেখানে মার্কা।
জিভ কেটে বলি, পরের দিন যখন আসব, তুলে আনলে হবে না? মা মাথা নাড়ে, হ্যাঁ-না কিছু বুঝি না। সংকুচিত কণ্ঠে বলে, "আজ সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে সব পয়সা ফুরিয়ে গেছে।" মা অমন বলে, আমার মা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, নির্ঘাত ব্যাগ হাতড়ালে কিছু বেরোবে। " দেখো না। দেখো না" বলে উৎসাহিত করি আমি।বেরোয় বটে, গুটি কয়েক একশ, পঞ্চাশ, কুড়ি টাকার নোট। মা বলে, "এতেই হয়ে যাবে।" দেওয়াল থেকে হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে বাবা।
বুড়ো জীবিত থাকাকালীন, কোনদিন এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি মাকে। মা তো কিছুই জানত না, কোথায় আধার কার্ড থাকে আর কোথায় ব্যাঙ্কের বই। মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্সের ফাইল কোনটা, জমির কাগজ কোথায় থাকে। কিছু কিছু জাস্ট মজার ছলেই দেখিয়ে রেখেছিল বাবা আমায়। ভাগ্যে রেখেছিল -
বাবার মত রাখতে পারিনি মাকে আমি, প্রতিদিন চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই। আজই দেখো না। জানলার বাইরে বাড়ল বুঝি বৃষ্টির দাপট, ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে নয়। দেওয়াল থেকে ঝুলন্ত বাবা বুঝি অন্য কিছু কয়। সারাদিন অফিস করা তেল প্যাটপ্যাটে মুখচোখ, উস্কোখুস্কো চুলেই, গলিয়ে নিই বাইরের পোশাক। মা আটকাবার শতেক চেষ্টা করে। খুঁজে বার করে একটা ছোট্ট টিফিন কৌটো, যার মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা জমানো আছে বাবার, অধিকাংশই কুড়ি টাকার নোট, কিছু কয়েন। মা বলে," এতেই হয়ে যাবে আমার। কি আর এমন লাগে -"। টনটন করে আমার চোখ আর গলা, এই বুঝি উপচে যায় নয়ন জলাধার।
পাড়ার রাস্তাঘাট এর মধ্যেই শুনশান। বৃষ্টিটা না পড়লেও, জমে আছে জল। সাবধানে হাঁটি আমি, কাল এই পোশাকেই অফিস যাব যে। মিটিং আছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত উৎসুক মুখগুলোকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর মুখে হেঁটে যাই মোড়ের মাথা। আমাদের ব্যস্ততম রাজপথ এখন জনশূন্য না হলেও বেশ ফাঁকা। একটা টোটো এসে দাঁড়ায় সামনে, একটি মেয়ে নামে। টোটোয়ালার গন্তব্য অনেক দূর, তবে সামান্য ঘুরে আমায় বাজারে নামিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। সহযাত্রী বাকি তিনজনের দুই জন মহিলা। নির্দ্বিধায় উঠে পড়ি।
ভেজা রাজপথ দিয়ে যেন উড়ে যায় টোটোটা। বাজারের পথ ধরতেই মৃদু প্রতিবাদ করেন একজন সহযাত্রী, " আবার বাজারের রাস্তা নিলে কেন -"। এটিএম এর সামনে নেমে, অভ্যাসবশত দ্রুত গতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাই আমি। পেরোবার পর খেয়াল হয়, রাস্তা এখন একদম ফাঁকা। ATM এর ভিতরে বিশাল লাইন। সর্বনাশ, এত রাতেও! আজ এগারোটা বাজবে নির্ঘাত। সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করি, " ভাই এটা টাকা তোলার লাইন তো?' ছেলেটি জবাব দেয় জমা করার। এতজন মানুষ, এত রাতে টাকা জমা করতে এসেছেন! ভিড়ে জনা দুই মহিলাও আছেন দেখি। বুঝতে পারি, স্থানীয় ব্যবসায়ী। ঝাঁপ ফেলার পর, সারা দিনের উপার্জন জমা করতে এসেছেন -
একটি অল্পবয়সী ছেলে সহৃদয় ভাবে বলে, " ঐ মেশিনটা ফাঁকাই থাকবে, আপনি তুলে নিন।" কেউ প্রতিবাদ করে না। লাইন ভেঙে টাকা তুলি আমি। বেরিয়ে আসার সময় একটু ভয়ভয় লাগে, কেউ কেড়ে নেবে না তো। একটা টোটো যেন আমার প্রতীক্ষাতেই বসে ছিল কোথাও। ঝিমোতে ঝিমোতে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। বাড়ির গলির সামনে এসে যখন নামলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত দশটার ঘর ছুঁই ছুঁই। কত বার, পড়ে ফিরেছি এই সময়। গলির উল্টো দিকে রিক্সাওয়ালাদের শিব মন্দিরের চাতালে বসে থাকত বাবা। একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম দুজনে। হেরে যাবার গল্প বলতাম আমি, জিতে যাবার গল্প শোনাত বাবা। আজ জিতে গেছি, শুধু হারিয়ে গেছে বাবাটাই।
কাল্পনিক বাপের সাথে গল্প করতে করতে পথ হাঁটি, যেখানেই থাকো, শুধু এইটুকু আশীর্বাদ করো, তোমার বউটাকে যেন ভালো রাখতে পারি। বাকি হারজিতে আর আমার কিস্যু যায় আসে না বাবা।















