Friday, 6 February 2026

অনির ডাইরি ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

 

অনির ডাইরি ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ 

#অনিরডাইরি 


উদ্দাম গলায় গাইছেন তিনি, " ধীরে সে এক নগমা কোই শুনা গ্যায়া হ্যায়, ও কৌন হ্যায় জো আ'কর খোয়াবো পে, ছা গ্যায়া হ্যায় -"। চোখ বন্ধ করে শুনছে বাবা, বুকের ওপর রাখা দুই হাতের তর্জনী উঠছে নামছে তালে তালে। মাস খানেক হল বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না বাবা, জাগতিক সবকিছু থেকে যেন বিচ্ছিন্ন বাবা। সংসার চালানোর দায় এসে পড়েছে মা আর আমার ঘাড়ে। অফিস ফেরৎ এতক্ষণ সেই হিসেবই মেলাচ্ছিলাম দুজনে। প্রায় সতেরো বার বুঝিয়ে দেবার পরও কিছু বুঝতে পারে না মা। শেষে ধুত্তোর বলে উঠেই পড়ি আমি। সব কিছুর জন্য দায়ী এই একটা লোক। সারাজীবন সব দায়িত্ব একাই সামলেছে, কিছু নিয়েই মাথা ঘামাতে হয়নি আমাদের, আজ ইলেকট্রিক বিল দিচ্ছি তো টিভির রিচার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটা ফোন রিচার্জ করছি তো আর দুটো বন্ধ হয়ে বসে থাকছে। বাড়ি জুড়ে কিছু না কিছু খারাপ হতেই থাকছে, হয় আলো, নয় কল, নয়তো অন্য কিছু। কাগজওয়ালার হিসেব করতে বসে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে, বিভিন্ন বারের কাগজের বিভিন্ন মূল্য কেন হয় রে বাবা। 


বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতেই গানটা চালিয়েছিলাম, মায়ের পছন্দ বাংলা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত। তাও হিন্দিই চালালাম, ওপি নাইয়ার এবং গীতা দত্ত। বাবার প্রিয় জুটি। ChatGPT সমানে বলছে তোমার বাবার মানসিক অবসাদ হয়েছে অনি, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাও। খুঁজে খুঁজে হদ্দ হয়ে গেলাম, কেউ বাড়ি এসে দেখতে চায় না আজকাল। এই শয্যাশায়ী মানুষটাকে কার কাছে টেনে নিয়ে যাব আমি? তাও একজনের নম্বর দিল সেদিন রুণা, কপালের এমন গেরো সেই রাত থেকেই জ্বরে পড়ল বাবা। সারা রাত কোঁকানি আর গোঙানি। কথা বললেই রেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। যাও বা উঠে বসে খাচ্ছিল, তাও ছেড়ে দিল। দুটোই, ওঠা এবং খাওয়া। 

কি যে দিন গেছে, ঈশ্বর মঙ্গল করুন পাড়াতুতো ভাইটার, নিজে ভাইটালস চেক করে ডাক্তার বাবুর সাথে ফোনে কথা বলে, রক্ত পরীক্ষা করিয়ে, ওষুধ পর্যন্ত কিনে এনে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের। সেই ওষুধের জোরেই একটু ভালো আছে বাবা। 


অফিস থেকে ফিরে মায়ের সাথে হিসেবের যুদ্ধে বসার আগে বেশ অনেকক্ষণ গল্প করলাম আজ। কিছুই জানে না বাবা, সুপ্রিম কোর্টের অর্ডার, এপস্টিন ফাইল, ভেনেজুয়েলার মাদুরো, ইরানে তুলকালাম মায় SIR। "সেই যে গো তোমাদের নাম লিখে ফর্ম ফিল আপ করেদিলাম।" কাল অবধি এইভাবে বললে, বাবা সিড়িঙ্গে হাত তুলে ঘুঁষি মারতে আসত হয়তো, আজ অবাক হয়ে সব শুনল। গতকালের কাগজটা এনে দিলাম পড়ার জন্য, বেশীক্ষণ পড়ল না অবশ্য। 


তাতে কি - তাও তো আশার আলো। গান চালিয়ে বললাম, " বাবা ওপি নাইয়ার", বাবা বলল, " মোটেই না। এটা মদনমোহন মনে হচ্ছে।" গান থামিয়ে দেখলাম, সত্যিই এটা মদনমোহন এর সুর। পয়সার থলেটা রাখতে এসে মাথা দোলাচ্ছিল মা, বাবার দিকে তাকিয়ে সোহাগী সুরে শুধাল, " আর গলাটা কার গো, খুব চেনা চেনা লাগছে -"। আমরা বাপ মেয়ে একসাথে বলে উঠলাম, " গীতা দত্ত তো।" "ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, গীতা দত্ত। আহা কি সুন্দর গলা -" জিভ কেটে বলে মা। উফ মা, তুমি গীতা দত্তর গলা ভুলে গেছ, তোমার পিতৃদেবের নাম মনে আছে তো, একটু প্রগলভ হয়েই বলি আমি, সরল ভাবে জবাব দেয় মা, " সদানন্দ"। আর আমার বাবার নাম?সাহস পেয়ে বুঝি আরো একটু ছ্যাবলা হই আমি। লাজুক হেসে মা বলে, " সেটা কি কোনদিন ভুলতে পারি। আমার জীবনটাই তো ঐ লোকটাকে ঘিরে -" বলতে বলতে ধপ করে বাবার পাশে বসে পড়ে মা। বাবা ইশারায় বলে, "কপালটা একটু টিপে দাও তো -"। মুঠো ফোনে তখন গান ধরেছেন রফি সাহেব, " শবাব আপকা নাশে মে খুদ হি চুর চুর হ্যায় -"।


অনির ডাইরি ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

#অনিরডাইরি 


রাতের দাসনগর স্টেশন। কে বলবে আপিস টাইম পেরিয়েছে ঘন্টা খানেক আগে! রাস্তায় অন্তত পাঁচ কোটি টোটো আর আড়াই কোটি বাইক মিলে রচনা করেছে দুর্ভেদ্য যানজট। মাঝে মাঝে গদাইলস্করী চালে প্রবেশ করছে দুয়েকটা বাস। 


 ট্রেন থেকে নেমে, রাস্তা পেরোবো বলে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে আছি। কয়েকজন অত্যুৎসাহী কয়েক পা এগোচ্ছেন আবার দৌড়ে ফিরে আসছেন। এটা এখানকার নৈমিত্তিক ঘটনা।এই জাল কাটা কি এত সহজ? একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, যেদিন উর্দি ধারী পুলিশ থাকে, সেদিন তিনি দৌড়ে এসে দুভাগ করে দেন এই বিপুল যানজট। আজ নির্ঘাত সিভিক আছে, সে বেচারা খানিক চেষ্টা যে করে না তাও নয়, তারপর হতোদ্যম হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। 


সবুরে মেওয়া ফলে, আমিও রাস্তা পেরিয়ে একটা টোটো পাই। তিনি অবশ্য কানায় কানায় না ভরলে ছাড়বেন না। বসে বসে প্রার্থনা করি, হে ঠাকুর আর একটা লোক জুটিয়ে দাও। একেকদিন তিনি সত্যিই মুখ তুলে চান। রাস্তার ওপার থেকে ভেসে আসে রুক্ষ মহিলা কন্ঠ, " টোটো, অ্যাই টোটো। দাঁড়াও -"। যানজটের মায়াজাল ছিন্ন করে তিনি দৌড়েও আসেন, ঠিক তখনই কোথা থেকে এসে উদ্যত হন এক বৃদ্ধ সাইকেল আরোহী এবং তাঁর সাইকেলের সামনের চাকাটা স্পর্শ করে মেয়েটির তনুলতা। 


ক্যালিগুলা মাইনাসের সেই বিখ্যাত ঘুঁষির মতোই ঠুস্ করে লাগে ধাক্কা, মেয়েটি ঝাঁঝিয়ে ওঠে, " দেখে চালাতে পারেন না?" সাইকেল আরোহী বৃদ্ধ ও তেরিয়া হয়ে জবাব দেন, " রাস্তা দেখে পেরোতে পারো না?" ব্যাস লেগে যায় "তুম তা না না না" ঝগড়া। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে দুর্দম গতিতে। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর, তার মধ্যে এদের এই গলার শির ফোলানো ঝগড়া, কাঁহাতক ভালো লাগে। বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেলি, " ছাড়ো না, দেখছই তো বয়স্ক মানুষ -"। 

মেয়েটি কিছু বলে না, গায়ে খদ্দরের চাদর আর মাথায় মাংকি ক্যাপ পরিহিত বৃদ্ধ তেড়ে আসেন, " বয়স্ক মানুষ! কে বয়স্ক মানুষ? কোথায় বয়স্ক মানুষ?" বৃদ্ধের তেজ দেখে পাশের সহযাত্রী ছেলেটি বলে, "দেখছেন তো দিদি, আজকাল কারো ভালো করতে নেই।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করি, এই যে আমি দাদা। আমি বয়স্ক মানুষ ভাই।" অতঃপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলি, "ভুল হয়ে গেছে ভাই, তুই ঝগড়া চালিয়ে যা।"

No comments:

Post a Comment