অনির ডাইরি ১৯ই জুন, ২০২৬
#অনিরডাইরি
ভেজা ভেজা মহানগরের ভোর। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি আমরা মা - মেয়ে। তাঁর ইস্কুলের গাড়ি আসতে আজকে যেন একটু বেশীই দেরী করছে। আজ তাঁর ইতিহাসের ক্লাস টেস্ট আছে, যার অন্যতম বিষয় হল ভারতীয় সংসদ ও সংবিধান। দল ত্যাগ বিরোধী আইন নিয়ে গতরাত থেকে লড়ে যাচ্ছি আমরা, আজও সেই নিয়েই গল্প করছিলাম আমরা। গল্পে গল্পে পড়া আর পড়তে পড়তে গল্প -
হঠাৎ দুজনেই থেমে গেলাম, আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অন্য একটা স্কুলের বাস, আসেপাশে অপেক্ষারত অন্যান্য বাচ্ছারা লাইন দিয়ে উঠতে গিয়েও উঠছে না। কারণ এক টলটলে বৃদ্ধ। বৃদ্ধের একহাতে সব্জির ব্যাগ অন্য হাতে বন্ধ টু ফোল্ড ছাতা। দৃশ্যতই বৃদ্ধের এক পা লন্ডনে পড়ছে, আরেক পা টোকিও। বারবার বিপজ্জনক ভাবে পিছন দিকে হেলে যাচ্ছেন বৃদ্ধ। কন্ডাক্টর ছেলেটি বাস থেকে নেমে এসে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করল, ধীরে ধীরে যান। বৃদ্ধ তো এমনিতেই শম্বুক গতিতে যাচ্ছে -
উনি কোনমতে ফুটপাথে উঠে পড়তেই, বাচ্ছা গুলো বাসে উঠে পড়ে। বাস বেরিয়ে যায় দ্রুত গতিতে। আমাদের গাড়ির দেখা নেই, আমরা সেটা নিয়ে ভাবিত ও নই। দুজনে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি বৃদ্ধের দিকে। পড়েই যায় বুঝি লোকটা। কেন যে লাঠি নিয়ে বেরোননি, "দাদুও লাঠি নিতে চাইত না, মনে আছে মা" বলে তুত্তুরী। কিছু বলি না আমি, তুত্তুরী একাই বলে যায়, " দুটো হাতে দুটো জিনিস নেওয়া উচিৎ হয়নি। বাবা বারবার বারণ করত ঠাম্মাকে -", বলতে না বলতেই বৃদ্ধ এমন ভাবে পিছন দিকে হেলে যান, যে মনে হয় মাথা ঠুকে পড়েই গেলেন বুঝি।
তুত্তুরী আঁতকে উঠে বলে, " তুমি যাও মা, আমার ভীষণ ভয় করছে ওনার জন্য -", মেয়েকে একা বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে যেতে যেন গুঁড়িয়ে যায় বুক, তাও দৌড়ে যাই মানবিকতার খাতিরে। যা নব্য ধনী এলাকা আমাদের, অধিকাংশই অবাঙালি, বাংলায় বলব না হিন্দিতে বলব ভাবতে ভাবতে, মাতৃভাষাই বেরিয়ে যায় মুখ দিয়ে, " কাকু কোথায় যাবেন? আমি ছেড়ে দিয়ে আসি চলুন -"।
মুখের মাস্কটা হাফ নেমে গেছে বৃদ্ধের, যা হাঁপাচ্ছেন। ঐ অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে পড়ে আমাকে আপাদমস্তক মাপেন, তারপর বলেন, " তুমি কোথায় যাবে?" যে বন্ধ মস্ত বিপণীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা, তার পিছন দিকে আঙুল দেখিয়ে বলি, আমি এখানেই থাকি, মেয়েকে স্কুলের গাড়িতে তুলতে এসেছিলাম। চলুন আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসি। ব্যাগটা কেড়ে নিই বৃদ্ধের হাত থেকে, ছাতাটাও। বৃদ্ধ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে টলটল করতে করতে বলেন, " আসলে আজ লাঠিটা আনিনি তো। ছাতাটা নিলাম বলে, দেখলাম বৃষ্টি হচ্ছে, তাই -"।
বার দুয়েক আরও টলে যাবার পর, আমি ওনার হাতটাই চেপে ধরি, কনুইয়ের ওপর। আজকের আরামদায়ক ভোরেও ঘামে ভিজে গেছেন বৃদ্ধ। বেশ গৌর বর্ণ, পরণে একটা স্ট্রাইপ টি শার্ট আর প্যান্ট, কোনটাই সস্তা বা মাঝারি দামের নয়। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার কসরৎ করার পরও আমরা দুয়েক পায়ের বেশি এগোই না। আমি বলি, একা একা একদম বেরোবেন না। বৃদ্ধ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, " আমি পারি। অন্য দিন লাঠিটা থাকে। প্লেনে হাঁটতে পারি, এই উঁচু নীচু তেই সমস্যা। পা দুটো কিছুতেই একদিকে পড়ছে না -"।
আমরা উঁচুতেই আছি, ফুটপাথের ওপর। সেটি আবার বিপণীর প্রবেশ প্রস্থান অনুসারে কাটা। যাতে গাড়ি ঢুকতে বা বেরোতে কোন সমস্যা না হয়। প্রথম কাটা অংশে আমি তো টুক করে নেমে পড়লাম, ওনাকে আর নামতেই পারি না। দুহাতে ধরে কোনমতে নামিয়ে বলি, রাস্তা ধরে হাঁটি চলুন, তাহলে এত চড়াই উৎরাই ভাঙতে হবে না। বলতে বলতে পিছন ফিরে তাকাই বারবার, মেয়েটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
বৃদ্ধ আমার কথা শুনে রাস্তার দিকে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ান। দোনামোনা করে বলেন, " রাস্তাটা বড় উঁচু নীচু -" । ঠিক আছে, তাহলে ফুটপাথই ধরি, বৃদ্ধকে যখন চাগিয়ে ফুটপাথে তুললাম, পাশ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল তুত্তুরীর স্কুল বাস। জানলার ধারে বসে হাত নাড়িয়ে গেল মেয়ে। সামান্য কয়েক পা যেতে যেন বছর ঘুরে গেল আমাদের। বৃদ্ধ সংকুচিত হয়ে বলেন, " তোমার বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে না -"। আজ আমার চাইল্ড কেয়ার লিভের শেষ দিন, তাই অফিস যাবার তাড়া নেই। শৌভিক রাত জেগে খেলা দেখে আপাতত গভীর নিদ্রামগ্ন। তাই এখুনি বাড়ি যাবার কোন তাড়া আমার নেই। শুধু পোশাকটা যদি একটু ভালো পরে নামতাম। ভেবেছিলাম মেয়েকে তুলে দিয়েই চলে আসব, তাই বাড়ির রঙ জ্বলে যাওয়া আরামদায়ক টিশার্ট আর লাউঞ্জ প্যান্ট পরেই নেমেছিলাম।
"ব্যাস আর একটু গেলেই আমাদের আবাসনের গেট, গিয়েই সিকিউরিটিকে ব্যাগটা ধরিয়ে দেব। তোমরা কোন ফ্ল্যাটে থাকো, আমার ফ্ল্যাটের নম্বর এই ।" উফ এই আলাভুলো প্রজন্ম, কেউ এইভাবে অপরিচিত মানুষকে ফ্ল্যাটের নম্বর বলে - আমি যদি চোর ডাকাত হই।
রাস্তার ধারের গ্রিল ধরে বেশ খানিক হাঁপান বৃদ্ধ, পাশ দিয়ে ছুটে চলে ঘুম ভাঙা শহরটা। বাজারের সামনে এসে পিঠটা পুরোই বেঁকে যায় ওনার, একটালাফ দিয়ে পিছনে গিয়ে ঠেলে ধরি আমি। বলি একটু বসবেন? বসবেনই বা কোথায়, ফুটপাথ উঁচু করার চক্করে বসার জায়গা সব নষ্ট হয়ে গেছে। বৃদ্ধ তাও থমকে দাঁড়ান, হ্যাংলার মত একফালি জায়গার দিকে তাকিয়ে বলেন, " বসব!"
আমাদের অবস্থা দেখে এগিয়ে আসেন আরেক ভদ্রলোক, ইনিও বাচ্ছাকে স্কুল বাসে তুলতে নেমেছিলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি, আমার একার শক্তিতে বৃদ্ধকে সামলাতে পারছিলাম না। বিশেষত আবার সামান্য চড়াই যখন সামনে। দুই জনে দুই বগলের তলায় হাত দিয়ে ওনাকে আবাসনে ঢোকাই। "পিঠটা, পিঠটা আবার বেঁকে গেল", হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন বৃদ্ধ। পাশের ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেন ওনাকে। " একি একা বেরিয়েছেন কেন -" বলতে বলতে এগিয়ে আসেন এক প্রৌঢ়। বুঝতে পারি উভয়েই পরিচিত একে অপরের। আমার দিকের হাতটা উনি ধরে নেন। আমি একটু পিছিয়ে এসে দম নিয়ে বৃদ্ধের ব্যাগ আর ছাতাটা প্রৌঢ় ভদ্রলোককে ধরিয়ে এগিয়ে যাই। আর আমার দরকার নেই -
বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, এই তো জীবন কালী দা, এই ধনী আবাসনে এটাই ঘর ঘর কি কাহানি। পাইপয়সা জমিয়ে সবাই এখানে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, মনের মত করে মানুষ করেছেন সন্তানসন্ততিকে। আজ তারা সকলেই সুপ্রতিষ্ঠিত কিন্তু দূরের নক্ষত্র। ঘরে ঘরে পড়ে আছে নিঃসঙ্গ দম্পতি অথবা বিধবা/ বিপত্নীক মানুষজন। যাদের পাশ দিয়ে স্কুল বাসের মতোই ছুটে চলে যাচ্ছে জীবন।
অনির ডাইরি ১৭ই জুন, ২০২৬
#অনিরডাইরি
নিজেকে এতটা সবলা ভাবা আমার উচিৎ হয়নি। এই হাসপাতালে আবার আসা আমার উচিৎ হয়নি। এই তো সেদিনের কথা, ঠিক এইখানেই দাঁড়িয়ে ছিল তুত্তুরী, আমার গা ঘেঁষে। তখনও আমরা দুজনের কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, বাবা আর নেই। আমি বার বার বলছিলাম, " তোকে আমাকে ছেড়ে দাদু কোথাও যেতেই পারে না। দাদু এখানেই আছে, সারা জীবন থাকবে -"। আজ সেকথা ভেবে হাসি পেল। আমি জানি, বাবা আর নেই। কোথাও নেই।
কি অদ্ভুত বৈপরীত্য আমার মধ্যে। যে বৃদ্ধের ছবি জ্বলজ্বল করে আমার সমস্ত মুঠোফোনের স্ক্রিন জুড়ে, তিনিও তো মানবজন্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং দেহরক্ষা করেছিলেন। আমি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি তিনি আছেন, হয়তো আমার ডাইমেনশনে নয়, অন্য কোন মাধ্যমে, কিন্তু তিনি আছেন। তাহলে বাবা কেন নেই?
তপ্ত কফির কাপ হাতে গিয়ে গল্প করছে শৌভিক আর পিসিমণি। প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবার ডায়ালিসিস চলে পিসেমশাইয়ের। সঙ্গে আসেন পিসিশাশুড়ি। দীর্ঘ চার পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে রক্ত পরিশোধনের কাজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে থাকেন পিসিমণি। বাবা ভর্তি ছিল যে কটা দিন, বরকে ডায়ালিসিস ইউনিটে ঢুকিয়ে দিয়েই আমার কাছে চলে আসত পিসিমণি। গল্প করত, সঙ্গ দিত। পিসিমণির রাগ দুঃখ অভিমানে আমার মাকে খুঁজে পেতাম আমি আর পিসতুতো দেওরের মধ্যে খুঁজে পেতাম নিজেকে। একই চিত্রনাট্য, শুধু বদলে গেছে কুশীলব।
আজ বহুদিন বাদে এই চত্বরে এসেছি বড়দার সৌজন্যে। বেলা দুটো থেকে অপারেশন ছিল বড়দার, যদিও অন্য হাসপাতালে, তবে সেটাও খুব বেশি দূরে নয়। বলেই রেখেছিলাম, দাদার অপারেশন হলেই আসব পিসিমণির সাথে দেখা করতে। কফি খাব একসাথে, সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর মত। তারপর থেকে বার তিনেক ফোন করেছে পিসিমণি, " জানিস আজ এসে থেকে মনে হচ্ছিল, তোরা যখন আসতিস, কিছুটা সময় কি ভালো কাটত -"। সাড়ে পাঁচটার পর যখন একজনকে কথা বলতে দিল দাদার সাথে আর সেজদা বেরিয়ে এসে বলল, " দাদা তো একদম নর্মাল কথা বলছে রে -", স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে এলাম ঐ হাসপাতাল থেকে এই হাসপাতাল। সঙ্গে করে নিয়ে এলাম পিসির ভাইপোকেও।
আজকের গল্প জুড়ে রাজা পিসেমশাই একাই, ডায়ালিসিস অন্তে বাড়ি ফেরার পথে একদিন কেমন কাঁপতে লেগেছিল লোকটা, অথবা ইদানীং কেমন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে লোকটা ইত্যাদি প্রভৃতি। শৌভিক বলে, " যতই যাই হোক, রক্তটা শরীর থেকে বার করে, পরিশোধন করে পুনরায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে, সেটা কি মুখের কথা -"। শুনতে শুনতে বাবার মুখটা ভেসে উঠল। ডায়ালিসিস চলছিল সেদিন বাবারও। ঘাড়ের কাছে ফুটো করে টানা হচ্ছিল রক্ত, নাকি ফেরৎ পাঠাচ্ছিল জানি না। রক্তে ভিজে গিয়েছিল ঘাড়ের নীচে রাখা মোটা তুলোর প্যাডটা। কতবার যে ডাকলাম, " বাবা - বাবা - বাবা", একবার সামান্য মাথা ফেরালো, অল্প খুলল চোখ দুটো, তারপর যেন তীব্র যন্ত্রণায় ছোট হয়ে গেল চোখ দুটো, মুখ বেঁকিয়ে মাথা নাড়ল এমন ভাবে মনে হল, এই যাতনা আর নিতে পারছে না। সেদিন রাতে আর বাবাকে সুস্থ করে দেওয়ার প্রার্থনা করতে পারিনি, শুধু বলেছিলাম, " হে প্রভু তুমি যা ভালো বোঝ।" সেই ভোরেই চলে গেল বাবা।
বাড়ি ফিরে মেয়ের কাছে সেদিনের কথা বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম আজ। আমি অতটাও সবলা নই। তুত্তুরী বলল, " তুমি গেলে কেন ওখানে? যদি আমার ক্ষমতা থাকত, আমি জীবন থেকে ঐ দিনটাই মুছে ফেলতাম।" নীরবে খানিক অশ্রুমোচন করলাম দুজনে। অনুযোগের সুরে তুত্তুরী বলে, "কেউ ভাবেনি যে সেটা আমারও চরম শোকের দিন। আমার সবথেকে বড় বন্ধু আমার পরম আশ্রয়স্থলকে হারিয়েছি আমি। তা নয়, যাঁরা বাড়ি চিনতে পারছে না, তাঁদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এসো, দোকান যাও, দিদাকে সামলাও, দাদুর দিদিকে সামলাও -। আমায় কেউ একটা আহাও বলেনি সেদিন।সবাই মাম্মাম (দিদা)কে নিয়ে ব্যস্ত ছিল।" হেসে বলি, সবল হওয়ার সেটাই তো জ্বালা বাবু। আর আমি তোকে সেটাই করতে বলেছি, যেটা আমি নিজে করেছি। শোক - চোখের জল আমার একান্ত ব্যক্তিগত। তার জন্য অনন্ত জীবন পড়ে আছে। তখন আমাদের একটাই কাজ ছিল, যাঁরা আমাদের দুর্দিনে ছুটে এসেছেন তাঁদের যথোচিত আপ্যায়ন করা। আমি নিজেও তাই করেছি কিনা বল -
কিছুক্ষণ অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করে আমাদের মধ্যে, দম নিয়ে বলি, দাঁড়া, বড্ড দুর্বল হয়ে পড়ছি। অবলা হবার আগে একবার পড়ে নিই। কি পড়ব, বলার আগেই তুত্তুরী চিৎকার করে ওঠে, " না একদম বলবে না, সত্যরে লও, সহজে- "। হেসে বলি, বাবুরে, তুই আমার প্রকৃত আত্মার আত্মীয়। কি করে বুঝলি -। তুত্তুরী আর আমার মাঝে কি অনায়াসে নেমে আসেন তিনি, শুরু হয় "বোঝাপড়া" -
" আকাশ তবু সুনীল থাকে,/মধুর ঠেকে ভোরের আলো,
মরণ এলে হঠাৎ দেখি/ মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।
যাহার লাগি চক্ষু বুজে/ বহিয়ে দিলাম অশ্রু সাগর
তাহারে বাদ দিয়েও দেখি, বিশ্বভূবন মস্ত ডাগর।"
অনির ডাইরি ৬ই জুন ২০২৬
#অনিরডাইরি
" নমস্তে স্যার,ম্যাম, ম্যায় প্রমীলা গুপ্তা, আপ কি আজ কি গাইড", খাকি পোশাক পরা শ্যামবর্ণ, ছিমছাম চেহারার মিষ্টি মেয়েটা এসে আত্মপরিচয় জ্ঞাপন করে যখন জিপসির দরজা খুলল, মনটা একটু দমে গেল। আজ্ঞে না, আমার কোন জেন্ডার বায়াস নাই, তবে " তুক" বায়াস ঘোরতর। এর আগের বার যখন মহিলা গাইড পেয়েছিলাম, তখন আমি ছাড়া সবাই বাঘ দেখতে পেয়েছিল।
আজ্ঞে হ্যাঁ, জঙ্গলের নাম ছিল পেঞ্চ, গাইড দিদিমণি চিৎকার করেই যাচ্ছিলেন, " উও দেখিয়ে টাইগার, উও দেখিয়ে টাইগার"। আমার বর আর কন্যা ক্যামেরার লেন্স বাড়িয়ে দেখেও নিল, ছবি তুলতে পারল না যদিও দূরত্বের কারণে। আমি ছাতা খালি চোখে কিস্যু দেখতে পাই না। বাঘের পাল নাকি গাছের পিছনে লুকোচুরি খেলছে আর আমি রাগে বিড়বিড় করছি, ভাবুন কি অবস্থা।
সেবার থেকে ঠিক করেছিলাম আর জঙ্গলে যাবই না। ওসব বাঘ ফাঘ সব গুলগল্প মশাই। কিস্যু থাকে না। একদল লোক ক্যামেরা বাগিয়ে পোজ দেয় আর তাদের দলেরই আরেক পাল লোক বাঘের পোশাক পরে হামাগুড়ি দেয় নির্ঘাত -। গত বছর মে মাসে কানহা গিয়ে আমার সেই বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। প্রখর দাবদাহে চারদিন ধরে সকাল বিকেল ঘুরলাম, গুচ্ছের পয়সার শ্রাদ্ধ হল, মুখ পুড়ে হনুমানের মত কেলে হয়ে গেল। দলে দলে চিতল, সাম্বার, নীলগাই, বারাশিঙ্গা ঘুরছে ফিরছে পোজ দিচ্ছে, কিন্তু কোথায় বাঘ? বাঘ কোথায়?
এবারে আমি একেবারেই বেঁকে বসেছিলাম আসব না বলে। এরা বাপমেয়েতে কিভাবে যে আমায় পটিয়ে ফেলল - । এবারের গন্তব্য বান্ধবগড়, তার আগে ঝটিতি সফর সঞ্জয়ডুবরি জাতীয় অরণ্যে। সঞ্জয়ডুবরির কথা প্রথম শুনি দেবাশীষ দার মুখে। দেবাশীষ দা আমাদের বেড়ু গ্রুপের এক প্রাক্তন সদস্য। কোন এক বিস্মৃতপ্রায় অতীতে, গ্রুপের দেওয়ালে প্রকাশিত হত যে লেখাপত্র তাদের মধ্যে থেকে সেরার সেরা নির্বাচন করতাম আমরা অর্থাৎ রঞ্জন দা, দেবাশীষ দা আর এই অধম। দেবাশীষ দার ব্যাঘ্র প্রীতি ছিল সাংঘাতিক। বাঘ বাড়ছে, কিন্তু সেভাবে জঙ্গল বাড়ছে না, আগামী দিনে তীব্র হবে হিউম্যান- অ্যানিমাল কনফ্লিক্ট, টেরিটোরিয়াল ফাইটে মারা যাবে অনেক বাঘ এই ভবিষ্যৎ বাণী দেবাশীষ দা করত আজ থেকে ধরুন প্রায় এক দশক আগে। লোকটাকে আমরা এত ভালোবাসতাম যে ওনার ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল "টাইগার"।
দেবাশীষ দা গ্রুপ তো ছাড়লেন, কিন্তু আমরা ওনাকে ছাড়লাম না। আজও যোগাযোগ আছে এবং যখনই আমরা কোন জঙ্গলে যাই, ছবি পোস্ট করি, দেবাশীষ দার অবধারিত মন্তব্য হয়, " একবার সঞ্জয়ডুবরিটা ঘুরে এসো। মৌসি মাকে দেখে এসো। সে বড় মজার বাঘ হে -"। মৌসিমা হল এমন এক বাঘিনী, যে অন্যের সন্তানকে স্তন্যপান করিয়ে বড় করে তুলেছিল। বাঘেদের ধাত্রীপান্না।
পরিচয় পত্রের গেরো কেটে গাড়ি জঙ্গলে ঢুকল, প্রমীলা গাইড পিছন ফিরে জিজ্ঞাসা করল, " পহেলি বার আয়ে হ্যায়।" আমরা যুগলে জবাব দিলাম এই জঙ্গলে প্রথমবার বটে, তবে মধ্য প্রদেশে এটা আমাদের সপ্তম বা অষ্টমবার। সত্যিই আমরা এমপি পাগল। এমপি আমাদের দ্বিতীয় জন্মভূমি যেন। প্রমীলা বলে, " এত ভালো লেগেছে আমাদের রাজ্য!" শৌভিক বলে, " আব ক্যায়া করে, হিন্দুস্তানের দিল আমাদের দিল জিতে নিয়েছে"। আমি বলি তোমাদের রাজ্যের সব ভালো, খারাপ কেবল বাঘ গুলো। এর আগে আমরা দশটা সাফারি করেছি, তাঁর দর্শন হয়েছে মাত্র তিনবার। এত উন্নাসিক, এত অসভ্য জীব। প্রমীলা হেসে বলে, " আব তো আপকো টাইগার দিখাকে হি ছোড়েঙ্গে ম্যাডাম।"
আর পাঁচটা সাফারির মত একাকী গাড়ি ঘোরে তার পূর্ব নির্দিষ্ট পথ ধরে। যেখানে দুটো গাড়ির মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়, উভয় গাড়ির ড্রাইভার, গাইড স্থানীয় ভাষায় শুধায়, কিছু পেলে? বিমর্ষ ভাবে মাথা নাড়ে দুপক্ষই। প্রমীলা বলে, " চল না, জলাধারের কাছটা একবার ঘুরে আসি।" জলাধার বলতে অনেকটা নীচে একটা ছোট পাথুরে গর্ত মত, প্রখর দাবদাহে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। কাছাকাছি যেতেই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ও যা রাহি হ্যায় টাইগার।" ঝিলের উল্টো পাড়ে উঁচু টিলার ওপর সত্যিই দেখা গেল একটা বাঘিনীর অবয়ব। শৌভিক চিৎকার করে ওঠে, " জঙ্গলে ঢুকতে না ঢুকতেই বাঘ -"। উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে বাঘিনীর তীব্র গর্জন। বাঘ যাও বা দেখেছি, তার গর্জন ইতিপূর্বে শুনিনি। বিশ্বাস করুন বেশ পিলে চমকানো টাইপ।
গর্জন করেই বাঘটা গাছপালায় মিশে গেল। প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, "গাড়ি ঘুমাও।" তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল, " ও নামছে জল খাবে বলে। যে পথে নামবে আমরা ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে একদম সামনে থেকে শট পাবেন স্যার।" ঝড়ের গতিতে গাড়ি অনেকটা এগিয়ে একটা ঢালু জায়গায় এসে দাঁড়াল। দুয়েকটা আরও গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এসে শুনল যখন আমরা বাঘ দেখেছি, তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল এদিকে, ওদিকে। এবার তিনি এলেই হয়। আস্তে আস্তে ছ - আটটা গাড়ি চলে এল। সবাই রুদ্ধশ্বাসে বসে আছি, তাঁর আর দেখা নেই। কি হল রে বাবা, পায়ে বাত ধরল নাকি?
প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট পর প্রমীলা বলল, " স্যার লাগতা হ্যায় ও কাহি ব্যাঠ গেই হ্যায়। চলুন জঙ্গলের অন্য দিক গুলোও দেখে আসি, যদি অন্য কাউকে পাওয়া যায়।" আমার বর নড়তে নারাজ। কোথাও যাব না, এখানেই অপেক্ষা করব - ও ঠিক নামবে। এমন বাঘ পাগল লোক, বাঘ দেখবে বলে বিগত তিন রাত ঘুমায়নি। মানে রোজই নাক ডেকে ঘুমিয়েছে, কিন্তু স্মার্ট ওয়াচ বলেছে ঘুমায়নি আর কি। যাই হোক, কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অপেক্ষা করতে করতে মুখে গামছা চাপা দিয়ে প্রমীলা খানিক ঘুমিয়ে নেয়। ঘুমিয়ে পড়ি আমিও।
রোদের তাত ক্রমেই বাড়ছে। প্রমীলা ঘুমিয়েই যাচ্ছে, ড্রাইভার রামসুখ যাদব কচরমচর করে পান চিবিয়েই যাচ্ছে। আমার বর আর মেয়ে ক্যামেরা তাক করে বসেই আছে। পাশ দিয়ে গাড়ি গুলো আসছে, যাচ্ছে। আমরাই কেবল স্থবির। ড্রাইভার সাহেব একবার বললেন, " সাব এহী পে ব্রেকফাস্ট কর লিজিয়ে -"। শৌচালয়-হাত ধোওয়ার জায়গা ওলা শেডে যেতে যেতে যদি বাঘ পালিয়ে যায়।
আমার বরের গলা দিয়ে খাবার নামে কখনও। অগত্যা অভুক্ত বসে বসে মাছি তাড়াই। রাগ করে বলি, " এই শেষ। এবার যদি 'প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে' বাঘ না দেখতে পাই, আর আসব না। আর তোদেরও আসতে দেব না। বলতে না বলতেই কটা গাড়ি ঝড়ের মত আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একটা গাড়ি থেকে ভেসে এল চিৎকার, সামনেই বসে আছে বাঘ। শিকার মেরে খাচ্ছে। এইভাবে কেউ বোকা বানায় মাইরি।
আমরাও দৌড়াই পড়ি কি মরি করে। গন্তব্যে ইতিমধ্যেই গুচ্ছ গুচ্ছ জিপসি দাঁড়িয়ে গেছে, মেঠো রাস্তার ধারে একটা লাল টিলা। টিলার ওপরে নাকি বসে আছেন মহারানী। তিনি সদ্য তিনটি বাঁদর মেরেছেন। সম্ভবত দুটো বাচ্ছা একটা বড়। এখন তাদের দিয়েই উদরপূর্তি করছেন। বাঁদরের কল শুনে তো আমরা বুঝি বাঘ আসছে, এত সাবধানী হয় ব্যাটারা। হরিণকে সাবধান করে দেয়। সেই বাঁদর কি করে বাঘের শিকার হয়। শৌভিক বলে, " বাঁদরামি করছিল নির্ঘাত -"।
একেই বোধহয় Déjà vu বলে । সেই সবাই দেখতে পাচ্ছে আমি বাদে। বাঘ নাকি টিলার ওপর গাছের ছায়ায় বসে মহানন্দে মাথা দোলাচ্ছে, ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাচ্ছে - আর আমি দেখছি আকাশ, পাহাড়, জঙ্গল, মানুষ আর গাড়ি। দূরবীনে চোখ লাগিয়ে লাগিয়ে চোখ ব্যথা করে ফেললাম, বুঝতেই পারলাম না কোন গাছের নীচে বসে প্রাতঃরাশ সারছেন তিনি। বিরক্ত হয়ে প্রমীলা কে শুধাই, এটাই কি মৌসীমা? প্রমীলা জবাব দেয়, না, ইনি হলেন মৌসীমার দিদি, নাম T-17। ওরা আদর করে ডাকে লছমি বলে।
ভাগ্য ক্রমে আজ আমাদের বিয়ের জন্মদিন এবং ১৭ তম জন্মদিন। শৌভিক গদগদ হয়ে বলে, " বিয়ের ১৭ বছরে টি -১৭ দর্শন হল, আহা -"। বিরস মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কেউ চিৎকার করে উঠল, " উঠেছে উঠেছে।" আমার বর আর কন্যা ক্যামেরা তাক করে তৈরি। কিন্তু প্রমীলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, " ভাগা, ভাগা, গাড়ি ভাগা।" একি রে বাবা, সবে লছমিকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে আর এই মেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
উড়ন্ত গাড়িতে দাঁড়িয়েই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ভরোসা রাখিয়ে, ও ঐ রাস্তা দিয়েই নামবে জল খেতে। একদম সামনে থেকে দেখাবো।" গাড়ি এসে দাঁড়ালো, আমরা এতক্ষণ যেখানে অপেক্ষা করছিলাম। অন্তত মিনিট সাত দশেক কোথাও কোন শব্দ নেই, মাছিদের ভনভন ছাড়া। তার পরই ছুটে আসতে লাগল একের পর এক গাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে সেরা স্পটটা দখল করে নিয়েছে রামসুখ আর প্রমীলা।
ধীরে ধীরে অদূরে টিলার মাথায় দেখা যায় তাকে, গদাইলস্করি চালে তিনি নামতে থাকেন। মুখে আধ খাওয়া একটি বাঁদর। খচখচ করে শব্দ করে সম্মিলিত ক্যামেরা কুল। আমার ক্যামেরা নেই। ফোন ও আনিনি মহামান্য আদালতের নির্দেশ মত। আমি তাই প্রাণ ভরে দেখি। তিনি ঢালু পথে নেমে এসে, আমাদের গাড়িটাকে আড়াআড়ি পার করে, আমার দিকে দরজা ঘেঁষে ঢুকে যান জঙ্গলে। আক্ষরিক অর্থেই জুড়িয়ে দিয়ে যান, পুড়িয়ে দিয়ে যান আমার চোখ। আর আমি, জিপসি থেকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে বলি, " মহারাণী তোমারে সেলাম 🙏🏻"
ছবি সৌজন্য - শ্রী Shouvik Bhattacharya










