Sunday, 8 March 2026

অনির ডাইরি মার্চ, ২০২৬

 অনির ডাইরি ৮ই মার্চ, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 

আমার মা হল, "নিষ্পাপ মায়েদের শেষ প্রজন্ম"র পতাকাবাহক। যতদিন জেঠু জীবিত ছিলেন মা মাথায় ঘোমটা দিত। পাড়ায় বেরোলেও মাথা ঢেকে নিত ঘোমটার আড়ালে। রেঁধে খাইয়ে পরম সুখ পেতে মা। যতদিন মায়ের কাছে থেকেছি, কোনদিন ভাত না খেয়ে বেরোই নি। সে স্কুল, কলেজ, চাকরি যাই থাকুক না কেন। যত সকালেই বেরোই না কেন। নাহ্ সিদ্ধ বা এক তরকারি ভাত নয়, রীতিমত একটু তিতো, একটু ডাল, একটা ভাজা, একটু পোস্ত, একটা মাছ বা ডিমের কারি, শেষ পাতে একটু অম্বল। শুধু কি তাই, কি যে যত্ন করে টিফিন গুছিয়ে দিত মা। ধেড়ে বয়সে সবাই কিনে খেত যখন, আমি ব্যাগ থেকে বার করতাম স্টিলের টিফিন কৌটো, যার মধ্যে দুটি রুটি দিয়ে ঘেরা একটি ছোট কৌটোয় তরকারি, আর একটি কৌটোয় মিষ্টি। মায়ের আঁচলে সত্যিই মিশে থাকত তেল হলুদের মুদিখানা মার্কা গন্ধ। আমার শৈশবের গন্ধ - 


এহেন আমার মহীয়সী জননী যখন ঠ্যাঙাতেন, তখন সেটাও ছিল দেখার এবং শোনার মত বিষয়। মা নীরবে ঠেঙিয়ে যেত, চিৎকার তো করতাম আমি। দশভূজা মতোই মায়ের ছিল দশ অস্ত্র- খুন্তি , হাতা, স্কেল, হাতপাখার বাঁট, চিরুনি থেকে হাওয়াই চপ্পল। ফতে -১১০ এর থেকেও দ্রুত গতিতে এবং অব্যর্থ লক্ষে লাগত মায়ের চটি। খাটের তলায় ঢুকে গেলে, হামাগুড়ি দিয়ে সেখানেও তাড়া করতেন ভদ্রমহিলা। 


এহেন নিষ্পাপ জননীর কাছে যখনই কেউ আমার নামে নালিশ করত, হতবাক হয়ে দেখতাম মা তার কথাই বিশ্বাস করত। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ জুটত না মাইরি আমার কপালে। আমি সেই কোন কৈশোর থেকে তসলিমার শিষ্যা, নারীবাদ, নারী স্বাধীনতা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একজন সবলা স্বাধীনচেতা উঠতি নারীকে সহ্য করা কি এতই সহজ-। নারীবাদের শিক্ষা যে মাকেও দিতাম না তা নয়, কিন্তু মা শুনলে তো।  মায়ের সামনে মাকে নিয়ে চর্চা হত, আর আমার মহীয়সী জননী নীরবে সইতেন। আমি ফুঁসে উঠলে বলতেন, " ঠাকুর বলে গেছেন যে সহে, সে রহে"। কত সইবে রে ভাই, সইতে সইতে তো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তোমার। 


আমি মুখরা এবং "লায়েক" হবার পর প্রত্যক্ষ আঘাত কিছু কমল বটে, চোরাগোপ্তা চলতেই থাকে। আমি পরে শুনি, অক্ষম রাগে মায়ের ওপর চিৎকার করি, একগাল হেসে মা বলে, " বলে আর কি করবে -"।  এই তো সেদিন, হাসপাতাল থেকে বাবাকে নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকলাম বেলা তখন দুটো, সেই সকাল আটটা থেকে হাসপাতালে বসে ছিলাম, ক্ষিদেয় তেষ্টায় অবস্থা কাহিল, তারই মধ্যে মা নালিশ করল, আমার জন্য মাকে কথা শুনতে হয়েছে, আমি নাকি জনৈকা আত্মীয়ের ফোন কেটে দিয়েছি। এত লায়েক কি করে হতে পারি আমি, যে গুরুজনের ফোন কেটে দেব? 


উদ্গত ক্রোধকে গিলে নিজের দুটো ফোনের হিস্টরি খুলে দেখালাম, কোথায় ফোন এসেছে আর কবে ফোন কেটেছি! বিগত একবছরে কোন ফোন আসেনি ওনার থেকে। ভদ্রমহিলা কি বুঝলেন ভগবান জানে, সেদিন আর কথা বাড়ালেন না। 


দিন দুয়েক পর, অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছি, শুনতে হল, " তুই ফোনটা কেন কাটলি?এটা কি ঠিক করলি?" এক প্রস্থ চিৎকার করার পর শুনতে হল, " তুইই কেটেছিস। আমাকে ফোন করেছিল, তুই কেটে দিয়েছিস।" গোটা কয়েক দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে, একটু শান্ত হয়ে শুধালাম, তোমার ফোনে কেটেছি? সেটা কি ওনাকে শুনিয়ে কেটেছি? মা অভিমানী সুরে বললে, " না ধরিসই তো নি। এমনিই কেটে দিয়েছিস।" বলি, তাহলে আমি কাটলাম, না তুমি কাটলে, নাকি বেজে বেজে কেটে গেল বুঝল কি করে! তোমার ফোন তো শতকরা ৯০ ভাগ সময় এমনিই বেজে বেজে কেটে যায়। তুমি শুনতেই পাও না। তাহলে আমি দোষী হই কি করে - 


অকাট্য যুক্তি, সেদিনের মত শান্ত হলেন মা জননী। তার দিন দুয়েক পর, শুনতে হল, " কাজটা কিন্তু খুব অন্যায় করেছিস? তুই আমার ফোন থেকে ওকে ব্লক করে দিয়েছিস কেন?ও আমায় ফোন করতে পারছে না -" আর রাগ হল না, ক্লান্ত হয়ে শুধালাম, মাইরি মা, আমার কি সারাদিন কোন কাজ নেই, আত্মীয়স্বজনের ফোন কাটা আর ব্লক করা ছাড়া! তুমি ওনাকে ফোন করতে পারছ, জবাব এল, "হ্যাঁ, আমি পারছি। কিন্তু ও তো পারছে না।" কপালে আক্ষরিক অর্থে করাঘাত করে বলতে গেলাম ব্লক মানে কেউ কারো যোগাযোগ করতে পারবে না। তারপর মনে হল বুঝিয়েই বা কি লাভ, এই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস আর অখণ্ড সরলতা এটাই তো  "Last generation of innocent mothers" দের বৈশিষ্ট্য। ভাগ্যে আমরা এমন নিষ্পাপ নই, বেশ পাপীতাপি। 

আজ বিশ্বনারী দিবসের শুভলগ্নে সকল নিষ্পাপ এবং পাপী নারীদের জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা। রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভাষায় বলি, "Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls" ✊🏻✊🏻✊🏻🩷

No comments:

Post a Comment