অনির ডাইরি ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬
#অনিরডাইরি
কবির ভাষায়, "যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে" , সেদিন প্রভাতেই মেসেজ করলেন দীপালি দি, " Mem sabai niye aste hobe"। ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা চোদ্দ। অধীর অপেক্ষায় বসে আছি আমরা তিনজনে, হাসপাতাল থেকে কয়েক মিনিট আগেই ফোনটা এসেছে, " কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। আমরা শেষ চেষ্টা করছি -।" ওনারাও জানেন, আমরাও জানি সব লড়াই শেষ। দীপালি দি তো জানেন না, উনি কাক না ডাকা ভোরে উঠে সুখবর দিচ্ছেন ওনাদের ম্যাডামকে। জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিয়ে বলে কথা। লিখছেন, " বাড়ির সবাইকে আনতে হবে ম্যাডাম।" লিখছেন, " আমি অফিস যাব মেম নেমন্তন্ন করতে -"। দীপালি দি আমাদের কোলাঘাট ব্লকের দেরিয়াচক পঞ্চায়েতের SLO। তাঁর জীবনের এই পরম সুখের মুহূর্তটাকে আমার দুঃখ দিয়ে মলিন করতে ইচ্ছে হল না। তাই নীরব রইলাম।
দাহকার্য সেরে প্রথম যেদিন অফিস গেলাম, হক বাবু এসে বললেন, " ম্যাডাম দীপালি খুব কাঁদছে -"। অবাক হয়ে শুধালাম, কেন? কান্নাটা অবশ্য দীপালি দির সাথে সমার্থক। আমি বকলে কাঁদেন, না বকলে কাঁদেন, ভালোবাসলে কাঁদেন, আদর করলে কাঁদেন। আজ কি করলাম রে বাবা! হক বাবু বললেন, " ঐ যে আপনার বাবা মারা গেছেন যেদিন, সেদিন ও আপনাকে ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন করেছে তাই -"। কি আশ্চর্য! আমার বাবার ব্যাপারটা তো ন্যাশনাল নিউজ ছিল না, দীপালি দি জানবেন কি করে! যদিও কোলাঘাটের কৌশিকের সৌজন্যে বেলা দশটার মধ্যেই খবর হয়ে গিয়েছিল SLO গ্রুপে, সে ব্যাটা কি করে জেনেছিল ভগবান জানে। তবে হাসপাতালে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সমবেদনা, সহমর্মিতায় ভেসে গিয়েছিলাম আমি।
হক বাবু আবার বললেন, " ম্যাডাম অভয় দিলে ও একবার আসতে চাইছে -"। তখনও অশৌচ গা, শুভকাজে আমার অশুভ ছায়া যাতে না পড়ে, বললাম কদিন পরে আসতে বলুন। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম সেরে যেদিন অফিস গেলাম, সত্যিই এসে হাজির হলেন দীপালি দি। পরনে সস্তার সিন্থেটিক শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, চোখে চশমা। বেশ করে হাত কচলে, কাঁদ কাঁদ সুরে বলতে গেলেন, " ম্যাডাম আমার খুব ভুল হয়ে গিয়েছিল -"। মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এসে কাঁদলে কিন্তু সত্যিই মারব।
মারধরের ভয় এদের প্রায়ই দেখাই, কেউ ভয় পায় না, সেটা আমার দুর্ভাগ্য। দীপালি দি যেমন, ভেউ ভেউ করে কাঁদলেন না বটে, ফোঁপালেন বিস্তর। বললেন, " আপনি তো জানেন ম্যাডাম, আমার বরের অবস্থা -"। সত্যিই আমি জানি, যে ওনার স্বামী পক্ষাঘাত গ্রস্ত। জানি যে দীপালি দি এবং ওনার ছেলেরা প্রাণপাত করে সেবা করেছেন ভদ্রলোকের।
জানতে চাই, এখন কেমন আছেন? দীপালি দি বলেন, " আগের থেকে অনেক ভালো ম্যাডাম। লাঠি নিয়ে কিছুটা হাঁটতে পারছে। কিন্তু -" চোখ মোছেন দীপালি দি। আবার শুরু হয় গল্প, " বাবুকে বললাম, দেখ বাবা, তোর বাবার এই হাল, এখন নমঃ নমঃ করে বিয়েটা করে নে, পরে বড় করে লোক খাইয়ে দেব। তো বাবু বলল,' মা বিয়ে তো মানুষের একবারই হয়।ভরসা রাখো, বাবাকে আমরা ঠিক সামলে নেব' -"। এই অবধি বলেই খেয়াল হয়, " এই যে ম্যাডাম আমার হবু বৌমার ছবি -"। ছবি তো আগেই দেখিয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা, তাও দেখি মিষ্টি মেয়েটার ছবি।
নির্বাচনী দামামায় অফিস যদিও ফাঁকা, তাও যে কজন আছে তাদেরই ডেকে পাঠাই। সবাইকে নিমন্ত্রণ করে যান দীপালি দি, আশ্বস্ত করে যান, " পূজারিকে(রাঁধুনি) বলা আছে মেম, সাড়ে ছটার মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দেব।" সেই মত নির্দিষ্ট দিনে আমরা পৌঁছে তো গেলাম ছটার মধ্যে, গিয়ে দেখি মণ্ডপ শুনশান। দেবারতিকে আমিই জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম, বেচারা এখনও কাউকেই চেনে না। তাতে কি, দুজনে মিলে প্রথমেই গিয়ে হাজির হলাম ফুচকাওয়ালার কাছে। সে সবে টেবিলে মালপত্র নামাচ্ছে। ইশারায় বললে দেরী হবে। লোকজন তেমন নেই, আমরা নিজের বাড়ি মনে করে ঘুরি ফিরি, দেদার সেলফি তুলি। অন্যান্য টেবিল গুলোর পাশ দিয়ে ঘুরে আসি, অনেক রকম স্টার্টার এর আয়োজন আছে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি রেডি হয়নি কিছুই।
হক বাবু ফোন করেন, " এই দীপালি। কোথায় তুই, ম্যাডাম এসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যে -"। ফোনেই একচোট কেঁদে নেন দীপালি দি। বিয়ের দিন ছেলের মা থোড়াই হুট করে আসতে পারে। আজ্ঞে হ্যাঁ, বিয়ে বৌভাত একই সাথে হচ্ছে আজ। ফুলে ঢাকা গাড়ি চড়ে কনে এসে নামলে তবে সেই গাড়ি যাবে বর আনতে। তবে না আসবে বরের মা। মায়ের নির্দেশে দীপালি দির ছোট ছেলে দৌড়ে আসে সব কাজ ফেলে, আমাদের পিছু পিছু ঘোরে। জমিয়ে ফুচকা খাই আমরা, রঞ্জিত আর আমার কটকটে ঝাল, বাকিদের আঝালা। আসে চিকেন পকোড়া। যেমন নরম তেমন সুস্বাদু। উত্তম খেয়েই বলে," এটা তো দিশি মুরগি -"। কিন্তু হক বাবু মোটে খাবেন না, " হালাল না জানলে খাব নি।" হক বাবু না খেলে আমাদের ভালো লাগে কি -।
হ্যাংলার মত বিস্তর তাগাদা দিয়ে যখন খেতে বসলাম ঘড়ির কাঁটা ছাড়িয়ে গেছে সাতটার ঘর। আমরাই প্রথম ব্যাচ, আমরা ছাড়া গোটা মণ্ডপে আর কেউ নেই। শাল পাতার থালায়, প্রথমে পড়ে শসা পেঁয়াজের স্যালাড, সাথে আলু ভাজা। গরম ভাত, ফুলকপি মটর শুঁটি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা ঘন মুগের ডাল, মিক্সড ভেজ নামক তরকারি যাতে ছানা থেকে শুরু করে পটল ভাজা, ফুলকপি মায় এঁচোড় পর্যন্ত খুঁজে পেলাম আমি। সাথে দই কাতলা, দিশী মুরগির ঝোল, চাটনি, পাঁপড়, সন্দেশ, কড়া থেকে নামানো গরম পরমান্ন। শেষ পাতে আমুলের আইসক্রিম। এমন নিছক বাঙালি মেন্যু বহুদিন বলা যেতে পারে বহুযুগ পর খেলাম।
ভুরিভোজ অন্তে বিদায় নেবার পালা। তখনও এসে পৌঁছায়নি দীপালি দি। আসেনি বর ও। উপহারটা তুলে দেওয়া হবে কার হাতে! দীপালি দির কনিষ্ঠ পুত্র বললে, "বৌদির হাতেই দিয়ে যান আজ্ঞে।" নববধূ তখন দরজা বন্ধ করে সবে সাজতে বসেছে। জ্বলছে রিং লাইট, MUA মেয়েটি লাইভ করতে করতে সাজাচ্ছে। কনের মুখে পাউডারের পুরু প্রলেপ, একেই বেকিং বলে বুঝি। উভয়ের কাছেই ক্ষমা চেয়ে নিলাম আমরা, প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলাম নববধূকে। খুব ভালো থেকো। সুখে থেকো। স্টল থেকে দুটো পান মুখে পুরে মহানগরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি দীপালি দির ফোন, "মেডাম, আপনাকে তো আপ্যায়নই করতে পেলাম না -" সাথে ফ্যঞ্চ ফ্যাঁচ, মাইরি ছেলের বিয়ের দিন কোন মা কাঁদে, নাহ্ এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আর পারা গেল না। বলেছিলাম না, কান্নাটা দীপালি দির সাথে সমার্থক -
অনির ডাইরি ১৩ই এপ্রিল, ২০২৬
#অনিরডাইরি
" হ্যালো, কি করছ -", রোজ ফোন করে এই একই কথা বলি, সারা দিনে যতবার ফোন করি, প্রতিবার এই একই কথা বলি। মাও একই রকম ভাবে জবাব দেয়, নির্লিপ্ত, আধা ঘুমন্ত ভাবে, " এই বসে আছি -"। শুধাই, চা খেয়েছ? ওষুধ? ইনহেলার? কেউ ফোন করেছিল? কেউ এসেছিল ইত্যাদি অকাজের কথা। না বললেও হয়, তাও বলি। মুঠো ফোনের এপার থেকে বোঝাই, আমি আছি।
মা ক্লান্ত সুরে বলে, " আজ নীল -"। বলি জানি তো, করেছি তো। কিঞ্চিৎ কৌতূহলী হয়ে মা শুধায়, কি খাবি? বলি, সাবু। কাল মধ্য রাতে অনুযোগ করেছিলাম বরের কাছে, একটু সাবু এনে দিলি না তো, আগামী কাল নীল যে, খাব কি? তিনি তখন পাত্তাও দেননি বটে, ভোর ছটায় আমাজন থেকে এসে ডেলিভারি দিয়ে গেছে ব্র্যান্ডেড সাবু। দাম দেখে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল, কেন সোহাগ করে বলতে গেলাম, আবাসনের মার্কেটে অর্ধেক দামে পাওয়া যেত।
আরও অনেক কথা হয়, যেমন আধখানা লাল টুকটুকে তরমুজ যত্ন করে ঠাণ্ডা আলমারিতে লুকিয়ে রেখেছিলাম, সকালে মেয়েকে স্কুল বাসে তুলে এসে দেখি, বাসন মাজার দিদি তাকে যত্ন করে খোসা ছাড়িয়ে, কেটে রেখেছে। আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল, " আজ তোমাদের নীল না বৌদি? তুমি খাবে তো, তাই কেটে দিয়ে গেলাম।" হায় হায়, এবার আমার বুড়ো শিবকে কি দিই? দিদিকে কিছু বলতে না পারলেও, বরের কাছে এক ঝুড়ি নালিশ করেছিলাম। শীতল কণ্ঠে শৌভিক বলেছিল," কেন ঐ তরমুজ শিব ঠাকুরকে দেওয়া যায় না, মুসলমানের মেয়ে কেটেছে বলে?"
হাসতে হাসতে মাকে বলি, প্রতি বছর নীলের দিন ঠাকুমা কি গল্প শোনাত তোমার মনে আছে মা? সেই যে গো, ভোলে বাবার মন্দিরে আজ এত ভিড় কেন বলে দেখতে এসেছিল এক বিধর্মী বালিকা, জানতে পারা মাত্র তাকে বিতাড়ন করে পাণ্ডার দল। চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় বালিকা, তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায় মন্দিরের দুয়ার। কিছুতে দ্বার খোলেন না মহাদেব, যতক্ষণ না সেই মেয়েটিকে খুঁজে সসম্মানে ফেরৎ নিয়ে আসে মন্দিরের মূল পুরোহিত। ঠাকুমা বলত, সেই বিশেষ মন্দিরে ঠিক বেলা বারোটার সময় প্রথম বাতিটা দেবে এক মোছলমানের মেয়ে, তারপর শুরু হবে মহাদেবের পুজো।
২০০৫ এ চলে গেছে ঠাকুমা,ভাগ্যে চলে গেছে নইলে একদল বলত কাফের আর এক দল ছাপ্পা মারত সিকুলার বলে। যাই হোক সাতসকালে ঠাকুমার ঝুলি না খুলে বলি, ঠাকুরের কাছে হিন্দু মুসলমান আবার কি, তবে ওমন খোসা ছাড়িয়ে ছোট টুকরো করে কাটা তরমুজ ভোলে বাবাকে দেওয়া যায় না। তাও আবার ফ্রিজে রাখা, কিসের সাথে ঠেকে বসে আছে কে জানে?
শৌভিক গজগজ করতে করতে নীচে নামে, " আজব নিয়ম, খোসা সমেত দিলে খাবে, খোসা ছাড়িয়ে দিলে খাবে না -"। মুঠো ফোনের ওপাশে মা হেসে গড়াগড়ি যায়, তারপর বলে, " দিদি তোর জন্য কত কি কিনে রাখত বল!" দিদি অর্থাৎ আমার সবেধন নীলমণি পিসি, যিনি সদ্য পেরিয়েছেন নব্বইয়ের ঘর, সত্যি তিনি কিনে রাখতেন - গোটা বেল, পাঁচ ফল, কাঁটাওয়ালা ধুতরো ফল, আকন্দ ফুলের মালা, পিতলের কমণ্ডুলে ভরে নিতেন কাঁচা দুধ আর গঙ্গা জল, তারপর আমায় বগলদাবা করে রওনা দিতেন পাড়ার বুড়ো শিবের মন্দিরে। কি যে ভিড় হয় এই দিনটায় আমাদের মন্দিরে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অবশেষে প্রবেশাধিকার মেলে গর্ভগৃহে। গোল করে শিবকে ঘিরে বসে পুরনারীবৃন্দ, মন্ত্র পড়েন পুরুত ঠাকুর। সবার আগে শিবের মাথায় ঢালা হয় দুধ, গলায় পরানো হয় আকন্দ ফুলের মালিকা, পিনেটের ওপর রাখা হয় বেল, ধুতরো ফল ইত্যাদি। আমরা রাখি, ঠাকুর মশাই সরিয়ে দেন নইলে ফলের চাপে মহাদেবের পাতাল প্রবেশ হবে যে। সবশেষে মিষ্টির বাক্স থেকে একটা করে মিষ্টি তুলে নেন ঠাকুর মশাই, জানতে চান নাম গোত্র। পুজো শেষে বীর দর্পে বাড়ি ফিরি আমরা পিসি ভাইঝি।
এবছর বাবা নেই,মানসিক ভাবে পিসি শতখণ্ড হয়ে গেছে। আবার বিমর্ষ হয়ে পড়ে মা, চাঙ্গা করতে স্মৃতিচারণ করি আমি, সোনালী দিনের স্মৃতি, যখন বাবা ছিল, ঠাকুমা ছিল, যখন গমগম করত ব্যাঁটরার চাটুজ্জে বাড়ি। যখন নীল এলেই বেলের শরবত বানাত ঠাকুমা, পুত্রবধূদের জন্য। আমরা বলতাম বেলের পানা। বাড়িতেই ছিল বিশাল বেল গাছ। তিনতলা বাড়ির সমান লম্বা। ছাদ থেকে হাত বাড়িয়ে বেলপাতা পাড়ত সবাই। সারা বছর কম বেশী বেল হত গাছটায়, আর গ্রীষ্ম এলে তো ফলের ভারে নুয়ে পড়ত গাছটা। এক হাতে বেল ধরে অন্য হাতে নোড়া দিয়ে পিটিয়ে বেল ভাঙত ঠাকুমা, বলত, " চৈত্র - বোশেখ" মাসে মাটিতে আছড়ে বেল ভাঙতে নেই। শিব ঠাকুরের মাথায় লাগে।
রোমন্থনে কখন যেন মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে আমার মুখে, মায়ের গলাতেও যেন মেঘ কেটে দেখা দেয় হালকা রোদের ছোঁয়া। ঠাকুমার বেলের পানা বানানোর গল্প ধরি আমি, কেমন যত্ন করে চামচ দিয়ে কুরে কুরে বার করত ভিতরের শাঁস টুকু, কচলে কচলে মেশাত কলসির ঠাণ্ডা জলের সাথে, কাচা ধপধপে সাদা থানের টুকরোয় ছাঁকা হত সেই বেলের ঘোল।আগে থেকেই ভিজিয়ে রাখত চিনি, সামান্য নুন আর সেই সুগার সিরাপ সহযোগে অমৃত হয়ে উঠত বেলের পানা। খরদুপুরে নীলের পুজো দিয়ে ফিরলেই, পুত্রবধূদের হাতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস সহ একগ্লাস করে তুলে দিত ঠাকুমা।
শুনতে শুনতে দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে মা, করুণ সুরে বলে," এত ভালো মানুষ গুলো কেন যে হারিয়ে গেল -", ছদ্ম ক্ষোভ গলায় মিশিয়ে মাঝপথে মাকে থামিয়ে দিই আমি, " কি বলছ গো, ঠাকুমা বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হত ১১২/১১৩ বছর -", মা থতমত খেয়ে কথা ঘোরায়, " আমার জন্য লুচি তরকারী বানিয়ে রাখতিস তুই।" তা রাখতাম বটে, প্রথম লুচি বানানো এই নীল উপলক্ষ্যে, একটাও গোল হয়নি সেবার। শেষে বাবা বলল, " একটা বাটি দিয়ে কেটে দে ব্যাটাদের গোল গোল করে।"
সেই বাবার প্রসঙ্গ উঠবেই, যত সরিয়ে রাখতে চাই লোকটাকে, জোর করে সব কথাতেই ঢুকে আসবে লোকটা। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে হাপুস নয়নে কাঁদছিল তুত্তুরী, " আমি আর ঘুমাব না মা। ঘুমোলেই দাদুর স্বপ্ন দেখি, ঘুম ভাঙলেই শূন্যতা।" ঠিক এই ভয়েই রোজ রাতে বলে শুই, একদম আমার স্বপ্নে আসবে না তুমি। তাও আসে, তবে সে অনেককাল পুরান বাবা। যার সাথে হালকা কথা হয়, গল্প হয়,কিন্তু মন খারাপ হয় না। মন খারাপ তো হয় পুজো করার সময়। কি বলব ঠাকুরকে আমি, প্রতিটা প্রার্থনায় জড়িয়ে ছিল যে লোকটা, তাকে বাদ দিয়ে কি চাই আমি? অন্যান্য সময় শক্ত থাকলেও এই একটা সময় নিজেকে সামলাতে পারি না আমি।
আজ তাই কিছু বলিনি ঠাকুরকে, জাস্ট সাজিয়ে দিয়েছি ফল, দুধ, সামান্য দক্ষিণা। যন্ত্রের মত বলেছি মন্ত্র। পুজো শেষে বাতি জ্বালিয়েছি প্রিয়জনদের মঙ্গলার্থে। প্রিয়জন কি আমার কম যাদের অনেককে আবার চোখের সামনে জন্মাতে, বেড়ে উঠতে দেখেছি-দেখছি ভালো থাকুক সবাই। জানলার সামনেটা ভরে উঠেছিল আজ বাতিতে বাতিতে -। সেই গল্প শোনাই মাকে, সব শেষে বলি, বাবার নামেও একটা বাতি দিয়েছি মা, ভেবেছিলাম দেব না। কি হবে দিয়ে - মৃত্যুর পর তো কিছু থাকে না। কিন্তু না জ্বালিয়ে আর নড়তে পারলাম না। যেখানেই থাক, ভালো থাক। ম্রিয়মান গলায় মা বলে, "ভালো করেছিস। খুব ভালো করেছিস। বাবা আছে, অবশ্যই আছে। তোর আশেপাশেই আছে, যা ভালোবাসত তোকে -"
অনির ডাইরি ১১ই এপ্রিল, ২০২৬
#অনিরডাইরি
দুটো ইঁটের মাঝে এক গোছা পাটকাঠি জ্বেলে তারওপর চাপানো একটা মাটির সরা। সরায় খানিক গঙ্গা জল আর কিছুটা আতপ চাল, একটু ফুটে উঠতেই নামিয়ে নিল পুরুত ঠাকুর। শ্মশানেই থাকেন ভদ্রলোক। কাজ করতে করতেই গল্প করছিলেন, এখন গ্রীষ্ম তাই দিনের বেলাটা ফাঁকাই থাকেন, ভিড় হয় রাতে। শীতকালে ঠিক উল্টো, দিনের বেলায় ভিড় বাড়ে শবদেহ তথা যাত্রীদের।
আধ সিদ্ধ চালের ওপর খানিক ঘি, মধু, কলা , তিল ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন "এটাকে ভালো করে মাখো"। হাত দিয়ে খানিক মাখার চেষ্টা করে আর পারলাম না, থরথর করে কাঁপছি, এর থেকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনও হয়নি। খুড়তুতো ভাই পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল হাত দিয়ে, সামনে থেকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে বড়দা, তাও পারলাম না, কোন মতে কয়েকবার চটকে দিয়ে দিলাম ভাইয়ের হাতে।
পুরুত ঠাকুর কইলেন, "এবার যে ঘি মাখাতে হবে মা!" কাকে? বাবাকে? আমি পারব না, কিছুতেই পারব না - টপ করে এক ফোঁটা চোখের জল টেবিলের কাঁচের ওপর এসে পড়াতে হুঁশ ফিরে পাই। কোথায় বাবা - বাবা আর নেই। বাবা মরে গেছে। যখন তখন এটা মনে হয় আর ছলকে যায় আঁখি। গতরাতেই তো, হাওড়া ময়দানে নেমে আর রাস্তা পেরোতে পারছিলাম না, কেবল মনে হচ্ছিল এই তো সেদিন এই তেলেভাজার দোকান থেকে ফাপড়া কিনে নিয়ে গেলাম বাবার জন্য। বাবা বলে গাঠিয়া, সাথে কুরানো কাঁচা পেঁপে সিদ্ধ আর লঙ্কা সিদ্ধ। বড্ড ভালোবাসত বাবা, সেদিন কেমন আমার সাথে বসে চা দিয়ে খেল আর আজ -।
অফিসে বসে একদম ভাবতে চাই না, তাও মনে পড়ে বুড়োর কথা। চেম্বারে কেউ ঢুকলে হাসি, পিছনে লাগি, গল্প করি, ফাইল ছাড়ি - ঘর ফাঁকা হলেই "ম্যায় ওর মেরি তানহাই "। মাঝে মাঝে পাগলের মত মস্তিষ্ক প্রক্ষালন করি, মুঠো ফোনে বাবার যাবতীয় পুরান রিপোর্ট ঝেড়ে দেখি কোথাও কিছু নির্ঘাত অবহেলা বা ভুল করেছি আমি। আমারই দোষে চলে গেছে বাবা, দোষটা কি সেটা না ধরতে পারা পর্যন্ত শান্তি পাব না। প্রিয় বন্ধু ফোন করে, রোজই করে, কেন করে ভগবান জানে। কখনও কেজো, কখনও অর্থহীন কথা বলি আমরা, আজ যেমন বলেই ফেলি মনের কথা -অপরাধ খুঁজে নিজেকে ফাঁসি দিতে চাই আমি। নির্ঘাত আমার দোষেই চলে যেতে হয়েছে বাবাকে -
বন্ধু বলে, " এটাই স্বাভাবিক। আমারও তাই মনে হয়, আজও। একদিন হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বাবার অক্সিজেনটা ওরা কমিয়ে রেখেছে। ওটাই নাকি নিয়ম, আস্তে আস্তে প্রেসার কমিয়ে রুগীর ফুসফুসকে এডজাস্ট করায় -। সেদিন কিছু বলিনি,বাবা চলে যাবার পর প্রায় মনে হত, কেন বলিনি, বললে হয়তো একটু কষ্ট কম পেত । কে জানে হয়তো আরও কয়েকটা দিন বাঁচত লোকটা -"। আশ্বস্ত করি, একই ঘটনা ঘটছিল আমার বাবার সাথেও, আমি বলেও ছিলাম, ফলাফল লবডঙ্কা।
জানতে চাই, এই দমচাপা কষ্টের মেয়াদ আর কত দিন? বন্ধু বলে, " জানি না। এতদিন হয়ে গেল বাবা চলে গেছে, আজও একা থাকলে কেঁদে ফেলি বাবার কথা ভেবে। গয়ায় গিয়ে এত কষ্ট হচ্ছিল কি বলব, হিন্দু ধর্ম মতে গয়ায় পিণ্ডদান করলেই তো মুক্তি, কেবল মনে হচ্ছিল এবার বাবা সত্যিই আমায় ছেড়ে চলে যাবে -"। ঠিক এই একই কথা আমারও মনে হচ্ছিল ঘাট কাজের দিন।
বন্ধুর সাথে বার্তালাপের মধ্যেই আসে ফোনটা, অচেনা নম্বর, ধরতেই ওদিক থেকে এক বয়স্ক পুরুষ কণ্ঠ বলে ওঠে, "ম্যাডাম? আমাকে কি আপনার মনে আছে, আপনি যখন খড়গপুরে ছিলেন, আমি আপনার ইন্সপেক্টর ছিলাম। আমার নাম প্রশান্ত দাস -"।
হঠাৎ খুশি হয়ে ওঠে মনটা, হেসে বলি অবশ্যই মনে আছে প্রশান্ত বাবু," পিংলায় ছিলেন না আপনি! কিন্তু ইন্সপেক্টর বলছেন কেন, আমি থাকতে থাকতেই তো আধিকারিক পদে পদোন্নতি হয়েছিল আপনার।" ভদ্রলোক হেসে বলেন, " ম্যাডাম শুনলাম আপনি তমলুকে আছেন, আমি যদি ঘণ্টা দুয়েক পর যাই আপনার সাথে দেখা হতে পারে?" বলি আলবাত পারে, আপনি আসুন তো, দুইয়ের জায়গায় চার ঘণ্টা লাগলেও আমি অপেক্ষা করব।
ঘণ্টা দুই আড়াই পর, চেম্বারের দরজা ঠেলে যিনি প্রবেশ করলেন, তাঁকে দেখে পলকে মনে হল আমি বুঝি ২০০৭-৮ সালে আছি। একই রকম দেখতে আছেন ভদ্রলোক, মিশমিশে কালো চুলে সামান্য নুন মরিচের ছোঁয়া ছাড়া, সময় বিন্দুমাত্র থাবা বসাতে পারেনি ওনার উপর। বললেন ২০১২ সালে অবসর নিয়েছেন। বাকিটা রামদেব বাবার প্রাণায়াম আর সাথে প্রাতঃভ্রমণের সুফল। অনেক গল্প হল ভদ্রলোকের সাথে, পুরান ভুলে যাওয়া সাদাকালো যুগের গল্প। শৌভিকের খোঁজ নিলেন, তুত্তুরীর বয়স বলে দিলেন নিখুঁত ভাবে। ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে খড়গপুর ছেড়ে এসেছি, আজ এত বছর পরও যে ওনারা আমাকে তথা আমার পরিবারকে মনে রেখেছেন তাতে ধন্য হয়ে গেলাম। বর্তমান অফিসের সকল সহকর্মীকে ডেকে সগর্বে আলাপ করিয়ে দিলাম, দেখ আমার প্রথম ইন্সপেক্টর। আজও ভোলেননি আমায়। লোক মুখে খোঁজ পেয়ে ছুটে এসেছেন -
প্রশান্ত বাবু গল্প শোনান, তমলুক আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের সাথে ওনার সম্পর্ক অনেক প্রাচীন, ওনার জীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল এই মহকুমায়। আমরা সাগ্রহে জানতে চাই, কোথায়? হেসে বলেন, " ময়না। তবে তখনও ময়না বিডিও অফিস তৈরি হয়নি, একটা ভাড়া বাড়িতে বসতাম আমরা।" জিজ্ঞাসা করি, সেটা কোন সাল? বৃদ্ধ দাড়ি চুলকে বলেন, " ১৯৭৬ থেকে ৮৪ আজ্ঞে -"। হরি হরি, তখন তো আমরা কেউই জন্মাইনি। প্রশান্ত বাবু হেসে কন, " আজ্ঞে, সেই ময়নার সাথে আজকের ময়নার কোন মিল পাবেননি।" একটু আগেই ময়না ব্লকের একটা বিশেষ পঞ্চায়েত এলাকার গল্প হচ্ছিল অফিসে, ময়নার সবথেকে ঝঞ্ঝাটিয়া পঞ্চায়েত ওটা। শুনেছি মুড়ি মুড়কির মত বোমা পড়ে ওখানে। গণ্ডগোল বাঁধলেই বঁটি কাটারি নিয়ে তেড়ে আসে ওখানকার প্রমীলা বাহিনী। আমি শুধাই, তখনও কি এমন রণপটু ছিল ঐ এলাকার নারী পুরুষ কুল? মারামারি হত? প্রশান্ত বাবু বলে ওঠেন, " বাবারে! একই ছিল ম্যাডাম। তবে তখন যে দুই দলের নামে ঝাড়পিঠ হত স্থানীয়দের মধ্যে, বর্তমান রাজ্য রাজনীতিতে তারা একেবারেই অপাংক্তেয়।" বুঝতে পারি, দল আসে, দল যায়, বদলে না মানুষের প্রকৃতি। ঝামেলা তখনও হত, এখনও হয়, নির্ঘাত ভবিষ্যতেও -। বেলা গড়ায়, প্রশান্ত বাবুকে ঠেলে তুলতে হয়, এবার বাড়ি যান। যাবার আগে অবশ্য ভয় দেখিয়ে গেলেন, " আবার আসব ম্যাডাম -"। মনে মনে বলি, অবশ্যই আসবেন, ভাগ্যিস এলেন, এই অপরিসীম শোকের হাত থেকে কিছুটা তো রেহাই পেলাম।
















