অনির ডাইরি ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
ভোররাত থেকে বলছিল শৌভিক, " তোকে আজ আর যেতে হবে না।" গতরাতে নাকি আকাশ ভেঙে পড়েছিল আমাদের মহল্লায়, যেমন মুষলধারে বৃষ্টি, তেমন বজ্রপাত। মুহুর্মুহু বাজ পড়ার শব্দে ঘুমোতে পারেনি শৌভিক, আমি অবশ্য কিছুই টের পাইনি।
তবে সকাল বেলা যখন পর্যায়ক্রমে ডুব মারল বাসন মাজার দিদি আর ফেল হল আমাজনের ডেলিভারি, বাইরে যে বিকট জল জমেছে, বুঝতে অসুবিধা হল না।
শৌভিক আবার বলল, " যাস না।" সাধ করে চেয়ে নেওয়া কলকাতা ট্রেনিং, আমার মত যাঁরা মহানগর বা তার আশেপাশের বাসিন্দা আর কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, এমন একেকটা ট্রেনিংয়ের মাহাত্ম্য তাঁরাই বুঝবেন।
তাই বলে এত জল! ভাগ্যে শাড়ি পরিনি, তুত্তুরী যে কেন হাফপ্যান্ট পরতে বলছিল বেশ বোঝা যায়। জলে ডোবা ফুটপাথ ধরে হেঁটে গিয়ে উঁচু বাসস্ট্যান্ড। উঠে হাঁটু অবধি প্যান্ট গোটালাম দুই জন। বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে শৌভিকের আপিসের গাড়ি। জল উত্তরোত্তর বাড়ছে। পাশ দিয়ে জল ছিটিয়ে যেতে গিয়ে খারাপ হয়ে গেল একটা ভলভো বাস, তার ঢেউয়ে ভিজে গেল হাঁটুর ওপরে গুটিয়ে রাখা প্যান্ট ও।
ফুটপাথ শেষ হবার আগে রিক্সা ধরার চেষ্টা করল শৌভিক, কেউ যেতে রাজি নয়। ফুটপাথ থেকে নামতেই জল উঠে এল গোড়ালি আর হাঁটুর মাঝামাঝি। শৌভিক ঘুরে বলল, " ফিরে যা, ভালো কথা বলছি।" বললাম, চল দুজনেই ফিরে যাই, তাতে তিনি নারাজ। আমার বর আপিস না গেলে কি এই বিশ্ব সংসার চলবে মশাই, ধড়াম করে থেমে যাবে না সবকিছু। কপাল গুণে ঠিক এই সময়েই পেয়ে গেলাম একটা রিক্সা। সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে দাবী করল আশি টাকা।
আমার বর ইতিমধ্যে জল ঠেলে এগিয়ে গেছে বেশ খানিকটা। জল আপাতত ওর হাঁটু অবধি, দর করার আমার কোন অবকাশ নেই।
কিছুটা যেতেই খারাপ হয়ে গেল রিক্সার ব্যাটারি। রিক্সাটাও এমন গর্তে আটকে পড়ল যে সেই শৌভিকেই নেমে ঠেলতে হল। আমায় কেউ নামতে বলেনি, আমি নামিও নি। নির্ঘাত কোমর জল হবে।
গাড়িতে উঠে বাকি পথটা বরের মুণ্ডুপাত করতে করতেই গেলাম। কে বলেছে এমন দিনে অফিস যেতেই হবে? না গেলে কি হবে? তোকে কে কর্মচারী রত্ন পুরস্কার দিয়েছে আমায় দেখা ইত্যাদি প্রভৃতি।
পারিপার্শ্বিক অব্যবস্থা, বরের গোঁয়ার্তুমি আর ভেজা পোশাকের অস্বাচ্ছন্দ্য দূর হয়ে গেল ট্রেনারকে দেখে। " তুমি পড়াবে বি দি!" শ্রীমতী বিদিশা ভট্টাচার্য, নার্ভাস ভাবে হেসে নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে তোলে খানিক। মাথার চুলে আঙুল চালায়। হাসি চেপে ছাত্রী সুলভ গম্ভীর হই আমি, খুব ভালো করেই জানি, এইসব পড়ানো/ ট্রেনিং দেওয়া এই ভদ্রমহিলার দুই চক্ষের বিষ। ভরা মিটিংয়ের এক কোণায় লুকিয়ে, মুঠো ফোনে বই পড়েন ভদ্রমহিলা। জনসমক্ষে ধারা বিবরণী দিতে যে কালঘাম ছুটছে বেশ বুঝি।
কিন্তু ঐ আর কি, আমরা সবাই হুকুমের চাকর। অচীরেই এই রাজ্যে লাঘু হতে চলেছে নতুন শ্রম আইন। OSH কোড (অকুপেশনাল সেফটি এন্ড হ্যাজার্ডস কোড), সেই নিয়েই আজকের সেশন। ১৩ টা পুরাতন আইনকে একত্রিত করে তৈরি এই আইন নিয়ে বিশদে পড়া এবং শোনা হয়।
সেশন শেষে ফিসফিস করে বলি, " সিসিডি যাবে?" ক্লাসের মধ্যেই বসে খুঁজছিলাম আসেপাশে কোথায় ভালো কফিশপ আছে। বি দি একগাল হেসে বলে, " হ্যাঁ চল। কতদিন কোথাও বসি না।"
বেরোবার আগে স্টেট লেবার ইনস্টিটিউটের একেবারে ঘরোয়া এবং আন্তরিক লাঞ্চে বসতেই হয়। বড় যত্ন করে খাওয়ায় এরা। ভাত - সব্জি দিয়ে ঘন মুগের ডাল- ঝুরি আলুভাজা - দই দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি আলু পটলের তরকারি - দই কাতলার পেটি - খেজুর আমসত্ত্ব দিয়ে টমেটোর চাটনি - পাঁপড় - বাটারস্কচ সন্দেশ হয়ে মুখ শুদ্ধি অবধি সবকটাই ১০/১০। খুব সামান্য খাই আমরা। কফি খেতে হবে যে।
এবার গুটিগুটি বেরিয়ে যাওয়ার পালা। নামতে যাব দেখি দুই ইনস্পেক্টর সহ গুটিগুটি উঠে আসছে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জয়িতা। মাইরি এই ভাবে কেউ রাউন্ড মেরে ভয় দেখায়? বি দি দায়িত্ব নিয়ে, মিষ্টি করে হেসে বলে, " একটু কফি খেয়ে আসি, অনেকদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা -"।
অনির ডাইরি ১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
#অনিরডাইরি
মা যখন বলল, " এই তুই টাকা তুলে আনতে ভুলে গেছিস -,"ঘড়িতে তখন রাত নটা। জানলার কাঁচে জমছে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মিহি জলকণা। কিসের টাকা, প্রশ্ন করতে গিয়ে মনে হল, কপালে করাঘাত করি। আজ মাস পয়লা, মায়ের মাসের খরচের টাকা তুলে দেওয়ার কথা ছিল আমার। ভেবেও ছিলাম, অফিসে এক ফাঁকে তুলে নেব। পাঁচ রকম ঝামেলা যার উৎস এবং বিধেয় দুইই আমি, ধুয়ে সাফ করে দিয়েছে মাথাটা। তারওপর আবহাওয়াটাও কেমন যেন ভয় দেখানে মার্কা।
জিভ কেটে বলি, পরের দিন যখন আসব, তুলে আনলে হবে না? মা মাথা নাড়ে, হ্যাঁ-না কিছু বুঝি না। সংকুচিত কণ্ঠে বলে, "আজ সবাইকে বেতন দিতে গিয়ে সব পয়সা ফুরিয়ে গেছে।" মা অমন বলে, আমার মা সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, নির্ঘাত ব্যাগ হাতড়ালে কিছু বেরোবে। " দেখো না। দেখো না" বলে উৎসাহিত করি আমি।বেরোয় বটে, গুটি কয়েক একশ, পঞ্চাশ, কুড়ি টাকার নোট। মা বলে, "এতেই হয়ে যাবে।" দেওয়াল থেকে হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে বাবা।
বুড়ো জীবিত থাকাকালীন, কোনদিন এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি মাকে। মা তো কিছুই জানত না, কোথায় আধার কার্ড থাকে আর কোথায় ব্যাঙ্কের বই। মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাক্সের ফাইল কোনটা, জমির কাগজ কোথায় থাকে। কিছু কিছু জাস্ট মজার ছলেই দেখিয়ে রেখেছিল বাবা আমায়। ভাগ্যে রেখেছিল -
বাবার মত রাখতে পারিনি মাকে আমি, প্রতিদিন চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই। আজই দেখো না। জানলার বাইরে বাড়ল বুঝি বৃষ্টির দাপট, ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে নয়। দেওয়াল থেকে ঝুলন্ত বাবা বুঝি অন্য কিছু কয়। সারাদিন অফিস করা তেল প্যাটপ্যাটে মুখচোখ, উস্কোখুস্কো চুলেই, গলিয়ে নিই বাইরের পোশাক। মা আটকাবার শতেক চেষ্টা করে। খুঁজে বার করে একটা ছোট্ট টিফিন কৌটো, যার মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা জমানো আছে বাবার, অধিকাংশই কুড়ি টাকার নোট, কিছু কয়েন। মা বলে," এতেই হয়ে যাবে আমার। কি আর এমন লাগে -"। টনটন করে আমার চোখ আর গলা, এই বুঝি উপচে যায় নয়ন জলাধার।
পাড়ার রাস্তাঘাট এর মধ্যেই শুনশান। বৃষ্টিটা না পড়লেও, জমে আছে জল। সাবধানে হাঁটি আমি, কাল এই পোশাকেই অফিস যাব যে। মিটিং আছে গুরুত্বপূর্ণ। পরিচিত উৎসুক মুখগুলোকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর মুখে হেঁটে যাই মোড়ের মাথা। আমাদের ব্যস্ততম রাজপথ এখন জনশূন্য না হলেও বেশ ফাঁকা। একটা টোটো এসে দাঁড়ায় সামনে, একটি মেয়ে নামে। টোটোয়ালার গন্তব্য অনেক দূর, তবে সামান্য ঘুরে আমায় বাজারে নামিয়ে যেতে রাজি হয়ে যায়। সহযাত্রী বাকি তিনজনের দুই জন মহিলা। নির্দ্বিধায় উঠে পড়ি।
ভেজা রাজপথ দিয়ে যেন উড়ে যায় টোটোটা। বাজারের পথ ধরতেই মৃদু প্রতিবাদ করেন একজন সহযাত্রী, " আবার বাজারের রাস্তা নিলে কেন -"। এটিএম এর সামনে নেমে, অভ্যাসবশত দ্রুত গতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাই আমি। পেরোবার পর খেয়াল হয়, রাস্তা এখন একদম ফাঁকা। ATM এর ভিতরে বিশাল লাইন। সর্বনাশ, এত রাতেও! আজ এগারোটা বাজবে নির্ঘাত। সামনের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করি, " ভাই এটা টাকা তোলার লাইন তো?' ছেলেটি জবাব দেয় জমা করার। এতজন মানুষ, এত রাতে টাকা জমা করতে এসেছেন! ভিড়ে জনা দুই মহিলাও আছেন দেখি। বুঝতে পারি, স্থানীয় ব্যবসায়ী। ঝাঁপ ফেলার পর, সারা দিনের উপার্জন জমা করতে এসেছেন -
একটি অল্পবয়সী ছেলে সহৃদয় ভাবে বলে, " ঐ মেশিনটা ফাঁকাই থাকবে, আপনি তুলে নিন।" কেউ প্রতিবাদ করে না। লাইন ভেঙে টাকা তুলি আমি। বেরিয়ে আসার সময় একটু ভয়ভয় লাগে, কেউ কেড়ে নেবে না তো। একটা টোটো যেন আমার প্রতীক্ষাতেই বসে ছিল কোথাও। ঝিমোতে ঝিমোতে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। বাড়ির গলির সামনে এসে যখন নামলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত দশটার ঘর ছুঁই ছুঁই। কত বার, পড়ে ফিরেছি এই সময়। গলির উল্টো দিকে রিক্সাওয়ালাদের শিব মন্দিরের চাতালে বসে থাকত বাবা। একসাথে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম দুজনে। হেরে যাবার গল্প বলতাম আমি, জিতে যাবার গল্প শোনাত বাবা। আজ জিতে গেছি, শুধু হারিয়ে গেছে বাবাটাই।
কাল্পনিক বাপের সাথে গল্প করতে করতে পথ হাঁটি, যেখানেই থাকো, শুধু এইটুকু আশীর্বাদ করো, তোমার বউটাকে যেন ভালো রাখতে পারি। বাকি হারজিতে আর আমার কিস্যু যায় আসে না বাবা।


No comments:
Post a Comment