অনির ডাইরি ১১ই এপ্রিল, ২০২৬
#অনিরডাইরি
দুটো ইঁটের মাঝে এক গোছা পাটকাঠি জ্বেলে তারওপর চাপানো একটা মাটির সরা। সরায় খানিক গঙ্গা জল আর কিছুটা আতপ চাল, একটু ফুটে উঠতেই নামিয়ে নিল পুরুত ঠাকুর। শ্মশানেই থাকেন ভদ্রলোক। কাজ করতে করতেই গল্প করছিলেন, এখন গ্রীষ্ম তাই দিনের বেলাটা ফাঁকাই থাকেন, ভিড় হয় রাতে। শীতকালে ঠিক উল্টো, দিনের বেলায় ভিড় বাড়ে শবদেহ তথা যাত্রীদের।
আধ সিদ্ধ চালের ওপর খানিক ঘি, মধু, কলা , তিল ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন "এটাকে ভালো করে মাখো"। হাত দিয়ে খানিক মাখার চেষ্টা করে আর পারলাম না, থরথর করে কাঁপছি, এর থেকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনও হয়নি। খুড়তুতো ভাই পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল হাত দিয়ে, সামনে থেকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে বড়দা, তাও পারলাম না, কোন মতে কয়েকবার চটকে দিয়ে দিলাম ভাইয়ের হাতে।
পুরুত ঠাকুর কইলেন, "এবার যে ঘি মাখাতে হবে মা!" কাকে? বাবাকে? আমি পারব না, কিছুতেই পারব না - টপ করে এক ফোঁটা চোখের জল টেবিলের কাঁচের ওপর এসে পড়াতে হুঁশ ফিরে পাই। কোথায় বাবা - বাবা আর নেই। বাবা মরে গেছে। যখন তখন এটা মনে হয় আর ছলকে যায় আঁখি। গতরাতেই তো, হাওড়া ময়দানে নেমে আর রাস্তা পেরোতে পারছিলাম না, কেবল মনে হচ্ছিল এই তো সেদিন এই তেলেভাজার দোকান থেকে ফাপড়া কিনে নিয়ে গেলাম বাবার জন্য। বাবা বলে গাঠিয়া, সাথে কুরানো কাঁচা পেঁপে সিদ্ধ আর লঙ্কা সিদ্ধ। বড্ড ভালোবাসত বাবা, সেদিন কেমন আমার সাথে বসে চা দিয়ে খেল আর আজ -।
অফিসে বসে একদম ভাবতে চাই না, তাও মনে পড়ে বুড়োর কথা। চেম্বারে কেউ ঢুকলে হাসি, পিছনে লাগি, গল্প করি, ফাইল ছাড়ি - ঘর ফাঁকা হলেই "ম্যায় ওর মেরি তানহাই "। মাঝে মাঝে পাগলের মত মস্তিষ্ক প্রক্ষালন করি, মুঠো ফোনে বাবার যাবতীয় পুরান রিপোর্ট ঝেড়ে দেখি কোথাও কিছু নির্ঘাত অবহেলা বা ভুল করেছি আমি। আমারই দোষে চলে গেছে বাবা, দোষটা কি সেটা না ধরতে পারা পর্যন্ত শান্তি পাব না। প্রিয় বন্ধু ফোন করে, রোজই করে, কেন করে ভগবান জানে। কখনও কেজো, কখনও অর্থহীন কথা বলি আমরা, আজ যেমন বলেই ফেলি মনের কথা -অপরাধ খুঁজে নিজেকে ফাঁসি দিতে চাই আমি। নির্ঘাত আমার দোষেই চলে যেতে হয়েছে বাবাকে -
বন্ধু বলে, " এটাই স্বাভাবিক। আমারও তাই মনে হয়, আজও। একদিন হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম বাবার অক্সিজেনটা ওরা কমিয়ে রেখেছে। ওটাই নাকি নিয়ম, আস্তে আস্তে প্রেসার কমিয়ে রুগীর ফুসফুসকে এডজাস্ট করায় -। সেদিন কিছু বলিনি,বাবা চলে যাবার পর প্রায় মনে হত, কেন বলিনি, বললে হয়তো একটু কষ্ট কম পেত । কে জানে হয়তো আরও কয়েকটা দিন বাঁচত লোকটা -"। আশ্বস্ত করি, একই ঘটনা ঘটছিল আমার বাবার সাথেও, আমি বলেও ছিলাম, ফলাফল লবডঙ্কা।
জানতে চাই, এই দমচাপা কষ্টের মেয়াদ আর কত দিন? বন্ধু বলে, " জানি না। এতদিন হয়ে গেল বাবা চলে গেছে, আজও একা থাকলে কেঁদে ফেলি বাবার কথা ভেবে। গয়ায় গিয়ে এত কষ্ট হচ্ছিল কি বলব, হিন্দু ধর্ম মতে গয়ায় পিণ্ডদান করলেই তো মুক্তি, কেবল মনে হচ্ছিল এবার বাবা সত্যিই আমায় ছেড়ে চলে যাবে -"। ঠিক এই একই কথা আমারও মনে হচ্ছিল ঘাট কাজের দিন।
বন্ধুর সাথে বার্তালাপের মধ্যেই আসে ফোনটা, অচেনা নম্বর, ধরতেই ওদিক থেকে এক বয়স্ক পুরুষ কণ্ঠ বলে ওঠে, "ম্যাডাম? আমাকে কি আপনার মনে আছে, আপনি যখন খড়গপুরে ছিলেন, আমি আপনার ইন্সপেক্টর ছিলাম। আমার নাম প্রশান্ত দাস -"।
হঠাৎ খুশি হয়ে ওঠে মনটা, হেসে বলি অবশ্যই মনে আছে প্রশান্ত বাবু," পিংলায় ছিলেন না আপনি! কিন্তু ইন্সপেক্টর বলছেন কেন, আমি থাকতে থাকতেই তো আধিকারিক পদে পদোন্নতি হয়েছিল আপনার।" ভদ্রলোক হেসে বলেন, " ম্যাডাম শুনলাম আপনি তমলুকে আছেন, আমি যদি ঘণ্টা দুয়েক পর যাই আপনার সাথে দেখা হতে পারে?" বলি আলবাত পারে, আপনি আসুন তো, দুইয়ের জায়গায় চার ঘণ্টা লাগলেও আমি অপেক্ষা করব।
ঘণ্টা দুই আড়াই পর, চেম্বারের দরজা ঠেলে যিনি প্রবেশ করলেন, তাঁকে দেখে পলকে মনে হল আমি বুঝি ২০০৭-৮ সালে আছি। একই রকম দেখতে আছেন ভদ্রলোক, মিশমিশে কালো চুলে সামান্য নুন মরিচের ছোঁয়া ছাড়া, সময় বিন্দুমাত্র থাবা বসাতে পারেনি ওনার উপর। বললেন ২০১২ সালে অবসর নিয়েছেন। বাকিটা রামদেব বাবার প্রাণায়াম আর সাথে প্রাতঃভ্রমণের সুফল। অনেক গল্প হল ভদ্রলোকের সাথে, পুরান ভুলে যাওয়া সাদাকালো যুগের গল্প। শৌভিকের খোঁজ নিলেন, তুত্তুরীর বয়স বলে দিলেন নিখুঁত ভাবে। ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে খড়গপুর ছেড়ে এসেছি, আজ এত বছর পরও যে ওনারা আমাকে তথা আমার পরিবারকে মনে রেখেছেন তাতে ধন্য হয়ে গেলাম। বর্তমান অফিসের সকল সহকর্মীকে ডেকে সগর্বে আলাপ করিয়ে দিলাম, দেখ আমার প্রথম ইন্সপেক্টর। আজও ভোলেননি আমায়। লোক মুখে খোঁজ পেয়ে ছুটে এসেছেন -
প্রশান্ত বাবু গল্প শোনান, তমলুক আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের সাথে ওনার সম্পর্ক অনেক প্রাচীন, ওনার জীবনের প্রথম পোস্টিং ছিল এই মহকুমায়। আমরা সাগ্রহে জানতে চাই, কোথায়? হেসে বলেন, " ময়না। তবে তখনও ময়না বিডিও অফিস তৈরি হয়নি, একটা ভাড়া বাড়িতে বসতাম আমরা।" জিজ্ঞাসা করি, সেটা কোন সাল? বৃদ্ধ দাড়ি চুলকে বলেন, " ১৯৭৬ থেকে ৮৪ আজ্ঞে -"। হরি হরি, তখন তো আমরা কেউই জন্মাইনি। প্রশান্ত বাবু হেসে কন, " আজ্ঞে, সেই ময়নার সাথে আজকের ময়নার কোন মিল পাবেননি।" একটু আগেই ময়না ব্লকের একটা বিশেষ পঞ্চায়েত এলাকার গল্প হচ্ছিল অফিসে, ময়নার সবথেকে ঝঞ্ঝাটিয়া পঞ্চায়েত ওটা। শুনেছি মুড়ি মুড়কির মত বোমা পড়ে ওখানে। গণ্ডগোল বাঁধলেই বঁটি কাটারি নিয়ে তেড়ে আসে ওখানকার প্রমীলা বাহিনী। আমি শুধাই, তখনও কি এমন রণপটু ছিল ঐ এলাকার নারী পুরুষ কুল? মারামারি হত? প্রশান্ত বাবু বলে ওঠেন, " বাবারে! একই ছিল ম্যাডাম। তবে তখন যে দুই দলের নামে ঝাড়পিঠ হত স্থানীয়দের মধ্যে, বর্তমান রাজ্য রাজনীতিতে তারা একেবারেই অপাংক্তেয়।" বুঝতে পারি, দল আসে, দল যায়, বদলে না মানুষের প্রকৃতি। ঝামেলা তখনও হত, এখনও হয়, নির্ঘাত ভবিষ্যতেও -। বেলা গড়ায়, প্রশান্ত বাবুকে ঠেলে তুলতে হয়, এবার বাড়ি যান। যাবার আগে অবশ্য ভয় দেখিয়ে গেলেন, " আবার আসব ম্যাডাম -"। মনে মনে বলি, অবশ্যই আসবেন, ভাগ্যিস এলেন, এই অপরিসীম শোকের হাত থেকে কিছুটা তো রেহাই পেলাম।
