অনির ডাইরি ৬ই জুন ২০২৬
#অনিরডাইরি
" নমস্তে স্যার,ম্যাম, ম্যায় প্রমীলা গুপ্তা, আপ কি আজ কি গাইড", খাকি পোশাক পরা শ্যামবর্ণ, ছিমছাম চেহারার মিষ্টি মেয়েটা এসে আত্মপরিচয় জ্ঞাপন করে যখন জিপসির দরজা খুলল, মনটা একটু দমে গেল। আজ্ঞে না, আমার কোন জেন্ডার বায়াস নাই, তবে " তুক" বায়াস ঘোরতর। এর আগের বার যখন মহিলা গাইড পেয়েছিলাম, তখন আমি ছাড়া সবাই বাঘ দেখতে পেয়েছিল।
আজ্ঞে হ্যাঁ, জঙ্গলের নাম ছিল পেঞ্চ, গাইড দিদিমণি চিৎকার করেই যাচ্ছিলেন, " উও দেখিয়ে টাইগার, উও দেখিয়ে টাইগার"। আমার বর আর কন্যা ক্যামেরার লেন্স বাড়িয়ে দেখেও নিল, ছবি তুলতে পারল না যদিও দূরত্বের কারণে। আমি ছাতা খালি চোখে কিস্যু দেখতে পাই না। বাঘের পাল নাকি গাছের পিছনে লুকোচুরি খেলছে আর আমি রাগে বিড়বিড় করছি, ভাবুন কি অবস্থা।
সেবার থেকে ঠিক করেছিলাম আর জঙ্গলে যাবই না। ওসব বাঘ ফাঘ সব গুলগল্প মশাই। কিস্যু থাকে না। একদল লোক ক্যামেরা বাগিয়ে পোজ দেয় আর তাদের দলেরই আরেক পাল লোক বাঘের পোশাক পরে হামাগুড়ি দেয় নির্ঘাত -। গত বছর মে মাসে কানহা গিয়ে আমার সেই বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। প্রখর দাবদাহে চারদিন ধরে সকাল বিকেল ঘুরলাম, গুচ্ছের পয়সার শ্রাদ্ধ হল, মুখ পুড়ে হনুমানের মত কেলে হয়ে গেল। দলে দলে চিতল, সাম্বার, নীলগাই, বারাশিঙ্গা ঘুরছে ফিরছে পোজ দিচ্ছে, কিন্তু কোথায় বাঘ? বাঘ কোথায়?
এবারে আমি একেবারেই বেঁকে বসেছিলাম আসব না বলে। এরা বাপমেয়েতে কিভাবে যে আমায় পটিয়ে ফেলল - । এবারের গন্তব্য বান্ধবগড়, তার আগে ঝটিতি সফর সঞ্জয়ডুবরি জাতীয় অরণ্যে। সঞ্জয়ডুবরির কথা প্রথম শুনি দেবাশীষ দার মুখে। দেবাশীষ দা আমাদের বেড়ু গ্রুপের এক প্রাক্তন সদস্য। কোন এক বিস্মৃতপ্রায় অতীতে, গ্রুপের দেওয়ালে প্রকাশিত হত যে লেখাপত্র তাদের মধ্যে থেকে সেরার সেরা নির্বাচন করতাম আমরা অর্থাৎ রঞ্জন দা, দেবাশীষ দা আর এই অধম। দেবাশীষ দার ব্যাঘ্র প্রীতি ছিল সাংঘাতিক। বাঘ বাড়ছে, কিন্তু সেভাবে জঙ্গল বাড়ছে না, আগামী দিনে তীব্র হবে হিউম্যান- অ্যানিমাল কনফ্লিক্ট, টেরিটোরিয়াল ফাইটে মারা যাবে অনেক বাঘ এই ভবিষ্যৎ বাণী দেবাশীষ দা করত আজ থেকে ধরুন প্রায় এক দশক আগে। লোকটাকে আমরা এত ভালোবাসতাম যে ওনার ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল "টাইগার"।
দেবাশীষ দা গ্রুপ তো ছাড়লেন, কিন্তু আমরা ওনাকে ছাড়লাম না। আজও যোগাযোগ আছে এবং যখনই আমরা কোন জঙ্গলে যাই, ছবি পোস্ট করি, দেবাশীষ দার অবধারিত মন্তব্য হয়, " একবার সঞ্জয়ডুবরিটা ঘুরে এসো। মৌসি মাকে দেখে এসো। সে বড় মজার বাঘ হে -"। মৌসিমা হল এমন এক বাঘিনী, যে অন্যের সন্তানকে স্তন্যপান করিয়ে বড় করে তুলেছিল। বাঘেদের ধাত্রীপান্না।
পরিচয় পত্রের গেরো কেটে গাড়ি জঙ্গলে ঢুকল, প্রমীলা গাইড পিছন ফিরে জিজ্ঞাসা করল, " পহেলি বার আয়ে হ্যায়।" আমরা যুগলে জবাব দিলাম এই জঙ্গলে প্রথমবার বটে, তবে মধ্য প্রদেশে এটা আমাদের সপ্তম বা অষ্টমবার। সত্যিই আমরা এমপি পাগল। এমপি আমাদের দ্বিতীয় জন্মভূমি যেন। প্রমীলা বলে, " এত ভালো লেগেছে আমাদের রাজ্য!" শৌভিক বলে, " আব ক্যায়া করে, হিন্দুস্তানের দিল আমাদের দিল জিতে নিয়েছে"। আমি বলি তোমাদের রাজ্যের সব ভালো, খারাপ কেবল বাঘ গুলো। এর আগে আমরা দশটা সাফারি করেছি, তাঁর দর্শন হয়েছে মাত্র তিনবার। এত উন্নাসিক, এত অসভ্য জীব। প্রমীলা হেসে বলে, " আব তো আপকো টাইগার দিখাকে হি ছোড়েঙ্গে ম্যাডাম।"
আর পাঁচটা সাফারির মত একাকী গাড়ি ঘোরে তার পূর্ব নির্দিষ্ট পথ ধরে। যেখানে দুটো গাড়ির মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়, উভয় গাড়ির ড্রাইভার, গাইড স্থানীয় ভাষায় শুধায়, কিছু পেলে? বিমর্ষ ভাবে মাথা নাড়ে দুপক্ষই। প্রমীলা বলে, " চল না, জলাধারের কাছটা একবার ঘুরে আসি।" জলাধার বলতে অনেকটা নীচে একটা ছোট পাথুরে গর্ত মত, প্রখর দাবদাহে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। কাছাকাছি যেতেই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ও যা রাহি হ্যায় টাইগার।" ঝিলের উল্টো পাড়ে উঁচু টিলার ওপর সত্যিই দেখা গেল একটা বাঘিনীর অবয়ব। শৌভিক চিৎকার করে ওঠে, " জঙ্গলে ঢুকতে না ঢুকতেই বাঘ -"। উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে বাঘিনীর তীব্র গর্জন। বাঘ যাও বা দেখেছি, তার গর্জন ইতিপূর্বে শুনিনি। বিশ্বাস করুন বেশ পিলে চমকানো টাইপ।
গর্জন করেই বাঘটা গাছপালায় মিশে গেল। প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, "গাড়ি ঘুমাও।" তারপর আমাদের দিকে ফিরে বলল, " ও নামছে জল খাবে বলে। যে পথে নামবে আমরা ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে একদম সামনে থেকে শট পাবেন স্যার।" ঝড়ের গতিতে গাড়ি অনেকটা এগিয়ে একটা ঢালু জায়গায় এসে দাঁড়াল। দুয়েকটা আরও গাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এসে শুনল যখন আমরা বাঘ দেখেছি, তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল এদিকে, ওদিকে। এবার তিনি এলেই হয়। আস্তে আস্তে ছ - আটটা গাড়ি চলে এল। সবাই রুদ্ধশ্বাসে বসে আছি, তাঁর আর দেখা নেই। কি হল রে বাবা, পায়ে বাত ধরল নাকি?
প্রায় কুড়ি পঁচিশ মিনিট পর প্রমীলা বলল, " স্যার লাগতা হ্যায় ও কাহি ব্যাঠ গেই হ্যায়। চলুন জঙ্গলের অন্য দিক গুলোও দেখে আসি, যদি অন্য কাউকে পাওয়া যায়।" আমার বর নড়তে নারাজ। কোথাও যাব না, এখানেই অপেক্ষা করব - ও ঠিক নামবে। এমন বাঘ পাগল লোক, বাঘ দেখবে বলে বিগত তিন রাত ঘুমায়নি। মানে রোজই নাক ডেকে ঘুমিয়েছে, কিন্তু স্মার্ট ওয়াচ বলেছে ঘুমায়নি আর কি। যাই হোক, কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অপেক্ষা করতে করতে মুখে গামছা চাপা দিয়ে প্রমীলা খানিক ঘুমিয়ে নেয়। ঘুমিয়ে পড়ি আমিও।
রোদের তাত ক্রমেই বাড়ছে। প্রমীলা ঘুমিয়েই যাচ্ছে, ড্রাইভার রামসুখ যাদব কচরমচর করে পান চিবিয়েই যাচ্ছে। আমার বর আর মেয়ে ক্যামেরা তাক করে বসেই আছে। পাশ দিয়ে গাড়ি গুলো আসছে, যাচ্ছে। আমরাই কেবল স্থবির। ড্রাইভার সাহেব একবার বললেন, " সাব এহী পে ব্রেকফাস্ট কর লিজিয়ে -"। শৌচালয়-হাত ধোওয়ার জায়গা ওলা শেডে যেতে যেতে যদি বাঘ পালিয়ে যায়।
আমার বরের গলা দিয়ে খাবার নামে কখনও। অগত্যা অভুক্ত বসে বসে মাছি তাড়াই। রাগ করে বলি, " এই শেষ। এবার যদি 'প্রাণ ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে' বাঘ না দেখতে পাই, আর আসব না। আর তোদেরও আসতে দেব না। বলতে না বলতেই কটা গাড়ি ঝড়ের মত আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একটা গাড়ি থেকে ভেসে এল চিৎকার, সামনেই বসে আছে বাঘ। শিকার মেরে খাচ্ছে। এইভাবে কেউ বোকা বানায় মাইরি।
আমরাও দৌড়াই পড়ি কি মরি করে। গন্তব্যে ইতিমধ্যেই গুচ্ছ গুচ্ছ জিপসি দাঁড়িয়ে গেছে, মেঠো রাস্তার ধারে একটা লাল টিলা। টিলার ওপরে নাকি বসে আছেন মহারানী। তিনি সদ্য তিনটি বাঁদর মেরেছেন। সম্ভবত দুটো বাচ্ছা একটা বড়। এখন তাদের দিয়েই উদরপূর্তি করছেন। বাঁদরের কল শুনে তো আমরা বুঝি বাঘ আসছে, এত সাবধানী হয় ব্যাটারা। হরিণকে সাবধান করে দেয়। সেই বাঁদর কি করে বাঘের শিকার হয়। শৌভিক বলে, " বাঁদরামি করছিল নির্ঘাত -"।
একেই বোধহয় Déjà vu বলে । সেই সবাই দেখতে পাচ্ছে আমি বাদে। বাঘ নাকি টিলার ওপর গাছের ছায়ায় বসে মহানন্দে মাথা দোলাচ্ছে, ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাচ্ছে - আর আমি দেখছি আকাশ, পাহাড়, জঙ্গল, মানুষ আর গাড়ি। দূরবীনে চোখ লাগিয়ে লাগিয়ে চোখ ব্যথা করে ফেললাম, বুঝতেই পারলাম না কোন গাছের নীচে বসে প্রাতঃরাশ সারছেন তিনি। বিরক্ত হয়ে প্রমীলা কে শুধাই, এটাই কি মৌসীমা? প্রমীলা জবাব দেয়, না, ইনি হলেন মৌসীমার দিদি, নাম T-17। ওরা আদর করে ডাকে লছমি বলে।
ভাগ্য ক্রমে আজ আমাদের বিয়ের জন্মদিন এবং ১৭ তম জন্মদিন। শৌভিক গদগদ হয়ে বলে, " বিয়ের ১৭ বছরে টি -১৭ দর্শন হল, আহা -"। বিরস মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কেউ চিৎকার করে উঠল, " উঠেছে উঠেছে।" আমার বর আর কন্যা ক্যামেরা তাক করে তৈরি। কিন্তু প্রমীলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, " ভাগা, ভাগা, গাড়ি ভাগা।" একি রে বাবা, সবে লছমিকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে আর এই মেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল।
উড়ন্ত গাড়িতে দাঁড়িয়েই প্রমীলা চিৎকার করে উঠল, " ভরোসা রাখিয়ে, ও ঐ রাস্তা দিয়েই নামবে জল খেতে। একদম সামনে থেকে দেখাবো।" গাড়ি এসে দাঁড়ালো, আমরা এতক্ষণ যেখানে অপেক্ষা করছিলাম। অন্তত মিনিট সাত দশেক কোথাও কোন শব্দ নেই, মাছিদের ভনভন ছাড়া। তার পরই ছুটে আসতে লাগল একের পর এক গাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে সেরা স্পটটা দখল করে নিয়েছে রামসুখ আর প্রমীলা।
ধীরে ধীরে অদূরে টিলার মাথায় দেখা যায় তাকে, গদাইলস্করি চালে তিনি নামতে থাকেন। মুখে আধ খাওয়া একটি বাঁদর। খচখচ করে শব্দ করে সম্মিলিত ক্যামেরা কুল। আমার ক্যামেরা নেই। ফোন ও আনিনি মহামান্য আদালতের নির্দেশ মত। আমি তাই প্রাণ ভরে দেখি। তিনি ঢালু পথে নেমে এসে, আমাদের গাড়িটাকে আড়াআড়ি পার করে, আমার দিকে দরজা ঘেঁষে ঢুকে যান জঙ্গলে। আক্ষরিক অর্থেই জুড়িয়ে দিয়ে যান, পুড়িয়ে দিয়ে যান আমার চোখ। আর আমি, জিপসি থেকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে বলি, " মহারাণী তোমারে সেলাম 🙏🏻"
ছবি সৌজন্য - শ্রী Shouvik Bhattacharya

No comments:
Post a Comment