অনির ডাইরি ১৪ই মে, ২০২৬
#অনিরডাইরি
শ্রীমতী তুত্তুরী তখন বছর চারেকের হবেন, ইনি তার থেকে বছর তিনেকের ধেড়ে। দুটোর কারোরই লেখাপড়ার চাপ নেই, ছোটটা তো তখনও নিরক্ষর (অক্ষর পরিচয় হয়েছে, নাম তো লিখতে পারে না)। অফিস থেকে ফিরে দেখি, দুই পিঠোপিঠি ভাইবোনের হল্লায় শিকেয় উঠেছে মায়ের প্যাঁনপ্যানে বাংলা সিরিয়াল, বাবার সান্ধ্যকালীন সমাচার।
প্রায় কান ধরে দুটোকে টিভির ঘর থেকে টেনে এনে বললাম, " আয় একটা খেলা খেলি -"। দুটোতেই কেমন যেন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে মাপল আমায়, একজনের মা তথা আর একজনের পিসি যে মোটেই খেলুড়ে নয় এটা ওদের বুঝতে বাকি নেই। গেঁড়ি ভদ্রমহিলা কিঞ্চিৎ আক্রমণাত্বক হয়ে এগিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে বললেন, " কি খেলা?" বললাম, বস না তারপর বলছি। মাটিতে যখন গোল হয়ে বসছি তিনজনায়, তখনও জানি না কি খেলা খেলব। ধেড়েটা সেটা বোধহয় কানে কানে বললও ক্ষুদেটাকে। প্রগাঢ় হল উভয়ের কপালের ভাঁজ, থতমত খেয়ে বললাম, " আমরা সবাই সবার একটা করে গুণ বলব -"। বিশদে বোঝালাম এ ক্ষেত্রে গুণ অর্থে সদ বৈশিষ্ট্য, অঙ্ক নয়। কি ভালো লাগে আমাদের একে অপরের মধ্যে।
আজ লিখতে বসে মনে হচ্ছে, দৈনন্দিন ক্লেদ মাখা জীবনে হয়তো নিজের কিছু প্রশংসা শুনতে চেয়েছিলাম আমি। কেউ তো বলুক আমি খুব ভালো। তো যাই হোক, ভাইবোন উভয়ের যে সব গুণ সেদিন খুঁজে বার করেছিল, সেটা আর আমি লিখে আপনাদের বিব্রত করতে চাই না। বিশ্বাস করুন, ওগুলো মোটেও গুণ পদবাচ্য নয়। এবার আমার পালা, বুল্লু বাবুকে বললাম, বল দেখি আমার মধ্যে কি ভালো খুঁজে পাস তুই। খিলখিল করে হেসে তিনি বললেন, "পিসি! পিসির চাকরীটা খুব ভালো।"
বিশ্বাস করুন হৃদয় ফেটে সেদিন সত্যিই আট টুকরো হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা নিষ্পাপ ফুলের মত হয়, ছল কপটতা বিবর্জিত। ওর যা মনে হয়েছে ও সেটাই বলেছে। দোষ যদি কারো থেকে থাকে, তাহলে সেটা আমারই। নিশ্চয় আমার আচার আচরণে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে জাঁদরেল আধিকারিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও ব্যর্থ করেছে স্নেহময়ী পিসি হিসেবে ভাইপোর হৃদয়ে জায়গা করে নিতে। মানুষ ব্যর্থতা থেকেই শেখে, আমিও শিখলাম সেদিন। শিখলাম, কিন্তু হাল ছাড়লাম না। দাঁড়া ব্যাটা, তুই কোন ছাড়, তোর বাপ (এবং মাও)ভালোবাসবে আমায়।
আজ দুপুরে ভদ্রলোক যখন ফোন করলেন বসে বসে পেনশন কেস ছাড়ছি আমি। ফোনটা দেখেই ধড়াস করে উঠল বুকটা। কি আবার হল চাটুজ্জে বাড়িতে। দুরু দুরু বুকে ধরলাম ফোনটা, তিনি বললেন, " পিসি?" বল বাবা। তিনি বললেন, " তোমায় একটা খবর দেওয়ার আছে -"। আমার ভীরু হৃদয় কেঁপে উঠল শুকনো পাতার মত। এইসব কিছু থেকে অনবহিত তিনি স্বভাব সিদ্ধ ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললেন, " আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে -"। হৃদপিণ্ডটা বুঝি লাফিয়ে চলে এল কণ্ঠের কাছে। বুল্লু বাবুর পিতৃদেব অর্থাৎ আমার বড় ভাই মনে করেন তাঁর পুত্র এবং ভাগ্নী দুই মাতব্বর। আমার ধারণা ঠিক তার উল্টো। গরুই চড়াবে দুটোতে এই ভবিষ্যত বাণী আমি প্রায়ই করি। আশা করি বুঝতে পারছেন কেন গুড়গুড়ে ভদ্রলোক আমায় ভালোবাসতেন না এককালে। এমন পিসিকে আবার ভালোবাসা যায় নাকি মশাই, ছ্যা -
কিন্তু আমার ভবিষ্যৎ বাণীকে সর্বাঙ্গীণ ভুল প্রমাণ করে তিনি কইলেন, যে তিনি প্রায় ৮২% নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন। রেজাল্ট বেরোনো মাত্র সেই খবরটা তিনি তার ছোট পিসিকে জানাচ্ছেন, এটা যদি ভালোবাসা না নয়। তাহলে ভালোবাসা কোনটা মশাই। আজ শুধু তিনি ভালো রেজাল্ট করেননি, করেছি আমিও।
চাটুজ্জে বাড়ির গুষ্টিতে কেউ কোনদিন তাঁর মত এত নম্বর পায়নি। সেটা বলেই ফেললাম। তিনি কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ সুরে বললেন, "অনেকে আরও অনেক বেশী নম্বর পেয়েছে পিসি -"। নিকুচি করেছে অনেক বেশী নম্বর আর পার্সেন্টেজের, যে পাচ্ছে পাক। ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করুন। আমার চোখে তো তুইই সেরা বাবা, তোর থেকে ভালো কেউ নেই। খুব ভালো থাক বাবা, অনেক অনেক বড় হ, মানুষের মত মানুষ হ। আমার বাপটা দেখে যেতে পারল না নাতির এই সাফল্য এই যা দুঃখ।
অনির ডাইরি ১লা মে, ২০২৬
#অনিরডাইরি
বাবা থাকলে, আজ ওদের বিয়ের ৫২ বছর পূর্তি হত। ঠিক মধ্যরাত্রে ফোন করতাম আমরা। আমি আর তুত্তুরী, তারপর গুঁতিয়ে ফোনটা ধরাতাম শৌভিকের হাতে। জেগে বসেই থাকত বাবা, গর্বিত ভাবে বলত, "থ্যাঙ্ক ইউ"। মা যথারীতি ঘুম ঘুম গলায় বলত, " তাই নাকি? আজ আমাদের বিয়ে হয়েছিল -"। এবারেও মনে ছিল না মায়ের। মনে করাইনি আমিও। শুধু বলেছিলাম, আজ তোমার কাছে খাব। আলাদা কিছু করো না, টিপিক্যাল ঘটি বাড়ির বিউলির ডাল - আলু পোস্ত হলেই হবে। টুকটুক করে অনেক কিছু করিয়েছিল মা, পোস্ত বাটা, মৌরোলা মাছ ভাজা, পুকুরের টাটকা কাতলা মাছের ঝাল, বাড়ির গাছের এঁচোড় চিংড়ি দিয়ে, আমের অম্বল, পায়েস। মা করিয়েছিল থোড়াই, করেছিল তো লতা দি আর ছুটকি। চোখ অপারেশনের পর বেশ কিছুদিন আগুন ধারে যেতে পারেনি লতা দি, আজ তাই আশ মিটিয়ে রান্না করেছে তার সোনা মা (শ্রীমতী তুত্তুরী) এর জন্য। কিনে এনেছে আইসক্রিম ও।
অনেক গল্প করলাম আমরা। পিসি নেমে এল দোতলা থেকে। সব গল্পের সব বাক্যে একটাই ধ্রুবক, সেটা হল বাবা। আমরা এমন ভাবে কথা বলছিলাম, সমালোচনা করছিলাম, ঠাট্টা করছিলাম বাবাকে নিয়ে যেন বাবা পাশের ঘরেই আছে। এখুনি এসে বসবে ডাইনিং টেবিলে আর বলবে, " আমায় নিয়ে মস্করা হচ্ছে -"। পিসি ছাড়া কেউ কাঁদিনি আমরা, সবাই সবার সামনে লোহার মুখোশ পরে ঘুরেছি। আমরা সবাই যে বীরাঙ্গনা। চলে আসার সময় তুত্তুরীকে বললাম একটা ছবি তুলে দে তো, মায়ের আর আমার। ২০০৮ এ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা ইস্তক প্রতি বছর আজকের দিনে ওদের একটা যুগল ছবি লাগাই আমি। এ বছর বাবা নেই তো কি হয়েছে, আমি তো আছি। আমার মধ্যেই বেঁচে আছে আমার বাবা। মাকে আঁকড়ে ধরে সেটাই বললাম, আমি আছি। আমি সবসময় আছি, আর আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না মা।

No comments:
Post a Comment