অনির ডাইরি ১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
মা যখন বলল, " এই তুই টাকা তুলে আনতে ভুলে গেছিস -,"ঘড়িতে তখন রাত নটা। জানলার কাঁচে জমছে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মিহি জলকণা। কিসের টাকা, প্রশ্ন করতে গিয়ে মনে হল, কপালে করাঘাত করি। আজ মাস পয়লা, মায়ের মাসের খরচের টাকা তুলে দেওয়ার কথা ছিল আমার। ভেবেও ছিলাম, অফিসে এক ফাঁকে তুলে নেব। পাঁচ রকম ঝামেলা যার উৎস এবং বিধেয় দুইই আমি, ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে মাথাটা। তারওপর আবহাওয়াটাও কেমন যেন ভয় দেখানে মার্কা।
জিভ কেটে বলি, পরের দিন যখন আসব, তুলে আনলে হবে না? মা মাথা নাড়ে, হ্যাঁ-না কিছু বুঝি না। সংকুচিত কণ্ঠে বলে, "আজ সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে সব পয়সা ফুরিয়ে গেছে।" মা অমন বলে, আমার মা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, নির্ঘাত ব্যাগ হাতড়ালে কিছু বেরোবে। " দেখো না। দেখো না" বলে উৎসাহিত করি আমি।বেরোয় বটে, গুটি কয়েক একশ, পঞ্চাশ, কুড়ি টাকার নোট। মা বলে, "এতেই হয়ে যাবে।" দেওয়াল থেকে হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে বাবা।
বুড়ো জীবিত থাকাকালীন, কোনদিন এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি মাকে। মা তো কিছুই জানত না, কোথায় আধার কার্ড থাকে আর কোথায় ব্যাঙ্কের বই। মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্সের ফাইল কোনটা, জমির কাগজ কোথায় থাকে। কিছু কিছু জাস্ট মজার ছলেই দেখিয়ে রেখেছিল বাবা আমায়। ভাগ্যে রেখেছিল -
বাবার মত রাখতে পারিনি মাকে আমি, প্রতিদিন চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই। আজই দেখো না। জানলার বাইরে বাড়ল বুঝি বৃষ্টির দাপট, ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে নয়। দেওয়াল থেকে ঝুলন্ত বাবা বুঝি অন্য কিছু কয়। সারাদিন অফিস করা তেল প্যাটপ্যাটে মুখচোখ, উস্কোখুস্কো চুলেই, গলিয়ে নিই বাইরের পোশাক। মা আটকাবার শতেক চেষ্টা করে। খুঁজে বার করে একটা ছোট্ট টিফিন কৌটো, যার মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা জমানো আছে বাবার, অধিকাংশই কুড়ি টাকার নোট, কিছু কয়েন। মা বলে," এতেই হয়ে যাবে আমার। কি আর এমন লাগে -"। টনটন করে আমার চোখ আর গলা, এই বুঝি উপচে যায় নয়ন জলাধার।
পাড়ার রাস্তাঘাট এর মধ্যেই শুনশান। বৃষ্টিটা না পড়লেও, জমে আছে জল। সাবধানে হাঁটি আমি, কাল এই পোশাকেই অফিস যাব যে। মিটিং আছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত উৎসুক মুখগুলোকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর মুখে হেঁটে যাই মোড়ের মাথা। আমাদের ব্যস্ততম রাজপথ এখন জনশূন্য না হলেও বেশ ফাঁকা। একটা টোটো এসে দাঁড়ায় সামনে, একটি মেয়ে নামে। টোটোয়ালার গন্তব্য অনেক দূর, তবে সামান্য ঘুরে আমায় বাজারে নামিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। সহযাত্রী বাকি তিনজনের দুই জন মহিলা। নির্দ্বিধায় উঠে পড়ি।
ভেজা রাজপথ দিয়ে যেন উড়ে যায় টোটোটা। বাজারের পথ ধরতেই মৃদু প্রতিবাদ করেন একজন সহযাত্রী, " আবার বাজারের রাস্তা নিলে কেন -"। এটিএম এর সামনে নেমে, অভ্যাসবশত দ্রুত গতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাই আমি। পেরোবার পর খেয়াল হয়, রাস্তা এখন একদম ফাঁকা। ATM এর ভিতরে বিশাল লাইন। সর্বনাশ, এত রাতেও! আজ এগারোটা বাজবে নির্ঘাত। সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করি, " ভাই এটা টাকা তোলার লাইন তো?' ছেলেটি জবাব দেয় জমা করার। এতজন মানুষ, এত রাতে টাকা জমা করতে এসেছেন! ভিড়ে জনা দুই মহিলাও আছেন দেখি। বুঝতে পারি, স্থানীয় ব্যবসায়ী। ঝাঁপ ফেলার পর, সারা দিনের উপার্জন জমা করতে এসেছেন -
একটি অল্পবয়সী ছেলে সহৃদয় ভাবে বলে, " ঐ মেশিনটা ফাঁকাই থাকবে, আপনি তুলে নিন।" কেউ প্রতিবাদ করে না। লাইন ভেঙে টাকা তুলি আমি। বেরিয়ে আসার সময় একটু ভয়ভয় লাগে, কেউ কেড়ে নেবে না তো। একটা টোটো যেন আমার প্রতীক্ষাতেই বসে ছিল কোথাও। ঝিমোতে ঝিমোতে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। বাড়ির গলির সামনে এসে যখন নামলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত দশটার ঘর ছুঁই ছুঁই। কত বার, পড়ে ফিরেছি এই সময়। গলির উল্টো দিকে রিক্সাওয়ালাদের শিব মন্দিরের চাতালে বসে থাকত বাবা। একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম দুজনে। হেরে যাবার গল্প বলতাম আমি, জিতে যাবার গল্প শোনাত বাবা। আজ জিতে গেছি, শুধু হারিয়ে গেছে বাবাটাই।
কাল্পনিক বাপের সাথে গল্প করতে করতে পথ হাঁটি, যেখানেই থাকো, শুধু এইটুকু আশীর্বাদ করো, তোমার বউটাকে যেন ভালো রাখতে পারি। বাকি হারজিতে আর আমার কিস্যু যায় আসে না বাবা।

No comments:
Post a Comment